বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

আউটবাউন্ড-শেষ পর্ব

চিকিৎসা বাবদ দেশের বাইরে যাচ্ছে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার

রুবেল পারভেজ

চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কতসংখ্যক রোগী বাইরে যান, বছর পাঁচেক আগে সেই হিসাব করেছিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বাবদ কী পরিমাণ অর্থের বহির্গমন ঘটে, তার একটি আনুমানিক হিসাবও করেছিল সংস্থাটি। হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালেই চিকিৎসা বাবদ দেশের বাইরে গিয়েছিল ২০৪ কোটি ডলার। ভারত, সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ডে লাখ ২৮ হাজার বাংলাদেশী রোগীর চিকিৎসায় অর্থ ব্যয় হয়েছিল।

যদিও বিদেশগামী রোগীর সংখ্যা বর্তমানে আরো অনেক বেড়েছে। চিকিৎসা ভিসায় বাংলাদেশ থেকে শুধু ভারতেই পাড়ি দিচ্ছেন বছরে লাখ ৩৫ হাজার রোগী। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যেও যাচ্ছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী। এর বাইরে থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর তো আছেই। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাবদ ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ৪০০ কোটি ডলার। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীমান্তবর্তী লোকজন ছোটখাটো রোগের চিকিৎসায়ও ভারতমুখী হচ্ছেন। রোগ একটু জটিল হলে দেশের সব প্রান্ত থেকেই নিম্ন মধ্যবিত্তরা ভারত যাচ্ছেন। মধ্য উচ্চবিত্তরা যাচ্ছেন থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায়। তবে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন কেবল উচ্চবিত্তরাই। আর অতি ধনীরা চিকিৎসা নিতে পাড়ি দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশে। সব গন্তব্যেই বাড়ছে বাংলাদেশী চিকিৎসাগ্রহীতার সংখ্যা।

বিদেশগামী বাংলাদেশী রোগীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। ২০১৭ সালে চিকিৎসা ভিসায় (এম-ভিসা) দেশটিতে যান লাখ ২১ হাজার ৭৫১ জন বাংলাদেশী, যা তার আগের বছরের চেয়ে সাড়ে শতাংশ বেশি। বৃদ্ধির হার বিবেচনায় নিলেও গত বছর শুধু এম-ভিসায় ভারত গেছেন লাখ ৩৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশী। আরো বেশিসংখ্যক বাংলাদেশী রোগী আকর্ষণে ভিসা প্রাপ্তি সহজ করেছে দেশটি। এছাড়া কোনো নাগরিক ভারতে থাকাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তির জন্য প্রাথমিক ভিসা এখন থেকে আর মেডিকেল ভিসায় রূপান্তরের প্রয়োজন পড়বে না। আগে থেকেই আক্রান্ত এমন রোগের (অঙ্গ প্রতিস্থাপন ছাড়া) ইনডোর মেডিকেল ট্রিটমেন্ট প্রাথমিক ভিসাতেই করানো যাবে। এর ফলে ভারতে বাংলাদেশীদের চিকিৎসা গ্রহণ আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের (ইওয়াই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া রোগীদের ৬২ শতাংশই অসংক্রামক নানা ব্যাধির (এনসিডি) চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মেডিকেল ট্যুরিস্ট ভিসা নিচ্ছেন। সংক্রামক, মাতৃত্ব, নবজাতক পুষ্টির অভাবজনিত বিভিন্ন রোগের (সিএমএনএনডি) চিকিৎসা নিতে ভারতে যাচ্ছেন ২৯ শতাংশ রোগী। আঘাতের চিকিৎসায় ভারতে যাওয়া রোগী শতাংশ। বাকিরা অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় দেশটিতে যান।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় দিল্লি-চেন্নাইকে অগ্রাধিকার দেন বাংলাদেশী রোগীরা। আর চোখের চিকিৎসায় বেছে নেন চেন্নাই কলকাতাকে। ভারতে মস্তিষ্ক হার্টের মতো জটিল অস্ত্রোপচারে খরচ হয় বাংলাদেশী মুদ্রায় গড়ে ২০ লাখ টাকা। সাধারণ চিকিৎসার জন্য রোগী তার সহযোগীর যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ সব মিলিয়ে ব্যয় হয় জনপ্রতি গড়ে প্রায় লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ভারতে চিকিৎসা বাবদ বাংলাদেশীদের খরচ হচ্ছে বছরে ২০০ কোটি ডলারের বেশি।

দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। গত বছর চোখের সমস্যা ধরা পড়ার পর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আসেন। বেসরকারি একটি চক্ষু হাসপাতালে ভর্তিও হন। সেখানে কয়েক দফা চিকিৎসা করিয়েও অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় যান থাইল্যান্ড। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকটাই সুস্থ বোধ করছেন তিনি।

মোশাররফ হোসেনের মতো মধ্যবিত্তদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যাচ্ছেন। থাইল্যান্ডগামী বাংলাদেশী রোগীদের নিয়ে গত বছর একটি গবেষণা করেন ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব আলী। তিনি জানান, সরকারি হিসাবে ২০১৭ সালে ৬৫ হাজার বাংলাদেশী রোগী দেশটিতে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তবে বাস্তবে সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কারণ ট্যুরিস্ট মেডিকেল ভিসা মিলিয়ে ২০১৭ সালে সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশী থাইল্যান্ড গেছেন, যাদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন দেশটিতে। হিসাবে অর্ধেক ধরলেও দেড় লাখ রোগী থাইল্যান্ডের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তুলনামূলক কম সময়ে অস্ত্রোপচার রোগ নির্ণয়ের মতো সুবিধা থাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী রোগী থাইল্যান্ডে যাচ্ছেন।

থাইল্যান্ডে বাংলাদেশী রোগীরা বেশি চিকিৎসা নেন সুমিতাভেজ, বামরুনগ্রাদ ব্যাংকক হাসপাতালে। এসব হাসপাতালে গড়ে গল ব্লাডারস্টোন অস্ত্রোপচারে হাজার ২৬৫ ডলার ( লাখ টাকা), হার্ট বাইপাস সার্জারিতে ১৫ হাজার ডলার (১২ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা), হার্ট ভাল্ব রিপ্লেসমেন্ট ১৭ হাজার ২০০ ডলার (১৪ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬০ টাকা), গ্যাস্ট্রিক বাইপাস ১৬ হাজার ৮০০ ডলার (১৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০ টাকা) এবং মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচারে ৫৯ হাজার ৭০৮ ডলার (৫০ লাখ টাকা) খরচ হয়। বাংলাদেশ থেকে মূলত হূদরোগ, ক্যান্সার নিউরোলজি রোগীরা থাইল্যান্ডে বেশি যান। ইনফার্টিলিটির চিকিৎসায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী দেশটিতে যাচ্ছেন। থাইল্যান্ডে চিকিৎসা বাবদ বাংলাদেশীদের খরচ হচ্ছে বছরে শতকোটি ডলারের মতো।

বিদেশে গন্তব্য হিসেবে উচ্চবিত্ত পরিবারের রোগীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। গত বছর দেশটিতে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৫ হাজার বাংলাদেশী। সিঙ্গাপুরে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগ চিকিৎসা নিয়েছেন ক্যান্সার, হার্ট বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের। দেশটিতে করোনারি এনজিওপ্লাস্টিতে ১৩ হাজার ৪০০ ডলার, হার্ট বাইপাস ১৭ হাজার ২০০ ডলার, গ্যাস্ট্রিক বাইপাস ১৩ হাজার ৯০০ ডলার হিস্টারেকটমিতে ১০ হাজার ৪০০ ডলার খরচ হয়।

ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিকেল ট্যুরিজম ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মেডিএইডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সহপ্রতিষ্ঠাতা সাব্বির আহমাদ তানিম বলেন, চিকিৎসা খরচ বাবদ নিয়ম অনুযায়ী কী পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে নেয়া যাবে, তার ঘোষণা দিতে হয় নাগরিকদের। তবে এক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। অনেকেই মূল খরচের চেয়ে কম পরিমাণ অর্থ উল্লেখ করে। আর উল্লেখ না করা অর্থের বেশির ভাগ দেশের বাইরে যায় নানা অবৈধ উপায়ে। ফলে চিকিৎসা বাবদ কী পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল।

সাম্প্রতিক সময়ে মেডিকেল ট্যুরিজমে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটিতে বিদেশী চিকিৎসাগ্রহীতার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত উভয় শ্রেণীর মানুষই চিকিৎসার জন্য দেশটিতে যাচ্ছেন। মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার ট্রাভেল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশটিতে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন হাজার ১০০ বাংলাদেশী। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে হাজার ৭০০ জনে। হার্ট সার্জারির জন্য দেশটিতে রোগীপ্রতি খরচ হয় প্রায় ১৩ হাজার ৯৩১ ডলার, মস্তিষ্কজনিত অস্ত্রোপচারে ১১ হাজার ৮০৬ ডলার এনজিওপ্লাস্টিতে হাজার ৩৬১ ডলার। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা বাবদ বছরে খরচ হচ্ছে আনুমানিক ৩০ কোটি ডলারের বেশি।

বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী অতি ধনীদের পছন্দের গন্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য। এসব দেশে প্রতি বছর কতসংখ্যক বাংলাদেশী চিকিৎসা নিতে যান, সে সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সংখ্যাটা একেবারে কম নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশী অতি ধনীরা এসব দেশে যান মূলত অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা নিতে। এসব দেশে খরচও অনেক বেশি। দেশসহ অন্যান্য দেশ মিলে চিকিৎসা বাবদ বছরে কম করে হলেও ৪০০ কোটি ডলার দেশ থেকে চলে যাচ্ছে।

তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট বিভাগের অধ্যাপক পরিচালক . সৈয়দ আব্দুল হামিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় এমনিতেই বেশি। তার ওপর আবার বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। বিদেশনির্ভরতার কারণে যে ব্যয় বাড়ছে, তা রাশ টেনে ধরতে না পারলে এবং পুরো স্বাস্থ্য খাতকে শৃঙ্খলায় না আনা গেলে ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসাসেবা কাঠামো বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সম্মিলিতভাবে এগোতে না পারলে থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. শাগুফা আনোয়ার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রোগীরা কেন দেশের বাইরে যাচ্ছেন? তারা এমন কোনো চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন কিনা, যার চিকিৎসা আমাদের দেশে নেই? এসব কারণ আগে চিহ্নিত করতে হবে। দেশে উন্নত চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিদেশগামী রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন