শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকার বিবর্তন

সাইফ উল হক

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ওড়িশার দেওয়ানি (জনপ্রশাসন পরিচালনার সুযোগ) লাভ করে। ফলে অঞ্চলের প্রশাসন পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে এবং ঢাকার গুরুত্ব কমে যায়। সময়ে ইংরেজরা তাদের প্রতিষ্ঠিত নগর কলকাতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে একেই রাজধানীতে পরিণত করে। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে নবাবদের রাজধানী মুর্শিদাবাদও গুরুত্ব পাচ্ছিল। দেওয়ানির দপ্তরগুলো মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে রাজধানী হিসেবে ব্রিটিশদের কাছে কলকাতার গুরুত্ব বোঝা যায় ১৯১২ পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকে। ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের দালানের গঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মোগল আমলের পার্থক্য লক্ষ করা যায়, পার্থক্য ছিল স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে রেনেসাঁ, নব্য ধ্রুপদী, ইংরেজ গথিকদের অলংকরণশৈলীকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে। আবার কোথাও কোথাও স্থানীয়ভাবে শৈলী নির্মিত হয়েছে, যেমন ইন্দোসারাসেন। ইউরোপীয় ঘরানার ভবনগুলোকে স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্যও নির্মাণশৈলীতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ইংরেজ শাসনামলের প্রথমদিকে ঢাকায় তাদের নির্মিত ভবন ছিল নিমতলী কুঠি (১৭৬৬), এটি ছিল নায়েব নাজিম বা উপশাসকদের বাসভবন। কুঠির পশ্চিম দরজার নাম ছিল নিমতলী দেউড়ি’, যা এখনো বহাল তবিয়তে আছে। এই তোরণে অ্যাংলো-মোগল ঘরানার স্থাপত্যশৈলী দেখা যায়। কোম্পানি শাসকরা মোগল সুবাদার ইসলাম খার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিদর্শন হলো পোগোজ স্কুল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী নিকি পোগোজের উদ্যোগে স্কুলটি নির্মিত হয়। বর্তমান জায়গায় স্কুলটিকে নিয়ে আসা হয় এই শতকের শেষ দিকে। আরেকটি স্কুল হলো ব্রাহ্ম স্কুল, যার নাম বদলে হয় জগন্নাথ স্কুল এবং শেষ পর্যন্ত জুবিলী স্কুল নাম ধারণ করে। প্রথম বেসরকারি কলেজ স্থাপিত হয় ১৮৮৪ সালে, যার নাম ছিল জগন্নাথ কলেজ।

উনিশ শতকের শেষার্ধে ঢাকা কলেজকে আরো বড় জায়গায় স্থাপনের জন্য আগের জায়গা থেকে সরিয়ে রমনার উত্তরাংশের খোলামেলা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কার্জন হল নামে কলেজ বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯০৪ সালে এবং ১৯০৮ সালে এখানে স্থানান্তর হয় কলেজ। কলেজ ছাড়াও সেখানে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল দুটি ছাত্র হল নির্মাণ করা হয়। লাল রঙের দ্বিতল কার্জন হলটি ইন্দো-সারাসেন রীতির ভবন, যেটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন হিসেবে নির্মাণ করেছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল হলগুলোও এমনিভাবে নির্মিত হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল পরে পলাশীর কাছে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ধর্ম, প্রশাসন কিংবা শিক্ষাবিষয়ক ভবনগুলোর বাইরে আবাসিক ভবনেও ঔপনিবেশিক চরিত্র লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকে নির্মিত দুটি বাসভবনে এর চিহ্ন রয়েছে, দুটি হল নদীর ধারে নির্মিত রূপলাল হাউজ (উনিশ শতকের প্রথমার্ধে) আহসান মঞ্জিল। রূপলাল হাউজের মালিক ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে রূপলাল রঘুনাথ দাস এই বাড়িটি কিনে নেন। তারা যে বাড়িটি নির্মাণ করেন এর থাম থামের ঊর্ধ্বাংশে করিন্থিয়ান কলাম দেখা যায়। আহসান মঞ্জিল ছিল ফরাসি কারখানা, খাজা আলিমুল্লাহ এটি কিনে নেন এবং আবদুল গনি ১৮৭২ সালে এখানে এক প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করেন। ১৮৮৭ সালের ভয়ংকর ভূমিকম্পের পর ১৮৮৮ সালে বাড়িটি পুনর্নির্মিত হয়।

রমনায় অনেকগুলো উদ্যান বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন নবাবরা। তারা শাহবাগ নামে একটি বাগান তৈরি করেছিলেন, এই এলাকায় তারা যে বাড়ি তৈরি করেছিলেন তার একটি এখনো আছে। উনিশ শতকের শেষার্ধে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে জমিদার ব্যবসায়ীরা ঢাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ি তৈরি করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখনো আছে। সেগুলো হলো রোজ গার্ডেন (উনিশ শতকের শেষার্ধে), শঙ্খনিধি হাউজ (বিশ শতকের প্রথম দিকে) ভজহরি লজ (বিশ শতকের শুরুর দিকে) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারী আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি স্থানীয় জনগণের প্রবল প্রতিবাদের কারণে রদ করা হয় ১৯১১ সালে। এই স্বল্প সময়ের বঙ্গভঙ্গকালীন পূর্ব বাংলা আসাম প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। বঙ্গভঙ্গ ঢাকাকে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতে সে সময়ে নিযুক্ত ইংরেজ ভাইসয়র লর্ড নাথানিয়েল কার্জন। এর মানে এই নয় যে আগে ঢাকা রাজধানী ছিল না। ইংরেজ শাসনের প্রথম পর্ব থেকে এই নগরী অবহেলিত ছিল। নাগরিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯০৫ সালে রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ার পর এর ব্যাপক বিকাশ ঘটে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভবন নির্মাণ করা হয় নতুন প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনার প্রয়োজনে। নতুন রাজধানীর কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পছন্দ করা হয় রমনার উপকণ্ঠ। এটি ছিল মোগলদের বাগান, কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দিকে সৌন্দর্য হারিয়ে তা বসবাসের জায়গায় পরিণত হয়। একটি রেসকোর্স সংযুক্ত ক্লাব, বিত্তশালীদের কয়েকটি বাগানবাড়ি এবং সাধারণের কুঁড়েঘর পাশাপাশি ছিল। এলাকাটি মূল শহরের বাইরে রেললাইনের দিকে ছিল। যা সে সময়ের শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। রেললাইন এবং স্থানীয় অধিবাসীদের কারণে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও প্রথমে রেললাইন সরিয়ে নেয়া দ্বিতীয় পর্যায়ে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়।

পরিবর্ধিত নতুন শহরে বাড়িগুলোর লাগোয়া বাগান লক্ষ করা যায়। একটা বাড়ি থেকে আরেকটা বাড়ি পর্যন্ত বেশ খানিকটা জায়গা আলো-হাওয়ার জন্য ফাঁকা থাকে। বাড়িগুলোর মাঝে যোগাযোগ রাখার জন্য আঁকাবাঁকা পথও ছিল। এই ভবন নির্মাণে শহরের অল্প কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ভূমিকা রেখেছেন। শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনার নাম ছিল সিভিল স্টেশন সরকার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে প্রকল্পটি গ্রহণ করায় স্বল্প সময়ে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ভবন নির্মিত হয়।

এই ভবনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সরকারি আবাস গভর্নমেন্ট হাউজ সচিবালয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের পরামর্শে এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অনুমোদনে বেশির ভাগ ভবনের পরিকল্পনা এবং অঞ্চল পরিকল্পনার কাজটি করে কলকাতাভিত্তিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। গভর্নমেন্ট হাউজ এবং সচিবালয় ছাড়াও সরকারি আমলাদের বাসভবন, কেরানিদের কোয়ার্টার এবং আরো কিছু ভবন ছিল পুরো পরিকল্পনাভুক্ত। ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের নির্মাণও এই নতুন নগরের নির্মাণ পরিকল্পনার মাঝে ছিল। কার্জন হলের স্থাপত্য পরিকল্পনাও এই নতুন ভবন নকশা পরিকল্পনার অংশ ছিল। ফলে নতুন রাজধানীর বর্ণনায় এলাকাকেও রাখা যেতে পারে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ কাঠামোর ভবন নতুন গভর্নমেন্ট হাউজটি রেসকোর্সের দক্ষিণে এবং কার্জন হলের উত্তরে ছিল। ষাট একর জমির ওপর নির্মিত গভর্নমেন্ট হাউজটির দুটি ভাগ ছিল, একটি হলো উত্তর আর অন্যটি দক্ষিণ। ভাগ দুটির মাঝে সংযোগ রেখেছে স্তম্ভ সারিবিশিষ্ট দুটি লম্বা টানা বারান্দা। যার একটি পূর্বদিকে আর অন্যটি পশ্চিমে। দক্ষিণ ভাগে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হতো গভর্নমেন্ট হাউজসংলগ্ন রাস্তার দিকে মুখ করে। অন্যদিকে রেসকোর্সমুখী উত্তর ভাগে পারিবারিক অনুষ্ঠানাদি আয়োজন করা হতো। অলংকৃত গম্বুজ দক্ষিণ ভাগে স্থাপিত। এই বাসভবনে একটি কার্যালয়, মিলনায়তন, বিনোদনকেন্দ্র এবং বিশালাকৃতির বসার থাকার ঘর রয়েছে। বাসভবনের পূর্ব পশ্চিম দিকের দুটি সংযুক্ত ভবনে বড় রান্নাঘরসহ আরো কয়েকটি ঘর আছে। দক্ষিণ-পূর্বদিকে ইউরোপীয় রেনেসাঁর স্থাপত্য অনুসারে একটি তোরণ ছিল। ১৯০৭ সালে শুরু হয়ে গভর্নমেন্ট হাউজের নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১০ সালে।

সব দপ্তরের প্রধান কার্যালয় একটি ভবনে রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকে নতুন রাজধানী ঢাকায় সচিবালয় ভবন তৈরি করা হয়। এছাড়া গভর্নমেন্ট হাউজ এবং সচিবালয় ছিল নতুন রাজধানী তৈরির স্মারক। সচিবালয় ভবন তৈরিতে যথেষ্ট তাড়াহুড়া করা হয়েছে, যার ফলে প্রাথমিক প্রস্তাবটি সংশোধন করতে হয়েছে। ইংরেজি এইচঅক্ষরাকৃতির ভবনে তিনটি ত্রিকোণ ছিল, যেখানে মধ্যবর্তী জায়গাটি পাশের চেয়ে লম্বা। সচিবালয় ভবনটি উত্তর-পূর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী ছিল। সেক্রেটারিয়েট রোডের দিকে মুখ করে ভবনটি ঢাকা কলেজের খেলার মাঠমুখী ছিল। দোতলা ভবনের স্তম্ভ, খিলান কার্নিশে সাধারণ অলংকরণ ছিল, ছাদে ছিল ছোট দেয়াল। নতুন রাজধানীতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কেরানিদের জন্য বাসভবন নির্মিত হয়েছে। প্রশাসনিক বিচারালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাসভবন ছিল রেসকোর্সের উত্তর-পূর্ব পশ্চিম দিকে। সেসব ভবনের কিছু কিছু এখনো রয়েছে। সেগুলো হলো প্রধান বিচারপতির বাসভবন, মন্ত্রীপাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন, চামেরি হাউজ এবং বর্ধমান হাউজ। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রমনার অধিকাংশ জায়গা ভবন বিশ্ববিদ্যালয়কে হস্তান্তর করা হয়। সে সময়ে ছাত্রদের আবাসিক হলসহ অল্প কয়েকটি ভবন নির্মাণ করা হয়, যেগুলোর মধ্যে ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (১৯২৯) জগন্নাথ হল।

১৯৪৭ সালের পর ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি ঘটা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ঘরানার স্থাপত্যরীতি দেখা যায় সরকারি বেসরকারি স্থাপনায়। বর্তমান সময়েও এই রীতির বেশকিছু ভবন তৈরি হতে দেখা যায়। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ঔপনিবেশিক আমলের অনেকগুলো ভবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষণের নীতি প্রণয়ন যথাযথ উদ্যোগ নেয়া না হলে ভবনগুলোকে স্থিরচিত্র এবং দলিলপত্র ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। (পুনর্মুদ্রণ)

 

সাইফ উল হক: স্থপতি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন