শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

ভবনে সাংস্কৃতিক প্রভাব

জাকিয়া রহমান ঋতা

সোনার বাংলা বলে একসময় বাংলার সুখ্যাতি ছিল। কাজল মাটির বাংলার রূপ-গুণ সমৃদ্ধির আকর্ষণে দেশে এসেছে নানা দেশের পর্যটক, ভাগ্যান্বেষণে এসেছে অনেক ব্যবসায়ী, শাসন করতে এসেছে ভিনদেশী জাতি। প্রথমে উপমহাদেশ এবং ক্রমান্বয়ে তত্কালীন বাংলায় বাণিজ্যের পথ সুগম করে দেন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা। ১৪৯৭ সালে ভারতের কালিকট বন্দরে তার আগমনের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে বহির্বাণিজ্যের দরজা খুলে যায়। আস্তে আস্তে বিদেশী বণিক সম্প্রদায় বাংলার অফুরন্ত সম্পদ সমৃদ্ধির সুযোগের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয় এবং ইউরোপের নানা স্থান থেকে তারা দেশে আসতে শুরু করে। মোগল যুগে বাংলার শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক সার্বিক উন্নতি সাধন হয় মাটিতে। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও পথ ধরেই বাংলায় তাদের কার্যক্রম শুরু করে। পর্তুগিজ ইংরেজ ছাড়াও তখন এসেছিল ফরাসি, ওলন্দাজ, আর্মেনীয়, গ্রিক প্রভৃতি ইউরোপীয় জাতি। এসব বিদেশীর দল ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর  তাদের আধিপত্য বিস্তার লাভ করতে থাকে। ১৬৯০ সালে জব চার্নক কলকাতার গোড়াপত্তন করেন। এভাবে ইউরোপীয় বণিকরা ক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি অতিক্রম করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতিকে প্রকাশ করতে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয় মূলত ১৭৫৭ সালে, যখন সে সময়ের বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার (ওড়িশা) শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা নির্মমভাবে পরাজিত নিহত হন মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ইংরেজদের কুচক্র বিচক্ষণতার কারণে। এভাবে ইংরেজদের সংস্পর্শে এসে বাংলার মধ্যযুগের অবসান হয়, শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসন; যা স্থায়ী হয় প্রায় দীর্ঘ ২০০ বছর। তবে আধুনিক যুগে এসেও ইংরেজ শাসনের সেই প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে কতটুকু কার্যকর ছিল বা এখনো আছে, তা কিন্তু ভাবার বিষয়!

কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর ক্রমে সোনার বাংলার জ্যোতি সমৃদ্ধি যেন নিঃশেষ হতে থাকে। ঘটে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (বাংলা ১১৭৬, ইংরেজি ১৭৭০) শাসকগোষ্ঠীর হাতে পরিবর্তিত হতে থাকে বাংলার চিত্রপট, তত্কালীন রাজধানী ঢাকার সার্বিক প্রেক্ষাপট। আবহমান কাল ধরে শাসকশ্রেণী কিংবা সমাজের প্রভাবশালী সম্প্রদায় স্থাপত্যের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা, আধিপত্য এবং সে সময়ের সামাজিক-অর্থনৈতিক আবহকে প্রতিফলিত করতে সচেষ্ট হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলেও এর তারতম্য ঘটেনি। তাই বাংলাদেশের নানা জেলায় দেখা যায় উপনিবেশ বাংলার বিচিত্র স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। তবে ২০০ বছরের শাসনামলে অন্যান্য উপনিবেশগোষ্ঠী অপেক্ষা ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী নির্মিত ইমারতগুলো বেশি দৃশ্যমান। ঢাকা রাজধানী এবং প্রধান একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হওয়ায় নগরে রয়েছে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনের বিচিত্র সমাহার।

মোগল আমলের সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ইউরোপীয়দের আগমন উজ্জীবিত হতে থাকে। পর্তুগিজ বণিকরা প্রথম ইউরোপীয়, যারা ঢাকায় বাণিজ্যের জন্য আগমন করে। পর্তুগিজ ওলন্দাজদের পরে আসে ইংরেজরা। সম্ভবত সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকেই পর্তুগিজরা শহরে আসে এবং ঢাকার নিকটবর্তী শ্রীপুরে বসতি স্থাপন করে। পরে অবশ্য ইসলামপুর, শরাফতগঞ্জ নবাবপুরে তারা বাড়িঘর নির্মাণ করে। বর্তমান তেজগাঁও এলাকায় ছিল তাদের কুঠিবাড়ি এবং গির্জা। বলা হয়, গির্জাটিই ছিল ঢাকার সবচেয়ে পুরনো গির্জা। পর্তুগিজ বণিকদের কাছাকাছি সময়ে আসে ওলন্দাজরা এবং ১৬৬৩ সালের দিকে বর্তমান মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় তারা স্থাপন করে তাদের কুঠিবাড়ি। তেজগাঁও এলাকায়ও ছিল তাদের কুঠিবাড়ি। তাদের স্মৃতি বহন করে চলেছে নারিন্দার খ্রিস্টান কবরস্থান, যেখানে রয়েছে ওলন্দাজ কুঠির প্রধান ডি ল্যাংহিটের সমাধি।

ওলন্দাজদের পর দেশে আসে ইংরেজরা। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জেমস হার্ট নামের এক ইংরেজ ব্যক্তি ঢাকায় প্রথম পদার্পণ করেন ১৬৫৮ সালে। তেজগাঁওসহ বর্তমান খামারবাড়ি এলাকায় তারা তাদের কুঠি স্থাপন করে। খুব সাম্প্রতিক কালে পুরনো লাল ভবনের অনেকগুলোই ভেঙে তৈরি করা হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীসমৃদ্ধ ভবনগুলো। কালের গর্ভে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন।

কোম্পানি আমলে ইংরেজদের তৈরি স্থাপত্যকর্মে মূলত দেখা যায় বসতবাড়ি কুঠি। কিন্তু ব্রিটিশরাজ শাসনভার হাতে নেয়ার পর এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা ধরনের ভবন; আবাসিক, প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রভৃতি। ২০০ বছরের দীর্ঘ সময়ে এভাবে বাংলার স্থাপত্যে পাশ্চাত্য ধারা খুব জোরালোভাবে প্রভাব বিস্তার করে। শুধু স্থাপত্যকর্মেই নয়, প্রভাব দেখা যায় বাঙালির সামাজিকতায়, শিক্ষাক্ষেত্রে তথা সমগ্র জীবনযাত্রায়।

পুরান ঢাকার আর্মানিটোলা এলাকা, আর্মানিটোলা স্কুল বা পোগজ স্কুল, আর্মেনীয় গির্জা অনেকের কাছেই পরিচিত কিছু নাম। এগুলো আজো বহন করে চলেছে তত্কালীন ঢাকায় ঔপনিবেশিক আমলের বিত্তশীল প্রভাবশালী আর্মেনিবাসীদের ঢাকার জীবন। সম্ভবত সপ্তদশ শতকের মোগল আমলেই তারা ঢাকায় এসেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য করে ভাগ্য বদলাতে। তাদের কোনো কোনো বংশধর অনেকদিন পর্যন্ত ছিল দেশে। মুনতাসীর মামুন তার ঢাকা স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী বইতে উল্লেখ করেছেন, ১৯৮৪ সালে স্টেফান নামের একজন আর্মেনীয় বংশধর নারায়ণগঞ্জে থাকতেন। আর্মেনীয় গির্জার দেখাশোনা করতেন তিনি। আর্মেনীয়দের উদ্যোগে এবং শহরের ম্যাজিস্ট্রেট সের কার্যকরী ভূমিকায় ১৮২৬ সালে কাটা হয় একটি খাল, যা বুড়িগঙ্গার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে আবর্জনা নিষ্কাশনে সহায়তা করত। পোগজ, আরাতুন কিংবা পানিয়াটি প্রভৃতি ধনী আর্মেনীয় পরিবারের উদ্যোগ পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার স্থাপত্যে আসে বেশকিছু পরিবর্তন। নিজেদের বসবাসের জন্য তারা নির্মাণ করেছিলেন প্রাসাদতুল্য সব ইমারত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফরাশগঞ্জের বিখ্যাত রূপলাল হাউজ, যা নির্মাণ করেছিলেন আরাতুন। এদিকে নিকি পোগজের বাড়িটি ছিল বর্তমান বাফা অবস্থানে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ছিল তাদের কুঠি, বাগানবাড়ি এবং দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও আর্মেনীয়রা শহরের নানা ধরনের উন্নয়ন কার্যকলাপ বা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। তারই ফলস্বরূপ দেখা যায় শাঁখারী বাজারের নিকটবর্তী বিখ্যাত পোগজ স্কুল, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিকি পোগজ। এদিকে আরাতুন ছিলেন নরমাল স্কুলের অধ্যক্ষ।

আর্মেনীয় জমিদার আরাতুনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল রূপলাল হাউজের প্রাথমিক ভবনটি। পরবর্তীতে বাঙালি জমিদার রূপলাল দাস আরাতুনের কাছ থেকে বাড়ি কিনে নেন এবং তত্কালীন মার্টিন কোম্পানিকে দিয়ে ভবনটি পুনরায় নির্মাণ করেন। সম্মুখে বিশাল ডরিক কলামসংবলিত গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বাড়ি অবশ্য ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাড়ির ওপর যে প্রকাণ্ড ঘড়িটি অনেক দূর থেকে দেখা যেত এবং আশপাশের অনেককে সময় জানিয়ে দিত, ভূমিকম্পে সেটা ভেঙে গেলে পরবর্তীতে তা আর নতুন করে বসানো হয়নি।

ফরাসিরা ঠিক কবে বাংলায় এসেছিল, তার সঠিক সময়টা না জানা গেলেও এটা জানা যায় যে ইংরেজদের পরে ছিল তাদের আগমন। তারা আহসান মঞ্জিলের নিকটবর্তী ফরাশগঞ্জ এলাকায় তাদের কুঠি স্থাপন করেছিল আর বর্তমান তেজগাঁও এলাকায় ছিল তাদের বাগানবাড়ি। ফরাসিরা দেশে ১৮৩০ সালের দিকে এলেও ব্যবসায় তেমন প্রসার লাভ করতে না পারায় তাদের কুঠি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ১৭৮৪ নাগাদ। ঢাকার জমিদার খাজা আলিমউল্লাহ আঠারো শতকের ত্রিশ দশকের কোনো এক সময়ে ফরাসি কুঠিয়ালদের কাছ থেকে বুড়িগঙ্গার তীর-ঘেঁষা একটি কুঠিবাড়ি কিনেছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৭২ সালে নবাব আবদুল গণি বাড়িটিকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন এবং পুরনো নাম রংমহল’-এর পরিবর্তে এর নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল ১৮৮৮ সালে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় অগ্নিকাণ্ডে প্রাসাদসম ভবনটি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সেটিকে আবারো নির্মাণ করা হয় এবং নতুন করে সংযোজন করা হয় মাঝ অংশের গম্বুজটি। দ্বিতল ভবনের বিন্যাসে ছিল ইউরোপীয় কায়দার বৈঠকখানা, বলনাচের হলঘর, লাইব্রেরি, খাবারঘর, দরবার হল, নবাব পরিবার অতিথিদের জন্য শোয়ার ঘর প্রভৃতি।

ইংরেজ শাসনামলে বাংলার সামাজিক পরিমণ্ডলে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। নানা রকম সমাজ সংস্কার, ইংরেজদের শিক্ষা আইন ব্যবস্থার প্রবর্তন, শহর তৈরি প্রভৃতির মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের জোয়ার আসে দেশে, ঢাকা নামের শহরে। নির্মিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোর্ট, পৌরসভা পিডব্লিউডি। এসব নাগরিক সুবিধার প্রসার ঘটেছিল নানা রকম প্রাতিষ্ঠানিক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে। যেমন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্ট বিল্ডিং টাউন হল, কমিউনিটি সেন্টার প্রভৃতি। শাসনকর্তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বসবাস করার সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে তৈরি হয়েছিল অনেক ধরনের আবাসিক প্রশাসনিক অফিস ভবন। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসারের জন্য তৈরি হয়েছিল সিভিল সার্জনের কার্যালয়, হাসপাতাল প্রভৃতি এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির রাস্তাঘাট, উদ্যান ইত্যাদি।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরাজের সময়কালের এসব ইমারতের স্থাপত্যশৈলী বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটি মিশ্রধারা তৈরি করেছিল, যা ছিল প্রথমত সেসময়কার ইসলামী; যা মূলত মোগল দ্বিতীয়টি ইউরোপীয় স্থাপত্য দুই শৈলীর সংমিশ্রণে উদ্ভূত। মোগল স্থাপত্যের আর্চ, গম্বুজ, প্রতিসমতা বা সিমেট্রি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইউরোপীয় স্থাপতিক উপকরণগুলো। ঢাকায় ইংরেজ বা ব্রিটিশরাজ কর্তৃক নির্মিত উল্লেখযোগ্য ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত সুপরিচিত কার্জন হল, পুরনো হাইকোর্ট ভবন, সলিমুল্লাহ হল, বর্ধমান হাউজ, নর্থ ব্রুক হল, রোজ গার্ডেন আরো কত কী!

সুবিখ্যাত কার্জন হল পুরনো হাইকোর্ট দুটি ভবনের নির্মাণকাল একই সময়ে। ১৯১০ সালে তত্কালীন রাজধানী ঢাকায় কার্জন হল তৈরি হয় সরকারের অ্যাসেম্বলি টাউন হল হিসেবে। অন্যদিকে হাইকোর্ট ভবনটি প্রাথমিকভাবে নির্মাণ করা হয় বড়লাটের আবাসস্থল হিসেবে। সজীব সবুজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের সুবিস্তৃত কার্জন হলটির স্থাপত্যশৈলীতে ইউরোপীয় অপেক্ষা মোগল স্থাপত্যের প্রভাব বেশি। ছোট ছোট গম্বুজ, অষ্টকোণসংবলিত স্তম্ভ মিনার, হলঘরের চারপাশের চওড়া বারান্দা, দেয়ালে খিলান বা আর্চের সমারোহ, দেয়ালের থেকে বেরিয়ে আসা কার্নিশ ব্র্যাকেটের সুচিন্তিত বিন্যাস সবকিছু মিলিয়ে ভবনটি একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যিক নিদর্শন হিসেবে আজো ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলিয়ের জনপ্রিয় স্থান শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্র বা টিএসসির অভ্যন্তরে রয়েছে বর্গাকৃতির এক কাঠামো, যা গ্রিক উপনিবেশের স্বাক্ষর বহন করে। গ্রিক মেমোরিয়াল নামের ছোট স্মৃতিস্তম্ভ কাঠামোর চারপাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে অভিক্ষিপ্ত অংশ, যেখানে ঢেউ খেলানো বা ফ্লুটেড উপরিতলবিশিষ্ট ডরিক কলামের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ত্রিকোণাকৃতির পেডিমেন্ট।

পূর্ববঙ্গ আসাম সরকারের গভর্নরের বাসস্থান হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল পুরনো হাইকোর্ট ভবন। সাদা রঙের ইমারত নির্মাণ হয়েছিল মূলত ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে, যদিও ভবনের মাঝ বরাবর উপরের গম্বুজটি নেয়া হয়েছিল মোগল স্থাপত্য থেকে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্থাপত্য ধারায় তৈরি চমত্কার ভবনটির বৈশিষ্ট্যে দেখা যায় প্রতিসম প্ল্যানসংবলিত একটি দোতলা ভবন, যার সম্মুখের মধ্যভাগে ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয় পোর্চ, যেখানে করেনথিয়ান স্তম্ভ বা কলামের ওপর ছিল ত্রিকোণাকৃতির পেডিমেন্ট। ভবনের ছাদ বা উপরিতলের মধ্যভাগে ছিল মোহনীয় এক গম্বুজ, যা মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বৃত্তাকারে সুসজ্জিত কতগুলো স্তম্ভের ওপর। ভবনের মাঝ বরাবর উঠে গেছে মার্বেল আচ্ছাদিত নাটকীয় সিঁড়ি। দোতলায় দুই পাশে দীর্ঘ বারান্দা, সব মিলিয়ে এক অভিনব, মোহনীয় আবহ। কিন্তু ভবন নির্মাণ শেষ হলে সরকারের তত্কালীন উপদেষ্টা স্থপতি মতামত জানান যে ভবনটি গভর্নরের বাসভবন হিসেবে যথার্থ নয়। তাই প্রথমে সাধারণ দপ্তর পরে ইন্টারমিডিয়েট কলেজ হিসেবে ব্যবহার হলেও ১৯৪৭-এর পর এখানে হাইকোর্ট স্থাপন করা হয়। নব্বইয়ের দশকের দিকে ভবন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক কালে ভবনটির একটি অংশ যুদ্ধাপরাধীদের ট্রাইব্যুনাল এবং অন্য কিছু অংশ কমিশনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয়। 

১৯১৭ সালে গঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সুপারিশে যখন ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়, তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, যার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তত্কালীন পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয়ের দোতলার একাংশে; যা বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ। ভবনটি তখন মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের জন্য ব্যবহার হতো। বর্তমানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের উত্তরে যে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলটি ব্রিটিশ ভারতের সাক্ষ্য বহন করে আজো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ গালিচাসম ভূমির ওপর, তার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৯৩১ সালে উদ্বোধন হওয়া সুন্দর প্রাসাদসম ভবন একসময় খুবই মনোমুগ্ধকর ছিল, এখন সেই জৌলুস না থাকলেও ঐতিহ্যের উপকরণগুলো দীপ্তমান।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অন্য পাশে অবস্থিত বাংলা একাডেমি আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একাডেমির কার্যক্রম যে ভবনটি ঘিরে আবর্তিত হয়, তা কিন্তু নির্মাণ হয়েছিল সেই ঔপনিবেশিক আমলে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী রমনা এলাকায় গভর্নরের নির্বাহী বা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের জন্য তিনটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। সেগুলোই একটি ছিল বর্ধমান হাউজ বা আজকের বাংলা একাডেমি ভবন। সে সময়ে বর্ধমান রাজার জন্য নির্মাণ হয়েছিল বলে ভবনটি বর্ধমান হাউজ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ছিল এটি। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়ে গেল ভবন, যার ফলে একে বাংলা একাডেমিতে রূপান্তর করা হয়। সম্প্রতি বাঙালির প্রাণপ্রিয় একুশের বইমেলা উদ্যানমুখী হলেও বহু বছর ধরে বাংলা একাডেমি বা বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণই ছিল ওই বইমেলার প্রাণকেন্দ্র।

নীলকর ওয়াইজ সাহেবের নামে নামকরণ করা হয়েছিল সদরঘাট অঞ্চলের ওয়াইজ ঘাট। বুড়িগঙ্গার তীরে ওয়াইজ ঘাট সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যকর্ম। আভিজাত্যপূর্ণ ভবনটির মূল নাম ছিল নর্থব্রুক হল, যা সাধারণভাবে লাল কুঠি নামেই এখন বেশি পরিচিত। ১৮৭৯ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুকের নামানুসারে পরিচিত ভবন ছিল একটি টাউন হল। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালের ফেব্রুয়ারি এটির সঙ্গে যুক্ত হয় গণপাঠাগার, যা নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে এবং আরো পরে একটি ক্লাবঘর সংযোজন করা হয়। তখন সেটা জনসন হল নামে পরিচিতি লাভ করে। ইমারতটিতে ইউরোপীয় রেনেসাঁ মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছিল এক অভিনব স্থাপত্য ভাষা, আর সেই সঙ্গে এক চমত্কার, দৃষ্টিনান্দনিকতা।

সে সময়কার ঢাকা শহরের বিস্তৃতির মধ্যে এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ব্রিটিশরাজের নির্মিত নানা ভবন, কাঠামো। ছিল চামেলী হাউজ, পুরোনো সেক্রেটারিয়েট বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ফজলুল হক হল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আরো ছিল হিন্দু জমিদার হূষিকেশ দাস কর্তৃক নির্মিত স্থাপতিক অলংকরণসমৃদ্ধ রোজ গার্ডেন, যা পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকায় অবস্থিত। এভাবে সূত্রাপুর, টিপু সুলতান রোড, নারিন্দা, ওয়ারী, টিকাটুলি, র্যাংকিন স্ট্রিট প্রভৃতি আবাসিক এলাকায় তৈরি হয়েছিল ইউরোপীয় স্থাপত্য ধারা দিয়ে প্রভাবিত নানা রকম আবাসিক ভবন। এছাড়া ঢাকার অদূরে সোনার গাঁ এলাকায় রয়েছে সময়কার স্থাপত্য নিদর্শন।

ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম থেকেই বাংলার নানা স্থানে খ্রিস্ট ধর্মীয় আচার-আচরণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল বিভিন্ন ধারার চার্চ। এগুলোর মধ্যে তেজগাঁওয়ের হলি রোজারি চার্চ নির্মাণ হয়েছিল পর্তুগিজদের দ্বারা সেই ১৬৭৭ সালে, যার সংস্কার হয়েছিল প্রায় ১০০ বছর পর, ১৭৭৯ সালে। ব্যাসিলিকান চার্চের বৈশিষ্ট্যসংবলিত হলেও চার্চের কিছু অংশে রয়েছে অঞ্চলের মোগল স্থাপত্য উপকরণের সম্মিলন। ১৭৮১ সালে আর্মেনীয়রা নির্মাণ করে আর্মেনীয় গির্জা, যা এখনো সে সময়ের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের ধারক। গির্জা কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে তাদের কবরস্থান বা সমাধিক্ষেত্র। গির্জা ভবনটির চারপাশের প্রাঙ্গণে বিস্তৃত সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হতো ঢাকার আর্মেনীয়দের। পাথরের স্মৃতিফলক বা এপিটাফগুলো বলে দেয় ছোটখাটো গল্প, জানিয়ে দেয় আঠারো শতকের কোনো এক অচেনা আর্মেনীয়কে, যে নিজ দেশ, সমাজ কিংবা প্রিয়জনদের ছেড়ে এসেছিল অজানা, অচেনা বাংলায়; যে আজো ঘুমিয়ে আছে মাটির নিচে। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের উত্তরে রয়েছে অ্যাংলিকান চার্চ, যা আঠারো শতকের শুরুর দিকে নির্মাণ করা হয়েছিল। চার্চ ভবনটির মধ্যবর্তী নেইভের উপরিভাগের ছাদ সমতল হলেও দুই পাশের আইলের ছাদ ছিল ঢালু। গথিক খিলান বা আর্চ ছাড়াও আছে দুই চারকেন্দ্রিক আর্চের ব্যবহার। এগুলো ছাড়াও রয়েছে লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট গ্রেগরি চার্চ, যা প্রাথমিকভাবে ১৮৯৭ সালে ফরাসি গথিক শৈলীতে নির্মাণ হলেও পরবর্তীতে নানা পর্যায়ে এর পরিবর্তন পরিবর্ধন করা হয়।

ঢাকাকে নিজেদের বসবাসের যোগ্য করে তোলার জন্য ব্রিটিশ সরকার শহরের মধ্যে তৈরি করে নানা রকম বাগান কিংবা পার্ক। যেমন রয়েছে বাহাদুর শাহ বা ভিক্টোরিয়া পার্ক, রমনা পার্ক প্রভৃতি। বিস্তৃত সবুজ পার্ক পার্কসংলগ্ন লেক, নানা ধরনের ইমারত সুবিন্যস্ত রাস্তা। সবকিছুর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ঢাকার অভিজাত সুবিশাল রমনা এলাকা, যা নিজেই যেন একটি গল্প। সেই ১৬১০-এর মোগল আমল থেকেই এলাকার খ্যাতি। এলাকাটি তখন ছিল শুজাতপুর মৌজার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে দুটি আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছিল। রমনা নামকরণ তখনই হয়েছিল। আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তখন ছিল বাদশাহী বাগ, যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো সুদর্শনীয় জলাধার খাল। কিন্তু বাদশাহী বাগের সেই বৈভব বেশিদিন টেকেনি। জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল সেই বিশাল উদ্যান। ইংরেজ আমলে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডসের উদ্যোগে প্রথমবার এলাকা নতুন করে তৈরি করা হয়। জঙ্গল পরিষ্কার করলে উন্মোচিত হয় এক ডিম্বাকৃতির খোলা পরিসর। কিছুদিন পর খোলা পরিসরের চারপাশে কাঠের রেলিং দিয়ে স্থাপন করা হয় রমনা রেসকোর্স ময়দান। তখন ১৮২৫ সাল।  ক্রমান্বয়ে এখানে অভিজাত শ্রেণীর জন্য ইউরোপীয় শৈলীতে স্থাপিত হতে থাকে নানা ইমারত। মিন্টু রোড, হেয়ার রোড কিংবা বেইলি রোড সে সময়ের সাক্ষীস্বরূপ আজো দাঁড়িয়ে আছে।

বাহাদুর শাহ পার্ক শুধু একটি উদ্যানই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একশ-দেড়শ বছরের নানা কাহিনী, ইতিহাস। আঠারো শতকের শেষের দিকে এখানে আর্মেনীয়দের একটি ছোট ক্লাবঘর ছিল। পরবর্তীতে সম্ভবত উনিশ শতকের শুরুর দিকে ইংরেজরা সেটা কিনে নেয় এবং জীর্ণপ্রায় ভবনটি ভেঙে একটি স্বল্প পরিসরের ময়দান বা খোলা স্থানের সূচনা করে। কয়েকটি রাস্তার সংযোগস্থলে একটি খোলা প্রাঙ্গণ, আর সেই প্রাঙ্গণের মাঝখানে বৃত্তাকার এক বাগান। শোনা যায়, ১৮৫৭ সালের বিখ্যাত সিপাহী বিদ্রোহের সময় এখানে কয়েকজন সিপাহীকে বিদ্রোহ করার অপরাধে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার গ্রহণ করার পর খোলা পরিসরেই সেই ঘোষণাপত্র পড়ে শোনানো হয়। সেই থেকে ছোট পরিসরের ময়দানটিকে ভিক্টোরিয়া পার্ক হিসেবে অভিহিত করা শুরু হলো। পরবর্তীতে নবার আবদুল গণি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবর্ষ পালন উপলক্ষে পার্কের নতুন নামকরণ হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছোট পার্ক যেন মরূদ্যানের মতো একটি দম ফেলার স্থান, ইট-কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে এক সবুজের সজীবতা।  

এভাবে ব্রিটিশরাজের অধীনে তত্কালীন ঢাকা বেড়ে উঠতে থাকে শহরের নিয়মে। কোথাও ইমারত, কোথাওবা পার্ক বা উদ্যান, একটুখানি খোলা পরিসর, সঙ্গে জলাধার, পুকুর, খাল, ঝিল, সুবিন্যস্ত রাস্তাঘাট, আর প্রত্যেকের সঙ্গে জুড়ে থাকা গল্পগাথা। সবকিছুর প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক আমলের ঢাকা, বিখ্যাত ঢাকা; যার পরতে পরতে ইতিহাস আর ঐতিহ্য, দুই- নীরবে তার পদচিহ্ন এঁকে যায়।

 

জাকিয়া রহমান ঋতা: স্থপতি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন