মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

মুসলিম ও ইউরোপীয় স্থাপত্যিক উপকরণে তৈরি আহসান মঞ্জিল

ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ঊনবিংশ বিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি নির্মিত হয়। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ঢাকার নবাবদের নির্মিত আহসান মঞ্জিল। এছাড়া হিন্দু জমিদাররা ঢাকায় অনিন্দ্যসুন্দর অট্টালিকা নির্মাণ করেন। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্যরেবতীমোহন দাস ভবন, মথুর নায়েব চক্রবর্তীর ভবন, যতীন্দ্র কুমার শাহের ভবন, রূপলাল হাউজ, হূষীকেশ দাসের বাগান (রোজ গার্ডেন), শঙ্খনিধি হাউজ, ভজহরী লজ (বর্তমানে সলিমুল্লাহ কলেজ)

সূত্রাপুর বাজার থেকে যে রাস্তাটা ডালপট্টির একরামপুর পর্যন্ত চলে গেছে, তার ডান পাশে তাকালে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গ্রিক কলাম ব্যবহূত একটি ত্রিতল জমিদারি ভবন দেখা যাবে। রেবতীমোহন লজ নামে অনিন্দ্যসুন্দর ইমারতটি ভগ্নাবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে সরকারের দখলে ইমারতটিতে সিভিল ডিফেন্সের প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া মদনমোহন বসাক, যা বর্তমানে টিপু সুলতান রোডে যে বিশালাকার অট্টালিকা রয়েছে, তা নির্মাণ করেন জমিদার ভজহরী। ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যাবে ইমারতে।

. আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, ঊনবিংশ শতাব্দী

বুড়িগঙ্গার উত্তর তীরে ঢাকার সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কুমারটুলি এলাকায় ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ জমিদারের সদর দপ্তর। ইসলামপুর হয়ে ওয়াইজঘাট এবং ব্যাকল্যান্ড বাঁধ দিয়ে আহসান মঞ্জিলে যাওয়া যায়। এছাড়া ইসলামপুরের নবাববাড়ি গেটের ভেতর দিয়ে যেসব গলি আছে, তা দিয়েও আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। এক সময় এখানে ফরাসিদের একটি কুঠি ছিল। ১৮৩৮ সালে খাজা আলিমউল্লাহ কুঠি কিনে নেন। তিনি খাজা স্যার সলিমুল্লাহর দাদা ছিলেন। বর্তমান আহসান মঞ্জিলটি ছিল ভগ্নপ্রাপ্ত ফরাসিকুঠি এবং ১৮৭২ সালে নবাব স্যার আবদুল গণি এটি নির্মাণ করেন। তার ছেলে নবাব স্যার আহসানউল্লাহর নাম থেকে এটি নাম রাখেন আহসান মঞ্জিল। ১৮৮৮ সালে আহসান মঞ্জিল টনের্ডোয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি জাদুঘর।

আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস খুব প্রাচীন। কথিত আছে, মোগল আমলে এখানে জামালপুর (ফরিদপুর, বরিশাল) পরগণার জমিদার শেখ এনায়েত উল্লাহর একটি রংমহল ছিল। পরে তার পুত্র মতিউল্লাহর কাছ থেকে রংমহলটি ফরাসি বণিকরা কিনে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। ১৮৩৮ সালে খাজা আলিমউল্লাহ ফরাসিদের কাছ থেকে কুঠিবাড়িটি কিনে নিয়ে সেটি সংস্কার করে তা নিজের বাসভবনে পরিণত করেন। ১৮৭২ সালে খাজা আবদুল গণি নতুন নকশা প্রণয়ন করে বর্তমান আহসান মঞ্জিল নির্মাণ করেন। তিনি ম্যাটিন অ্যান্ড কোম্পানি নামের এক ইউরোপীয় নির্মাণ সংস্থাকে একটি মাস্টার প্লান তৈরি করতে বলেন।

. দানী আহসান মঞ্জিলের বিস্তারিত বিবরণ দেন। আহসান মঞ্জিলের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এর প্রাসাদোত্তম অট্টালিকা। একটি বিশাল চতুর্ভুজের মাঝখানে সুউচ্চ ভিত্তের ওপর এটি স্থাপিত। আহসান মঞ্জিল দ্বিতলবিশিষ্ট এবং মধ্যভাগে একটি গম্বুজ রয়েছে। বুড়িগঙ্গার নদীর সম্মুখ দিক থেকে ব্যাকল্যান্ড বাঁধের সামনে দিয়ে ভবনে প্রবেশ করতে হয়। অসংখ্য সিঁড়ি পার হয়ে দ্বিতলে উঠতে হয়। দ্বিতলে তিন খিলানবিশিষ্ট পোর্টালের মধ্য দিয়ে ভেতরে যাওয়া যায়। খিলানগুলো ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে খাঁজকাটা, পিলাস্টার, গোলাকার খিলান। কার্নিশমোল্ডিং, কিয়স্ক প্যারাপেট দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে। গম্বুজটি অষ্টকোণাকার ড্রামের ওপর থেকে উপরে উঠে গেছে। গম্বুজের নিচে চতুষ্কোণাকার কক্ষটি অভ্যর্থনা কক্ষ হিসেবে ব্যবহূত হয়। মধ্যভাগে কক্ষটি ডানদিকে দুই ভাগে বিভক্তপূর্ব পশ্চিম প্রান্ত। পূর্ব দিকে বৈঠকখানা রয়েছে এবং পশ্চিম দিকে নাচঘর বা বলরুম শয়নকক্ষ। উত্তর দক্ষিণ দিকে ভল্টের বারান্দা দেখা যাবে। এর সম্মুখে মধ্যভাগে একটি খোলা টেরেস বা পোর্টিকো। অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনের কক্ষটিতে প্যাঁচানো সিঁড়ি নির্মিত হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নিচের তলায় যাওয়া যায়। দ্বিতলের ভূমি-নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে নিচের তলার কক্ষগুলোকে সাজানো হয়েছে। পূর্ব দিকে দরবার কক্ষ এবং পশ্চিম দিকে ভোজনকক্ষ রয়েছে।

আহসান মঞ্জিল মুসলিম ইউরোপীয় স্থাপত্যিক উপকরণের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতল আকারে নির্মিত মূল ভবনটি রংমহল ১২৫-২৭-৭৫ মিটার আয়তন, মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। নিচতলার মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত মিটার অর্থাৎ ১৬ ফুট ইঞ্চি এবং দোতলায় - মিটার। আহসান মঞ্জিলের মধ্যভাগে ড্রামের ওপর গম্বুজ নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ দিকে অসংখ্য সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যাওয়া যায়। প্রাসাদের উভয় তলায় উত্তর দক্ষিণ দিক অর্ধবৃত্তাকার খিলান সহযোগে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা কক্ষগুলোর মেঝে মার্বেল পাথরে শোভিত।

বৃহদাকার চতুর্ভুজ ক্ষেত্রের মাঝখানে দ্বিতলের ছাদের ওপর আকর্ষণীয় বিশাল গম্বুজটি স্থাপিত। গম্বুজের শীর্ষে একটি ফিনিয়াল শোভা পাচ্ছে।

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ কর্তৃক ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত আর্কিটেকচারাল কনজার্ভেশন বাংলাদেশ নামক গ্রন্থে প্রখ্যাত স্থপতি শাহ আলম জহিরুদ্দীন History of Architectural conservation and Government initiatives in Bangladesh.প্রবন্ধে বলেন, ‘যদিও অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর মুঘল স্থাপত্যের কৃত্রিম প্রতিফলন দেখা যায়, তবুও জাগতিক ইমারতসমূহে ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। চতুর্ভুজের মধ্যভাগে বিশালাকার প্রাসাদ আহসান মঞ্জিলটি ইউরোপীয় স্টাইলে নির্মিত, যাতে ভারতীয় (মোগল) প্রভাব বিদ্যমান। মধ্যভাগে তিন খিলানবিশিষ্ট পোর্টালটিতে মোগল স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে। নিম্নভাগে প্লাস্টারের অলংকরণ আওনিক স্তম্ভ, গোলাকার খিলান ইউরোপীয় ধাঁচে সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া গম্বুজের আকৃতি গঠন এবং নির্মাণকৌশল অষ্টকোণাকার ড্রাম সবই ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত। প্যারাপেট নকশা, প্লাস্টারে কাটামোটিভ, স্তম্ভের ওপর নির্মিত কিয়স্ক ভারতীয় স্থাপত্য রীতির প্রতিফলন।

শাহ আলম জহিরুদ্দীন আহসান মঞ্জিলের একটি ভূমি-নকশা দিয়েছেন। তিনি ১৯০৪ সালের একটি আলোকচিত্র বিলাত থেকে সংগ্রহ করে তার ওপর ভিত্তি করে ভগ্নপ্রাপ্ত আহসান মঞ্জিল পুনর্নির্মাণ করেন। তার দক্ষতা দূরদর্শিতা অসাধারণ। আহসান মঞ্জিলের প্রথম দ্বিতীয় তলার যে ভূমি-নকশা দিয়েছেন, তা থেকে ধারণা করা যায়, আহসান মঞ্জিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাসাদ। যেমন বার্কিংহাম প্যালেস বা উইন্ডসর ক্যাসল। প্রথম তলায় যেসব কক্ষ, পোর্টিকো, লবি, বারান্দা, নিরাপত্তা (strong) কক্ষ, তোষাখানা, বিলিয়ার্ড রুম, বিশ্রাম কক্ষ, প্যান্ট্রি, অফিস রয়েছে তা নকশায় দেখা যাবে। অনুরূপভাবে দ্বিতলে লবি, শয়নকক্ষ, নাচঘর, দরবার ঘর, ভোজন কক্ষ, খাসমহল, শৌচাগার, বসার ঘর, কাড ঘর নকশায় দেখানো হয়েছে। ১৯৮৯ সালে আহসান মঞ্জিলের সংস্কারের কাজ শেষ হয়।

আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পাকিস্তানের প্রথম পর্ব পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছর ধরে ভবনটি বাংলার মুসলিম জাগরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে পূর্ববাংলা আসামকে নিয়ে যখন একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠিত হয়, তখন ঢাকা প্রদেশের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। পঞ্চায়েত প্রশাসনের প্রধান ঢাকার নবাবরা প্রায় প্রতিদিন সালিশি দরবারে বসতেন। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী নবাব আহসানউল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে কংগ্রেসবিরোধী বহু সভা-সমিতি অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার নবাব পরিবার ঢাকার আর্থসামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখে। ১৮৭৪ সালে নবাব আবদুল গণি প্রথম ঢাকায় ওয়াটার ওয়ার্কস শোধনাগার স্থাপন করে পানির সংকট দূর করেন। বড় লাট লর্ড নর্থব্রুক যার নাম থেকে লালকুঠি বা নর্থব্রুক হলের নামকরণ হয়েছে, ১৮৭৪ সালে ঢাকায় এসে ওয়াটার ওয়ার্কস উদ্বোধন করেন। এছাড়া ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন ঢাকায় এসে আহসান মঞ্জিলে অবস্থান করেন। বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার সমর্থনে ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন ঢাকায় এসে ১৮ ১৯ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে রাত্রি যাপন করেন। তিনি নবাব সলিমুল্লাহর আতিথ্য গ্রহণ করেন। এখান থেকে বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হয়ে ১৯০৫ সালে। পূর্ববাংলা আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ ঘোষিত হয় এবং ১৯১১ সালে এই ভবন থেকেই বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষিত হয়। কিন্তু সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ১৯০৬ সালে আহসান মঞ্জিলে মুসলিম লীগের জন্ম। শাহবাগ অঞ্চলে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম লীগ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। মুসলিম লীগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার ফলে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েম হয়।

আহসান মঞ্জিল এখন জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে একটি আকর্ষণীয় জাদুঘর। এখানে বিভিন্ন কক্ষে আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, পেন্টিং, মূল্যবান দ্রব্যাদি প্রদর্শিত হচ্ছে। ইসলামী শিল্পকলা’ (২০০৯) গ্রন্থে প্রকাশিত আহসান মঞ্জিল: ঐতিহাসিক স্থাপত্যিক গুরুত্বশীর্ষক প্রবন্ধে জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষে সংগৃহীত প্রদর্শিত বীযরনরঃ সমূহের আলোকচিত্র দেখা যাবে। এগুলোর মধ্যে মুসলিম লীগ কক্ষ, ডাইনিং রুম, বৈঠকখানা, অষ্টকোণাকার ইতালিয়ান মার্বেলে সজ্জিত টেবিল, ফিলিগ্রি কাজের রূপের আতরদান, হীরক, মুক্তাসংবলিত মূল্যবান অলংকার দরিয়া--নূর এছাড়া তৈলচিত্র, অস্ত্রশস্ত্র, তৈজসপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, কাষ্ঠ খোদাইকৃত আকর্ষণীয় আসবাবপত্র, যোদ্ধাদের ব্যবহূত coat of mail ফিলিগ্রি কাজের ব্যাপার আহসান মঞ্জিলের মডেল এবং হাতির দাঁতের শৌখিন দ্রব্যাদি। (ঢাক থেকে ঢাকা গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রণ)

 

. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান: ইতিহাসবিদ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন