রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

শিক্ষা, চিকিৎসাসেবায় বিদেশমুখিতা ও অন্য দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ

কারণ অনুসন্ধানপূর্বক সার্বিকভাবে আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করুন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিস্ময়কর বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশ, শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় এত কিছুর পরও প্রশ্ন উঠছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিয়ে এর পেছনে যে যুক্তিগুলো কাজ করছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো দেশ থেকে মেধা অর্থ বাইরে চলে যাওয়া বণিক বার্তা বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছে তিন পর্বের প্রতিবেদনে প্রথম পর্ব ছিল বছরে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশ যাওয়াসংক্রান্ত এতে বলা হয়েছে, প্রতি বছরই সংখ্যা বাড়ছে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রবণতা বিদ্যমান এর অন্যতম কারণ নিম্ন শিক্ষার মান শুধু ইউরোপ-আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া নয়, শিক্ষার্থীদের গন্তব্য হয়ে উঠছে মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশও এমনকি পাশের দেশ ভারতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয় সর্বাধুনিক শিক্ষা বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা পেতে এবং বৃহত্তর পরিবেশে বিশ্বের মেধাবীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ নিতে শিক্ষার্থীরা বিদেশের দিকে ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় কারণ সরকারের লক্ষ্য, দ্রুততম সময়ে আধুনিক উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা কিন্তু বিপুল শিক্ষার্থীর বিদেশ যাওয়ার চিত্র নির্দেশ করে যে তারা পড়ালেখা করার জন্য যেমন টিউশন ফি হিসেবে বিদেশে অনেক টাকা নিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি পড়ালেখা শেষে অনেকেই আর দেশে ফিরছেন না এভাবে পাচার হচ্ছে অর্থ মেধা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ভবিষ্যৎ এতে দক্ষ মানবসম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ ফলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও চলে যাচ্ছে দেশ থেকে

শিক্ষার্থীদের বিদেশে চলে যাওয়ার মূল কারণ, তারা শিক্ষার গুণগত মানে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অথচ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ের তলানিতে পড়ে আছে বিশ্বমানে শিক্ষাকে উন্নীতকরণের বিষয়কে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সন্ত্রাস, সেশনজট, দুর্নীতিসহ নানা বিষয় রয়েছে আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগই শিক্ষার গুণগত মানের চেয়ে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে থেকে উত্তরণে ইউজিসি সরকারের দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষার মানে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি শিল্পায়ন কর্মসংস্থানেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে 

অন্যদিকে বিত্তশালীদের মধ্যে বাইরে ঠিকানা গড়ার প্রবণতা বাড়ছে মধ্যবিত্তের মধ্যেও প্রবণতা বেড়ে ওঠায় মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় হোম বা কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী নিবাসে সহায়তাকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়ে উঠছে প্রবণতার পেছনে বিশেষজ্ঞরা দেশে নিরাপত্তাহীনতা ভয়ংকর রাজনৈতিক পরিবেশকে দায়ী করছেন বৈধ অবৈধ উভয় উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়েই মানুষ দ্বিতীয় দেশে ঠিকানা গড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মানসম্পন্ন জীবনযাপন এর পেছনে কাজ করে থাকতে পারে বিনিয়োগের আওতায় বিত্তশালীদের মধ্যে নাগরিকত্ব লাভ বা বিদেশে বসবাসের প্রবণতা বাড়ায় দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণও বাড়ছে, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে উঠে এসেছে শুধু তা- নয়, বিদেশে নাগরিকত্ব লাভের তালিকায় বাংলাদেশ উপরের সারিতে অবস্থান করছে এটি আমাদের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈকি বিত্তশালীদের মধ্যে বিদেশে বিনিয়োগ প্রবণতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, দেশে বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখনো তলানিতে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না এখন বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট এখনো মেটেনি দক্ষ শ্রমিক ব্যবস্থাপক নেই এসব বিষয়ের সমাধান করতে হবে সর্বাগ্রে 

শিক্ষার মতো উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে লক্ষাধিক রোগী ভারত, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক যান খাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায় রোগীরা দেশেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিলে বা নিতে পারলে প্রতি বছর দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতো  দেশের বিপুলসংখ্যক রোগী যে বিদেশে চিকিৎসার্থে যান, তার যৌক্তিক কারণ রয়েছে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশে বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল হাতে গোনা কয়েকটা ১৬ কোটি মানুষের দেশে তা মোটেও যথেষ্ট নয় দেশে বেসরকারিভাবে বেশকিছু নামিদামি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে সত্য ওইসব প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসহ দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাসেবা প্রদানের দাবি করে কিন্তু এসব হাসপাতালে চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল রোগীদের সাধারণ ভাষ্য হলো, এর চেয়ে কম খরচে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আসা যায় তারপর দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো রোগীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি দেশের নামিদামি হাসপাতালেও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নৈমিত্তিক ব্যাপার তারপর চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়ে ভুল করা, তাদের অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মনোবৃত্তি এসব দেশের রোগীদের বিদেশমুখী করতে ভূমিকা রাখছে বিদেশমুখিতা ঠেকাতে হলে দেশে সুলভে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা চিকিৎসকদের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি করতে হবে ব্যাপারে সরকারের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন প্রয়োজন প্রতিটি বিভাগে একটি করে উচ্চমানসম্পন্ন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা ঢাকার বাইরে উন্নত মানের হাসপাতাল স্থাপনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান সংরক্ষণে সরকারের মনিটরিং থাকতে হবে দেশে চিকিৎসাশিক্ষার মান বাড়াতেও উদ্যোগ নিতে হবে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে উচ্চপর্যায়ের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে কিংবা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে চিকিৎসক চিকিৎসাকর্মীদের রোগীবান্ধব মানসিকতা তৈরিও একটি জরুরি বিষয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন