বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

প্রথম পাতা

দুদকের নজর এবার দুবাইয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর অন্যতম দুবাই। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতের নগরীতেও প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ পাচার হয়। বিভিন্ন সময় পাচার হওয়া অর্থের সন্ধানে এবার দুবাইয়ের দিকে নজর দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর অংশ হিসেবে এবি ব্যাংকের পাচার হওয়া ১৬৫ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। বিভিন্ন সময় দুবাইয়ে পাচার হওয়া অন্যান্য অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াও শুরু হবে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, পাচার হওয়া এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনতে দুবাই কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিচ্ছে দুদক। এর ধারাবাহিকতায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মাধ্যমে দুবাইয়ে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টও (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। এমএলএআর পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান আনোয়ার প্রধান।

ভুয়া অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগের নামে অর্থ পাচারের অভিযোগে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি আটজনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করে দুদক। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এবি ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দুদকের কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, এবি ব্যাংকের চট্টগ্রামের ওবিইউ শাখা থেকে সুইফটের মাধ্যমে দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকের চেং বাউ জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি নামের একটি কোম্পানির হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে। হিসাবটি ছিল জনৈক আব্দুস সামাদ খানের নিয়ন্ত্রণে। পরে চেং বাউ জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি নামীয় প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে সমুদয় অর্থ, অর্থাৎ কোটি ডলার অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু অর্থ কোথায়, কার নামে বা কার হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য এবি ব্যাংক বা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সরবরাহ করতে পারেনি। কিন্তু মামলা প্রমাণে তথ্য খুবই জরুরি। তাই দুবাই থেকে তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে এমএলএআর পাঠানোর জন্য কমিশনের অনুমতি চান তদন্তকারী কর্মকর্তা। কমিশন অনুমতি দিলে গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মাধ্যমে এমএলআর পাঠানো হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান বণিক বার্তাকে বলেন, দুবাইয়ে পাচার করা সমুদয় অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে অন্য কোনো হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু কোথায়, কার নামে বা কার হিসাবে অর্থ গেছে সে তথ্য এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা বিএফআইইউয়ের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু মামলা আদালতে প্রমাণ করতে গেলে এসব তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণক। সেজন্য এসব তথ্যের জন্য দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে।

এবি ব্যাংকের অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদক মামলাটি দায়ের করে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হকসহ মোট আটজনকে মামলায় আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন এবি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ চৌধুরী, মো. ফজলুর রহমান, কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল, এবি ব্যাংকের হেড অব অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের (ওবিইউ) মোহাম্মদ লোকমান, হেড অব করপোরেট ব্যাংকিং মোহাম্মদ মাহফুজ উল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নুরুল আজিম এবং এবি ব্যাংকের গ্রাহক আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল হক।

মামলার এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে এবি ব্যাংকের বৈদেশিক শাখা থেকে ১৬৫ কোটি টাকা দুবাইয়ে পাচার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর এম ওয়াহিদুল হকসহ তিন আসামিকে গ্রেফতারও করা হয়। পরে তারা জামিন পান। 

বিদেশে ভুয়া কোম্পানি খোলার পাশাপাশি আমদানি-রফতানিতে জালিয়াতির মাধ্যমেও প্রতি বছর বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ হিসাব বলছে, বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালেই পাচার হয়েছে প্রায় ৫৯২ কোটি ডলার। ২০১৪ সালে দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৮৯৭ কোটি ডলার। তারও আগে ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ডলার পাচার হয়েছিল দেশ থেকে। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ হিসাব করলে অংকটি দাঁড়ায় হাজার ৩১৫ কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচার হওয়া এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশের গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। এবার সেদিকেই নজর দিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন