শনিবার | নভেম্বর ২৩, ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

রেলের জমিতে সিএনজি স্টেশন

১৬ বছরেও বাড়েনি জমির ইজারামূল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০২ সালের দিকে সিএনজি স্টেশন বা রূপান্তর কারখানা স্থাপনের জন্য জমি ইজারা দেয়া শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ওই সময় প্রতি বিঘা জমির মাসিক ইজারামূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৫ হাজার টাকা, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ১০ হাজার অন্যান্য এলাকায় হাজার টাকা। এরপর ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বাড়ানো হয়নি তা। এছাড়া ইজারা শেষে জমি উদ্ধারেও নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে রেলওয়েকে। অবস্থায় সিএনজি স্টেশনের জন্য নতুন করে জমি ইজারা না দেয়ার পক্ষে রেলওয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের জমিতে স্থাপিত সিএনজি ফিলিং স্টেশন বা রূপান্তর কারখানার লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণের পর করণীয় নিয়ে গঠিত এক কমিটির প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

রেলের জমি ইজারা নিয়ে গড়ে ওঠা সিএনজি স্টেশনগুলোর ইজারা নবায়ন, ইজারামূল্য পুনর্নির্ধারণ জমি ইজারার জন্য নতুন আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গত বছরের জুলাইয়ে কমিটি গঠন করে রেলওয়ে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব (আইন) মো. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি বিভিন্ন পর্যবেক্ষণসহ তিনটি সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে সিএনজি স্টেশনের জন্য নতুন করে রেলের জমি ইজারা না দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

ওই কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে ক্রমবর্ধিষ্ণু। রেলওয়ের প্রধান কাজ রেল পরিচালনা করা, জমি ইজারা দেয়া নয়। যদিও বাড়তি আয়ের জন্য নন-কোর ব্যবসা হিসেবে জমি ইজারা দেয়া হয়। তবুও সিএনজি স্টেশনে ইজারা দেয়া জমি পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করতে সমস্যায় পড়তে হয় রেলওয়েকে।

এসব কারণে নতুন করে আর কোনো সিএনজি স্টেশনে জমি বরাদ্দ না দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে বর্তমানে রেলের জমিতে যেসব সিএনজি স্টেশন রয়েছে, ইজারার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও যতদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের সেই জমি প্রয়োজন না হচ্ছে, ততদিন তারা সেখানে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে।

এক্ষেত্রে বিদ্যমান ইজারামূল্য পুনর্নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি। বিষয়ে কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০২ ২০০৩ সালের অর্থনীতি আর ২০১৮ সালের অর্থনীতি এক নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির স্বার্থে ইজারামূল্য পুনর্নির্ধারণ করে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। ২০০২ সালে যে হারে ইজারামূল্য প্রদান করা হতো, ২০১৮ সালেও একই হার বহাল থাকবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতি বছর বর্ধিত মূল্যে নবায়নের শর্তে জমির ইজারা চুক্তি করতে হবে। একইভাবে নবায়নের প্রথম বছর যে হারে ইজারামূল্য নির্ধারণ হবে, পরের বছর থেকে সেটি শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এদিকে নতুন করে রেলের জমি ইজারা না দেয়ার খবরে উদ্বিগ্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিকরা। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রেলপথমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন করেছেন চট্টগ্রামের ফোরস্টার সিন্ডিকেট নামের একটি সিএনজি স্টেশনের মালিক। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে সিএনজি স্টেশন চালু করা হয়েছে। এমন অবস্থায় যদি আমাদের ইজারার মেয়াদ বাড়ানো না হয়, তাহলে আর্থিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ইজারার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য রেলপথমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ফোরস্টার সিন্ডিকেট সিএনজি স্টেশনের মালিক আনোয়ার হোসেন।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য বলছে, বর্তমানে রেলওয়ের জমিতে তাদের ১০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এজন্য নির্ধারিত হারে রেলওয়েকে ইজারামূল্য দিয়ে আসছে আরপিজিসিএল। অর্থাৎ ঢাকা মহানগরে ১৫ হাজার টাকা, চট্টগ্রাম মহানগর, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, টঙ্গী পৌরসভার জন্য ১০ হাজার টাকা অন্যান্য মহানগরে সিএনজি স্টেশনের জমিপ্রতি হাজার টাকা ইজারা প্রদান করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সংস্থাকে ইজারা দেয়া জমি উদ্ধারে পরবর্তী সময়ে সমস্যা হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে কমিটির প্রতিবেদনে। মূলত সমস্যা থেকে বাঁচতে নতুন করে জমি ইজারা দেয়ার বিপক্ষে মত দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।

প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি অনেক বেশি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এবং বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা এসব জমির বড় অংশই অব্যবহূত। ফলে ক্রমেই বেহাত হচ্ছে রেলওয়ের জমি। সর্বশেষ হিসাবে সংস্থাটির হাজার ৩৯১ একরেরও বেশি জমি বেদখল হয়ে আছে, যার বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও জমি উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্যের খবর নেই।

জানা গেছে, সারা দেশে রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৬০৬ একর। এর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৪০২ পশ্চিমাঞ্চলের জমির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৭০৪ একর। এর প্রায় অর্ধেক বা ৩০ হাজার ৫১৪ একর জমি রেলের অপারেশনাল কাজে ব্যবহার হচ্ছে। আর ৩১ হাজার ৯২ একর জমি রেলের নিজস্ব কোনো ব্যবহার নেই। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৩ একর জমি ইজারা দিয়েছে রেলওয়ে। ১৩ হাজার ৪২৩ একর পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। বাকি অংশ বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের জমি ইজারা দেয়া হয়েছে একটা নীতিমালার মাধ্যমে। ইজারামূল্য বাড়াতে হলে নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য একটু সময় দরকার। সংসদীয় কমিটি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। ১৬ বছর আগের ইজারামূল্য এখনো কার্যকর থাকায় রেলওয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন