বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড ও অশুভ রাজনৈতিক সংস্কৃতি

আশেক মাহমুদ

আবরার ফাহাদ বুয়েটের মেধাবী ছাত্র। অক্টোবর রাতে ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় আঘাতে আঘাতে ফাহাদকে মেরে ফেলেছে ২৫ জন মেধাবী ছাত্র। ঘটনায় পুরো দেশ এমনকি বিশ্ববাসী স্তম্ভিত, হতভম্ব। শেরেবাংলা হলের ১০১১ নং কক্ষ নির্মম অত্যাচার, নিপীড়ন আর খুনের সাক্ষী হয়ে আছে। ফাহাদ নাকি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, যে স্ট্যাটাসের পরিণতি হলো এই পৈশাচিক খুন। আর তাই ঘটনাকে শুধু খুনের ঘটনা বলাটা সমীচীন নয়। এর পেছনে এক অশুভ রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর কলুষিত সামাজিক দীনতার ভয়ংকর চিত্র রয়েছে; আর সেই চিত্রায়ণ করব লেখনীতে।

. ফেসবুকে স্ট্যাটাস: ফেসবুক পোস্টে আবরার লিখেছে, দেশের গ্যাসসম্পদ দিয়ে যেখানে আমাদের কলকারখানাই চলছে না, বরং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা কেন ভারতকে গ্যাস দেব। সে তো কোনো অশ্লীল বা বাজে কথা লেখেনি। একজন মানুষ দেশের নাগরিক হয়ে কি দেশের জন্য কোনো কথা লিখতে পারবে না? দেশের জন্য স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার পেয়েছি তো সেই ৭১ থেকে। আমাদের স্বাধীনতার দাবি এসেছে পাকিস্তানের শাসকশ্রেণীর শোষণের কারণ থেকে। আমাদের সম্পদ তারা লুট করছে বলেই তো আমরা স্বাধীনতা চেয়েছি, আমাদের কথা বলার অধিকার দেয়নি বলেই তো আমরা স্বাধীনতা চেয়েছি। সে কারণেই তো বঙ্গবন্ধু অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে রুখে দাঁড়াতে বলেন। এর মানে সেদিন যদি এই আবরার থাকত, সে তো বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিত।

কিন্তু যারা তাকে নির্মমভাবে পেটাল, তারা কি বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিত? নাকি ইয়াহিয়া খানের পক্ষ হয়ে কাজ করত? তাহলে যারা দেশের জন্য লিখবে, তারা কি এই স্বাধীন দেশে ভয়ে, আতঙ্কে থাকবে? পাকিস্তান আমলেও তো যারা দেশের জন্য কথা বলত, তাদের গ্রেফতার করা হতো, শাস্তি দেয়া হতো। অথচ আমরা স্বাধীন দেশ পাওয়ার পর প্রায় ৫০ বছর অতিবাহিত হতে চলল, তবুও যারা দেশকে ভালোবাসে, তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারিনি। ব্যর্থতার দায় কে নেবে? আমরা হয়তো বলব, অপরাধীর কোনো দল নেই। তাহলে ধরনের অপরাধীর ক্ষমতায়ন কী করে হচ্ছে, তা কি দেখার প্রয়োজন নেই? বিষয়টি শুধু এটা নয় যে সন্ত্রাসীরা মেরেছে। মূল কথাই হলো, সন্ত্রাসীরা যেখানে স্বাধীন দেশে ভয়ে, আতঙ্কে থাকবে, সেখানে ওরা কেন দাপটে চলতে পেরেছে? আর যারা দেশ নিয়ে ভাবে, তাদের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ নেই কেন?

. টর্চার সেল র্যাগিং নিপীড়ন: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে রয়েছে টর্চার সেল। বুয়েটের নয়টি হলেই নাকি টর্চার সেল আছে। বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগে! মা-বাবা কত কষ্ট করে তার সন্তানকে জ্ঞানকেন্দ্রে পাঠায় মানুষ হওয়ার জন্য, আর তাদের আবাসিক সেন্টারগুলো কী করে এত বছর ধরে নির্যাতনের ক্ষেত্র হতে পারে, তা মাথায় ধরছে না। এখানে তো বড় ভাই, ছোট ভাই কালচার চলত না। চলত বাধ্যতামূলক আনুগত্যের কালচার। প্রভাব বিস্তারকারীদের আনুগত্য হতো। সাধারণ ছাত্ররা অল্প খরচে থাকত বলে ওরা অনুগত থাকতে বাধ্য হতো। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আসলেই মেধাবী, তারা আনুগত্য দেখায় পেশি শক্তিবাদীদের। পেশি শক্তির বলে হলগুলোকে অমানবিক টর্চার সেল বানানো হয়েছে। অনেকে ভয়ে মুখ খুলত না প্রাণ হারানোর ভয়ে, নিপীড়নের ভয়ে। যে রুমগুলোকে টর্চার সেল বানানো হয়েছে, সেখানে ক্যাসিনোর মতো চলত মদের আড্ডা। ছাত্রদের ওপর র্যাগিং করা ছিল হল সংস্কৃতি। র্যাগিংয়ের নামে অশ্লীল, নোংরা বিষয়ের চর্চা করতে বাধ্য করা হতো। কালচার একদিনে হয়নি। ছাত্র রাজনীতির নামে যারা হল নিয়ন্ত্রণ করত, তারা যে দলই করুক না কেন, একই কালচার জিইয়ে রাখত, কিছু স্টাইলের ভিন্নতা ছাড়া। সেই দীর্ঘদিনের টর্চার সেল কালচারের গর্ভ থেকে আসে আবরারের মরদেহ।

. জল্লাদখানাকক্ষ নং ২০১১: কী হয়েছিল সেদিন! কক্ষ নং ২০১১ ২০০৫ এখন বর্বর নির্যাতনের প্রতীক, পিটিয়ে লাশ বানানোর প্রতীক, দেশপ্রেমিক হত্যার প্রতীক। এক কথায় জল্লাদখানা। বুয়েটের ১৮ জন মিলে দফায় দফায় আবরারকে পেটাল। রাত ৮টা থেকে ঘণ্টা ধরে কীভাবে মারতে পারল বুয়েটের নরপশুরা! অনিক তো মারতে মারতে স্ট্যাম্প ভেঙে ফেলল, স্কিপিং রোপ দিয়ে বেধড়ক পেটাল। আবরার ফাহাদের মুখ চেপে ধরল, যাতে তার চিত্কারের কোনো শব্দ কেউ শুনতে না পায়। কয়েকবার বমি করল, তার পরও  পেটাল। পেটাতে পেটাতে লাশ বানিয়ে ফেলল। এভাবে পেটানো যে আবেগের বশে হয়নি, তার প্রমাণ মিডিয়ায় প্রকাশিত দলীয়  মেসেজিং গ্রুপের মেসেজ আর আসামিদের স্বীকারোক্তি। মেসেঞ্জার গ্রুপে রবিন লেখে, ১৭-এর আবরার ফাহাদ, মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। এর আগেও বলছিলাম, তোদের তো দেখি কোনও বিগারই নাই। শিবির চেক দিতে বলছিলাম, দুই দিন সময় দিলাম। এর মানে এটা নিশ্চিত, হত্যা ছিল পরিকল্পনামাফিক; উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গলা টিপে হত্যা করা। সে কারণে তাকে ডেকে এনে জেরা করা হয়, মারধর করতে করতে লাশ বানানো হয়। কারা জেরা করল? যারা মদখোর, মাতাল; কাকে মারল? যে দেশের জন্য লিখল।

. নোংরা আধিপত্য: ঘটনাকে শুধু হত্যা বললেই হবে না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের নোংরা আধিপত্যের খেলা। হলগুলোয় কী করে জঙ্গি শাসন কায়েম করা হলো, তা দেখা দরকার। স্বাভাবিকভাবেই অন্যের ওপর আধিপত্য করার মধ্যে মানুষ এক নিকৃষ্ট আনন্দ পায়। ফ্রয়েড এর নাম দিয়েছেন মরা প্রবৃত্তি; পাশাপাশি পাওলো ফ্রেইরে বলেছেন, আধুনিক কালের প্রধান থিম হলো আধিপত্য মূলত আদিকাল থেকে আধুনিক-উত্তরাধুনিক সর্বকালে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার বর্বর নীতি চালু ছিল। শোষণমুক্ত সমাজ যদি কল্পনা করি, সেখানেও আধিপত্য থেকে যায়। সেই আধিপত্যবাদের বিরোধিতা থেকে স্বাধীনতা ধারণার উদ্ভব। এর আরেক নাম মুক্তি। সমাজবিজ্ঞানী হেবারমাস সেই মুক্তির লক্ষ্যে পাবলিক স্ফেয়ার তত্ত্ব হাজির করেন। এর মানে পাবলিক স্পেসে মানুষের মধ্যে থাকবে অবারিত জ্ঞানচর্চা, উন্মুক্ত বিতর্ক সাবলীল যোগাযোগের ব্যবস্থা। হেবারমাসের মতে, কাজ বাধাগ্রস্ত হয় তখনই, যখন অন্যের ওপর দমন চালানো হয় আর মানুষের জীবন-জগতের ওপর উপনিবেশ স্থাপন করা হয়।

হলগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখলে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বুয়েট, মেডিকেল অন্যান্য পাবলিক ভার্সিটিতে পাবলিক স্ফেয়ার নেই। এর মানে গণতন্ত্র নেই, অবারিত জ্ঞানচর্চা মতপ্রকাশের সুযোগ নেই, বিতর্কের পরিবেশ নেই। বরং এখানে চলে আধিপত্যচর্চার মহড়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে বানানো হয়েছে অন্ধ আনুগত্যের যন্ত্র। সে কারণে এখানে শক্তির মহড়া হয়, র্যাগিং হয়, তামাশা হয়, মদের আসর হয়। তাহলে ক্যাসিনো থেকে এর কী পার্থক্য? আধিপত্যের ক্যাসিনো থেকেই আবরারের ঘটনার জন্ম। কারণেই দেখি, আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে গায়ে বাতাস দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘাতক খুনিরা, সঙ্গে প্রক্টর। কী নির্লজ্জ চিত্র!

. প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন: সবার অভিযোগের তীর প্রশাসনের দিকে। বছরের পর বছর ধরে হলগুলোয় পেশি শক্তির যে মহড়া চলত, ছাত্রছাত্রীদের মিছিলে যেতে বাধ্য করা হতো, একটু ব্যত্যয় হলে নিপীড়ন করা হতো, র্যাগিং করা হতো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হতো, তা কি চলত যদি শিক্ষকসমাজ প্রশাসন বিকাশের প্রকৃত পরিবেশ দিতে পারত? শিক্ষক রাজনীতিকে আমরা খারাপ বলছি না। কিন্তু শিক্ষক রাজনীতির মধ্যে যে সুস্থতা থাকার দরকার ছিল, তা কি আমরা পেয়েছি? শিক্ষক রাজনীতির উদ্দেশ্য হবে শিক্ষাকেন্দ্রকে আধিপত্যের চর্চা থেকে মুক্ত করা, জ্ঞানচর্চা মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকে জোরালো করা, এমনকি সমাজে চলমান অন্যায় অত্যাচার কাঠামোর সংস্কারে অবদান রাখা। যদি তা- করা হতো, তাহলে কী করে হলগুলোয় দুশ্চরিত্রদের অত্যাচার চলতে পারে যুগ যুগ ধরে? সরকার পরিবর্তন হলেও হল কাঠামোয় কেন পরিবর্তন আসে না? কেমন করে যুগ যুগ ধরে হলগুলো চলতে পারে অনেকটা স্বৈরাচারী কায়দায়? এর দায় কি প্রশাসনকে নিতে হবে না? এর দায় কি ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির নয়? ১৮ জন মিলে আবরারকে হত্যা করার পরও হত্যাকারীদের মধ্যে কোনো ভয়, শঙ্কা কাজ করেনি কেন? কেন তারা ভয়ে পালিয়ে যায়নি? কেন প্রক্টরকে দেখা গেছে মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে খুনিদের সঙ্গে আলাপরত থাকতে? কেনইবা ঘণ্টা ধরে পেটাচ্ছে অথচ কোনো ছাত্র জেনেও হল প্রশাসনের প্রভোস্ট বা প্রক্টরকে জানানোর সাহস বা প্রয়োজন মনে করছে না? এসবের উত্তর কে দেবে? এর মানে কতটা ঘুণে ধরলে ছাত্ররা অসহায় হয়ে থাকতে পারে?

এভাবে আর চলতে পারে না। একটি দেশের পাহারাদার হলো শিক্ষক বুদ্ধিজীবী। একটা জাতির গুণগত মান নির্ভর করে এই শ্রেণীর গুণগত মানের ওপর। শিক্ষক বুদ্ধিজীবী যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারেন, সে চিন্তায় তত্কালীন ব্রিটিশ আমলে অনুগত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সৃষ্টি করা হয়। পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসক  শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা করে, হত্যা করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বুদ্ধিজীবী বিনাশের ষড়যন্ত্র হয়। ইতিহাস মাথায় রেখে আমাদের বুঝতে হবে শিক্ষক রাজনীতিকে যদি আমরা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে না পারি, তাহলে একটা দেশ জাতি দিশা পাবে না। কাজটি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি বলেই শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস আর আধিপত্য কালচার রয়ে গেছে। নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে আমাদের শিক্ষক রাজনীতিকে, যে রাজনীতির মধ্যে থাকবে স্বতন্ত্রতা, জ্ঞান বিতর্কের উন্মুক্ত পরিবেশ, থাকবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। শিক্ষক রাজনীতি করবেন তারা, যারা জ্ঞানী, গবেষক, স্বাধীনচেতা উচ্চতর মানবিক গুণে আলোকিত। যদি তা করা সম্ভব হয় তাহলে প্রশাসন থাকবে চাপের মধ্যে, সেই চাপ থেকে বন্ধ হবে লেজুড়বৃত্তি। আর তখনই ছাত্র রাজনীতিকে উন্নত মানে নিয়ে আসা সম্ভব। ছাত্র রাজনীতি করবে তারা, যারা শুধু মেধাবীই হবে না, তাদের থাকতে হবে অধ্যয়নকালীন সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট, তাদের থাকবে উন্নত চরিত্র সততা।

আমরা চাই আবরারের খুনিদের কঠোর শাস্তি। শাস্তি চাই তাদের, যারা খুনিদের ক্ষমতায়ন করেছে। নিম্ন নোংরা রাজনীতির অবসান চাই। সবচেয়ে জ্ঞানী চরিত্রবানদের নিয়ে হোক প্রকৃত রাজনীতির চর্চা। উন্মুক্ত হোক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; কবর হোক আধিপত্যবাদী রাজনীতির।

 

আশেক মাহমুদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ইউনিভার্সিটি অব মালায়াতে পিএইচডি গবেষণাধীন

[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন