বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

এসএমই ফাউন্ডেশনের গবেষণা

পারিবারিক বাধা কাটিয়ে উঠছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পারিবারিক সামাজিক বাধা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছেন দেশের ক্ষুদ্র মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা। এসএমই ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০০৯ সালে ৪১ দশমিক ৩৭ শতাংশ নারীই ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করতে গিয়ে তাদের পিতা-মাতার কাছ থেকে নিরুৎসাহিত হতেন। ২০১৭ সালে হার দশমিক ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৯ সালে এমন কোনো ক্ষুদ্র মাঝারি নারী উদ্যোক্তা ছিলেন না, যিনি কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হননি। কিন্তু ২০১৭ সালে এসে ৭৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাই ব্যবসা করতে গিয়ে কোনো পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হননি।

গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত ২০১৭ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করে এসএমই ফাউন্ডেশন। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন কেএম হাবিব উল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো . নাজনীন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম।

গবেষণায় দেখা যায়, গত আট বছরে বাধা অতিক্রমের বেশির ভাগ সূচকেই এগিয়েছেন ক্ষুদ্র মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৫৯ দশমিক শূন্য শতাংশই জানিয়েছেন, ব্যবসা করতে গিয়ে তারা কোনো ধরনের সামাজিক বাধার সম্মুখীন হননি। ২০০৯ সালে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা স্বামীর কাছ থেকে নিরুৎসাহিত হতেন, ২০১৭ সালে হার কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৩০ শতাংশ। 

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ক্ষুদ্র মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সমাজ কর্তৃক নিরুৎসাহিত হন। অন্যদিকে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ নারী ব্যবসা করতে গিয়ে নানা ধরনের অহেতুক চাপ এবং দশমিক ৫৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা বিভিন্ন আঙ্গিকে লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে জানান।

পারিবারিক সামাজিক বাধা অনেকাংশে কমে এলেও ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে নানা বাধার সম্মুখীন হন ক্ষুদ্র মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা। এসএমই ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়, ব্যবসা শুরু করার সময় ৩৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক ঋণ পেতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হন, ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ নারীর বাজার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে না, ১৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ নারীর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকে, ১০ দশমিক ১১ শতাংশ নারীর ব্যবস্থাপনা দক্ষতায় ঘাটতি দেখা যায়, দক্ষ জনবল সংকটে ভোগেন দশমিক ৮১ শতাংশ, পরিবার ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় সমস্যার মুখোমুখি হন দশমিক শূন্য শতাংশ, কাঁচামাল জোগাড়সংক্রান্ত সংকটে থাকেন দশমিক ২৭ শতাংশ অন্যান্য সমস্যার মুখোমুখি হন দশমিক ৬১ শতাংশ নারী। ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হন না মাত্র ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ নারী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ৮৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ নারীই কোনো সমস্যার মুখোমুখি হননি। তবে দশমিক ৬৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, ট্রেড লাইসেন্স পেতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। দশমিক শূন্য শতাংশ নারী জানিয়েছেন, ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে অনেক বেশি কাগজপত্র চেয়েছেন, যা কিনা তাদের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন ছিল। দশমিক শূন্য শতাংশ নারী জানিয়েছেন, ট্রেড লাইসেন্স পেতে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। সুতরাং নারীদের বাদ দিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিবেচনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্য অর্জনে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যার সমাধান করছে। নারীদের নিয়ে এসএমই ফাউন্ডেশন বড় ধরনের গবেষণা চালালে শিল্প মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, জাতি গঠনে বাংলাদেশের নারীদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। দেশের নারী জনগোষ্ঠী তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন সেক্টরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশের নারীরা বিভিন্ন পেশায় যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে করে আগামী ১০ বছর পর নারীদের আলাদা করে দেখার কোনো প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি দেশীয় বাজারের বিপুল চাহিদা মেটাতে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত রেখে নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। লক্ষ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে অঞ্চলভিত্তিক সাংস্কৃতিক মানসিক প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রূপান্তরিত নারীদের (তৃতীয় লিঙ্গ) জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। লক্ষ্যে নারীদের ওপর বড় ধরনের গবেষণা চালিয়ে শিল্পায়ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পেছনে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং এর প্রতিকারে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের তাগিদ দেন তারা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন