রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ক্রিকেটারদের ধর্মঘট

অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্রিকেট বর্জনের ঘোষণা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

পূর্ণোদ্যমে চলছিল ক্রিকেট মৌসুম। জাতীয় লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড শেষ হয়েছে রোববার। ২৪ অক্টোবর শুরু হওয়ার কথা তৃতীয় রাউন্ড। এদিকে ভারত সফর সামনে রেখে জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা ২৫ অক্টোবর। কিন্তু এর মাঝেই গতকাল দুপুরের আগে থেকে গুঞ্জন শোনা যায়, বিভিন্ন দাবিতে ক্রিকেটাররা আন্দোলনে যাচ্ছেন। আসে জাতীয় ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণাও। এরপর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ভিড় জমাতে থাকেন সাংবাদিকরা। বেলা ৩টার দিকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ক্রিকেটাররা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদসহ জাতীয় ক্রিকেটারদের অনেকেই। সময় ১০ জন ক্রিকেটার মোট ১১টি দাবি পড়ে শোনান। পরে সবার পক্ষ থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্রিকেট বয়কটের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের টেস্ট টি২০ অধিনায়ক সাকিব। একই সঙ্গে নারী ক্রিকেটারদেরও তাদের দাবি নিয়ে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার।

দাবি উত্থাপনের পর ক্রিকেট থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়ে সাকিব বলেন, যেহেতু অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে আছে। আমরা তাদের এখানে অন্তর্ভুক্ত করছি না। এর বাইরে সবাইকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করছি। আমরা জানি, সবাই আমাদের সঙ্গে আছে। যতদিন পর্যন্ত আমাদের দাবিগুলো পূরণ না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আমরা ক্রিকেটের কোনো কার্যক্রমে জড়িত থাকতে চাচ্ছি না।

সময় নারী ক্রিকেট দল নিয়ে সাকিব বলেন, আমরা নারী দলের খেলোয়াড়দের এখানে আনতে পারিনি। কারণ এটা খুব আকস্মিক সিদ্ধান্ত। তাদের যদি কোনো দাবি থাকে, স্বাগত জানাব। যদি তারা আমাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে, তবে তাদের দাবিদাওয়াও আমরা এরপর তুলে ধরতে পারব।

এর আগে মিরপুরে এদিন ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে প্রথম দাবি নিয়ে সামনে আসেন নাঈম ইসলাম। দাবি উত্থাপনের শুরুতেই তিনি অভিযোগ করে বলেন, ক্রিকেটাররা পর্যাপ্ত সম্মান পান না, যেটা তাদের প্রাপ্য। সময় তিনি সরাসরি আঙুল তোলেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) বিরুদ্ধে। তিনি জানান, খেলোয়াড়দের স্বার্থে সংগঠনটিকে কখনই পাওয়া যায়নি। তাই সংগঠনের বর্তমান সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। সময় খেলোয়াড়রাই নির্বাচনের মাধ্যমে কোয়াবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করবে বলে জানান তিনি। এরপর দ্বিতীয় দাবিটি নিয়ে আসেন জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, আমাদের দ্বিতীয় দাবি হচ্ছে, প্রিমিয়ার লিগ আগে যেভাবে চলত, তা ফিরিয়ে আনা হোক।

এবারের বিপিএল নিয়ে হচ্ছে অনেক আলোচনা। ইস্যুটি সামনে রেখে নিজেদের তৃতীয় দাবি তুলে ধরেন তারকা ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। আগামী বছর থেকে বিপিএল আগের নিয়মে ফিরিয়ে নিতে অর্থাৎ ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে খেলানোর দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি বিদেশী ক্রিকেটারদের সঙ্গে স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের সামঞ্জস্য আনার কথাও বলেন মুশফিক। সময় মুশফিক গ্রেড নির্বাচনের ক্ষমতা খেলোয়াড়দের হাতে দেয়ার দাবির কথাও জানান।

চতুর্থ পঞ্চম দাবি নিয়ে কথা বলেন সাকিব। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ম্যাচ ফি লাখ টাকা করার দাবি জানান তিনি। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারদের বেতনও ন্যূনতম ৫০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলেন অধিনায়ক। পাশাপাশি ক্রিকেটারদের অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বলেন, জিম, ইনডোর, মাঠ সব সুবিধা রাখতে হবে। ১২ মাস কোচ-ফিজিও-ট্রেইনার নিয়োগ দিতে হবে। তারাই খেলোয়াড়দের একটা সিস্টেমের ভেতর নিয়ে আসবে। আগামী মৌসুমের আগে এটা নিশ্চিত করতে হবে। এসব সুবিধা কেবল ঢাকায় নয়, বিভাগভিত্তিক করার কথাও বলেন সাকিব। এছাড়া সাকিব কথা বলেন মানসম্মত বল পাওয়া, ক্রিকেটারদের খাবার মান উন্নয়নে দৈনিক ভাতা হাজার ৫০০ টাকা থেকে যৌক্তিকভাবে বাড়ানো, ভ্রমণ ভাতার ক্ষেত্রে হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে বিমান যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং জিম-সুইমিং পুল সুবিধাসম্পন্ন হোটেলের ব্যবস্থা করা নিয়েও।

সাকিবের পর ষষ্ঠ দাবিটি নিয়ে কথা বলেন স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র। তিনি বলেন, জাতীয় দলের চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট অনুসারে যদি চিন্তা করেন, তবে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের সংখ্যা বাংলাদেশে অনেক কম। আমার মনে হয়, চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৩০ জন করা উচিত। সময় বেতন বাড়ানোর দাবিও জানান তিনি।

কেবল ক্রিকেটার নন, তামিম ইকবালের কণ্ঠে শোনা যায় গ্রাউন্ডসম্যান, দেশীয় কোচ, দেশীয় আম্পায়ার, ফিজিও ট্রেইনারদের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার কথাও। তিনি বলেন, আম্পায়ারিং নিয়ে আমরা সবাই অভিযোগ করছি। খেলোয়াড়রা করেন, সাংবাদিকরা করেন। কিন্তু কেউ আম্পায়ারিংকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে তাকে তো একটা নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমরা তা দিই না। একইভাবে ফিজিও-ট্রেইনারও। আমাদের মনে হয় এটাই সঠিক সময়, যেখানে আমরা বাংলাদেশীদের অন্যদের চেয়ে প্রাধান্য দেব।

ঘরোয়া ক্রিকেটে ওডিআই টি২০ টুর্নামেন্ট বাড়ানোর দাবি পড়ে শোনান এনামুল হক বিজয়। তিনি বলেন, প্রিমিয়ার লিগে ওয়ানডেতে আমরা একটা টুর্নামেন্ট খেলি। আমাদের মনে হয় আরেকটা টুর্নামেন্ট অবশ্যই বাড়ানো উচিত। বিপিএলে আমরা একটা টি২০ লিগ খেলি। এর বাইরে কোনো টি২০ টুর্নামেন্ট হয় না। আমার মনে হয় বিপিএলের আগ মুহূর্তে আমাদের একটা টি২০ লিগ হওয়া জরুরি। পাশাপাশি জাতীয় ক্রিকেট লিগে একটা ওডিআই টুর্নামেন্ট চালু করার দাবিও জানান তিনি। এরপর নবম দাবির কথা পড়ে শোনান নুরুল হাসান সোহান, ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট পঞ্জিকাবর্ষ থাকতে হবে। এতে আমরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারব।

বিপিএল প্রিমিয়ার লিগে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেয়া হয়, সে দাবির কথা বলেন জুনায়েদ সিদ্দিকী। নিজেদের ১১ নম্বর শেষ দাবিটির কথা পড়ে শোনান অলরাউন্ডার ফরহাদ রেজা। ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে তিনি আপত্তি জানান দুটির বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে না দেয়ার ব্যাপারে। তিনি দাবি করেন, জাতীয় দলের খেলা না থাকলে ক্রিকেটারদের যেন ছেড়ে দেয়া হয়।

সব শেষে আলোচনাসাপেক্ষে ক্রিকেটের স্বার্থে এসব দাবি মেনে নেয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সাকিব, আলোচনাসাপেক্ষেই অবশ্য সবকিছুর সমাধান হবে। আমাদের দাবি মানা হলে আমরা আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসব। আমরা সবাই চাই ক্রিকেটের উন্নতি হোক। যারা ভবিষ্যতে আসবে, তাদের জন্য আমরা একটা ভালো পরিবেশ রেখে যেতে চাই। যেখান থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট এগিয়ে যেতে পারবে সামনের দিকে।

এদিকে খেলোয়াড়দের এসব দাবির ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ হয়নি। আমরা ব্যাপারে খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ করব এবং পরবর্তী বোর্ডসভায় ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন