বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

বন্ধ কারখানার দখলে বিসিকের প্লট

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিল্প-কারখানা বন্ধ দীর্ঘদিন ধরে। তবু দখল করে রেখেছে প্লট। সিলেটের গোটাটিকরের বিসিক শিল্পনগরীর রকম অন্তত ২০টি প্লট দখল করে রেখেছেন বন্ধ শিল্প-কারখানার উদ্যোক্তারা। অপরদিকে, শিল্প-কারখানা গড়তে চাইলেও বিসিকে প্লট খালি পাচ্ছেন না নতুন উদ্যোক্তারা।

ময়মনসিংহ বিসিক শিল্পনগরীর অধিকাংশ শিল্প প্লট মালিকরা কারখানা না করে ফেলে রেখেছেন। কেউ ভাড়া দিয়েছেন অন্য কাউকে। আবার পরিত্যক্ত প্লটের ভবনগুলোতে চলছে মাদকাসক্তদের আড্ডা।

দেশের বেশির ভাগ বিসিক শিল্পনগরীরই একই অবস্থা। কোথাও কারখানা বন্ধ থাকলেও প্লট ছাড়ছেন না মালিকরা। কোথাও আবার প্লট বরাদ্দ নিয়েও শিল্প করছেন না। কিছু প্লট আছে যা বরাদ্দই দেয়া হয়নি।

সিলেটের গোটাটিকরের বিসিক সূত্রে জানা যায়, নয়টি বন্ধ শিল্প-কারখানা দখল করে আছে ২০টি প্লট। প্রায় এক যুগ ধরে শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে পড়লেও প্লটের দখল ছাড়ছে না তারা। ফলে প্রায় পতিত হয়ে পড়ে আছে প্লটগুলো।

১৯৬২ সালে ২৪ দশমিক ৮৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিসিকে মোট বরাদ্দ উপযোগী প্লট রয়েছে ১৩৪টি। মোট ৬৩টি উৎপাদনশীল শিল্প-কারখানার দখলে আছে ১১৪টি প্লট। বাকি ২০টি প্লট বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়টি শিল্প-কারখানার দখলে।

দীর্ঘদিন ধরেই সিলেট বিসিক শিল্পনগরীগুলো সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট খালি না থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না উল্লেখ করে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা বিসিকের জায়গা সম্প্রসারণের জন্য লিখিতভাবেও আবেদন করেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছেও একাধিকবার বিসিক সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তবে বিসিকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জমি না থাকায় বিসিক সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না।

সিলেট নগরীর গোটাটিকরের বিসিক- সূত্রে জানা যায়, বন্ধ কারখানা ইআর এন্টারপ্রাইজের দখলে চারটি প্লট, মেসার্স বেগম প্যাকেজিংয়ের দখলে রয়েছে এক, সুরমা ইন্ডাস্ট্রিজের দখলে এক, আল-ফাত্তাহ অয়েল মিলের দখলে তিন, কুশিয়ারা উইভিং ফিশনেটের দখলে এক, মনসুর নিটিং অ্যান্ড হোশিয়ারি ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের দখলে এক, এনকেএফ টেক্সটাইল মিলের দখলে এক, কুশিয়ারা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজের দখলে এক প্রিমিয়ার ডায়িং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিংয়ের চারটি প্লট। প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে এসব প্লটের শিল্প-কারখানা। ব্যাংকঋণ শোধ করতে না পেরে অনেক ফ্যাক্টরি মালিকই লাপাত্তা।

গোটাটিকরের বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক জানান, বন্ধ হওয়া নয়টি শিল্প-কারখানার মধ্যে পাঁচটির ব্যাংকঋণ অনাদায়ী থাকায় এগুলোর দখলে থাকা প্লটগুলো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিলামে না তুললে আমাদের কিছু করার নেই। তবে আমরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করে যাচ্ছি।

এছাড়া হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকায় বন্ধ থাকা বাকি চারটি শিল্প-কারখানার প্লটও ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

বিসিক শিল্পনগরীর ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, বন্ধ কারখানার কাছ থেকে প্লট ফিরিয়ে আনতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে ২২টি রুগ্ণ শিল্প ছিল। এখন আছে নয়টি। বাকি ১৩টি রুগ্ণ শিল্প-কারখানার কাছ থেকেই প্লট ফিরিয়ে নিয়ে আমরা নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছি।

শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া লোকসান হওয়ার পর ব্যাংকগুলো ঋণের টাকার জন্য চাপ দিয়েছে। নতুন করে ঋণ দেয়নি। ব্যাংকঋণ দিতে না পেরেই অনেকে কারখানা বন্ধ করে চলে গেছে। কারখানাগুলো বন্ধের পেছনে ব্যাংকগুলোর অনেক দোষ রয়েছে।

ময়মনসিংহ বিসিক শিল্পনগরীর সুপার কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানা করেও দীর্ঘদিন তা বন্ধ রেখেছে। শুধু সুপার কেবল নয়, রকম ডজনখানেক কোম্পানি কোনো কার্যক্রমই শুরু করেনি। বছরের পর বছর পড়ে আছে এসব প্লট। অথচ নতুন উদ্যোক্তারা প্লটের আবেদন করেও পাচ্ছেন না।

বিসিক সূত্র জানায়, ১০ দশমিক ৮১ একর জায়গা নিয়ে ১৯৬৮ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে নগরীর মাসকান্দা এলাকায় ময়মনসিংহ বিসিক স্থাপন করা হয়। পরে আরো দশমিক ৬২ একর জায়গা নিয়ে সম্প্রসারিত করা হয় বিসিক শিল্পনগরীর পরিধি। বর্তমানে পুরনো ৫৫ প্লট নতুন ৫০ প্লটসহ মোট ১০৫ প্লট রয়েছে ময়মনসিংহ বিসিকের। ২০ দশমিক ৪৩ একর জায়গাজুড়ে বিসিকের ১০৫ প্লটের মধ্যে ৭৫টিতে ছোট-বড় শিল্প-কারখানা চালু রয়েছে। এসব প্লট ওষুধ, ছাপাখানা, জর্দা, বেকারি, তেলের মিল, চানাচুর মুড়ির কারখানাসহ বাহারি পণ্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। ১৫ প্লটে শিল্প রুগ্ণ এবং বাকি প্লট পরিত্যক্ত বলে দেখানো হয়েছে বিসিকের তালিকায়।

সরেজমিন বিসিক ঘুরে দেখা গেছে, পরিত্যক্ত প্লটের ভেতরে গুদাম বানিয়ে ভাড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। কোনোটির আংশিক নির্মাণকাজ শেষ করে ফেলে রাখা হয়েছে। পরিত্যক্ত প্লটের ভেতর দিনেদুপুরে নেশা করছে মাদকাসক্তরা। আবার বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে কোনোটি ব্যবহার করা হচ্ছে বাসাবাড়ি হিসেবে।

তাকওয়া ইন্ডাস্ট্রির মালিক ফেরদৌস আলম জানান, বিসিকে অনেক প্লট পরিত্যক্ত আছে। এসব প্লটের সার্ভিস চার্জ বকেয়া রয়েছে। বতর্মানে চালু প্লটের মালিকরা টাকা স্কয়ার ফুট হিসেবে সার্ভিস চার্জ দিয়ে আসছেন। বিসিকে প্লট বরাদ্দ পাওয়া মালিকরা অন্যত্র প্লটের অর্ধেক ভাড়া দিতে পারেন। এজন্য অনেকেই প্লট বরাদ্দ নিয়ে সেখানে শিল্প স্থাপন করে ভাড়া দিচ্ছেন, এটা বৈধ। তবে অনুমতি নিতে হবে।

ব্রহ্মপুত্র প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যোগাযোগ করেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। জান্নাতুল ফেরদৌসের নামে বরাদ্দ দেয়া মিতা গার্মেন্টস চালু না করে ফেলে রাখা হয়েছে। ১৩ হাজার বর্গফুটের প্লট নিয়ে সাজ্জাতুল জুম্মা ফ্রেসকো ফ্লাওয়ার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আটা-ময়দা-সুজি তৈরির কারখানা চালু করলেও পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়, আর চালু হয়নি। প্লট মালিকের কাছে বিসিকের সার্ভিস চার্জ বাবদ পাওনা রয়েছে লাখ টাকার ওপরে। এক্সিম ফার্মাসিউটিক্যাল নামের ওষুধ কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভায় এর প্লট বাতিল হলেও তা এখনো বাতিল হয়নি। হাজার ৯০০ বর্গফুটের ন্যাশনাল অয়েল মিলটি বন্ধ রয়েছে। এটিও ভাড়া দেয়া হয়েছে অন্য মালিকের কাছে। এখানে কোনো কোম্পানি চালু নেই।

১৯৯৮ সালে ১১ দশমিক ৭৬ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরী। এতে , বি এস ক্যাটাগরি ৭৬টি প্লট, যার ১৮টি শিল্প ইউনিট দিয়ে শুরু হয় শিল্পনগরী। তবে বর্তমানে ১২টি শিল্প ইউনিট চালু আছে, দুটি শিল্প ইউনিট নির্মাণাধীন এবং চারটি শিল্প ইউনিটের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় সেগুলো বন্ধ রয়েছে। সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে সবচেয়ে বড় শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছেন এমএ মতিন কটন মিল। তারা ক্যাটাগরির দুটি প্লট নিয়ে ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন এমএ মতিন কটন সুতার মিল। এখানে তারা আরো দুটি সুতার কারখানা গড়ে তুলছেন।

সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর প্রমোশন অফিসার ভারপ্রাপ্ত সহকারী ব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ জনবল সংকটের কথা জানিয়ে বলেন, কষ্ট হলেও কাজ করতে হচ্ছে। কাজ তো ফেলে রাখা যায় না। সীমানা প্রাচীর নির্মাণের টেন্ডার হয়েছে, পানি নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আশা করছি, সমস্যাগুলো দ্রুতই সমাধান হবে।

প্লট সংকট নিয়েই চলছে বগুড়া বিসিক। সংকটের মধ্যেও বন্ধ হয়ে আছে ১০টি শিল্প প্লট। বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে দুটি হালকা প্রকৌশল, একটি টেক্সটাইল, চারটি খাদ্য সহায়ক শিল্প, দুটি কেমিক্যালস ফার্মাসিউটিক্যাল এবং একটি প্লাস্টিক শিল্প। নানা জটিলতায় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। পুরনো কারখানা বন্ধ থাকলেও শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য প্লট পাচ্ছেন না নতুন উদ্যোক্তারা।

বগুড়া বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা একেএম মাহফুজুর রহমান জানান, দুই দফায় নির্মিত হয়েছে ২৩৩টি প্লট। ১০ শিল্প ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন