শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সিল্করূট

পদ্মা ও আটলান্টিকতীরে রবীন্দ্রসংগীত

জাহিদ হায়দার

নদীটা যেন একটা সুবৃহৎ প্রাণ পদার্থের মতোএকটা প্রবল উদ্যম রাশি বহুদূর হতে গর্বভরে কলস্বরে অবহেলে চলে আসছে। তাই দেখে আমাদের প্রাণের মধ্যে একটা আত্মীয়তার স্পন্দন অনুভূত হতে থাকে।...আমি অনেকবার ভেবে দেখেছিপ্রকৃতির মধ্যে যে এমন একটা গূঢ় গভীর আনন্দ পাওয়া যায়, সে কেবল তার সঙ্গে আমাদের একটা সুবৃহৎ আত্মীয়তার সাদৃশ্য অনুভব করেএই নিত্যসঞ্জীবিত সবুজ তৃণলতা-তরুগুল্ম, এই জলধারা, এই বায়ুপ্রবাহ, এই সতত ছায়ালোকের আবর্তন, এই ঋতুচক্র, এই অনন্ত-আকাশ-পূর্ণ জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রবাহমাণ স্রোত, পৃথিবীর অনন্ত প্রাণীপর্যায়, এই সমস্তের সঙ্গেই আমাদের নাড়ীর রক্ত চলাচলের যোগ রয়েছে—‘সমস্ত বিশ্বচরাচরের সঙ্গে আমরা একই ছন্দে বসানোএই ছন্দের যেখানে যতি পড়ছে, যেখানে ঝংকার উঠছে, সেখানেই আমাদের মনের ভেতর থেকে সায় পাওয়া যাচ্ছেপ্রকৃতির সমস্ত অণু-পরমাণু যদি আমাদের সগাত্রে না হতো, যদি প্রাণে সৌন্দর্যে এবং নিগূঢ় একটা আনন্দে অনন্তকাল স্পন্দমান থাকত, তাহলে কখনই এই বাহ্য জগতের সংসর্গে আমাদের এমন একটা আন্তরিক আনন্দ ঘটত না।’ (ছিন্নপত্র, পত্রসংখ্যা : ২২৭। ..১৩০২। ১৩ অগস্ট, ১৮৯৫; শিলাইদহ)

সব স্থানে সংগীত বিরাজ করে, কেউ শুনতে পায়, কেউ পায় না। সবারই শ্রবণশক্তি আছে, কিন্তু সব শ্রবণই শ্রেয় ধ্বনির প্রতি আগ্রহী নয়। অবশ্য সব গানই যে শ্রেয়বোধে ঋদ্ধ হবে, তার নির্দিষ্ট হিসাবরেখা নেই।

সব প্রাণের, সব বস্তুর আছে নিজস্ব গান। প্রাণ না হয় জীবনসঞ্চারী একটি জিনিস, তার মধ্যে যে চলমানতার ধ্বনি আছে, তাকে অর্থাৎ ওই ধ্বনিকে গান হিসেবে ধরলে আপত্তি ওঠে না, বরং সংবেদী হূদয় ওই ধ্বনির কাছ থেকে এক সুখকর আশ্রয় পায়। কিন্তু বস্তুর আবার নিজস্ব গান কিসের? প্রশ্ন উঠতে পারে। একটি সবুজ মাঠের বিস্তারের মধ্যে বড় একটি সাদা পাথর, এই পাথরকে রাত্রি কিংবা দিবাভাগের যে সময়ই দেখা যাক না কেন, তার অস্তিত্ব অসহিংস অহংকার ঘোষণা করছে নীরবে এবং দর্শকের চোখ মনকে বলছে, আমার অবস্থান তোমার বোধে যে বাণী সৃষ্টি করল, তা- আমার গান। বস্তুর নিজস্ব রূপকে মানুষ তার আকাঙ্ক্ষিত রূপে গ্রহণ করতে চায়। সেজন্য মানুষ কঠিন খসখসে পাথর কেটে বের করে প্রিয় চোখ বা মুখ বা শরীর-সৌন্দর্যের শিল্প। ভাস্কররা বাটালির তীক্ষ ধারে কঠিন বস্তুকে কেটে নয়ন মানস তৃপ্তকর আকার দিয়ে নিজেই নিজেকে বলে, নির্মিত হলো আমার শিল্প, আমার গান।

রঙপাত্রে রাখা রঙ চিত্রকলা নয়, ওই রঙ পরিমিত মূর্ত-বিমূর্ত বিন্যাসে শিল্পীর হাতে যখন রূপ পায়, তখন হয়ে ওঠে চিত্রকলা। কাঠ, পাথর, ধ্বনি, রঙ বা শব্দ ইত্যাদি যার হাতেই পড়ুক সে ব্যক্তি যদি সঠিক মাত্রা ওইসব বিষয়কে না দিতে পারে, তাহলে ওইগুলো থেকে শিল্পমানসম্পন্ন গান সৃষ্টি হয় না, শিল্প হয় না, কবিতা হয় না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে আমাদের চারদিকে পরিমার্জনহীন অবস্থায় যা কিছু বিরাজ করছে, তার মধ্যে কি কোনো গান নেই? অবশ্যই তার মধ্যে গান আছে। ওই গান, প্রথমেই বলেছি, সবাই শোনে না। প্রকৃতি থেকে জাত সব বস্তুই নিজস্ব শিল্পসম্মত মাত্রা ধারণ করে আছে। সেই মাত্রা পূর্ণতার সকল অংশকে নিজেই ধারণ করে নিজের মধ্যে। ওইসব বস্তু বা জিনিসে মানুষের অশিল্পীত হাত লাগলে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। যেমন নষ্ট হতে পারে প্রজাপতির বহুরঙে বিন্যাসিত চিত্রময় ডানা বা গোলাপ ফুল।

যতদূর মনে পড়ে, নিটশে বলেছিলেন, ঈশ্বর যেসব বাণী তার প্রেরিত মানুষের মাধ্যমে পাঠাতে পারেননি, সেসব বাণীই উচ্চারণ করে সংগীত। মানুষ ভালো সংগীতে নিজস্ব অস্তিত্বের সন্ধান খুঁজে পায় এজন্য যে সেখানে ওই ব্যক্তিমানুষের বোধে চেতনার মধ্যে ঘটে যাওয়া বা স্বপ্ন হিসেবে লালিত হওয়া বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আবহের সায় থাকে। এবং ব্যক্তিমানুষ তখনই নিজের মধ্যে চিত্রিত হয়, ইতি নেতিতে বিভাজিত হয়, যখন তার পরিবেশ পরিপার্শ্ব থাকে নির্বিঘ্ন, অনুকূল এবং প্রতিকূল ভাঙনময়।

পৃথিবীতে গায়কের সংখ্যা বেশি, শ্রোতার সংখ্যা কম। দৃশ্যমান সবকিছুর মধ্যে সংগীত আছে এবং সেসবের মধ্যে থেকে চলছে নিরন্তর গান, কিন্তু তা সব মানুষ শুনছে না। হঠাৎ করে একটি পরিপ্রেক্ষিত ব্যক্তিমানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে। সে যেভাবে যে অর্থে একটি বিষয়কে -যাবত্কাল দেখে আসছিল, তার অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়, যেতে পারে ওই পরিপ্রেক্ষিতের কারণে।

চটুল নয়, যথার্থ রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হতে হলে শ্রী সুধীর চক্রবর্তী তার বিখ্যাত গ্রন্থগান হতে গানেবলেছেন, ‘হতে হয় দীক্ষিত রবীন্দ্রমন্ত্রে, জানতে হয় তার অভিপ্রায় জীবনের সত্য উপলব্ধি। তার গানের বিভাজন, পূজা প্রেমের গানের মায়াময় যুগ্মতার রহস্য, তার গানের অন্তর্গত নাট্য এবং সুরমিশ্রণের অনুপাত আলাদা করে বুঝতে হয়।কিন্তু যার রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হওয়ার কোনো রকম যোগ্যতা নেই কিন্তু গান ভালোবাসে, ঘনিষ্ঠভাবে থাকতে চায় গানের সঙ্গে, সে কী করবে তখন? প্রশ্নের একটি সহজ উত্তর হতে পারে, সে মানুষ নিয়মিত গান শুনবে। গান নিয়মিত শুনেও সেজন যদি অতৃপ্ত থাকে (মানুষমাত্রেই অতৃপ্ত এবং ত্বরাপ্রিয়), সেক্ষেত্রে গানের আরো ভেতর-গভীরে যাওয়ার জন্য একটি উপায় হতে পারে, শোনার সময় ওই গান পাঠ করা। আমি আমার নিজ সুরে, যা কেবলই ব্যক্তিগত, যা অন্যের সামনে উপস্থাপিত হলে হবে অন্যায়; গান গাইতে পারি কিন্তু গানের মর্মমূল স্পর্শ যদি করতে চাই এবং সেই গান যদি রবীন্দ্রসংগীত হয়, আমি তখন গীতবিতান খুলে কোনো বেজে চলা গানের সাথে নিজের বোধ চেতনায় যে সুরধ্বনি আছে, যা সব মানুষের মধ্যেই কমবেশি বিদ্যমান, তার সঙ্গে মিলিয়ে নিচু স্বরে গেয়ে যাই, সঙ্গে থাকে অধ্যয়ন। তখন এক মায়াময় যুগ্মতার রহস্য আমার চেতনার মধ্যেভালোবাসি ওই চলিষ্ণু মেঘহয়ে ঘুরে বেড়ায়।

অনেক গান আছে পড়তে ভালো লাগে না, কিন্তু যখন তা সুরে গাওয়া হয়, সে গান সব অর্থ-ঐশ্বর্য নিয়ে শ্রোতাকে তার অস্তিত্বের প্রতিটি স্তরের অবস্থানের অনুভবের মধ্যে নিয়ে যায়। আবার উল্টোও হতে পারে, গানের বাণী সুন্দর কিন্তু সুরটি যথাযথ নয়, সেক্ষেত্রে গানটি হয়তো পড়তেই ভালো লাগবে। বিষয়টি ব্যক্তিগত রুচির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যেমন আমারমধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেনু তব বাজাও একাকীগানটি কবিতা হিসেবে পড়তে বেশি ভালো লাগে। অন্যদিকেবড়ো বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে আমার প্রাণে’— গান গান হিসেবে শুনলে যত ভালো লাগে, কবিতার মতো পড়লে ভালো লাগে না।

ভালো গান কবিতা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। আর উপরে এইমাত্র দেয়া বক্তব্য ওই আগের বক্তব্যের বিরোধিতা করছে কিনা, কথা যদি ওঠে তাহলে বলতে হবে, গান কবিতা দুটোই ধারণ করে জীবনবোধে চেতনাকে বিভাজিত করা রহস্য, ফলে ব্যক্তিমানুষের গ্রহণ গ্রহণের ব্যবহারে যে তারতম্য ঘটে, সেখানেই বিম্বিত হয় তার পক্ষপাত। অর্থাৎ যেদিক থেকেই তাকে গ্রহণ করা হাকে না কেন, সে তার বিভায় হূদয়কে আলোকিত করবেই। এই ব্যক্তিমানুষ, গীতবিতানের ভূমিকাগানে যেভাবে বলা আছেবহু জনতার মাঝে অপূর্ব একাএবং যে গান বা কবিতা সে শুনছে, তা মানুষকে সঙ্গ দিচ্ছে কেবল ওই গান বা কবিতায় বিষয়ের মতো করেই।

আমি জানি না, রবীন্দ্রনাথ মোট কতগুলো গান পদ্মার বোটে ভাসতে ভাসতে লিখেছিলেন। আটলান্টিকে জাহাজে বসে দূর দেশে যেতে যেতে তিনি কোনো গান লিখেছিলেন কিনা। শ্রী প্রফুল্লকুমার দাসেররবীন্দ্রসংগীত গবেষণা-গ্রন্থমালা দুই জিজ্ঞাসার উত্তর থাকতে পারে। আমার হাতের কাছে বইটি নেই। কবির মাথায় কখন কোন কবিতা, গান বা লেখার বিষয় ঢুকবে, তা স্বয়ং কবিও জানেন না। যেসব নতুন প্রকাশক গীতবিতান ছাপছেন, তারা গীতবিতানের প্রতিটি গানের নিচে লেখার তারিখ স্থান যদি দিয়ে ছাপতে পারেন, তাহলে রবীন্দ্রনাথ আকাশ-লোক থেকেও খুশি হবেন, ‘বাহ এরা তো আমার ইনকমপ্লিট কাজ কমপ্লিট করছে!’

মহৎ শিল্পকর্মকে প্রতিটি মানুষ বা গোষ্ঠী তার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে এবং আনন্দিত হয়। যুগ মনমানসিকতা যেহেতু পরিবর্তনশীল, সেহেতু শিল্পবিষয়ও পরিবর্তনের মধ্যে থেকে নিজেকে নতুন অর্থ দেয়। কাজটি কেবল মহৎ শিল্পের ক্ষেত্রেই ঘটে। একইভাবে স্থান-কাল পরিবেশের তারতম্যে শিল্প নতুন অর্থে নতুন মাত্রায় ধরা দেয়। আমরা জানি, গীতবিতানের প্রকৃতি পর্বের শরৎ অংশে আছেঅমলধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া.../ দেখি নাই কভু দেখি নাই এমনই তরণী বাওয়া। গান কীভাবে বিপ্লবীরা নিজেদের গান হিসেবে গ্রহণ করেন, তার কথাবাংলার বিপ্লববাদবইয়ে লিখেছেন শ্রী নলিনীকিশারে গুহ। তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, তখনকার বিপ্লবীরা মনে করতেন, নবীন বাংলার নতুন বিপ্লবপথের যাত্রাকে লক্ষ্য করে কবি গান লিখেছিলেন।মেঘে ঢাকা তারাছবিতে ঈষৎ আঁধারে এক মর্মমূল ক্ষত করা আবহ ঋত্বিক ঘটক সৃষ্টি করেযে রাতে মোরে দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে/জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরেগানটিকে ব্যবহার করেছেন, ফলে পূজা পর্যায়ের গানটি পূজার ধ্যানচেতনার ইতিবাচক সমর্পিত মাত্রায় আমাকে ফেলে না, বরং আমি মানুষের অসহায়ত্বের সুরঘন দৃশ্যরূপ দেখি। আমার চেতনায় ছবি অংশের পরিবেশটি সামগ্রিকতা থেকে বের হয়ে বেদনাবিধূর মানুষের শোকসংগীতে পরিণত হয়। আবার তরুণ মজুমদারেরনিমন্ত্রণছবিতে উঁচু উঁচু টিলার পাদদেশে যখন পূজা পর্বের গানদূরে কোথায় দূরে দূরেধ্বনিত হয়ে ওঠে, তখন পিকনিকে আসা অনেকের মধ্যে কেবল একজনকে আরো একাকী করে তোলে। মনে প্রশ্ন জাগে, প্রার্থনা কি এক ধরনের প্রেমহীনতা বা নিঃসঙ্গতা।

পছন্দটি কেবল আমার। একই রবীন্দ্রসংগীত বিভিন্ন প্রেক্ষিত পটভূমিতে গিয়ে আমি শুনি। বদল প্রেক্ষিত পটভূমির মধ্যে আমার গৃহকোণ পালিত অস্তিত্বের চিন্তাচেতনা ওই একই গান আমাকে বদলে দেয়, অন্যভাবে ধরা দেয় গানের অপার অর্থ। চৈত্র মাসে গাজীপুরের শালবনে যখন শুনেছিলাম, ‘বিরস দিন বিরল কাজ প্রবল বিদ্রোহে/এসেছ প্রেম এসেছ আজ কী মহা সমারোহে’, মনে হয়েছিল এখনই কোকিল ডাকবে, বৃষ্টি হবে কিছুক্ষণ পর। চিম্বুক পাহাড়ের চূড়ায় বসে যখন শুনছিলাম, ‘আমার নিখিল ভুবন হারালেম আমি যে/বিশ্ববীণায় রাগিণী যায় থেমে যে’, সামনের বঙ্গোপসাগরকে এক ক্ষুদ্র তৃণ মনে হয়েছিল।

সে রাতে পদ্মার তীরে বৃষ্টি ছিল না। আকাশে হালকা মেঘ। ছিল কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ। হঠাৎ করেই আমাদের কজনের মনে হয়, পদ্মার তীরে সারা রাত কাটালে কেমন হয়। কিটু আমার চাচাতো ভাই রতনের খালাতো ভাই, সেই অর্থে আমারও খালাতো ভাই, আর সঙ্গে ছিল রতন ভাইয়ের মামাতো ভাই স্বপন, যার সাহসের প্রশংসা যে কেউ করবে। স্বপনকে বারণ করা হলো, সে যেন রাতে ডাব পাড়তে গাছে না ওঠে, গাছে সাপ থাকতে পারে। কে শোনে কার কথা। অনেকগুলো ডাব, ক্যাসেট প্লেয়ার, দেবব্রতর রবীন্দ্রসংগীতে ক্যাসেট এবং মাথার ওপর হালকা মেঘ চাঁদ নিয়ে আমরা বসে গেলাম পদ্মার তীরে।

অনেক দূরে মাঝখানে একাকী একটি নৌকা। নৌকার মাঝি মাথার উপরে চাঁদ আর রাত নিয়ে ভাঙা গলায় গেয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গী না থাকবার গান। ঢেউয়ের দোলায় নৌকা দুলছে, তার নিঃসঙ্গতা কাঁপছে লণ্ঠনের রহস্যময় আলোয়। মাঝির গানের দীর্ঘ লয়ের সুর শোনা যাচ্ছিল। কোনো কথা বোঝা যাচ্ছিল না। প্রয়োজন নেই বোঝার। ওই চিরপরবের আবহ চরাচরের সমগ্রতাকে নিয়ে ঐক্যের যে মৈত্রীমমতা নির্মাণ করছে তার প্রবহমান সুর, তার শব্দরূপ বোঝার প্রয়োজন কী। ধীরে ধীরে শ্রুতির বাইরে চলে গেল মাঝির গান, কিন্তু আলো দুলছিল পানির ওপর।

তখন মধ্যরাত। ক্যাসেটে বাজছিলগোধূলিগগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা/আমার যা কথা ছিল হয়ে গেল সারা।যখন গানটি শুরু হয়, আমি বসে ছিলাম ক্যাসেট প্লেয়ারের কাছে, হঠাৎ মনে হলো একটু দূরে গিয়ে গানটি শুনলে কেমন লাগবে। একটি সিগারেট জ্বালিয়ে, তখন ধূমপায়ী ছিলাম, একটু দূরের দিকে যেতে যেতে দেবব্রত পৌঁছে গেছেনআকাশ মুখর ছিল যে তখন ঝরোঝরো বারিধারায়।মৃদুমন্দ সমীরণ বলতে যা বোঝায়, বয়ে চলেছে। আনন্দে সহনীয় জলের কল্লোলধ্বনি প্রবাহিত। মাথার উপরে ভেসে যাচ্ছে হালকা মেঘ। জ্যোত্স্না পদ্মার পানির ওপর ততটা রূপার রূপে নেই। এখান থেকে বেশ দূরে শিলাইদহ।চেয়েছিনু যবে মুখে তোলো নাই আঁখি/আঁধারে নীরব ব্যথা দিয়েছিল ঢাকি/আর কি কখনো কবে এমন সন্ধ্যা হবে/জনমের মতো হায় হয়ে গেল হারা।চরাচরের সবকিছুকে ছাড়িয়ে আমার বোধের মর্মমূলে কড়া নাড়ে, আমাকে শতখণ্ডে ছিন্নভিন্ন করে এবং এক মুহূর্তের মধ্যে করে নির্মাণ। অস্তিত্ব আর অস্তিত্বহীনতার দুর্বহ আনন্দ আমাকে রাখে জায়মান।

সিগারেট পুড়ে যেতে থাকে, টান দিই না, এক আচ্ছন্নতা আমাকে টেনে তোলে, যেন এক বিষম ঘোর। আমি ক্যাসেট প্লেয়ারের কাছে এসে গানটিকে ঘুরিয়ে দিয়ে আবার ওই দূরত্বে ফিরে গিয়ে শুনতে থাকি, গানের উদ্ধৃত অংশের শেষ তিন পঙিক্ত আমার মধ্যে এবার মৃত্যুবোধ জাগায়। প্রেম পর্বের গান মৃত্যুবোধ জাগাচ্ছে? সত্যি তো, আর কখনো এমন সন্ধ্যা হবে না, সবকিছু শেষ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগে দেখা দূরবর্তী কালো নৌকা, কম্পমান আলো ভেসে কোথায় চলে গেছে। হঠাৎ মনে প্রশ্ন আসে, এই যে আমরা বলি বা গানের শেষ লাইনে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘জনমের মতো হায় হয়ে গেল হারা’, এই জনম শব্দটি এখানে কী অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, শেষ হয়ে যাওয়া অর্থে নিশ্চয়ই, কিন্তু জনম বা জন্মের মধ্যে আমরা সাধারণভাবে জাগরণকেই উপলব্ধি করি। শব্দ তার নিজস্ব আভিধানিক অর্থ অতিক্রম করে অন্য শব্দের সাহচর্যে যখন নতুন অর্থ পায়, তখন শব্দ অর্জন করে ব্যাখ্যাতীত একটি মাত্রা। গীতবিতানের প্রেম পর্যায়ের গানটি ঢাকায় যতদিন শুনেছি, একজন বিরহী প্রেমিকের হূদয় খচা কষ্টের উচ্চারণ বলেই মনে হয়েছে, কিন্তু পদ্মার তীরে বসে মধ্যরাতে গানটি যখন মনোযোগসহ শ্রবণ করি, আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ গানকে মৃত্যু পর্ব শিরোনামে একটি পর্ব করে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু মৃত্যুচেতনাকে বিষয় করে অনেক কবিতা লিখেছেন (পাঠক, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনার উপরে লেখা কবি হায়াৎ মামুদের অসাধারণ গ্রন্থটি পড়তে পারেন)

স্বপনের ডাক শুনি, ডাব খাবেন না? বাস্তবতায় ফিরে আসি। ক্যাসেটে তখন বাজতে থাকেআজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে ওরা পরিকল্পনা করছে, এই রাতে আর কী কী করা যায়। তিনজন প্রায় সমবয়সের তরুণ, যাদের রুচি রবীন্দ্রসংগীতে আনন্দ পায়। পরিকল্পনা করে, একটি নৌকা জোগাড় করতে হবে এবং রাতটি কাটাতে হবে চলমান নৌকায়। কিটু নৌকার খোঁজে যায়। দেবব্রত তখনএকেলা কোন পথিক তুমি পথিকহীন পথের পরে।একা সখা শ্রাবণ রাতে দুয়ার খোলা পেয়েও চলে যায়। (নজরুলেরথৈ থৈ জলে ডুবে গেছে পথ, এসো এসো পথভালোএবং রবীন্দ্রনাথেরআজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে বিষয় এক। রবীন্দ্রনাথের গানটি আগে লেখা, নজরুল একই বিষয়ে লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু শব্দ সুর প্রয়োগে ভিন্ন করে তুলেছেন তার সংগীত।

লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়ার আফ্রিকা হোটেলটি আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে। হোটেল চৌহদ্দির সমুদ্র দিকবর্তী সীমানায় সমুদ্রের গর্জনঋদ্ধ ঢেউ ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে এবং ওই সীমানায় সাজিয়ে রাখা বড় বড় কালো পাথরে ঢেউয়ের আছাড় হয়ে উঠছে ঊর্ধ্বে নৃত্যমান জলের সাদা উচ্ছ্বাস। ওই পাথরগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে লাফিয়ে আসা ঢেউয়ের পানিতে মুশতাক, মণ্ডল ভাই, বোখারী আর আমি ভিজেছি এবং বলেছি, যদি আড়াআড়ি ওইদিকে যাওয়া যেত, ঘুরে আসা যেত ফুটবলের স্বর্গরাজ্য ব্রাজিল।

দূর দেশে থাকলে প্রতিনিয়ত মাতৃভূমি টানে। লাইবেরিয়াকে আর ভালো লাগছিল না, কিছুতেই শেষ হচ্ছিল না শেষ পাঁচদিন। হোটেলের সমুদ্রমুখী ঘরে যতক্ষণ থাকি, শুনি রবীন্দ্রসংগীত। সমুদ্রের নিয়মমাফিক শোঁ শোঁ শব্দের মধ্যে রিজওয়ানা চৌধুরী বন্যা চাঁদ চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারেগেয়ে যান। যখনপথিক সবাই পেরিয়ে গেল ঘাটের কিনারাতে/আমি সে কোন আকুল আলায়ে দিশেহারা রাতেবন্যা সুরে সুরে উচ্চারণ করেন। আমার মনে হয় ওই দূরের ভাসমান জাহাজ আমাকে নেবে না, আমি ফিরতে পারব না স্বদেশে। সংগীত বাস্তববুদ্ধিকে ভোঁতা করে, মনে থাকে না যে আমি পানির জাহাজে বাড়ি ফিরব না। কিন্তু গানে যে ঘাটের প্রসঙ্গ আছে। তাতেই ওই অনুভব জারিত হয় বোধ মানসে। ঘাট গ্রহণ করে। ঘাট বিদায় দেয়। পথ হারানোর অধিক টান টের পাই। মুশতাক পাশের ঘর থেকে বলে, অন্য গান দাও। ওরও কি একই রকম কষ্ট হচ্ছে, যা হচ্ছে আমার। যখন কলিম শরাফী তার হূদয় ছিঁড়ে গেয়ে যাচ্ছিলেনবড় বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে আমার প্রাণেতখন আটলান্টিকের জায়মান নিরন্তর বেদনাকে আমি অনুভব করলাম।তোমারে হূদয়ে করে আছি নিশিদিন ধরে/চেয়ে থাকি আঁখি ভরে মুখের পানে/বড়ো আশা, বড়ো তৃষা, বড়ো আকিঞ্চন তোমারি লাগি/বড়ো সুখে, বড়ো দুখে, বড়ো অনুরাগে রয়েছি জাগি।হূদয়-বেদনার বা নিঃস্বতার কোন স্তরে পড়লে রকম একটি গান লেখা সম্ভব বা ওই অনুভূতি অনুভবকে ভাষা সুরে ধারণ করা সম্ভব, তার সঠিক উত্তর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবন আর ওই গানটি।

সমুদ্রের সীমানা আছে, কিন্তু কলিম শরাফীর বিশেষ স্বর ঘরানায় ওই গানের শব্দেরা যে অসীমতা সৃষ্টি করে, তার মধ্যে আমি মানুষকে মনে হয়, হূদয় ছেঁড়া এক করুণ মহিমান্বিত আর্তনাদ। আটলান্টিকের বিশালত্ব পাহাড়সমান ঢেউ গানের মহত্ত্বের অতলে পড়ে এক বিস্তৃত ধূসর সমতল হয়ে যায়। আমি ক্রমাগত নিঃস্ব হতে থাকি, কিন্তু শেষ হই না। এক নতুন পর্ব আমাকে কী সব স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজি না। যদি ব্যাখ্যায় অন্য অন্ধকার আসে। বেদনা ধূসর হয়ে যায়। চোখ বুজি। মনে হয়, ‘তোমারে হূদয়ে করে আছি নিশিদিন ধরে।মনে হয়, আমার মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণকারীকে বলব, যে অজানা লোকে আমাকে নিয়ে যাচ্ছ, সেখানে রবীন্দ্রসংগীত যদি না থাকে, আমাকে ওখানে নিও না, ওইপরবাসে কে রবে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন