শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ উৎকর্ষের ছোঁয়া আসে নগরকেন্দ্রিক স্থাপনায়

ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ

১৪৯৭ সালে ভাস্কো দা গামা কর্তৃক সামুদ্রিক পথে ভারত গমনের রাস্তা আবিষ্কারের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের নবযুগের সূচনা হয়। পর্তুগিজদের সঙ্গে অন্যান্য জাতি যেমনডাচ, ফরাসি কিংবা ইংরেজরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা শুরু করে। যদিও তখন ভূখণ্ডে মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য স্তিমিত হয়নি, বরং উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে চলেছে। যা- হোক, বাণিজ্যের অভিপ্রায়ে এসে ভিনদেশী জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা অদ্ভুত একটি বিষয় আবিষ্কার করে, তা হলো তুলনামূলক অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা সামুদ্রিক উপকূল। তাছাড়া আরো বিস্ময়কর যে বিষয়টি তারা লক্ষ করে, তা হলো ভারতীয় বাসিন্দারা তাদের রুখে দেয়া কিংবা তাদের সঙ্গে বৈরী কোনো আচারণ না করে বরং খুব সামান্য কিছুর বিনিময়ে তাদের পণ্যসামগ্রী বিক্রি করতে সম্মত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই নৌসম্বন্ধীয় কলাকৌশলে ইউরোপীয়দের জানা-বোঝা অনেক বেশি ছিল। ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমির পূর্ব পশ্চিম উপকূলজুড়ে ইউরোপীয় বণিকেরা কারখানা স্থাপন শুরু করে। এভাবে কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য সংগ্রহের লক্ষ্যে তারা ক্রমেই অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে থাকে। মূলত বণিকদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মূল প্রচেষ্টা ছিল মোগল অধিপতির সঙ্গে পারিতোষিকবিষয়ক একটি বার্ষিক চুক্তিতে আসা। এভাবে ইউরোপীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা বা বৈরিতা তৈরি হয়। অবস্থায় আঠারো শতকের শুরুর দিকে পর্তুগিজরা তাদের অন্যান্য ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাংলায় তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে ডাচ, ফরাসি আর ইংরেজরা হুগলি পশ্চিম বাংলার উপকূলে তাদের কারখানা প্রতিষ্ঠায় সফল হয়।

সতেরো শতকের শেষ দিকে মোগল শাসকের কাছ থেকে কোম্পানির জন্য কলকাতা, সুতানুটি গোবিন্দপুরে জামিনদারি অধিকার লাভের মাধ্যমে বাংলায় ইংরেজদের শক্তি আরো জোরালো হয়। এভাবে আঠারো শতকের প্রথম দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিধি বিস্তার করতে থাকে। ১৭১৭ সালের রাজকীয় ফরমান প্রদানের মাধ্যমে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক বাণিজ্যিক প্রভাবের বিষয়টি অনেকটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই বলা যায়, ১৬৯০ থেকে ১৭৫৬ সাল ছিল কোম্পানির বাণিজ্যিক পরিধি বিস্তারের চমত্কার সময়, তাছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তারা তাদের বাণিজ্যিক ক্ষেত্র বৃদ্ধি করেনি, বরং নিরাপদও করতে সমর্থ হয়েছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পথপরিক্রমায় আরো একটি মাইলফলক অর্জিত হয় সম্রাট শাহ আলমের (দ্বিতীয়) সময়ে বাংলা, বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে। রাজস্ব সংগ্রহের অধিকারের মাধ্যমে ত্বরান্বিত হয় ঔপনিবেশিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। ১৭৬৭ সালে রবার্ট ক্লাইভকে দ্বিতীয়বারের মতো গভর্নর করে ফোর্ট উইলিয়ামে প্রেরণ করা হলে পরে ১৭৯৩ সালের মধ্যে ঔপনিবেশিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে ক্লাইভ কর্তৃক ক্রমেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া উন্নীত হতে থাকে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধুই বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং রাজনীতি-সেনাবাহিনী অর্থনৈতিক বিষয়ে আগ্রহী হতে শুরু করে, তখন মূলত তারা বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে মনোযোগী হয়ে ওঠে। কোম্পানি তার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে প্রথমে গুদামঘর, ব্যারাক বা সেনানিবাস আর কোম্পানির লোকদের বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে বিভিন্ন কোয়ার্টার নির্মাণ করতে থাকে। যেগুলোকে মূলত দুর্গ দিয়ে সুরক্ষিত করা হতো। ব্রিটিশদের নির্মিত প্রথম দিককার দুর্গের মধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম উল্লেখযোগ্য, যেটি কিনা একটি আদর্শ শহরের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পর্তুগিজ আর ফরাসি বৈচিত্র্যের সঙ্গে ইতালিয়ার রেনেসাঁর ধারণা দিয়ে গড়া।

এভাবে ঔপনিবেশিক সময়ে বাংলার সমাজ নির্মাণে শিল্পগত এক ধরনের পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়। সংিস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিটি উপকরণ ক্রমেই গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপীয় বাঙালি সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ায় একটি মিশ্র ধরন তৈরি হয়। ১৯০ বছর ধরে উভয় সমাজের মধ্যকার ঘটে চলা পরিবর্তনগুলোও সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে। দুই অঞ্চলের সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে সহজাতভাবেই একটি সংযোগ স্থাপিত হয়। জীবনশৈলী, আচরণ আর সাংস্কৃতিক উপাদানের পরিবর্তন উৎসাহিত করে সমাজের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের রূপান্তরকে। ক্ষমতাধর শ্রেণী, সরকারি কর্মকর্তা, কমিশন পদমর্যাদার কর্মকর্তা, রাজা জমিদার, বণিক, ব্যাংকার এবং অন্যান্য পেশাজীবীই মূলত ঔপনিবেশিক নগরসমাজের উন্নয়নের জন্য দায়বদ্ধ ছিলেন। যা কিনা সহজাতভাবেই একটি নতুন ধরনের নগর বসতি স্থাপন, নির্মাণের নতুন ধরন আর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের জন্য অবকাঠামোগত স্থানিক অবস্থার বিকাশ করতে সহায়তা করেছিল।

প্রাচীন যুগ থেকেই বাংলার স্থাপত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিদ্যমান। তুর্কিদের আগমন, প্রতিষ্ঠা লাভ স্বাধীনভাবে বাংলার ভূখণ্ড শাসনের ফলে স্থাপত্যের একটি বিশেষ ধরন তৈরি হয়, যেটি কিনা বাংলা স্টাইলহিসেবে পরিচিত, যেখানে বাঁকা কার্নিশ কুঁড়েঘরের বাঁকানো ছাউনি, যা মূলত মুসলিম স্থাপত্যের প্রধান ধরন বা রীতি হয়ে ওঠে। সতেরো শতকের প্রথম দশকে বাংলায় মোগলদের ক্ষমতা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর দিল্লি আগ্রায় মোগল স্থাপত্যের আদলে ভবন নির্মাণ করা হয়, যার বেশির ভাগই ছিল পারস্যের আদলে।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের আগমনের মাধ্যমে পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত হয়, বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে। আরো বলা যায়, এর মাধ্যমে বাংলা প্রথমবারের মতো পশ্চিমা সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, নগরায়ন, শিল্প স্থাপত্যের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে।

তবে প্রথম দিককার ব্রিটিশ নির্মাণগুলো সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত উপযোগিতাবাদী বা সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে নির্মিত হতো, কেননা কোম্পানির গোটা মনোযোগে বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়গুলোই অগ্রাধিকার পেয়েছে এবং যখন তারা অনুধাবন করেছে, কোনো কারণে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থগুলো ন্যূনতম ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে, তখন তারা রাজনীতিতে মনোযোগী হয়েছে। তাই রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে স্থাপত্য নির্মাণের বিষয়টি তাদের মধ্যে খানিকটা পরে এসেছে। তবে মোগল সাম্রাজ্যের পতন অন্যান্য শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্যের সূত্র ধরে গোটা উপমহাদেশের বৃহৎ সম্রাজ্যজুড়ে ব্রিটিশদের জন্য নিজেদের পদাঙ্ক অঙ্কনের বিষয়টি বিবেচনা করা সহজ হয়ে যায়।

ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক সামরিক বাহিনীতে পরিণত হওয়ার পর নিজেদের অধীনে বিভিন্ন অঞ্চল শাসনের কর্তৃত্ব প্রয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন সভ্য সামরিক বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠার তাগিদ তৈরি হয়। এভাবে তারা একে একে সেনা ছাউনি, দুর্গ, বাসভবনের মতো লোকায়ত স্থাপনা তৈরি করে। তবে গির্জার পাশাপাশি সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য এবং ব্রিটিশ কর্তৃত্ব তুলে ধরার জন্য আরো বেশি দৃশ্যমান স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন তৈরি হয়। এরই ফলে নির্মিত হয় গভর্নমেন্ট হাউজ কিংবা টাউন হলের মতো স্থাপনগুলো, বিশেষ করে যেখান থেকে প্রশাসন আর বিচারকাজ পরিচালিত হয়, সেখানে ব্রিটিশ উৎকর্ষের ছোঁয়া না থাকলে তো চলে না।

বাংলায় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বিকাশ শুরু হয়েছে মূলত মহানগরী আর রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের সূত্র ধরে। ঔপনিবেশিক জনপদের অপরিহার্য নিদর্শন হিসেবে চলে আসে ওল্ড টাউন, সিভিল লাইন, থানা, পুলিশ লাইন, ক্যান্টনমেন্ট, জেল, কালেক্টর অফিস, কোর্ট, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, জিলা স্কুল, মিশনারি স্কুল, কলেজ, ডাকবাংলো, চিরকুট হাউজ, স্টিমার বা রেলওয়ে স্টেশন ইত্যাদি। ঔপনিবেশিক আমলের সময়ে বাংলাদেশের শহর গ্রামীণ এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বেশকিছু ভবন নির্মাণ করা হয়। তখনকার উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্য রয়েছে গির্জা, নগর ভবন, কাচারিবাড়ি, বাগানবাড়ি, কুঠিবাড়ি, সরকারি বাংলো, জামিদার বাড়ি ইত্যাদি।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকগুলোতে নির্মিত ভবনের গঠনশৈলীতে ঔপনিবেশিক অবয়ব আর সুনির্দিষ্ট উপাদান যোগ হতে থাকে, যেমনবিশাল হল রুম, আলাদা ডাইনিং রুম, সংযুক্ত বাথরুম, আলাদা বারান্দা-ব্যালকোনি, খিলানযুক্ত স্তম্ভ ইত্যাদি। সুনির্দিষ্ট কিছু ভবনে বিশেষ ধরনের আদল আর উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে তা বৈশিষ্ট্যগতভাবেই ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিকে তুলে ধরে, একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দাবিকে পূরণ করে, যেমননগর ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত বাথরুম, কুমারী হাউজ, কাচারি ব্লক রুম, নাচঘর, হল রুম, বৃহৎ ডাইনিং রুম ইত্যাদি, বিশেষ করে জমিদারদের বাড়ির জন্য। কিছু বৈশিষ্ট্য যেমনচত্বর, মূল ভবনের সঙ্গে খাবার ঘর বা ডাইনিং, ল্যাম্প রুম ফায়ার প্লেস, মূল ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত বাথরুম ড্রেসিংরুম ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপীয়রাই পরিচয় করিয়ে দেয়।

বিভিন্ন ধরনের উপকরণ যেমনকাঠামোগত, পরিবেশগত, সৌন্দর্যবৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রায়োগিক ইত্যাদির ব্যবহার প্রচলিত ঔপনিবেশিক ভবনের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরতে সাহায্য করে। কাঠামোগতভাবে স্তম্ভ, দেয়াল, খিলান, চৌকাঠ, ধনুকাকৃতি ছাদ, গম্বুজ, কড়িকাঠ, তাকের ব্যবহার ছিল দৃশ্যমান। পরিবেশগত উপাদান যেমনশেডিং ডিভাইস, ড্রপসহ ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে ব্যবহূত অন্যান্য অলংকরণ যেমন বেজ ক্যাপিটাল সিল, প্রোজেকশন, মলডিং (ছাঁচে প্রস্তুত দেয়ালের ওপর দিকে বা ঘরের বাইরের কারুকাজ), ভবনের সম্মুখভাগের উপরিদেশে ত্রিকোণ গঠন বিশেষ, রাস্টিকেটেড ব্লক, চূড়ার ব্যবহার ইত্যাদি মূলত ইউরোপীয় স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী তৈরি হয়েছে। কিছু প্রায়োগিক উপকরণ যেমনপ্লিনথ (স্তম্ভ বা ভাস্কর্যের তলদেশের চতুষ্কোণ ভিত্তি), সিঁড়ির ধাপ, অ্যালকৌভ (চোরকুঠরি; কোনো কক্ষের আংশিকভাবে পরিবেষ্টিত বর্ধিতাংশ, যেখানে অনেক সময় শয্যা বা আসন রাখা হয়), ওয়ারড্রৌব, সম্মুখ দরজা (ওপেনিং ডোর), জানালা, ফায়ার প্লেস, চিমনি, প্রাচীর, পানি নির্গমনের নল, ভেন্টিলেটর, রেলিংঝুলবারান্দা, গ্রিল ইত্যাদি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে ব্যবহূত হয়।

এর নিজস্ব ধরন ছাড়াও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সাধারণ প্রচলিত কিছু উপাদান ব্যবহার করা হতো যেমনহাউজ ব্লক, সার্ভিস ব্লক, ড্রাইভওয়ে, লন, ট্যারেস, বেষ্টনী, গেট কিংবা গেট হাউজ, সার্ভিস এন্ট্রি, লবি এরিয়া, ইন্দ্র ইত্যাদি।

ঔপনিবেশিক নির্মাতারা সমন্বিত একটি ধারণার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, যেখানে নির্মাণ ধরনের সঙ্গে লনের আদলে খোলা জায়গা (ওপেন স্পেস) রাখার প্রচলন ঘটে। বেষ্টনী সংযুক্তির বিষয়টি ছিল ল্যান্ডস্কেপিং উপকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক নির্মাতারা তাদের কাজগুলোতে সংজ্ঞায়িত করতেন। উপনিবেশকেরা স্থায়ী প্রাচীর তোলার পক্ষপাতী ছিলেন না, ঢালাও প্রাচীরের বদলে তারা বরং ছিদ্রবহুল সীমানা প্রাচীর দেয়া পছন্দ করতেনবাংলোর চারপাশে কাঁটাতারের বেষ্টনী কিংবা ক্ষুদ্র বৃক্ষ নির্মিত বেড়া দিয়ে তৈরি স্থির আচ্ছাদন।

১৬৯০ সালে বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কলকাতার গোড়াপত্তনের পর অল্প সময়ের মধ্যে একে একে দুর্গ, গির্জা আর কোর্ট হাউজ নির্মিত হওয়ার মাধ্যমে এটি একটি সার্বভৌম নগরে পরিণত হয়। শহরটি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে, বিশেষ করে বণিক আর ব্যবসায়ীরা ইংলিশ কান্ট্রি হাউজ যেমন তখনকার সমসাময়িক স্থাপনা প্যালাডিয়ান মেনশনের আদলে গ্র্যান্ড হাউজ বা বড় বড় ভবন নির্মাণের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রদর্শন করতে থাকে। যা ছিল ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় নির্মাণশৈলী অভিযোজনের প্রথম প্রয়াশ।

আঠারো শতকের দিকে তত্কালীন পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশে ইউরোপীয় প্রথম দিককার স্থাপনাগুলো মূলত গির্জার নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে প্রচলিত ইউরোপীয় প্রভাব দেখা যায়। বাংলাদেশে বিদ্যমান সবচেয়ে প্রাচীনতম উদাহরণ তেজগাঁওয়ের হোলি রোজারি গির্জা। সতেরো শতকে পতুর্গিজরা এটি নির্মাণ করে এবং পরে ১৭১৪ সালের দিকে এটির পরিবর্ধনের কাজ করা হয়। দুই সারি স্তম্ভ এক প্রান্তে গম্বুজবিশিষ্ট প্রশস্ত লম্বা হল রুম সদৃশ্য চক্রনাভি (গির্জার মূল অংশ, যেখানে লোকজন উপবেশন করে), গির্জার অভ্যন্তরে চলাচলপথ বা দুই সারি আসনের মধ্যবর্তী সরু পথ এবং বর্গাকার চূড়ার আকারে তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। গির্জার মোচাকার চূড়াবিহীন সমান্তরাল ছাদ, যা কিনা আগেকার মোগল রীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

১৭৮১ সালে আরমানিটোলায় নির্মিত আর্মেনীয় গির্জাটি মূলত আর্মেনিয়ার মূল গির্জা এছমিয়াডজিন কলকাতার গির্জার মধ্যকার সাধারণ সাদৃশ্যের প্রতিমূর্তি। যদিও উচ্চতা, ভবন তৈরির উপকরণ আবহাওয়াগত অভিযোজনের বিষয়গুলো বিবেচনাপূর্বক কিছু পার্থক্য বিদ্যমান।

ওয়ারির খ্রিস্টান সিমেট্রিতে পুরনো অতীতের বেশকিছুসংখ্যক সমাধিস্তম্ভ বিদ্যমান যেমনপিরামিড, স্মারকস্তম্ভ, প্যাভিলিয়ন সমাধিক্ষেত্র, যেগুলো স্থাপত্যের নব্য ধ্রুপদী (নিউ ক্ল্যাসিক) ঘরানার সাবলীলতা উৎকর্ষ দিয়ে নির্মিত।

তখনকার সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামী অথবা জমিদাররা পরিচিত ছিলেন রাজা কিংবা মহারাজা নামে। তারা তাদের জমিদারির দেখাশোনা আর নিজেদের থাকার জন্য গ্রামীণ এলাকাগুলোতে যেসব ভবন নির্মাণ করেন, সেগুলো ছিল বড় বড় প্রাসাদ বা রাজকীয় প্যাটার্নে তৈরি। যেমন নাটোরের রাজবাড়ি, দিনাজপুরের রাজবাড়িতে বড় ধরনের প্রবেশদার, অট্টালিকার সম্মুখভাগের উপরিদেশে ত্রিকোণ গঠনবিশেষ, করিন্থিয়ান (গ্রিক স্থাপত্যে দৃষ্ট তিন রকম স্তম্ভের একটি) বা লোনিক কলামে সমর্থিত অর্ধবৃত্তাকার খিলান জানালায় রঙিন কাচের শার্সির ব্যবহার। ভবনগুলো মূলত নব্য ধ্রুপদী ঐতিহ্যের যৌথ বৈশিষ্ট্য এবং সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা শাসকদের পাশাপাশি বর্তমানের শাসকদের চিহ্ন বহন করে।

১৭৯৩ সালে স্থায়ী বন্দোবস্তের পর নতুন সমান্ততান্ত্রিক জমিদার পয়সাওয়ালা নতুন অভিজাত শ্রেণী দেউলিয়া জামিদারদের তালুকগুলো কিনে নিতে শুরু করে এবং তাদের পাশাপাশি ধনী বণিকশ্রেনী যারা তাদের অর্থের সিংগভাগই জমিদারি ক্রয়ে ব্যয় করেন এবং বসবাস না করলেও গ্রামাঞ্চলে বিশাল বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরি করেন। যেমনটা তারা কলকাতায় করেছিলেন, যেখানে তারা বসবাস করতেন। পাশ্চাত্যের অনুকরণে জীবনযাপনের প্রতি নতুন অভিজাত শ্রেণীর গভীর অনুরক্তি সুস্পষ্টভাবেই তাদের স্থাপত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। যার মধ্যে ক্ল্যাসিক্যাল ডরিক (প্রাচীন গ্রিসের ডরিস প্রদেশের স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী নির্মিত স্তম্ভ), আয়োনিক করিন্থিয়ান স্তম্ভ, উঁচু গোলাকার গম্বুজ জানালা, অট্টালিকার সম্মুখভাগের উপরিদেশ ত্রিকোণ গঠন, রোমান অর্ধবৃত্তাকার খিলান, গথিক স্থাপত্যরীতির তোরণ, মূল ব্লকের উভয় পাশে কক্ষ আর মাঝখানে সিঁড়ি হল সংযুক্তের বিষয়টি উল্লেখ্য। মানিকগঞ্জের বালিয়াটি প্রাসাদ, জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি স্থাপত্যের নিওক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার অনন্য উদাহরণ।

ধরনের স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে অন্যতম দর্শনীয় প্রাসাদ নবাব আবদুল গনি নির্মিত ঢাকার আহসান মঞ্জিল। দুই তলা ভবনটি একটি উঁচু বেদির (পডিয়াম) উপরে দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার বারান্দা থেকে একটি সুবৃহৎ খোলা সিঁড়ি বুড়িগঙ্গা নদীর ধার পর্যন্ত নেমে গেছে। ঢাকা থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে পানাম নগরে ধনী অভিজাত কারবারিদের স্থাপত্যে মিশ্র স্থ্যাপত্যশৈলী (হাইব্রিড আর্কিটেকচার) ফুটে ওঠে, তারা সোনারগাঁওয়ের মধ্যযুগীয় রাজধানী নগরের মাঝ বরাবর একটি রাস্তা জুড়ে দিয়েছিলেন, রাস্তার দুই পাশে বিভিন্ন নকশা আর বৈশিষ্ট্যের বাড়িগুলোর ভূখণ্ডের নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীর কথা বলে, কিন্তু অঙ্কন অনুপ্রেরণা ব্রিটিশ রাজার রাজধানী কলকাতা শহরে নির্মিত ঔপনিবেশিক উদাহরণগুলো থেকে প্রভাবিত, যেমনটা সারা দেশের বিস্তৃত জমিদার প্রাসাদগুলোতে একই ধরনের প্রভাব চোখে পড়ে। ভবনগুলোর আলংকারিক উপাদানগুলো স্পষ্টভাবেই ইউরোপীয় অনুপ্রেরণা সংযুক্ত।

কলকাতা দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী থাকায় এটি ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলী আর উপাদানের মিশেলে নির্মিত বেশকিছু সরকারি ভবন নিয়ে রীতিমতো গর্ব করতে পারে। শহরটি ইউরোপীদের পরিকল্পনার আদলে ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে এখানের সরকারি ভবনগুলো নির্মাণ-নকশায় বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ১৮১১ সালে প্যালাডিয়ান রীতিতে কলকাতার টাউন হলের নকশা করেন কর্নেল জে গার্স্টিন। মেটক্যাফে হলের (১৮৪০-৪১) পশ্চিম দিকে সদর মুখ রাখা হয়েছে, যা মূলত উইন্ডস ইন এথেন্স টাওয়ারের মডেল অনুসারে তৈরি।

১৯০২ সালে ব্রিটিশ শাসিত কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে নির্মাণ পরিকল্পনা শুরু হলে রয়েল একাডেমি অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের প্রেসিডেন্ট স্যার উইলিয়াম এমারসনকে এর নকশা প্রস্তুতের দায়িত্ব দেয়া হয়। ইতালীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যশৈলীতে নকশা প্রস্তুত করতে বলা হলেও তিনি শুধু ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রয়োগের বিরোধিতা করেন। তিনি মনে বিশ্বাস করতেন, স্থাপত্যে প্রাচ্যের অনুভূতি বজায় রাখা উচিত। তাই তিনি ইন্দো-সারাসেনিক (ইউরোপীয় শরীরে মোগল অলংকার বা ঔপনিবেশিক আমলের শঙ্কর স্থাপত্য) শৈলীর সঙ্গে মোগল উপাদান যুক্ত করে মূল নকশা প্রস্তুত করেন। শ্বেতপাথরের ব্যবহার, উন্নমিত চত্বর, সম্মুখে জলাশয় ইত্যাদি অনুষঙ্গ মূলত তাজমহলের নকশা দিয়ে প্রভাবিত।

১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষ সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে গেলে, ভারতীয় অতীতের দিকে জোর দেয়া হলে নির্মিত ভবনগুলোর বাহ্যিক নকশায় অধিক হারে ভারতীয় ঐতিহ্য সংযুক্ত করা হলো এবং অভ্যন্তরীণ নকশায় অনেক বেশি আধুনিক ইউরোপীয় নির্দশন যোগ হয়। ঢাকার কার্জন হল ওল্ড গভর্নমেন্ট হাউজ পরবর্তী সময়ে যেটি হাইকোর্ট হিসেবে পরিচিত, স্থাপনাগুলো উল্লেখ্যযোগ্য পরিবর্তিত উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ব পশ্চিমের সংমিশ্রণে শঙ্কর স্থাপত্য ধারার উত্থান ব্রিটিশদের স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের গ্রহণযোগ্য খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রচেষ্টার উত্কৃষ্ট উপমা।

ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি কলকাতা, চেন্নাই কিংবা মুম্বাইয়ের সঙ্গে ব্রিসবেন বা মেলবোর্নের ভবনের তুলনা করলে খুব বেশি পার্থক্য চোখে পড়ে না। এখানের স্থাপত্যগুলো যেহেতু ঔপনিবেশিক সময়ে তৈরি হয়েছে, সেহেতু সবখানেই ইংল্যান্ডের স্থাপত্যের একটা ছাপ রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভিক্টোরিয়ান কিংবা প্যালাডিয়াম ছাপ, ইংল্যান্ডের স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি হয়েছে বলা যায়। বিশেষ করে সরকারি ভবনগুলো ঠিক ইল্যান্ডের ভবনের মতো করে তৈরি। ব্রিটিশরা যে ভবনগুলোতে থাকত বা বসবাস করত, তাও ইংল্যান্ডের স্থাপত্যের আদলে করা।

আমাদের গভর্নর হাউজ সম্পূর্ণ ইংল্যান্ডের অনুকরণে তৈরি একটি ভবন। তবে এটা কিন্তু বলা যাবে না যে আমাদের অঞ্চলের স্থাপত্য নকশার প্রভাব এখানে পড়েনি। আমাদের ভবনে যেমন বড় জানালা প্রশস্ত বারান্দা লাগে, ইংল্যান্ডে এমন লাগে না। কেননা ওরা শীতপ্রধান দেশ। বড়জোর বাড়িতে প্রবেশের জন্য একটা বড় গাড়িবারান্দা রাখা হয়।

লর্ড কার্জনের জন্য নির্মিত গভর্নর হাউজটিও ইংল্যান্ডের স্থাপত্য নকশায় করা। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি, কিন্তু আমাদের অঞ্চলের কোনো প্রভাব নেই। স্থায়ী বন্দোবস্তের পর ভবন নির্মাণে আমাদের অঞ্চলের স্থাপত্যের প্রভাব পড়েছে। সে সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর নির্ধারণ করে দেয়া হলো। এর মাধ্যমে কলকাতায় বসেই ব্রিটিশরা পুরো বাংলার অর্থটা পেতে শুরু করল। আগে ধান হয়নি, খরা হয়েছে কিংবা বন্যা হয়েছেজমিদারদের ধরনের কারণ দর্শানোর সুযোগ ছিল। এজন্য ব্রিটিশরা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ধার্য করে দেয়। এরপর সাধারণ জমিদারেরা অত্যাচারিত জমিদারে পরিণত হলো। এভাবে বাংলার জমিদাররা প্রজাদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণ কর নিতে শুরু করল এবং অল্প সময়ের মধ্যে তারা প্রচুর সম্পদের মালিক বনে গেল। এভাবে জমিদারের জীবনযাপনের পদ্ধতিরও পরিবর্তিত হয়। তাদের সন্তানেরা ইংল্যান্ডে পড়তে যেতে শুরু করে, জমিদারদের পোশাক-আশাকের পরিবর্তন হয়, তারা ইংল্যান্ডের সুগন্ধিসহ অন্যান্য জিনিস আনা শুরু করে। বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে তারা তখন ব্রিটিশ স্থপতিদের নিয়ে আসতে শুরু করল।

তবে জমিদার বাড়িগুলো কিন্তু ভিন্ন। যেমন বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। এটি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের একটি চমত্কার উদাহরণ। বাড়িটির সম্মুখভাগের উপরিদেশে ত্রিকোণ গঠনবিশেষ বা পেডিমেন্টের ব্যবহার রয়েছে, উপরের দিকের স্থাপত্য নকশা ইত্যাদি দেখে মনে হবে এটি একটি ব্রিটিশ স্থাপত্য। তবে বাড়িটি কিন্তু ওই জমিদারদের মতো। পোশাক ব্রিটিশ তবে ভেতরটা বাঙালি। বাড়িটার কিছুটা ভেতরে গেলে একটু বড় কৌটিয়ার্ড (চত্বর), তারপর সার্ভিস কৌটিয়ার্ড, শেষ দিকে দেখা যায় চার ভাইয়ের জন্য চারটি বাড়ি এবং চার বউয়ের জন্য চারটি ঘটলা, যা ব্রিটিশ অনুকরণে তৈরি নয়। বাড়ির সামনের অংশটুকু ব্রিটিশ, তারপর বাংলা খোলা চত্বর, এরপর পুকুর। বাড়ির সম্মুখভাগের লাল অংশটি যদি বাদ দিই, তাহলে গোটাটাই আমাদের অঞ্চলের নিদর্শন। ব্রিটিশরা এমন বাড়ি তৈরি করত না। এর মানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর যে জমিদার বাড়িগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আমাদের অঞ্চলের স্থাপত্য, আবহাওয়া বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।

যেমন কার্জন হল। এটিও কিন্তু ব্রিটিশ স্থাপত্যের মতো নয়। এখানে কিছুটা স্থানীয় ইসলামিক স্থাপত্য উপাদান নেয়া হয়েছে। ভবনটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো চারদিকে টানা বারান্দা। ব্রিটিশ স্থাপত্যে টানা বারান্দা নেই। চারদিকে টানা বারান্দা তৈরির মূল কারণ কোনো কক্ষের মধ্যে সরাসরি সূর্যের আলো প্রবেশ করবে না। তার মানে প্রত্যেকটা কক্ষ অনেক শীতল থাকবে। বাংলার যেখানেই ব্রিটিশরা ভবন নির্মাণ করত, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য টানা বারান্দা দিত। আহসান মঞ্জিল আরো একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া, দক্ষিণের বাতাস, মৌসুমি বায়ু বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমাদের অঞ্চলে ভবনগুলো উত্তর-দক্ষিণমুখী করে নির্মাণ করা হয়। ঔপনিবেশিক আমলের অনেক ভবন কিন্তু পশ্চিমমুখী। যেমন রাজউক বিল্ডিং। এমনকি গভর্নরস হাউজও পশ্চিম দিকে মুখ করে তৈরি। আমাদের অঞ্চলে পশ্চিমমুখী করে বাড়ি নির্মাণ কেউ করত না। কেননা এদিক থেকে রোদ আসে। অঞ্চলের ভবনগুলো হয় দক্ষিণমুখী, থাকবে টানা বারান্দা।

তবে ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিক আমলের ভবনগুলোতে বরান্দাযুক্ত করার পাশাপাশি বাতাস চলাচলের জন্য অঞ্চলের স্থাপত্য নকশাগুলোকে গ্রহণ করে। তাই ওই সময়ের ভবনগুলোতে ব্রিটিশ-বাঙালি স্থাপত্য মিশ্র। যেমন আর্চ বা খিলান এসেছে ব্রিটিশদের থেকে আবার ডৌম বা গুম্বজটা অঞ্চলের। এখানকার জলবায়ুর বিষয়টিকে মাথায় রেখে ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। সেজন্য কলকাতা বা মুম্বাই থেকে বাংলার ভবনগুলো ভিন্ন। ওই সময়ে অঞ্চলে নির্মিত ভবনগুলো দেখতে ঔপনিবেশিক মনে হলেও আমাদের জলবায়ু-আবহাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা। ভবনগুলোতে সান ব্রেকারযুক্ত বা হয়েছে, এতে বাইরে থেকে ভবনের ভেতর অবাধ বাতাস চলাচল করতে পারবে। তবে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করতে পারবে না। আমি মনে করি, ঔপনিবেশিক আমলের একটি বড় সংযোজন চারদিকে বারান্দা, কাঠের জাফরি, ইসলামিক স্থাপত্যশৈলী নেয়ার চেষ্টা ইত্যাদি। তাই বলা যায়, ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ স্থাপত্যের সঙ্গে বাংলার স্থাপত্যের উপাদান, উপকরণ, রীতি মিলিয়ে বাঙালি কলোনিয়াল আর্কিটেকচার বা হাইব্রিড আর্কিটেকচার আসে, যা বিশ্বের অন্যান্য ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের চেয়ে ভিন্ন

ওই সময়ে ভারতের কলকাতা, মুম্বাইয়ে নির্মিত ভবনগুলো কিন্তু আমাদের এখানকার ভবনের মতো নয়, ওগুলো পূর্ব-পশ্চিমমুখী। সেখানে কোনো বারান্দা রাখা হয়নি। জানলাগুলো ইংল্যান্ডের ভবনের মতো ছোট ছোট। মেলবোর্নের ভবন, ব্রিসবেনের ভবন আর কলকাতার ভবনগুলো দেখলে এক মনে হবে। কলকাতা, মাদ্রাজ, মুম্বাইয়ের মানুষগুলোকে সরিয়ে দিলে একে ব্রিটেনের ভবন বলেই মনে হবে।

আমাদের অঞ্চলের ভবনগুলো জমিদাররেরা নির্মাণ করায় তা ভিন্ন হয়েছে। তবে জয়পুরের জমিদাররা ঔপনিবেশিক সময়ে যে ভবনগুলো তৈরি করেছে, তাও কিন্তু ভিন্ন। জয়পুরের জমিদারবাড়িগুলো কিছুটা ইসলামিক আর কিছুটা কলোনিয়াল। জয়পুর আর বাংলা দুটি জায়গায় ভবনগুলো ঔপনিবেশিক আমলের অন্য ভবনগুলোর তুলনায় ভিন্ন।

এর মানে সরকারি ভবনগুলো ব্রিটিশ স্থাপত্য রীতিতে আর আবাসিক ভবন অঞ্চলের স্থাপত্যবৈশিষ্ট্যযুক্ত। কারণ স্থানীয় জমিদাররা, ধনী ব্যবসায়ীরা ব্রিটিশ-বাংলা স্থাপত্য মিলিয়ে নিজেদের সুবিধামতো ভবন তৈরি করেছে। বাংলাদেশ আর জয়পুরের উদাহরণ যার সেরা দুটি উদাহরণ। বাংলায় শঙ্কর স্থাপত্যের মূল কারণ হলো স্থায়ী বন্দোবস্ত। ব্যবস্থাটা না হলে এখানকার জমিদারদের হাতে এত অর্থ আসত না। পুরো বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে কিন্তু জমিদারদের তৈরি করা একটা করে বাড়ি আছে।

ঢাকার রূপলাল হাউজের ভেতরে নাচের জন্য ফ্লোর করা হয়েছে, বাঙালিরা কিন্তু এতে অভ্যস্ত নয়। এটা ব্রিটিশদের জন্য করা, এভাবে ব্রিটিশ সংস্কৃতি গ্রহণ করা হয়েছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধিই যার নেপথ্য কারণ।

মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির সামনে টানা বারান্দা, পেছনে খোলা চত্বর (কোর্টিয়ার্ড) কিন্তু ফ্যাসাদটা অনেক বেশি ঔপনিবেশিক গড়নের। আবার ভবনের পেছনে পুকুর রাখা হয়েছে। বাংলার বাড়িতে একটি খোলা চত্বর একটি পুকুর থাকবে। বাড়িটি যদি হিন্দু জমিদারদের হয়, তাহলে চত্বর বা উঠানে একটি পূজা মণ্ডপ থাকবে। যেখানে পূজা হয়। পূজা আবার দুই ধরনের। অনেক জনসাধারণের অংশগ্রহণে একটা, অন্যটা দৈনিক পূজা। সেজন্য ধরনের বাড়িগুলোতে বড় যে চত্বর থাকে, যেখানে গ্রামের সাধারণ জনগণ প্রবেশ করতে পারে। আর বাড়ির লোকেদের দৈনিক পূজার জায়গাটি থাকে ভিন্ন।

ঔপনিবেশিক আমলে দুই ধরনের স্থাপত্য হয়েছে। ব্রিটিশরা আমাদের অঞ্চল থেকে শুরু করলেও কলকাতাকে তারা রাজধানী করে। তাই ব্রিটিশদের অফিশিয়াল ভবনগুলো সব কলকাতাকেন্দ্রিক। জাদুঘর থেকে শুরু করে লাইব্রেরি এগুলো ব্রিটিশ আদলে কলকাতায় তৈরি হয়েছে। যদিও গোটা বাংলা থেকে কর আদায় করা হতো। ফলে টাকাটা আমাদের অঞ্চল থেকে যেত, কিন্তু খরচ হতো কলকাতায়। এজন্য কলকাতার উন্নয়ন হয়েছে, আমাদের অঞ্চলে হয়নি।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর বাঙালিকে খুশি করার জন্য এখানে আটটি কলেজ প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেয়া হয়। এর সূত্র ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজের প্রতিষ্ঠা। যা- হোক, তবে কলকাতার স্থাপত্য আর বাংলার স্থপত্য ভিন্ন। কারণ অঞ্চলে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড হয়নি, তাই সরকারি ভবন তৈরি হয়নি। সরকারি কার্যক্রম বলতে ছোট ছোট ডাকবাংলো তৈরি করেছে। বিশেষ করে ব্রিটিশরা যখন বাংলায় কর নিতে আসত, তখন কলকাতায় যাওয়ার পথে ওরা ছোট ছোট অনেক ডাকবাংলো তৈরি করে।

নীলকুঠি হিসেবে যে ভবনগুলো নির্মাণ করেছে, ওগুলোও ঔপনিবেশিক স্থাপত্য। নীলকুঠি ব্রিটিশদের আর বাঙালিদের জমিদারবাড়ি। এখানে সবচেয়ে বড় ভবন হচ্ছে গভর্নর হাউজ। ঔপনিবেশিকের শেষের দিকে কিছু বড় ভবন নির্মাণ করছে যেমনরাজউক বিল্ডিং বা সেক্রেটারিয়েট ভবন। তবে ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকার তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রামে বেশি স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। তাই বাংলার ঔপনিবেশিক ভবনগুলো কলকাতার তুলনায় একটু ভিন্ন, আবার কলকাতার ভবনগুলো ব্রিটিশদের অন্যান্য অঞ্চলের ভবনগুলোর মতো। এমনও গল্প আছে, ব্রিটিশরা কলকাতার একটি ভবন তৈরির জন্য ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে মাটি পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। এটা কিন্তু কলকাতার পয়সায় আনা হয়নি, বাংলা থেকে আদায় করা করের পয়সা খরচ করা হয়েছে।

বাংলায় বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তখন দুটি ব্যবসায়িক পথ ছিলএকটা সিল্করুট অন্যটা স্পাইসরুট। সিল্করুট ছিল সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে চীন, আর স্পাইসরুট আফ্রিকা থেকে সংযোগ করে বেঙ্গল হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। মসলা ছিল একটি বড় রফতানি পণ্য। মসলা মানে হলুদ-মরিচ নয়, বরং যা মেডিসিন, প্রিজারভেটিভ, সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহূত হতো। মমি সংরক্ষণের জন্য যে সংরক্ষক দ্রব্য তা আমাদের এখান থেকে যেত। এগুলো ছিল অনেক দামি। সেক্ষেত্রে মসলার একটা খনি ছিল বঙ্গ। তাছাড়া রেশমের সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাপড় তৈরি হতো এখানে। কৃষি বয়নশিল্প দুটোই ছিল আমাদের। অতএব আমাদের বড়লোক না হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুটো কারণে বাংলার অর্থনীতি উন্নত ছিল। এর সঙ্গে চারদিকে ছিল সুবিধাজনক নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে অঞ্চলটি ছিল ব্যবসা করার জন্য খুব ভালো জায়গা।

১৬৭৬ সালে তেজগাঁও হলিক্রস কলেজের ভেতর নির্মিত হলি রোজারিও চার্চ, আমাদের অঞ্চলের চৌচালা ছাদের আকারে করা, গম্বুজের ব্যবহারও লক্ষণীয়। যা মোগল প্রারম্ভিক ইসলামিক আমলের নির্মাণবৈশিষ্ট্য। পরে কিন্তু চার্চের নির্মাণ ধরনে পরিবর্তন হয়েছে। তার মানে বিভিন্ন আমলে আমাদের অঞ্চলে এসে ভবন নির্মাণের ধরনগুলোর পরিবর্তন হয়েছে। তাছাড়া অঞ্চলের জলবায়ু এত বেশি প্রভাব বিস্তার করে যে ভবন নির্মাণে অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।

(ভাষান্তর শ্রুতিলিখন রুহিনা ফেরদৌস)

 

. আবু সাঈদ এম আহমেদ: স্থপতি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক বিভাগীয় চেয়ারম্যান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন