শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

জমিদারি আমলে প্রাসাদ-স্থাপত্য প্রকৃতি

ড. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলার রাজনৈতিক সমাজ ব্যবস্থায় দেশের জমিদারশ্রেণী যে বিশেষ ভূমিকা পালন করত। বিশেষ করে মুসলিম ইংরেজ শাসনামলে তারা ছিলেন সাধারণ প্রজা সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধস্বরূপ সরকারি মুখপাত্র। রাজস্ব আদায়ের সাথে সাথে স্বীয় জমিদারি এলাকার উন্নয়ন বিভিন্ন জনহিতকর কার্যাদি সম্পাদন করাও তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অত্যন্ত প্রতাপশালী এসব জমিদার স্বীয় জমিদারি এলাকায় আধিপত্য অক্ষুণ্ন রাখাসহ সাধারণ প্রজাদের চোখে নিজেদের শৌর্য-বীর্য ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য ঊর্ধ্বতন শাসকদের অনুকরণে নির্মাণ করতেন জাঁকজমকপূর্ণ বিশাল প্রাসাদ এবং প্রাসাদের সাথে বিভিন্ন অফিস, কাছারি, খাজাঞ্চিখানা, অতিথিশালা বিভিন্ন ধর্মীয় ইমারত। তাদের নির্মিত এসব ইমারতে শিল্পকলার প্রতি তাদের গভীর অনুরাগের পরিচয় মেলে। কেন্দ্রীয় শাসকদের মতো বাংলার জমিদারদের নির্মিত ইমারতগুলোও দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত, যথা. ধর্মীয় স্থাপত্য . লৌকিক বা লোকায়ত স্থাপত্য। ধর্মীয় স্থাপত্য হলো সেসব ইমারত, যেগুলো বিভিন্নভাবে মানুষের ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন মন্দির, মঠ, মসজিদ, সমাধিসৌধ, মাদ্রাসা, ইবাদতখানা, ঈদগাহ ইত্যাদি। অন্যদিকে লৌকিক স্থাপত্য হলো সেসব ইমারত, যেগুলো মানুষের পার্থিব কাজে অর্থাৎ বসবাস বা অন্য কোনো কর্মসম্পাদনের জন্য ব্যবহূত হয়। যেমন প্রাসাদ, অফিস-আদালত ভবন, দুর্গ, সরাইখানা, হাম্মামখানা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, থিয়েটার হল, সেতু ইত্যাদি।

বিশ্বের সব ধর্মাবলম্বীই স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন পারলৌকিক শান্তি লাভের জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণে এবং এর সৌন্দর্যবর্ধনে যে শ্রম অর্থ ব্যয় করেছে, লৌকিক স্থাপত্য নির্মাণে ঠিক ততটা করেনি। ধর্মীয় ইমারতগুলোকে কালজয়ী করে রাখার জন্য এগুলো নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপাদান হিসেবে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তর কিংবা যেখানে প্রস্তরের স্বল্পতা রয়েছে, সেখানে পোড়ানো ইট ব্যবহূত হয়েছে। ফলে এর স্থায়িত্বকাল বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মানুষের মনে ধর্মীয় অনুভূতি সদাজাগ্রত থাকার কারণে স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে ধর্মীয় স্থাপত্যই অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে। কথা সামগ্রিকভাবে বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি বাংলার জমিদারদের নির্মিত স্থাপত্যকর্মের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলে, বিশেষ করে বাংলার নবাবি আমলে (১৭০০-৫৭) গড়ে ওঠা দেশের জমিদারশ্রেণীর অধিকাংশই ছিল হিন্দু। ফলে ১২০৩- খ্রিস্টাব্দে হিন্দু রাজত্ব অবসানের পর কেন্দ্রীয় মুসলিম শাসকদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলার হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্য অর্থাৎ মন্দির স্থাপত্যের নির্মাণধারা যখন স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, তখন দেশের হিন্দু জমিদারদের ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতায় তা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্বীয় উদ্যোগে হিন্দু জমিদাররা নব উৎকর্ষে বিকশিত বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের সাথে সংগতি রেখে দেশের মন্দির স্থাপত্যের চরম বিকাশ ঘটায় এবং ইংরেজ শাসনের অবসান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ফলে সময় জমিদারদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় স্বীয় জমিদারবাড়ি তার আশপাশে বহু মন্দির নির্মিত হয়। আকৃতি অনুসারে মন্দিরগুলো প্রধানত রেখ দেউল, চালা মন্দির (একচালা বা একবাংলা, দোচালা, চৌচালা, আটচালা, জোড়বাংলা ইত্যাদি), রত্নমন্দির (রত্নের সংখ্যা অনুসারে একরত্ন, পঞ্চরত্ন, নবরত্ন, ত্রয়োদশরত্ন, সপ্তমরত্ন, পঁচিশরত্ন ইত্যাদি) এবং দালান মন্দির চার শ্রেণীতে বিভক্ত। জমিদারদের নির্মিত চার শ্রেণীর অসংখ্য মন্দিরের দৃষ্টান্ত পশ্চিম পূর্ব উভয় বাংলায় বিদ্যমান। এসব মন্দিরের নির্মাণশৈলী অলংকরণে দেশজ, মুসলিম কিছু কিছু ইউরোপীয় প্রভাবের অপূর্ব সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়। মধ্যযুগে নির্মিত বাংলার জমিদারদের মন্দির স্থাপত্যের কিছু নিদর্শন অর্ধভগ্নাবস্থায় এখনো টিকে থাকলেও লৌকিক স্থাপত্যের কোনো নির্দশন পাওয়া যায় না। আর লৌকিক স্থাপত্যের বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে প্রধান উল্লেখযোগ্য ইমারত হলো প্রাসাদ স্থাপত্য। বাংলার জমিদারদের নির্মিত যেসব প্রাসাদ বিভিন্ন জেলায় অযত্ন-অবহেলায় এখনো টিকে আছে, সেগুলো সবই আধুনিককালে অর্থাৎ ইংরেজ শাসনামলে নির্মিত। নিম্নে জমিদারদের নির্মিত সেসব প্রাসাদ স্থাপত্যের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যরূপ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

অভিধান অনুযায়ী প্রাসাদ শব্দের অর্থ বিশাল অট্টালিকা, রাজার বাড়ি বা রাজগৃহ কিংবা রাজভবন, শাসকের সরকারি বাসভবন, বালাখানা, হর্ম্য, জাঁকজমকপূর্ণ ইমারত ইত্যাদি। সাধারণ অর্থে আমরা রাজা-বাদশাদের বাসগৃহকে রাজবাড়ি অর্থে প্রাসাদ বলি। সাধারণ প্রজা রাজা-বাদশা বা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি সাধারণ প্রজার বাসগৃহ রাজা-বাদশা বা শাসকগোষ্ঠীর বাসগৃহের মধ্যেও বিস্তর প্রভেদ রয়েছে। রাজা বা শাসককুলের থাকে শক্তি, ক্ষমতা, আভিজাত্য, বিলাসিতা শৌর্য-বীর্য। সেই সাথে থাকে অঢেল অর্থ। প্রজারা তাদের সমীহ করে চলবে, অনুগত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ থেকে রাজাকে আলাদা করার জন্য যেমন মাথায় থাকে রাজমুকুট পরনে বিশেষ ধরনের পোশাক, তেমনি রাজাদের বাসগৃহে থাকে শৌর্য-বীর্য, শক্তি, ক্ষমতা, সৌখিনতা, জৌলুস, বিলাসিতা আভিজাত্যের চরম বহিঃপ্রকাশ। বিশাল এলাকাজুড়ে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে নির্মিত রাজকর্মচারী এবং পাইক-পেয়াদা পরিবেষ্টিত রাজবাড়িকেই বলা হয় প্রাসাদ কমপ্লেক্স। প্রাসাদ কেবল রাজাদের বসবাসের ভবনই নয়, তার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে সরকারি অফিস (দরবার হল, কাছারি বা মহাফেজখানা, রাজকোষাগার বা খাজাঞ্চিখানা), পারিবারিক ধর্মীয় উপাসনালয়, মালখানা, কর্মচারীদের আবাসস্থল, ফুলবাগান (উদ্যান), নাট্যমঞ্চ, সৌন্দর্যের প্রতীক জলফোয়ারা ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় শাসকদের প্রাসাদ অনুকরণে দেশের জমিদাররাও প্রচুর অর্থ ব্যয় করে স্বীয় জমিদারি এলাকায় নিজেদের বাসবভন হিসেবে বিশাল এলাকাজুড়ে সুরক্ষিতভাবে নির্মাণ করেছেন সুবিশাল অট্টালিকা, যা প্রকৃত অর্থেই রাজবাড়ি বা রাজপ্রাসাদ বলে অভিহিত। এসব প্রাসাদ বা রাজবাড়ি দেশের জনগণের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিভূ হিসেবে তদানীন্তন জমিদারদের প্রভূত ক্ষমতা শক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যের কিছু নিদর্শন অদ্যাবধি ভগ্ন-অর্ধভগ্ন কিংবা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রাসাদ স্থাপত্যের কোনো নিদর্শন একেবারেই নেই। খননে আবিষ্কৃত প্রাচীন বাংলার হাতেগোনা কয়েকটি দুর্গনগরী দুর্গের ধ্বংসস্তূপে এবং ওই আমলের শাসকদের নির্মিত কোনো আবাসগৃহ বা প্রাসাদ স্থাপত্যের কোনো নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এমনকি মধ্যযুগে বাংলার সুলতানি শাসনামলের ধর্মীয় স্থাপত্যের বহু নিদর্শন এখন পর্যন্ত টিকে থাকলেও প্রাসাদ স্থাপত্য সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত। সামান্য যেটুকু নিদর্শন দেখা যায়, তা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ মাত্র। তবে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে চীনের পর্যটকদের বর্ণনায় পাণ্ডুয়ায় সুলতানের প্রাসাদ সম্পর্কে বলা হয় যে চুনকাম দ্বারা ইটের তৈরি বাড়ি খুব উঁচু বিরাট আকারে নির্মিত ছিল। তিনটি দরজা পার হয়ে গেলে প্রাসাদের অভ্যন্তরে নয়টি অঙ্গন দেখা যেত। দরবার কক্ষের পিতল মণ্ডিত স্থাপত্যগুলোয় ফুল পশু-পাখির প্রতিকৃতি উত্কীর্ণ ছিল। দরবার কক্ষের দুদিকের বারান্দা এত দীর্ঘ প্রশস্ত ছিল যে এক সহস্র অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত, বর্মে আচ্ছাদিত অশ্বারোহী এবং ধনুর্বাণ তরবারি হস্তে পদাতিকের সমাবেশ হতে পারত। অঙ্গনে ময়ূর পুচ্ছের তৈরি ছত্র হস্তে নিয়ে ১০০ অনুচর দাঁড়াত এবং বিরাট দরবার কক্ষে হস্তীপৃষ্ঠে ১০০ সৈন্য থাকত। অঙ্গনের সম্মুখে কয়েকশ হস্তী সারিবদ্ধাকারে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। তবে পাণ্ডুয়ার প্রাসাদ সম্পর্কে চৈনিক পরিব্রাজকদের বর্ণনার সামান্যতমও আর বর্তমান নেই। শুধু গৌড় দুর্গের বিথরে সুলতান নাসির উদ্দীন মাহমুদের নির্মিত প্রাসাদ প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ এখনো অবশিষ্ট রয়েছে, যা বাইশগজি প্রাচীর নামে অভিহিত। প্রাচীরের উচ্চতা ২২ গজ বা ৬৬ ফুট বলে এটি বাইশগজি প্রাচীর নামে পরিচিত হয়েছে। চতুর্দিকে ইটের প্রাচীর বেষ্টিত লম্বাকারে নির্মিত প্রাসাদের পরিমাপ দৈর্ঘ্যে উত্তর-দক্ষিণে ৭০০ গজ পূর্ব-পশ্চিমে ২৫০-৩০০ গজ। প্রাসাদটি সম্ভবত তিনটি অঙ্গন বা অংশে বিভক্ত ছিল। উত্তর দিকের প্রথম অংশটি ছিল দরবার অঙ্গন বা দরবার কক্ষ কিংবা দরবার হল, দ্বিতীয় অংশ ছিল সুলতানের নিজস্ব বাসস্থান এবং তৃতীয় অংশ ছিল হেরেম বা নারীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান। প্রত্যেক অংশেই একটি করে দীঘি ছিল এবং তার মধ্যে একটি দীঘি ছিল পাথর দিয়ে বাঁধানো। প্রাসাদের উত্তর দিকের দরবার অঙ্গনকে গৌড়ের অধিবাসীরা খাজাঞ্চি নামে অভিহিত করে। অর্থাৎ এখানে খাজাঞ্চিখানা ছিল বলেই হয়তো নামকরণ হয়েছে। তবে অঙ্গনে অবস্থিত দীঘিটি টাকশাঁল দীঘি নামে আখ্যায়িত। দীঘির পশ্চিম দিকে ৪০ ফুট পরিমাপের একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট ছোট ইমারতের ভগ্নাবশেষ পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া প্রাসাদটির আর কোনো নিদর্শন দেখা যায় না। তবে ইটের নির্মিত প্রাসাদটি যে একসময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সুলতানি আমলের মতো বাংলায় মোগল আমলে নির্মিত ধর্মীয় স্থাপত্যের বহু নিদর্শন টিকে থাকলেও লৌকিক স্থাপত্যের সংখ্যা খুবই কম। টিকে থাকা লৌকিক ইমারতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকা তার আশপাশে কয়েকটি দুর্গের ভগ্নাবশেষ, যেমন লালবাগ দুর্গ (১৬৭৮), ইদ্রাকপুর দুর্গ (১৬৬০), সোনাকান্দা দুর্গ (সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ), জিনজিরা দুর্গ (সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ) ইত্যাদি এবং গৌড় লখনৌতির ফিরুজপুরে তথাকথিত তাহখানা কমপ্লেক্স (সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ) দুর্গের সমতুল্য অন্যান্য নির্মাণ কাঠামো স্থানীয়ভাবে কাটরা নামে অভিহিত সরাইখানা (মালদহ, ঢাকা মুর্শিদাবাদে এগুলোর কিছুসংখ্যক নিদর্শন রয়েছে) এগুলোর মধ্যে ঢাকার লালবাগ দুর্গ নির্মিত হয়েছিল সুবাদারের বসবাসের জন্য প্রাসাদ দুর্গ হিসেবে, তাহখানা নির্মিত হয়েছিল সুফি দরবেশ নিয়ামতউল্লাহ ওয়ালীর আবাসস্থলরূপে এবং নদীতে নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য নিরাপত্তা ফাঁড়ি হিসেবে নির্মিত হয়েছিল অন্যান্য জলদুর্গ। এসব দুর্গের সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রকম। ইটের নির্মিত দুর্গগুলোতে ছিল সুউচ্চ দুর্গপ্রাকার, ইওয়ান আকৃতির ফটক, উত্তর ভারতের মোগল দুর্গের অনুকরণে বহিঃপ্রাচীরে বন্দুকের গুলি চালানোর ফোকর ঘুলঘুলি (কুলঙ্গিযুক্ত) জানালা এবং অভ্যন্তরভাগে নির্মিত প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো। অবশ্য এসব দুর্গ অভ্যন্তরের নির্মাণ কাঠামো বর্তমানে প্রায় সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত। কেবল লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে টিকে রয়েছে দরবার হল নামে পরিচিত একটি ছোট আবাসিক প্রাসাদ, পরী বিবির সমাধিসৌধ জামে মসজিদ এবং গৌড়ের তাহখানা ইমারত। তাহখানা একটি অতীব সাদাসিধে ধরনের অরক্ষিত এক কক্ষবিশিষ্ট ইমারত। এটিকে দুর্গ প্রাসাদ না বলে খানকাহ বলাই ভালো। তবে সুলতানি আমলের মতো মোগল শাসনামলেও বাংলার জমিদারদের নির্মিত বেশকিছু ধর্মীয় স্থাপত্য টিকে থাকলেও লৌকিক ইমারতগুলোর নিদর্শন দেখা যায় না। অথচ মোগল আমলেই বাংলার জমিদারি প্রথার পূর্ণ বিকাশ ঘটে এবং জমিদাররা স্থানীয় প্রশাসনে তাদের যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতেন, তা আগে আলোচিত হয়েছে। সুতরাং সময়ে এখানকার জমিদাররা যে প্রাসাদতুল্য বাসভবনে বসবাস করে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে জমিদারি পরিচালনা করতেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কালের করাল গ্রাসে তাদের নির্মিত সেসব আবাসস্থল সব ধ্বংস হয়ে যায় কিংবা তাদেরই পরবর্তী বংশধররা ইংরেজ শাসনামলে সেগুলো ভেঙে ফেলে তদস্থলে নতুন করে বিশাল বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করে, যেগুলো অর্ধভগ্নাবস্থায় এখনো টিকে রয়েছে। সুতরাং বলা যায় যে প্রাচীন মধ্যযুগে বাংলার কেন্দ্রীয় শাসকদের মতো জমিদারদেরও নির্মিত জমিদারবাড়ি বা প্রাসাদ স্থাপত্যের কোনো নিদর্শন বর্তমান নেই। যা আছে তা সবই আধুনিককালের অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬-৫৭) এবং ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাসিমের (১৭৬০-৬৪) পতনের পর বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনার মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়। ইংরেজদের ক্ষমতা লাভ দেশের ইতিহাসে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই নয়, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্থাপত্য ক্ষেত্রেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচনা করে। এসব কারণে কলকাতা হয়ে ওঠে বাংলার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অবস্থার মূল কেন্দ্র। ১৭৭৩ থেকে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ফলে রাজধানী হিসেবে উপযোগী করে কলকাতা শহরকে গড়ে তোলার জন্য ইংরেজ শাসকেরা এখানে ইউরোপীয় শহরের আদলে তাদের ধর্মীয় স্থাপত্য হিসেবে গির্জা সমাধিসৌধ নির্মাণের পাশাপাশি বসবাসের জন্য লৌকিক ইমারত হিসেবে বিভিন্ন বাসভবন, জলাধার অফিস ভবন নির্মাণ করতে থাকে। অচিরেই কলকাতা নগরীর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। আঠারো শতকের প্রথমভাগেই কলকাতার ছিল একটি দুর্গ, গির্জা, আদালত ভবন উদ্যানশোভিত ঘরবাড়ি, যেগুলো ঔপনিবেশিক স্থাপত্য হিসেবে পরিচিত। রাজধানী হওয়ার পর ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নিজেদের বিত্তবৈভবের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে জমকালো সব ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে। নবনির্মিত এসব ভবন ইংল্যান্ডের পল্লী ভবন সমকালীন প্যালাডীয় বিশাল ভবনগুলোর সাথে তুলনায়। এর মধ্য দিয়ে সূচনা হয় বণিক সম্প্রদায় কর্তৃক ভারতীয় পরিবেশে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি প্রবর্তনের প্রথম পর্যায়। এগুলোর অধিকাংশই ছিল উদ্যান পরিবেষ্টিত ইটের নির্মিত দ্বিতল বা ত্রিতল ভবন, যার অন্তঃস্থিত কক্ষগুলো প্রশস্ত বারান্দা দ্বারা সুরক্ষিত। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে আলীপুরে নির্মিত হেস্টিংসের বাসগৃহটি নগরীর সর্বপ্রাচীন প্রাসাদ। একজন পেশাদার রিয়েল এস্টেট নির্মাতার মতো হেস্টিংস শুধু তার নিজের বাসগৃহ নির্মাণ করেছিলেন তা- নয়, বরং অন্যের জন্যও করেছেন বলে তিনি একজন স্থাপত্য উদ্যোক্তা হিসেবে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেছেন। বাংলা স্থাপত্যের অনুসরণে আলীপুরের তার বাসগৃহ বাংলাদেশে বাংলোস্থাপত্যের আদর্শ নকশা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তিনি রীতির জনক বলে অভিহিত হয়ে থাকেন। স্থাপত্যরত্ন হিসেবে খ্যাত তার দ্বিতলবিশিষ্ট বাসগৃহে ছিল একটি কেন্দ্রীয় হলঘর, দুই পাশে দুটি সংযোগ কক্ষ একটি গাড়িবারান্দা। ভবনটির নিচতলায় ছিল তুশকান স্তম্ভ ওপরতলায় আয়নীয় স্তম্ভ। উল্লেখ্য, স্থাপত্যে বাংলো বারান্দা দুটি শব্দ সময় থেকেই বিশেষ পরিচিতি লাভ করে এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের পরিচায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গভর্নর জেনারেল ভবনটি এত বেশি পছন্দ করতেন যে তিনি যখন ইংল্যান্ডে ফিরে যান তখন আলীপুরে অবস্থিত তার বাগানবাড়ির অনুরূপ একটি বাগানবাড়ি ইংল্যান্ডের ডেলসফোর্ডে নির্মাণ করনে। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে মিসেস কিন্ডারসলির খবঃঃবৎ ভত্ড়স ঃযব ঊধংঃ ওহফরধং গ্রন্থে একই ধরনের আরো অনেক বাসগৃহের তথ্য পাওয়া যায়, যেগুলোকে তিনি ইংরেজ ভদ্রলোকের বাগানবাড়ি (মধত্ফবহ-যড়ঁংবং নবষড়হমরহম ঃড় ঊহমষরংয মবহঃষবসবহ) বলে অভিহিত করেছেন। গার্ডেন রিচে নির্মিত কলকাতার কোম্পানির বড় সাহেবদের বাড়িগুলো একই রীতিতে নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে টমাস টুইনিং গার্ডেন রিচের বাড়িগুলোকে প্রাসাদহিসেবে উল্লেখ করায় কলকাতা প্রসাদের নগরীহিসেবে খ্যাতি লাভ করে। সুন্দর বাসগৃহ নির্মাণ ছাড়াও ওয়ারেন হেস্টিংস কিছু অফিস ভবনও নির্মাণ করেছেন। বিখ্যাত রাইটার্স বিল্ডিং (১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হলেও ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে পেডিমেন্টসহ সম্পূর্ণ আয়নীয় স্তম্ভ দ্বারা এর সম্মুখভাগ নতুন করে নির্মিত হয়) তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সময় কলকাতার দেশীয় ধনিক শ্রেণীও তাদের মর্যাদের সাথে সংগতি রেখে ঔপনিবেশিক আদলের দালান নির্মাণ করতে থাকে। নীতির উত্কৃষ্ট উদাহরণ কুমারটুলীর গোবিন্দরাম মিত্রের বাড়ি। মিত্রের বাড়িতে ডরিক, আয়নীয় করিন্থীয় শীর্ষসহযোগে তুশকান স্তম্ভ সংযোগ করায় তা একটি ঔপনিবেশিক স্থাপন্য ইমারত হিসেবে তখন বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। তবে স্তম্ভের উল্লম্বতার সাথে শীর্ষের সংগতি না থাকায় সাধারণভাবে তা ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যের একটি মন্দ উদাহরণ হিসেবে স্থাপতিদের কাছে বিবেচিত হলেও গ্রেকো-রোমার ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যরীতির আদলে স্তম্ভ নির্মাণের সস্তা সাদাসিধে সংস্করণই কলকাতার বিকশিত স্থাপত্যের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। গভর্নমেন্ট ভবন (১৭৫৭ ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত), যা বর্তমানের আর্মহার্স্ট হাউজ নামে পরিচিত, হেস্টিংসের আরেকটি বাসগৃহের নির্মাণ বৈশিষ্ট্য পরবর্তী স্থাপত্যের বিশেষ করে জমিদারের প্রাসাদ নির্মাণে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। ভবনটির নির্মাণশৈলীর মধ্যে অর্ধস্তম্ভের ওপর নির্মিত পেডিমেন্ট, দ্বিপত্রবিশিষ্ট উল্লম্ব দরজা জানালার ঊর্ধ্বাংশের কি-স্টোনবিশিষ্ট অর্ধবৃত্তাকৃতির ফ্যান-লাইট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একই সময়ে নির্মিত কিচেনার ভবনে অবশ্য মোগল ইতালীয় ছত্রি এবং বারান্দা বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় দৃষ্ট হয়। শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের এই রীতির সমাহার এমনভাবে পরিলক্ষিত হয়, যা আর আলাদা বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে একটি নতুন রীতি হিসেবে পরিগণিত হয়। নব্য সৃষ্ট রীতিই বর্তমানে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যবা ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যবলে সংজ্ঞায়িত।

ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য বিকাশে আরেকজন প্রশাসকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি হলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিল্পপ্রেমী গভর্নর জেলারেল লর্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮-১৮০৫) নব্য ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যের মহত্ত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কলকাতা তার আশপাশে নতুন নতুন ইমারত নির্মাণের পরিকল্পনা করেন, যা পরবর্তীকালে আদর্শ স্থাপত্য ইমারত হিসেবে পরিগণিত হয়। তিনি প্রাচীন গভর্নমেন্ট হাউজ কাউন্সিল হাউজসংলগ্ন এলাকায় ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের জন্য আরেকটি বাসভবন নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ স্থপতি পরিবারের সদস্য ক্যাপ্টেন চার্লস ওয়ায়েট এর নকশা প্রণয়ন করেছিলেন। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে উদ্বোধনকৃত নতুন গভর্নমেন্ট হাউজটি জর্জিয়ান প্রাসাদের এক উত্কৃষ্ট উদাহরণ। ভবনটির বৈশিষ্ট্যে আপাতদৃষ্টে প্যালাডিয়ান একঘেয়েমিথাকলেও এটির উত্তর গৃহমুখের লম্বা সিঁড়ি সম্মুখের পেডিমেন্ট-সংবলিত প্রবেশপথ এবং তার দক্ষিণে ভবনের রোমান গম্বুজ ছাদ-পাঁচিলের বক ভাস্কর্য ইমারতটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। বক নকশায় রূপায়িত ভাস্কর্য আগের ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রতীকী ভাস্কর্যের স্থলাভিষিক্ত হয়ে গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছিল বলে অনুমিত হয়। ২৬ একর ভূমির ওপর পরিব্যাপ্ত অট্টালিকার প্রধান প্রবেশপথগুলোতে রয়েছে চারটি নব্য ক্ল্যাসিক্যাল রীতির বিশাল ফটক। তবে প্রাসাদটির সবচেয়ে আকর্ষণ ছিল এর সুবিশাল বলরুমটি, যা কাচ ঝাড়বাতির জন্য সুপ্রসিদ্ধ। এছাড়া প্রাসাদের আরেকটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল তার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের তোরণটি, যা রোমান বিজয় তোরণের নকশায় নির্মিত হয়েছিল। তোরণের উপরে স্থাপিত সিংহের মূর্তিটি ছিল কোম্পানির ক্ষমতার প্রতীক চিহ্ন হিসেবে, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ক্ষমতাকে বিধৃত করে এবং ব্রিটিশ ক্ষমতাকে ব্রিটিশ সিংহরূপে আখ্যায়িত করে। প্রাসাদের নির্মাণ বৈশিষ্ট্য এবং তোরণ পরবর্তীকালে ঢাকায় বাংলার বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত জমিদারি প্রাসাদগুলোতে পরিলক্ষিত হয়। মোটকথা ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য বিকাশের মূল উদ্যোক্তা দিকনির্দেশনাকারী ছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড হেস্টিংস লর্ড ওয়েলেসলি।

কলকাতার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইমারতগুলো হলো টাউন হল (১৮০৪), কাউন্সিল হাউজ (১৮১৪), অক্টারলনি ইমারত (১৮২৮, বর্তমানে শহীদ মিনার), রাজেন্দ্র মল্লিকের শ্বেত প্রাসাদ (১৮৩৫-৪০), মেডিকেল কলেজের মূল ভবন (১৮৫২), বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট হাউজ (১৮৫৭), জেনারেল পোস্ট অফিস (১৮৭০), ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম (১৮৭৫), হেস্টিংসের বাসভবনের কাছেই নির্মিত হয় লেফটেন্যান্ট গভর্নরের বাসভবন হিসেবে বেলভেডার হাউজ (১৮৫৪-১৯২১), যা পরবর্তী সময়ে দিল্লি থেকে আসা পরিদর্শক ভাইসরয়দের বাসভবন হিসেবে ব্যবহূত হতো (বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থাগার) প্রভৃতি। ইমারতগুলো নির্মাণে নব্য ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্য ঐতিহ্য ব্যবহূত হয়েছে। ইতালি সৃষ্ট নব্য ক্ল্যাসিক রীতিকে ধরে রাখার সাথে সাথে কলকাতার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গথীয় পুনর্জাগরণের ধারাকেও রক্ষা করার চেষ্ট করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সেন্ট পিটার্স গির্জা (১৮৩৫), হাইকোর্ট ভবন মিউনিসিপ্যাল মার্কেটের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

ওয়ারেন হেস্টিংস ওয়েলেসলির পর স্থাপত্য শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যার নাম আসে, তিনি হলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮-৫৬) ডালহৌসির পর ব্রিটিশ সাম্রাজের স্থায়িত্ব কলকাতা শহরের নান্দনিক উন্নয়নে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন লর্ড কার্জন (১৮৯৯-১৯০৫) তবে ইমারত নির্মাণে তিনজন গভর্নর জেনারেলের সাথে লর্ড কার্জনের পার্থক্য হলো ওই তিনজন ছিলেন প্রধানত ইতালি ফ্রান্সের নব্য ক্ল্যাসিক রীতির অনুসারী। পক্ষান্তরে লর্ড কার্জন ছিলেন ঐতিহ্যবাহী মোগল স্থাপত্যের সমঝদার পৃষ্ঠপোষক। তার নকশায় কয়েক বছর পর নির্মিত সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরে তৈরি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল (১৯০৬-২১) ইমারতে মোগল ইউরোপীয় স্থপত্যশৈলীর অপূর্ব সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়, যা ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের চূড়ান্ত রূপ। ইমারতটির গম্বুজ স্যার ক্রিস্টোফার রেনের বিখ্যাত লন্ডন সেন্টপল গির্জার অনুরূপ। ছাদের কোণের পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্রাকার গম্বুজগুলো মোগল, সম্মুখ তোরণ মোগল -ওয়ান আকৃতির এবং স্তম্ভ পরিবেষ্টিত বারান্দা উল্লম্ব জানালা ইউরোপীয়।

কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিম বাংলার মতো ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ব বাংলা বিত্তবৈভবে সময়ে কোনোক্রমেই কলকাতার সমকক্ষ ছিল না। রাজধানী শহর হওয়ার সুবাদে ইংরেজ শাসকদের দ্বারা ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই কলকাতা যেভাবে ঔপনিবেশিক দালানের নগরীতে পরিণত হয়, পূর্ব বাংলার মধ্যমণি হিসেবে ঢাকায় ঠিক ততটা সম্ভব হয়নি। তবে পূর্ব বাংলার বড় বড় জমিদার কলকাতায় নির্মিত ইংরেজ শাসকদের স্থাপত্য বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। এদিকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের কারণে পূর্ব বাংলা আসামের রাজধানী হওয়ার সুবাদে ঢাকা অল্প সময়ের জন্য হলেও (১৯১১ পর্যন্ত) ব্রিটিশ সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে রাজধানী হিসেবে ঢাকা শহরকে সাজানোর জন্য রমনা এলাকাটিকে ঘিরে গড়ে তোলা হয় একগুচ্ছ লৌকিক ইমারত। এগুলোর মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে টাউন হল হিসেবে নির্মিত ওয়াইজঘাটের নর্থব্রুক হল (১৮৭২), পুরনো হাইকোর্ট ভবন (গভর্নমেন্ট হাউজ হিসেবে নির্মিত), কার্জন হল (১৯০৪, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিজ্ঞান ভবন), পুরনো সচিবালয় (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ), সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (১৯২৯, বর্তমানে বাংলা একাডেমি) প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমারতগুলোর মধ্যে নর্থব্রুক হল নির্মাণে মোগল-ইউরোপীয় নির্মাণ রীতির একটি সমন্বিত প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় এবং সমন্বয়ের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে কার্জন হলে। লাল ইট দ্বারা নির্মিত কার্জন হলের দ্বিতল ভবনে রয়েছে এক বিশাল কেন্দ্রীয় হলঘর। সেই সাথে পূর্ব পশ্চিম উভয় পাশে রয়েছে সংযোজিত কাঠামো এবং চারপাশ দিয়ে ঘেরা বারান্দা। উত্তর দিক অশ্বক্ষুরাকৃতি খাঁজকাটা খিলান। ভবনটির গম্বুজযুক্ত ছত্রিবিশিষ্ট ব্র্যাকেটের ওপর সংস্থাপিত ছাঁচ শোভাবর্ধক ইটের কারুকার্যের সমাহার এটিকে ইউরোপীয় মোগল নির্মাণ রীতির অপূর্ব সমন্বয়ের এক নান্দনিক দৃষ্টান্ত হিসেব প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফতেহপুর সিক্রি যে ধরনের ইমারত নির্মাণের প্রেরণার উৎস, তা সহজেই বোধগাম্য। কার্জন হলের প্রক্ষিপ্ত প্রবেশপথের সাথে ফতেহপুর সিক্রির দিওয়ান--খাসের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। ব্রিটিশদের উদ্যোগে বিকশিত মোগল-ইউরোপীয় রীতির সংমিশ্রণে সৃষ্ট যে সংকর নির্মাণরীতি, তা সুরম্য অট্টালিকায় সর্বোত্কৃষ্ট পরিণতি লাভ করে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের নির্মিত উপরোল্লিখিত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যগুলোর গঠনশৈলী বিশ্লেষণ করলে সংক্ষিপ্তাকারে কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেগুলো বাংলার জমিদারদের প্রাসাদ নির্মাণে অনুসৃত হয়। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো ইমারতের কার্যোপযোগী নকশা, লম্বা সিঁড়িযুক্ত উঁচু ভিতের ওপর ইমারত নির্মাণ, ইতালীয় রেনেসাঁ প্রকৃতির উন্মুক্ত প্রবেশপথ বারান্দা, ইমারতের ছাদ-পাঁচিলে নির্মিত গ্রেকো-রোমান রীতির ত্রিকোণাকার কাঠামো বা প্রেডিমেন্ট, ক্ল্যাসিক্যাল রোমান গম্বুজ অথবা রেনের সেন্টপল গম্বুজ নির্মাণ রীতি, দুই পত্রবিশিষ্ট উল্লম্ব দরজা জানালা, ছাদ-পাঁচিল শীর্ষে মানব বা পশু-পাখির ভাস্কর্য, অভ্যন্তরে কাঠের সিঁড়ি, ক্ল্যাসিক্যাল স্তম্ভ, ফ্যান-লাইটের ব্যবহার ইত্যাদি। এগুলো সবই ইউরোপীয় চিন্তাচেতনা কৌশলে নির্মিত। ঐতিহ্যবাহী মোগল অথবা মুসলিম স্থাপত্যরীতির মধ্যে রয়েছে ছত্রি, উদ্গত জানালা, অশ্বনালাকৃতিসহ বিভিন্ন খিলান, ব্র্যাকেট পলেস্তারায় নির্মিত জালিকাজ। সার্বিক মিশ্র রীতিই ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত এবং বাংলায় রীতি একটি সম্ভ্রান্ত স্টাইল হিসেবে বিবেচিত। ধরনের স্থাপত্যরীতির সাথে ক্ষমতা, মর্যাদা শৈল্পিক বোধ জড়িত।

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে দেশে এক নতুন অভিজাত বিত্তশালী শ্রেণী গড়ে ওঠে, যারা পূর্ববর্তী মোগল আমলের যেসব জমিদারির খাজনা অনাদায়ী ছিল, সেগুলো ক্রয় করে নব্য জমিদারের মর্যাদা লাভ করেন। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর এসব অভিজাত ভূম্যধিকারী বা জমিদারশ্রেণী যাদের অনেকেই রাজা-মহারাজা-মহারানী ইত্যাদি সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত, তাদের দৈনন্দিন জীবন প্রণালি যথা চলাফেরা, পোশাক-আশাক, খাওয়া-দাওয়া, আচার-আচরণ ইত্যাদিতে ইংরেজ বা পাশ্চাত্য জীবন ব্যবস্থার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাদের পাশ্চাত্যায়ন রীতি যে কেবল দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, বরং তাদের নির্মিত স্থাপত্যগুলোতে, বিশেষ করে প্রাসাদ নির্মাণে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। নগরজীবনে অভ্যস্ত এসব জমিদারের অনেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন কলকাতায়। তবে স্বীয় জমিদারি অঞ্চলে সময় তাদের নির্মাণ করেছেন ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাবপুষ্ট বিশাল বিশাল প্রাসাদ, যেগুলো তাদের বিত্তবৈভব ক্ষমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে এখনো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অযত্ন-অবহেলায় বিধ্বস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাংলার জমিদারদের অনেকেরই অত্যাচারী আচরণের কাহিনী দেশের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। তারা খাজনা প্রদানে ব্যর্থ দরিদ্র কৃষকদের পাইক-পেয়াদা দ্বারা ধরে এনে এসব প্রাসাদের সম্মুখে দৈহিক নির্যাতন চালাতেন বলে শোনা যায়। কথিত আছে, কোনো সাধারণ মানুষ এসব প্রাসাদের সম্মুখের রাস্তা দিয়ে জুতা পায়ে হেঁটে যেতে পারত না। এসব স্বৈরাচারী জমিদারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে নজরানা দিয়ে হাত জোড় করে সম্মুখে আসতে হতো। পাশ্চাত্য জীবনধারায় অভ্যস্ত এসব জমিদারি প্রাসাদের অভ্যন্তরে জমিদারদের ব্যক্তিগত কার্যকলাপসহ অন্যান্য আর কী হতো, তার অধিকাংশই আমাদের অজানা। তবে তাদের নির্মিত এসব জমিদারি প্রাসাদে মোগল ইংরেজদের নব্য ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের এক অপূর্ব সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়, যা বাংলার স্থাপত্য ধারায় এক নতুন মাত্রা সংযোজন করে। সাধারণত এসব প্রাসাদ স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের কার্যোপযোগী নকশা, ক্ল্যাসিক্যাল স্তম্ভ (ডরিক, আয়নীয়, করিন্থীয়, তুশকান, কম্পোজিট), বিশেষ করে তুশকান স্তম্ভের ব্যাপক ব্যবহার, উচ্চ পিপাযুক্ত সুবিন্যস্ত বাতায়নবিশিষ্ট শিরাল গম্বুজ, ত্রিকোণী উপরিকাঠামো অর্ধবৃত্তাকার রোমান খিলান তিনপত্রবিশিষ্ট কৌণিক খিলান, দুই ধারে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত কক্ষসহ মূল ভবনাংশের কেন্দ্রস্থলে হলঘর, হাতলযুক্ত সিঁড়ির ব্যবহার, প্রাসাদ সম্মুখে গাড়িবারান্দা, সুউচ্চ প্রবেশ তোরণ, দ্বিতলে চন্দ্রাতপ বা প্যাভিলিয়ন, উল্লম্ব দরজা-জানালা, ভেনিসীয় খড়খড়ি, দরজা-জানালায় ভেনিসীয় ফ্যান-লাইটের ব্যবহার, নিরাপত্তা সুরক্ষার কারণে কোনো কোনো প্রাসাদের চারদিকে পরিখা বেষ্টনী, প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যান ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে অলংকরণ হিসেবে ছাদ-পাঁচিলের ওপর মানব বা পশু-পাখির ভাস্কর্য, কার্নিশের নিম্নভাগের পাড় নকশায় পলেস্তারায় কর্তিত পেঁচানো লতাপাতা, দন্তনকশা, ফুলের নকশা, ফুল লতাপাতার সাথে নর-নারী অথবা পাখির নকশা, বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়।

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে নওয়াব আব্দুল গণি কর্তৃক ঢাকায় নির্মিত আহসান মঞ্জিল শ্রেণীর অট্টালিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ। ইমারতটি নবাবতনয় আহসান উল্লাহর নামানুসারে নির্মিত। ভবনের সাথে মহিলা মহল সংযুক্ত হয়েছে দুই ভবনের মাঝে স্থাপিত একটি পথের সাহায্যে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবনটিকে আগের অবস্থায় সংস্করণ করা হয়। দ্বিতলবিশিষ্ট সমগ্র ভবনটি নদীমুখী (বুড়িগঙ্গা) এক বিশাল সোপান সারিসহ একটি উঁচু মঞ্চের ওপর নির্মিত। সিঁড়িটি দ্বিতীয় তলায় ত্রিখিলানবিশিষ্ট প্রক্ষিপ্ত উন্মুক্ত প্রবেশপথে সংযুক্ত হয়েছে। প্রবেশপথটির পেছনে অর্থাৎ ভবনটির মধ্যবর্তী অংশ স্তম্ভ জানালাযুক্ত ড্রামের ওপর একটি আকর্ষণীয় গম্বুজে শোভিত। ভবনটিতে বিভিন্ন আকারের এবং ভিন্ন ভিন্ন কাজের ব্যবহারের জন্য কতকগুলো কক্ষ রয়েছে যেমন অভ্যর্থনা কক্ষ, লাইব্রেরি, গেস্টরুম বা অতিথি কক্ষ ইত্যাদি এবং নিচতলায় পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি প্রশস্ত দরবার হল পূর্ব পাশে রয়েছে একটি ডাইনিং হল। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন ঢাকা পরিদর্শনে এলে নবাব সলিমুল্লাহ তাকে প্রাসাদে আতিথ্য দেন। ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী গোবিন্দরাম সাহার পরিবার কর্তৃক মানিকগঞ্জে নির্মিত বলিয়াটি প্রাসাদ (ঊনবিংশ শতাব্দী) জমিদার কালিনারায়ণ কর্তৃক জয়দেবপুরে ভাওয়াল প্রাসাদ (১৮৩৮) নব্য ক্ল্যাসিক্যাল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ইমরাতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাছাড়া বাংলাদেশে নির্মিত অন্যান্য জমিদারি প্রাসাদগুলোর মধ্যে নারাণগঞ্জের মুরাপাড়া প্রসাদ (১৮৮৯), মানিকগঞ্জের শিবালয়ের তেওটা প্রাসাদ (১৮৫৮), ময়মনসিংহ রাজবাড়ি (১৯০৫-১১), মুক্তাগাছা প্রাসাদ, গৌরীপুর প্রাসাদ, লাহিড়ী লজ, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নওয়াব প্রাসাদ, দিনাজপুর রাজবাড়ি, রংপুরের তাজহাট প্রাসাদ, পাবনায় শীতলাই প্রাসাদ তাড়াশ রাজবাড়ি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন