শনিবার | নভেম্বর ২৩, ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দুই ধাপ অবনমন বাংলাদেশের

পিছিয়ে পড়াদের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে

বিশ্ববাসীর মধ্যে ক্ষুধার প্রকোপ কতখানি, তা জানতে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক প্রতি বছর প্রকাশ করে আসছে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফরি) কোন দেশে কত মানুষ এখনো ক্ষুধা আক্রান্ত, তা প্রকাশ করাই এর কাজ। এ সূচকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বরাবরই সর্বাধিক ক্ষুধা আক্রান্ত বলে উঠে এসেছে। হতাশার বিষয় হলো, বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুধায় এখনো কষ্ট পায়। গেল কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ উঁচু পর্যায়ে ছিল। অর্থনীতি ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে, এখন আমরা মধ্য আয়ের দেশের পথে। যে দেশ নিজের অর্থনীতিকে উন্নয়নশীল বলে দাবি করে, সেই দেশে জনসংখ্যার একটি অংশ পেট ভরে খেতে পারে না, এ সংবাদ নিঃসন্দেহে রাজনীতি ও প্রশাসনিক নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। গত বছরের চেয়ে দুই ধাপ অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। আফ্রিকার দেশগুলোয় নিরন্তর সংঘর্ষ ও এইডসের মতো রোগের প্রবলতা ক্ষুধার প্রধান কারণ হলেও বাংলাদেশে ক্ষুধা ও অপুষ্টির এ অতি উচ্চহারের কারণ প্রধানত নারী ও শিশুদের অপুষ্টি এবং যথাযথ শিক্ষার অভাব। কারণটি বিশেষ চিন্তার দাবি রাখে।

ইফরি প্রতি বছর বৈশ্বিক ক্ষুধাসংক্রান্ত সূচকের মাধ্যমে এর পরিমাপ নির্ণয় করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো অপুষ্টি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করা। এ সংস্থা আশা করে যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ক্ষুধার বৈশিষ্ট্য বহুমুখী, যা একমাত্র অনাহারের ক্ষুধাকেই বোঝায় না। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য বা সূচক হলো এক. পুষ্টির অভাব; দুই. শিশুদের পরিমাণ অনুযায়ী ওজনের ঘাটতি; তিন. খর্বাকার শিশু এবং চার. শিশুমৃত্যুর হার। পুষ্টির অভাবের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মোট জনসংখ্যার পুষ্টির ঘাটতির শতকরা হার, শতকরা কতটি শিশুর ওজন কম, শতকরা কতটি শিশু খর্বাকৃতির এবং শিশুমৃত্যুর শতকরা হার। এ ধরনের সূচক ব্যবহার করার বহু সুবিধা রয়েছে। এসব সূচক দিয়ে একমাত্র পুষ্টির অভাব সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে শিশুদের অপুষ্টি ও তার ফলাফল সম্পর্কেও জানা যায়। শিশুদের জীবন অপুষ্টির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর ফলে তারা সহজেই নানা রকম রোগের শিকার হয়। সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্যের অভাব। এ বিষয় জানতে পারলে এর কুফলও রোধ করা সম্ভব।

নীতি প্রণয়ন করতে হলে ক্ষুধা নিবারণের নীতি ও অপুষ্টি প্রতিরোধের নীতি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। অপুষ্টির কারণ অনেক, ক্ষুধা অপুষ্টির একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশে অপুষ্টির বিস্তার ব্যাপক। মধ্যবিত্ত ও ধনী পরিবারেও শিশুদের অপুষ্টি কিংবা নারীদের রক্তস্বল্পতা দেখা যায়। তাই অপুষ্টি দূর করতে হলে কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তির কথা ভাবলেই চলবে না। শিশুর পরিবার কীভাবে তাদের যথেষ্ট পরিমাণে সুষম খাবার খাওয়াতে পারে, তার জন্য নানা উপায় চিন্তা করতে হবে। কিন্তু ক্ষুধাজনিত অপুষ্টির হারও যে কম নয়, তা ক্ষুধা সূচক সমীক্ষায় প্রতি বছর প্রকাশ হচ্ছে। এক্ষেত্রে কিন্তু সংখ্যা অপেক্ষাও বড় তাত্পর্য মানবাধিকারের। খাদ্যে সব মানুষেরই অধিকার রয়েছে, তা জীবনের অধিকারেরই অন্তর্গত। ক্ষুধা নিবারণের নীতি স্থির করতে হবে এ উদ্দেশ্যে, একজনও যেন ক্ষুধার্ত না থাকে এবং সুষম খাবার পায়। এ উদ্দেশ্য নিয়ে রেশন ব্যবস্থার মতো সরকারি উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এটি কাজ করছে না। দারিদ্র্য কমার হারও শ্লথ হয়ে পড়েছে।

সর্বজনীন উন্নয়ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। উন্নয়নের বাইরে থাকা মানুষদের সম্পদে ও আয়ে অধিকার কমছে, যার প্রমাণ বৈষম্য সূচকে বাংলাদেশের ঊর্ধ্বগতি। অন্যদিকে প্রশাসনিক যেটুকু উন্নয়ন পৌঁছে দেয়া যেত, তা-ও দুর্নীতি, পরিকাঠামোর অভাব ইত্যাদি কারণে যায়নি। অধিকারভিত্তিক পুনর্বণ্টন, নাকি কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে যোগ দেয়ার পথ খুলে দেয়াউন্নয়ন কোন পথে আসবে, নাকি দুটি পথই জরুরি, এ তর্ক জারি রাখা জরুরি। ক্ষুধা ও অপুষ্টির হার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আফ্রিকার কিছু দেশে গবেষণা করে দেখা গেছে, যে স্কুলে ছাত্রদের নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, সে স্কুলের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি সুস্থ। বাংলাদেশে অপুষ্টি নিয়ে যতটুকু ভাবা হয়, তা সচরাচর খাদ্যের বাইরে পৌঁছতে পারে না। শুধু আয় বাড়ালেই উন্নয়ন হবে না, সেই আয় বৃদ্ধির সুফল পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বটে, তবে অপুষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনো যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। এর জন্য সরকার অবশ্য কিছু উপজেলায় পুষ্টিগুণসম্পন্ন চাল বিতরণ করছে। কিন্তু দেশের বিদ্যমান অপুষ্টিচিত্রের বিপরীতে এটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো ফল দিচ্ছে না। তাছাড়া বরিশাল ও কক্সবাজার অঞ্চলে ৩৪ লাখ মানুষ মারাত্মক ক্ষুধার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও এক ধরনের হুমকির মধ্যে রয়েছে। সুতরাং বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে টেকসই অবদান রাখতে হলে ঝুঁকির মধ্যে থাকা উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। উত্তরাঞ্চলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য গৃহীত কার্যক্রম যে সুফল দিচ্ছে না, তার প্রমাণ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হারের অনেক বেশি। এক্ষেত্রে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্তকরণের জন্য নেয়া সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচির পর্যালোচনাও দাবি রাখে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন