শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

সিলেটে স্টোন ক্রাশার জোন স্থাপন

তিন মাসের নির্দেশনা ৩৩ মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি

দেবাশীষ দেবু সিলেট

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে বালাপুঞ্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই তিনটি পাথর ভাঙার কল (স্টোন ক্রাশার মেশিন) দিনভর উচ্চশব্দে পাথর ভাঙা হয় এসব কলে। পাথর ভাঙার ফলে সৃষ্ট ধুলোয় অন্ধকার হয়ে থাকে পুরো এলাকা। ধুলো শব্দের কারণে ব্যাহত হয় বিদ্যালয়ের পাঠদান। শিক্ষার্থীরাও অসুস্থ হয়ে পড়ে ঘন ঘন।

বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, দিনের বেলাও স্কুলের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। তবু ধুলো আর শব্দ ঠেকানো যায় না। এখানকার শিক্ষার্থীদের কাশি-সর্দি লেগেই থাকে।

সিলেট সদর উপজেলার ধোপাগুলে সড়কের গা ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য পাথর ভাঙার কল। পাশেই সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে। কল থেকে পাথরগুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায়ও। সড়ক দিয়ে যাওয়া বিমানযাত্রীদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়।

কেবল একটি-দুটি এলাকা নয়, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর কানাইঘাট এই পাঁচ উপজেলার যেখানে সেখানে গড়ে উঠেছে দেড় হাজার পাথর ভাঙার কল। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকা কৃষিজমি ধ্বংস করেও গড়ে উঠছে এসব কল। এগুলোর একটিরও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। অবৈধ এসব কল শব্দদূষণ, বায়ুদূষণের কারণে পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

পাথর ভাঙার কলের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আলাদা একটি জোন করে সিলেটের সব পাথর ভাঙার কল সেখানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। তিন মাসের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন আদালত। নির্দেশনা দেয়া হয় যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা সব অবৈধ কল বন্ধ করে দেয়ারও। এরপর প্রায় ৩৩ মাস পেরোতে চললেও বাস্তবায়ন হয়নি আদালতের নির্দেশনা। এখনো আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে পাথর ভাঙার কলগুলো।

এছাড়া স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা ২০০৬ অনুসারে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫০০ মিটার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বসতবাড়ির ১০০ মিটার এবং প্রধান সড়ক-মহাসড়কের ৫০ মিটারের মধ্যে কোনো পাথর ভাঙার কল স্থাপন করা যাবে না।

এসব বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশনার পর স্টোন ক্রাশার জোন স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এটি এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য পাথরের গুঁড়ো অপরিহার্য। অবস্থায় পাথর ভাঙার কলগুলোকে বৈধতা দিতে ২০০৬ সালে পরিবেশ বন মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। খোলা জায়গায় যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা এসব কল পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে বিধায় ২০১৩ সালে পরিবেশ বন মন্ত্রণালয় আলাদা আরেকটি নীতিমালা করে।

স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা (সংশোধিত ২০১৩) নীতিমালায় সিলেটে পাথর ভাঙার কল স্থাপনের প্রথম শর্ত ছিল স্টোন ক্রাশার জোন করতে হবে। নীতিমালা উপেক্ষা করে যেখানে সেখানে পাথর ভাঙার কল স্থাপন করে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানোয় ২০১৫ সালে উচ্চ আদালতে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তিন মাসের মধ্যে পাথর ভাঙার কলগুলোর আলাদা জোন করার নির্দেশ দেন আদালত।

ব্যাপারে বেলা সিলেটের সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, আদালতের নির্দেশনার পর প্রথমে জৈন্তাপুরে পরে গোয়াইনঘাটে একটি জোন করার উদ্যোগ নিয়েছিল জেলা প্রশাসন। এরপর উদ্যোগ আর এগোয়নি। এখন কোন অবস্থায় আছে, তা- জানি না। 

২০১৫ সালে বেলার করা রিটে সিলেটের পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ৬০৬টি পাথর ভাঙার কল অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। গত চার বছরে সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে নতুন করে দক্ষিণ সুরমা এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েকটি কল।

সিলেট স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মাসুদ আহমদ চৌধুরী বলেন, পরিবেশের যে নীতিমালা রয়েছে তা মেনে স্টোন ক্রাশার মেশিন স্থাপন করা সম্ভব নয়। পরিবেশের নীতিমালায় বলা হয়েছে, আশপাশের ৫০০ একরের মধ্যে কোনো বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল থাকতে পারবে না। এমন জায়গা দেশে কোথায় পাওয়া যাবে? এটি মানতে হলে শতাংশ কলও টিকবে না। সব কল বন্ধ করে দিলে তো দেশে পাথরের বিরাট সংকট দেখা দেবে। খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ক্রাশিং জোন নির্মাণের জায়গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্রাশিং জোন নির্মাণে আমাদের আপত্তি নেই। তবে তা ব্যবসায়ীদের সুবিধাজনক স্থানে হতে হবে। যেখানে গেলে ব্যবসা হবে না, সেখানে ব্যবসায়ীরা যাবেন কেন?

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন