সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সিল্করূট

নোবেলকাণ্ড!

এসএম রশিদ

ক্ষমতায় এসে ওবামার নোবেল জয় নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘কেন তাকে পুরস্কার দেয়া হলো, সে বিষয়ে নিজেও জানতেন না ওবামা।আর ২৩ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নোবেল কর্তৃপক্ষ সৎ হলে তিনি অবশ্যই নোবেল পেতেন। তার মতে, অনেকগুলো অবদানের কারণেই তিনি নোবেল পেতে পারেন। ট্রাম্পের নোবেল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর ওবামার শান্তিতে নোবেল পাওয়া কোনোটাই দুনিয়ার মানুষের কাছে ঠিক বোধগম্য হয়ে ওঠেনি। বছর সাহিত্যে নোবেলজয়ী পিটার হান্ডকে বসনিয়ায় মুসলিমদের ওপর চালানো গণহত্যার কসাই বলে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী স্লোবোদান মিলোসেভিচের গুণমুদ্ধ। নোবেল পুরস্কারের প্রায় ১২০ বছরের ইতিহাসে রকম বহু ঘটনা আছে, যা কখনো ভুল কিংবা প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কাউকে যে আবিষ্কারের জন্য নোবেল দেয়া হয়েছিল, পরে দেখা গেল যে সে আবিষ্কারই ভুল! গত কয়েক বছরে শান্তিতে নোবেলজয়ীদের ভূমিকা নিয়ে, ন্যায্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে। তাই নোবেল নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমছে, উল্টো বাড়ছে বিতর্ক।

নোবেল পুরস্কার দুনিয়াকে কী দিয়েছে বা নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তনে দুনিয়া কতটা বদলেছে, এমন প্রশ্নের জবাব দেয়াটা কঠিন। ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। বলা ভালো, সময়ের মধ্যে দুনিয়ার মানুষের আয়ু দ্বিগুণ হয়েছে; ক্ষুধা, দারিদ্র্য কমেছে; জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছেএসবের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এই এক শতকে দুনিয়ার জনসংখ্যা যতটা বেড়েছে, তা মানবেতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। গত সাত দশকে কোনো বিশ্বযুদ্ধও হয়নি। এখানে একটা প্যারাডক্স আছেখুব সম্ভবত পারমাণবিক বোমার ভয়ে দুনিয়ার যুদ্ধবাজরা এখন আর বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে আগ্রহী নয়। এতক্ষণ নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর গত প্রায় ১২০ বছরে দুনিয়ার আগ্রগতি নিয়ে যে দু-চার কথা বলা হলো, তাতে নোবেলজয়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।


সাধারণভাবে আমরা ধরে নিতেই পারি, আলফ্রেড নোবেল এসব অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট হতেন। কিন্তু গত এক শতাব্দীর পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বিষয় নতুন করে পড়া অনিবার্য হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ খাদ্য কৃষির বিষয়টি খেয়াল করা যাক। নরম্যান বোরলগ ১৯৭০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি ছিলেন কৃষিতত্ত্ববিদ, কিন্তু তিনি খাদ্যোৎপাদন বা ক্ষুধা দূরীকরণের জন্য নোবেল পাননি, তাকে নোবেল দেয়া হয় শান্তিতে। নরম্যান নিজে অনুমান করেছিলেন যে আলফ্রেড নোবেল যদি তার উইল আরো অর্ধশতক আগে লিখতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই খাদ্য কৃষিকে নোবেল পুরস্কারের বিভাগ হিসেবে অবশ্য বিবেচনা করতেন। সে সময়, ১৮৪৫-৫১ সালের মধ্যে ইউরোপ আলুর উৎপাদন নষ্ট হওয়ায় দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করছিল। এখনো দুনিয়ার অনেক মানুষ প্রতিদিন পেট পুরে খেতে পায় না।

আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে পুরস্কারের জন্য পাঁচটি বিভাগ নির্ধারণ করেছিলেনপদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি শরীরতত্ত্ব বা ওষুধ। শেষ বিভাগে আলফ্রেড নোবেল লুই পাস্তুরের কাজ দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন, লুই অবশ্য কোনো ডাক্তার ছিলেন না, তিনি ছিলেন মেডিকেল কেমিস্ট। বিভাগে পুরস্কার দেয়া হয় ক্লিনিক্যাল কোনো অর্জনের জন্য নয়, বরং মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণার জন্য। ১৯৬৮ সালে নোবেল পুরস্কারের তালিকায় অর্থনীতি বিভাগটি যুক্ত হয়।

বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই যে গত ১০০ বছরে দুনিয়া অবিশ্বাস্যভাবে বদলে গেছে। এমন বদল মানবেতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। মানুষ এখন হাওয়া দিয়ে যুক্ত হয়ে গেছে। দুনিয়ার কোনো প্রান্তই আর মানুষের পদচারণা থেকে মুক্ত নয়। নিজেদের মস্তিষ্কের চেয়ে এখন মানুষ যন্ত্রের মস্তিষ্কের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছে। এক নতুন দুনিয়া, যেখানে যন্ত্র চিন্তা করতে শিখে গেছে। মানুষই শিখিয়েছে যন্ত্রকে, কিন্তু এখন সেই যন্ত্র আবার মানুষকে ভাবাচ্ছে। এখন দুনিয়ায় জ্ঞান-গবেষণার এমন অনেক নতুন নতুন বিষয় বিকশিত হয়েছে, যা নোবেল চালু করার সময় কারো পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। মনস্তত্ত্ব, পরিবেশবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, কম্পিউটার সায়েন্সের মতো আরো কিছু বিষয় এখন নোবেল দাবি করতে পারে। ধরা যাক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কথা, মানুষের মনের অবচেতন অংশ নিয়ে তার কাজ ছিল বৈপ্লবিক কিংবা জ্যাঁ পিয়াজে, যিনি শিশুদের শিক্ষাগ্রহণের মানসিক প্রক্রিয়াকে আবিষ্কার করেছেনকখনো নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হননি।


এমন আরো অনেক বিজ্ঞানী আছেন, যাদের উপযুক্ত কাজ থাকা সত্ত্বেও তারা কখনো নোবেলের জন্য বিবেচিত হননি। ১৯০৩ সালে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন, টমাস আলভা এডিসন উপহার দেন বৈদ্যুতিক বাতি, নিকোলা টেলসা আবিষ্কার করেন ঘূর্ণায়মান চুম্বকীয় ক্ষেত্র, টেলিভিশন আবিষ্কার করেন ফিলো ফার্নসওর্থএর কেউই নোবেল পাননি। গণিতবিদ অ্যালান টার্নিং কম্পিউটারের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন; এডুইন হাবল জানিয়েছেন মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে এবং ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমেএরাও কেউ নোবেল পাননি। পরিবেশ সংরক্ষণ আজকের দুনিয়ার অন্যতম জ্বলন্ত ইস্যু, কিন্তু দুনিয়ার প্রথম এনভায়ারনমেন্টালিস্ট বলে পরিচিত র্যাচেল কার্সন নোবলে পাননি। আজ দুনিয়া যে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েবের ওপর নির্ভরশীল, তার আবিষ্কারক টিম বার্নস-লি যে নোবেল পাননি, সেটা জেনে বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। দুনিয়ায় কয়েকশ কোটি মানুষের জীবন যার আবিষ্কারে প্রভাবিত হয়েছে, তিনি কেন নোবেল পাননি, এমন প্রশ্নটা আমাদের মতো আদার ব্যাপারিরাও নিশ্চয়ই অবাক হয়ে জানতে চাইতে পারেন।

এসব দেখেশুনে অনেক পণ্ডিতই বলেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশের কথা মাথায় রেখে নোবেল পুরস্কারের তালিকায় নতুন নতুন বিভাগ যুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে, যেমনটা একসময় করা হয়েছিল অর্থনীতিকে যুক্ত করে।

১৯২৬ সালে ইয়োহানেস ফিবিজারকে নোবেল দেয়া হয়েছিল পেটের ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এক ধরনের কৃমি আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু নোবেল দেয়ার পর একসময় বোঝা গেল, আবিষ্কারটি ছিল ভুল। রকম আরো দুবার ঘটেছে ইতিহাসে। জুলিয়াস ফন য়ুরেগ ভাগনারকে নোবেল দেয়া হয় (১৯২৭) জ্বর সৃষ্টি করে মানসিক রোগের চিকিৎসা করার পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য; জ্বর তৈরির জন্য রোগীর শরীরে ম্যালেরিয়া জীবাণু প্রবেশ করানো হতো। মেডিসিনে ১৯৭৩ সালে নোবেল পেয়েছিলেন কোনার্ড লোরেঞ্জ। এই লোরেঞ্জ ১৯৪০ সালে দাবি করেছিলেন, শ্বেতাঙ্গদের জাতিগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে অন্য নিম্নবর্গীয় জাতিগুলোকে নির্মূল করতে হবে। ধারণা হিটলার গ্রহণ করেছিলেন। বাতাসে থাকা নাইট্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া আহরণের উপায় বের করে রসায়নে নোবেল জেতেন জার্মান নাগরিক ফ্রিত্জ হেবার। কৃষিতে জমির উর্বরতায় আবিষ্কার অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছিল। হেবার নোবেল পান ১৯১৮ সালে। আবিষ্কার জার্মানিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করেছিল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ হলেওদেশপ্রেমিক জার্মানযুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাসের ব্যবহার করতে কাজ করেন। কিন্তু তাদের অতীতের কর্মকাণ্ড জানা সত্ত্বেও লোরেঞ্জ হেবারকে নোবেল দেয়া হয়। একেবারে উল্টো পরিস্থিতি দেখা যায় ফিলিস্তিনিদের আন্দোলনের কিংবদন্তী নেতা ইয়াসির আরাফাতের ক্ষেত্রে। তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়ায় নোবেল পিস কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন নরওয়ের পার্লামেন্টের এক সদস্য।

মানুষের জিনোমের ম্যাপিং তৈরি সম্পন্ন হয় ২০০০ সালে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার আবিষ্কার বিষয়ে জানাতে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সন্দেহাতীতভাবে এটা ছিল ২০০০ সালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। কিন্তু নোবেল কমিটি আবিষ্কারকে পাত্তা দেয়নি। সাহিত্যে দেখা যায় টলস্টয়, ব্রেখট, জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ, বোর্হেসনোবেল পাননি।


মহাত্মা গান্ধী অহিংসার পক্ষে কাজ করে, অহিংস আন্দোলন চালিয়েও শান্তিতে নোবেল জেতেননি। অথচ বিশ শতকে অহিংস আন্দোলনে তিনিই সবচেয়ে প্রভাবসঞ্চারী চরিত্র। অন্যদিকে দেখা যায়, শান্তিতে নোবেল দেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শান্তি চুক্তিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। চুক্তি কতটা কার্যকর হলো, তা নিয়ে কম মাথা ঘামানো হয়। হেনরি কিসিঞ্জারকে নোবেল দেয়া হয়েছিল উত্তর ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরে ভূমিকা রাখার জন্য। ১৯৭৩ সালের চুক্তিতে উত্তর ভিয়েতনামের পক্ষে ভূমিকা রাখা লে ডাক থোকেও কিসিঞ্জারের সঙ্গে নোবেল দেয়া হয়েছিল, কিন্তু শান্তি তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি দাবি করে লে ডাক থো পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান। সত সত্যই সে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়নি। কিসিঞ্জারকে নোবেল দেয়ার প্রতিবাদে নোবেল কমিটির দুজন সদস্য পদত্যাগ করেন। ইতিহাসে কিসিঞ্জারকে শান্তিতে নোবেল দেয়া রীতিমতো কলঙ্কজনক এক অধ্যায় হয়ে আছে। এই কিসিঞ্জারই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চালানো গণহত্যার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড পশ্চিম পাকিস্তানের চালানো গণহত্যা নিয়ে যে টেলিগ্রাম যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন, তা উপেক্ষা করেছিলেন কিসিঞ্জার। যে বছর, মানে ১৯৭৩ সালে কিসিঞ্জারকে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়। চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত হত্যা করা হয়। কাজে চিলির সেনা শাসক পিনোশেকে সহায়তা করতে সিআইএকে নিযুক্ত করার পেছনে অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন কিসিঞ্জার। তার অপকর্মের ফিরিস্তি দীর্ঘ। এমন কিসিঞ্জারই শান্তিতে নোবেলজয়ী!

নোবেল পরিবার

বছর অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন মোট তিনজনকলকাতার ছেলে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় তার স্ত্রী এস্তার দুফলো। আরেকজন হলেন মাইকেল ক্রেমার। স্বামী-স্ত্রীর নোবেল জয় নিশ্চয়ই যেমন-তেমন কথা নয়। রকম ঘটনা ইতিহাসে দুর্লভ। নোবেলজয়ী পরিবারের মধ্যে ইতিহাসকে সবচেয়ে আলোকিত করেছে কুরি পরিবারপদার্থবিদ্যায় ১৯০৩ সালে একসঙ্গে নোবেল পেয়েছিলেন মারি কুরি তার স্বামী পিয়েরে কুরি। মারি কুরি ১৯১১ সালে আবার নোবেল জেতেন, এবার রসায়নে। এমন কৃতিত্ব আর কোনো নারী -যাবৎ অর্জন করতে পারেননি। মারিসহ মোট চারজন প্রতিভাবান দুবার করে নোবেল জিতেছেনমারি বাদে অন্যরা পুরুষলাইনাস পাউলিং, জন বার্ডিন, ফ্রেডেরিক স্যাংগার। যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট বার্নস উডওয়ার্ড কুইনাইন, কোলেস্টের, কর্টিসোন, ক্লোরোফিলের জৈব সংশ্লেষণ নিয়ে গবেষণা করে ১৯৬৫ সালে রসায়নে নোবেল পান। উডওয়ার্ড মারা যান ৬২ বছর বয়সে। তা না হলে তিনি রসায়নে দ্বিতীয় নোবেল পেতেন বলে জোর ধারণা করা হয়।

মারি পিয়েরে দম্পতির জ্যেষ্ঠ কন্যা ইরেনে কুরি তার স্বামী জুলিও কুরি একত্রে ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল জয় করেন। এমন পারিবারিক কৃতিত্ব দুনিয়ায় আর নেই। এখানেই অবশ্য শেষ নয়। ইরেনের কন্যা ইভের স্বামী হেনরি লাবোয়সি ১৯৬৫ সালে ইউনিসেফের পক্ষে শান্তিতে নোবেল গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান নরওয়ের মোজেস দম্পতিমে-বিট মোজেস এডওয়ার্ড মোজেস। ১৯৪৭ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগেই আরেক দম্পতির নোবেল জয়ের রেকর্ড রয়েছেতারা কার্ল ফার্দিনান্দ কোরি গার্টি কোরি। সুইডিশ মির্দাল দম্পতিও নোবেল জয় করেন। আমেরিকান ডিলেমা, এশিয়ান ড্রামা নামের আলোচিত গ্রন্থের লেখক গুনার মির্দাল নোবেল পান অর্থনীতিতে ১৯৭৪ সালে আর তার স্ত্রী আলভা মির্দাল ১৯৮২ সালে শান্তিতে নোবেল জয় করেন। উল্লেখ্য, সুইডিশ লেখক বুদ্ধিজীবী য়ান মির্দাল এই দম্পতির সন্তান।


স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি পিতা-পুত্রের নোবেল জয়ও ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে। স্যার উইলিয়াম হেনরি ব্রাগ (১৮৬২-১৯৪২) ছিলেন ব্রিটিশ পদার্থবিদ, রসায়নবিদ, গণিতজ্ঞ। স্যার উইলিয়াম তার ছেলে লরেন্স ব্রাগ ১৯১৫ সালে তাদের যৌথ কাজের জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান। ব্রিটেনের টমসন পরিবারেও আছে পিতা পুত্রের নোবেল জয়ের কৃতিত্ব। তবে সেটা ব্রাগ পরিবারের মতো একত্রে নয়। জোসেফ জন টমসন ১৯০৬ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান, তার ছেলে জর্জ প্যাগেট টমসন পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান ১৯৩৭-এ। জার্মান-সুইডিশ হান্স ফন ইউলার-চেলপিন রসায়নে নোবেল পান ১৯২৯ সালে, আর তার ছেলে উলফ ফন ইউলার মেডিসিনে নোবেল পান ১৯৭০-এ। নিলস বোর ১৯২২ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান। তার ছেলে এজে বোর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছিলেন ১৯৭৫ সালে। পদার্থবিদ্যায় কার্ল মান সিগবান (১৯২৪) তার ছেলে কাই মান সিগবান ১৯৮১ সালে নোবেল জয় করেন। উপলক্ষে দক্ষিণ ভারতের চন্দ্রশেখর পরিবারেরও নাম নিতে হয়। চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমণ (১৮৮৮-১৯৭০) বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া প্রথম এশীয় সন্তান। আলো নিয়ে গবেষণা করে তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান ১৯৩০ সালে। তার ভাইপো সুব্রামনিয়ান চন্দ্রশেখর পদার্থবিদ্যায়ই নোবেল পান ১৯৮৩ সালে।

নোবেল প্রত্যাখ্যান

উত্তর ভিয়েতনামের লে ডাক থোর নোবেল প্রত্যাখ্যানের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে তাকে নোবেল দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ভিয়েতনামের পরিস্থিতি তার নোবেল গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নয়। তার কথা ছিল, ‘ভিয়েতনামে এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

নোবেল প্রত্যাখ্যানে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬৪ সালে। সে বছর ফরাসি দার্শনিক, সাহিত্যিক জ্যাঁ পল সার্ত্রকে সাহিত্যে নোবেল দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সার্ত্র নোবেল নিতে অস্বীকৃতি জানান। সার্ত্র চিরজীবন কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান, পুরস্কার গ্রহণ করেননি।

আমি খুবই দুঃখিত যে ঘটনাটা এক রকম স্ক্যান্ডাল হয়ে যাচ্ছে: একটা পুরস্কার দেয়া হলো এবং আমি সেটা প্রত্যাখ্যান করলাম। এমনটা হলো, কারণ বিষয়টি আগেভাগে আমাকে জানানো হয়নি।...আমি সে সময় জানতাম না যে গ্রহীতার সঙ্গে আলাপ না করেই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। আমার মনে হয়, পরিস্থিতি রোধ করার সময় ছিল। এখন আমি বুঝি যে সুইডিশ একাডেমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা পরিবর্তন করা যায় না।

আমি একাডেমিকে আমার দেয়া চিঠিতে জানিয়েছি যে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি সুইডিশ একাডেমি বা খোদ নোবেল পুরস্কারের কোনো সম্পর্ক নেই। এর পেছনে আমার দুটি কারণ উদ্দিষ্টব্যক্তিগত অবজেক্টিভ।

আমার ব্যক্তিগত কারণটি রকম: আমার প্রত্যাখ্যাত কোনো আবেগতাড়িত আচরণ নয়। আমি সবসময়ই যেকোনো দাপ্তরিক সম্মাননা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। যুদ্ধের পর, ১৯৪৫ সালে যখন আমাকে লিজিয়ন অব অনার দেয়া হয়েছিল, আমি সেটা প্রত্যাখ্যান করি। যদিও আমি সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম। একইভাবে অনেক বন্ধু পরামর্শ দিলেও আমি কলেজ দে ফ্রসেতে প্রবেশ করিনি।


আমার মনোভাবের ভিত্তি হলো লেখকের উদ্যোগ নিয়ে আমার নিজের ধারণা। একজন লেখক যিনি কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাহিত্যিক অবস্থান গ্রহণ করেন, তাকে শুধু তার নিজের কাজ, মানে লিখিত শব্দের মাধ্যমে সবকিছু প্রকাশ করা উচিত। লেখক যত সম্মাননা নেবেন, সেগুলো তার পাঠকের জন্য একটি গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়, যা আমি কাম্য বলে মনে করি না। আমি যখন জ্যাঁ পল সার্ত্র নামে স্বাক্ষর করব, সেটা কখনই জ্যাঁ পল সার্ত্র, নোবেলজয়ী নামে স্বাক্ষর করার মতো এক বিষয় হবে না।

লেখক যখন ধরনের কোনো সম্মাননা গ্রহণ করেন, তখন তিনি নিজেকে সেই সম্মাননা দাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন। আমি ভেনিজুয়েলার বিপ্লবীদের প্রতি যে সহানুভূতি ধারণ করি, সেটার জন্য শুধু আমিই দায়ী, কিন্তু নোবেল লরিয়েট জ্যাঁ পল সার্ত্র যদি ভেনিজুয়েলার প্রতিরোধকে সমর্থন করেন, তাহলে তিনি তার সঙ্গে ইনস্টিটিউট হিসেবে পুরো নোবেল পুরস্কারকেও তার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন।

তাই লেখককে অবশ্যই নিজেকে কোনো ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এমনকি তা যদি নোবেলের মতো সবচেয়ে সম্মানজনক পরিস্থিতিতে হয় তাহলেও।

অবশ্যই উপরোক্ত মনোভাব একেবারেই আমার নিজস্ব। যারা আগে নোবেল গ্রহণ করেছেন, তাদের প্রতি এটা কোনো সমালোচনা নয়। অনেক নোবেল লরিয়েটকে জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, যাদের প্রতি আমার গভীর সম্মান মুগ্ধতা রয়েছে।

১৯২৫ সালে বার্নার্ড নোবেল সম্মাননা নিতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত বদল করে পুরস্কার নিতে স্টকহোমে গিয়েছিলেন।

নোবেল প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি সরকারের নির্দেশ মেনে নোবেল পুরস্কার না নেয়ার নজিরও আছে। হিটলারের নিষেধ থাকায় তিনজন জার্মান নোবেলজয়ী তাদের পুরস্কার নেননি। রিচার্ড কান নোবেল পেয়েছিলেন রসায়নে ১৯৩৮ সালে। এই রিচার্ড ছিলেন নািস কোলাবোরেটর প্রকাশ্যভাবে ইহুদিবিদ্বেষী। হিটলারের নির্দেশ ছিল, কোনো জার্মান যেন নোবেল পুরস্কার গ্রহণ না করেন। তিনি এমনকি হাতে লেখা এক চিঠিতে লেখেন যে কোনো জার্মানকে নোবেল পুরস্কার দেয়া মানে তাকে ফুয়েরারের নির্দেশনা অমান্য করার আমন্ত্রণ জানানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি অবশ্য নোবেল গ্রহণ করেছিলেন। আরেক জার্মান অ্যাডলফ বুটনাডট রসায়নে নোবেল পান ১৯৩৯ সালে। তিনিও হিটলারের নির্দেশমতো নোবেল নিতে অস্বীকৃতি জানান। অবশ্য ১৯৪৯ সালে তিনি নোবেল গ্রহণ করেন। গেরহার্ড ডোমাগ চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান ১৯৩৯ সালে। তিনিও হিটলারের নির্দেশের কারণে নোবেল নেননি। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি নোবেল গ্রহণ করেন।


সাহিত্যে নোবেল পাওয়া বরিস পাস্তেরনাকের কাহিনী সবারই জানা। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ডক্টর জিভাগো। উপন্যাসে রুশ বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট শাসনের নানা নেতিবাচক চেহারা জায়গা করে নিয়েছিল। পশ্চিমারা উপন্যাস নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল। এতক্ষণে সোভিয়েত শাসন ব্যবস্থাকে ঘায়েল করার মোক্ষম এক হাতিয়ার পাওয়া গেছে!—এই ছিল সিআইএর ভাবনা। বই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ, একে আন্তর্জাতিক বেস্টসেলারে পরিণত করা এবং পাস্তেরনাক যেন নোবেল পান, তার জন্য যত যা করা যায়, সবই সিআইএ করেছিল। ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর বরিস পাস্তেরনাককে সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২৫ অক্টোবর তিনি নোবেল কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে টেলিগ্রাম করেন। অন্যদিকে নিজের দেশেই পাস্তেরনাকের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। সরকারের তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, নোবেল নিতে স্টকহোমে গেলে তিনি আর সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরতে পারবেন না। এবার আরেকটি টেলিগ্রামে বরিস পাস্তেরনাক নোবেল নিতে তার অক্ষমতার কথা জানিয়ে দেন। নোবেল ত্যাগ করে বরিস পাস্তেরনাক মুষড়ে পড়েছিলেন, যা তার ছেলের কথা থেকে জানা যায়।

নোবেলজয়ীদের কারাভোগ-হত্যাকাণ্ড

তিনজন নোবেল জিতেছেন বন্দি থাকা অবস্থায়। এরা সবাই শান্তিতে নোবেল জিতেছেনজার্মান শান্তিবাদী সাংবাদিক কার্ল ফন ওসিয়েটজকি, মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী নেত্রী বলে পরিচিত অং সান সু চি চীনা মানবাধিকারকর্মী লিউ জিয়োবো।

কার্ল ফন ওসিয়েটজকি ভার্সাই চুক্তি ভঙ্গ করে নাজিদের সামরিক প্রস্তুতির কথা প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৩২ সালে নািস জার্মানদের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। হিটলার ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে জার্মান চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেন। নািসদের হাত থেকে বাঁচতে অনেক জার্মান লেখকই তখন দেশ ছাড়ছেন। কার্লও হয়তো অল্প দিনেই দেশ ছাড়তেন, কিন্তু তার আগেই ১৯৩৩ সালে তাকে গ্রেফতার করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ১৯৩৫ সালে কার্লকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পুরস্কার নিতে অসলো যেতে তাকে সরকার মুক্তি দেয়নি। যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত কার্লের অবস্থা খারাপ হলে ১৯৩৮ সালের মে মাসে গেস্টাপোদের তত্ত্বাবধানে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই কয়েক দিন পর কার্ল মারা যান।


কয়েকজন নোবেলজয়ী নোবেল পাওয়ার পরবর্তী জীবনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন জাতিসংঘের সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি দাগ হ্যামারশোল্ড, যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল রাইটস আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন