সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা- পর্ব ২

প্রত্নস্থল বাগেরহাট

ড. একেএম শাহনাওয়াজ

বাগেরহাট প্রত্ন অঞ্চলকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত হয়েছে অনেক আগেই। এতে বাগেরহাটের ঐতিহ্যিক গুরুত্ব জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। বিশ্বজুড়ে সব সভ্য দেশই তাদের অতীত ঐতিহ্য যত্ন মমতার সঙ্গে সংরক্ষণ করে। সংরক্ষণ করে নিজেদেরই এগিয়ে নেয়ার জন্যআলোকিত করার জন্য। ঐতিহ্যিক প্রণোদনা বর্তমানকে বুঝতে সাহায্য করে, ভবিষ্যৎ নির্মাণ প্রচেষ্টাকে দেয় সহযোগিতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাগেরহাটের প্রত্ননিদর্শনসমূহ বিশেষ তাত্পর্য বহন করছে। বাগেরহাটে সংরক্ষিত স্থাপনার মধ্যে মসজিদ সমাধিই প্রধান। এসব নিদর্শন থেকে মুসলিম-পূর্ব যুগ সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা নেয়া সম্ভব নয়। মধ্যযুগের প্রথম পর্ব অর্থাৎ স্বাধীন সুলতানি যুগের আঞ্চলিক ইতিহাস নির্মাণই শুধু নয়, বরং বাগেরহাট অঞ্চলের স্থাপত্যগুলো এর শৈলী বিচারে সুলতানি যুগপর্বেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। ফলে বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক গৌরবের আকর সূত্র হিসেবে বাগেরহাট অনেক বৈচিত্র্য স্থাপত্যিক ঐশ্বর্য নিয়ে উপস্থাপিত হতে পারে।

স্থাপত্যকলার বিবেচনায় খানজাহানের সময়ে গড়া ইমারতগুলোর বিশেষত্ব রয়েছে। এর মূল ধারণায় দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব থাকলেও সম্পূর্ণ নির্মাণশৈলীতে একটি স্বতন্ত্র রীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। যে কারণে অধ্যাপক দানী শৈলী বিবেচনায় বাগেরহাটের মধ্যযুগের ইমারতগুলোকেখানজাহানি রীতিবলে উল্লেখ করেছেন। বাংলার সুলতানি ইমারতের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যেমন এখানে পাওয়া যায়, পাশাপাশি একটি নিজস্ব ঘরানার বিকাশ ঘটতেও দেখা যায়। কারণে বাগেরহাটের স্থাপত্য মূল্যায়ন করতে গেলে সুলতানি বাংলার স্থাপত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পরিচয় উপস্থাপন করতে হয়। যুগের ইমারত সাধারণত ইটে তৈরি। দেয়াল গড়া হয় দেড় থেকে চার মিটার পর্যন্ত পুরু করে। স্তম্ভ বা দেয়ালের প্লিন্থে কখনো কখনো পাথর বসানো হয়ে থাকে। কখনো কখনো ভেতরের খিলান বসানো হয় পাথরের স্তম্ভের উপর।

বহির্দেয়ালের চার কোণে থাকে চারটি বুরুজ। এগুলোর বেশির ভাগই গোলাকার অষ্টভুজাকৃতির হয়ে থাকে। বুরুজগুলো ছাদের সমান্তরালে গিয়ে শেষ হয়। এক বুরুজ থেকে অন্য বুরুজ পর্যন্ত টানা ছাদ ধনুকের মতো বাঁকা। গম্বুজগুলো একেবারেই স্থানীয় অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। অনেকটা উল্টানো পাত্রের মতো এবং নিরাভরণ। গম্বুজের বেশির ভাগই ত্রিকোণী পেনডেন্টিভের ওপর এবং কখনো কখনো স্কুইঞ্চের ওপর বসানো। ষাটগম্বুজের মতো বড় বড় ইমারতের অভ্যন্তরভাগে দ্বিকেন্দ্রিক সূচ্যগ্র খিলান বহনের জন্য পাথরের স্তম্ভ সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে। এর ফলে ভেতরটা খোলামেলা রাখা সম্ভব হয়। ইমারতের ভেতরে বাইরে আলংকারিক বন্ধনী পোড়ামাটির অলংকরণ থাকে। মসজিদগুলোতে পূর্বদিকের প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিমে সমসংখ্যক মিহরাব থাকে। খিলানাকৃতির মিহরাবে আয়তাকার ফ্রেম করে তা কারুকার্যমণ্ডিত করা হয়। এসব রীতির অনেকটাই ধারণ করেছে বাগেরহাটের ইমারত। আবার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও যুক্ত হয়েছে।

যেমন খানজাহানি রীতির কর্নার টাওয়ার বা কোনের বুরুজ অষ্টভুজাকৃতি না হয়ে হয় গোলাকৃতি। অনুমান করা যায়, কুঁড়েঘরে বাঁশের খুঁটি ব্যবহারের ধারণার মিশ্রণ আছে গোলাকার বুরুজ ব্যবহারে। বাঁশের খুঁটিতে যেমন কিছু পর পর গাঁট থাকে, এসব বুরুজেও সমান বিরতিতে রয়েছে ব্যান্ড। চৌচালা আকৃতির গম্বুজও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদে দেখা যায়। বিস্তারিতভাবে না হলেও সীমিতভাবে পোড়ামাটির অলংকরণ দেখা যায় অঞ্চলের প্রত্ন ইমারতে। অলংকরণে শিকলঘণ্টা, জাফরি, গোলাপ, পদ্ম ইত্যাদি সাধারণ মোটিফের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্ভিদের উপস্থাপনও বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। কোথাও দেখা গেছে মেঝেতে রঙিন  মোজাইকের ব্যবহার।

বাগেরহাটের প্রত্ন স্থাপনাগুলোর মধ্যে মসজিদের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে টিকে থাকা মসজিদের অধিকাংশই সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুনর্নির্মাণ করেছে। এসব নির্মাণে স্থাপত্যগুলো সুলতানি স্থাপত্যের একটি আদল পেয়েছে ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় এবং ঐতিহাসিকতাকে গুরুত্ব না দেয়ায় একদিকে যেমন তা সঠিকভাবে ইতিহাসকে উপস্থাপন করতে পারছে না, অন্যদিকে সংস্কার সংরক্ষণকাজ সহজ করার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ অলংকরণশৈলীর বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। কোথাও কোথাও সংস্কার দুর্বলতার কারণে ইমারত হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

ষাটগম্বুজ মসজিদ: বাগেরহাটের খানজাহানি ইমারতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গৌরবের তাত্পর্যপূর্ণ ইমারত ষাটগম্বুজ মসজিদ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ইতিহাস অস্বীকার করে এবং সংরক্ষণ আইনকে গুরুত্বে না এনে এর সংস্কার করা হয়েছে। বেশি ইতিহাস বিকৃত হয়েছে মসজিদের অভ্যন্তরে। বালি-সিমেন্টের পুরু আস্তরণ দিয়ে চুনকামে উজ্জ্বল করা হয়েছে পুরো অভ্যন্তর দেয়াল পাথরের স্তম্ভগুলো। কারণে স্বাভাবিকভাবেই অপসৃত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মূল্যবান পোড়ামাটির অলংকরণ। নকশা কাটা পাথরের স্তম্ভগুলো সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে বালি-সিমেন্টের প্লাস্টারে। কর্তৃপক্ষ অদ্ভুত এক ঔদার্যে দর্শনার্থীদের জন্য ভেতরে একটি সাইনবোর্ড রেখেছে। জানানো হয়েছে আপাত ইটের স্তম্ভ মনে হলেও তারা যেন নিজ গুণে মেনে নেন এগুলো আসলে পাথরের। বহির্দেয়ালের সংস্কার নিয়ম মেনে করা হয়েছে বলে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হয়। তবে গভীর পর্যবেক্ষণে মননশীল দর্শনার্থী গবেষকের হতাশ হওয়ার কারণ আছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে সংস্কারের আগেও পূর্ব দিকের কেন্দ্রীয় প্রবেশ দরজার খিলানের উপরে ত্রিকোণাকৃতি চমৎকার পেডিমেন্ট ছিল। স্থাপত্য স্থাপত্যিক অলংকরণের ক্ষেত্রে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাংলার নিজস্ব ঘরানার পরিচায়ক চালা আকৃতির ছাদের ধারণার একটি তাত্পর্যপূর্ণ সমর্থন ছিল পেডিমেন্টে। একই সঙ্গে গ্রিক স্থাপত্যিক শৈলীর প্রভাবের কথাও ভাবা যায়। ষাটের দশকে অধ্যাপক দানীর করা মন্তব্য থেকে আমরা এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। তিনি লিখেছেন, ‘on the eastern side over the central arched doorway, which is larger than others, is peculiarly seen a triangular pediment, from which the cornice bands slope down towards the corner towers. The pediment is a unique decoration, and may have been derived from the gable ends of the Do-Chala hut roof of Bengal.’ (Ahmad Hasan Dani, Muslim Architecture in Bengal, Dacca, 1961, Asiatic Society of Pakistan, p. 144-146)

ইতিহাসকে অস্বীকার করে কী কারণে এই পেডিমেন্ট অপসারণ করতে হলো তা আমাদের বোধগম্য নয়। সংস্কারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কতটুকু গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে আমরা বাস্তব পর্যবেক্ষণে বিস্মিত হয়েছি এটি দেখে যে অল্প সময়ের ব্যবধানে পশ্চিম দেয়ালের বাইরের দিকটি শেওলায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং উত্তরের বহির্দেয়ালের অনেকটা নোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্খনন রিপোর্ট প্রকাশের আগে কী করে এবং কিসের ভিত্তিতে বর্তমার আকারের সীমানাপ্রাচীর নির্মিত হলো তাও আমাদের বোধগম্য নয়। উত্তর-পূর্ব দিকের সীমানাপ্রাচীরের সঙ্গে আধুনিক দেয়াল যুক্ত করে মূল স্থাপত্যিক ভারসাম্য ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, বিষয়টিও নজরে আসা প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে একটি প্রকল্পের আওতায় বিদেশী স্থপতিদের তত্ত্বাবধানে মসজিদের অভ্যন্তর আগের রূপে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সিঙ্গাইর মসজিদ: বাইরে থেকে দাঁড়ালে মসজিদটির গাঠনিক অবস্থা ভালো বলে মনে হয়। কিন্তু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে এবং মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মনে হবে বহুকাল ধরে মসজিদটি সংস্কারে হাত দেয়া হয়নি। ভেতরের দেয়াল, স্কুইঞ্চ ক্ষতিগ্রস্ত, উত্তর দেয়ালে সৃষ্টি হয়েছে ফাটল, মুসল্লিদের অভিযোগ ছাদ চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ত। শুনেছি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে।

বারো আজিনা: সোনাতলা মৌজায় অবস্থিত -উন্মোচিত এই প্রত্নস্থলটি বাস্তব পর্যবেক্ষণকালে আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। সুপারি কাঁঠালবাগানের ভেতরে জনবসতিহীন অনুচ্চ একটি ঢিবি না জানা ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঢিবিটি উত্তর-দক্ষিণে আনুমানিক ১৮০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১১০ ফুট। ঢিবির মাঝবরাবর পূর্ব-পশ্চিমে মানুষ পায়ে চলা পথ তৈরি করে নিয়েছে। দীর্ঘদিন পথ চলায় প্রায় ৬০ ফুট জায়গা সমতল হয়ে গেছে। কারণে পাশাপাশি দুটো ঢিবি বলে ভুল হয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সমতল অংশেও মাটির নিচে অসংখ্য ইট অন্তরীণ রয়েছে। ঢিবিজুড়ে পাথরের স্তম্ভের খণ্ডাংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। চারদিকে ইটের কাঠামোর আভাসও স্পষ্ট। এখনো প্রত্নস্থলটির রহস্য উন্মোচিত হয়নি বলে জনশ্রুতি এবং অবৈজ্ঞানিক অনুমান জায়গা করে নিচ্ছে। যেমন কখনো বলা হচ্ছেত্রিশ গম্বুজ বড় আজিনা মসজিদকখনো অনুমান করা হচ্ছে খানজাহানের জীবিতাবস্থায় নির্মিত একটি মুসাফিরখানা।

খানজাহান আলীর মাজার: ইমারতটি মোটামুটি ভালো অবস্থায় টিকে আছে। তবে ছাদের কার্নিশ সংস্কার করা প্রয়োজন। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে মাজারের বহির্দেয়ালে এবং ফটকে চোখ পীড়াদায়ক মেটে লাল রঙের ব্যবহার। যা সুলতানি যুগের মূল সুরকে ব্যাহত করছে।

মাজারসংলগ্ন মসজিদ: সংস্কার সংরক্ষণ করতে গিয়ে নানাভাবে মসজিদের ঐতিহাসিকতাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। মূল গম্বুজ ছিল অঞ্চলের সমকালীন প্রচলিত গম্বুজরীতির ব্যতিক্রম। গম্বুজের উপরিভাগ ছিল জায়গায় জায়গায় একসারি করে ইট বের করা, অনেকটা যেন কর্বেল পদ্ধতির মতো করে নির্মিত। সংস্কারের সময় গম্বুজটির অভিনবত্ব নিশ্চিহ্ন করে সাধারণ গম্বুজে পরিণত করা হয়েছে। মসজিদটির নিচের দিকের ইট নোনায় আক্রান্ত। প্লিন্থের পর কর্নার টাওয়ারের ব্যান্ডগুলোর অলংকৃত বরফি মোটিফ অধিকাংশই ভেঙে গেছে। মসজিদ সম্প্রসারণ করতে গিয়ে . পূর্ব-দক্ষিণ দিকের কর্নার টাওয়ারের ভেতর সম্প্রসারিত দেয়াল ছাদ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, . পূর্ব-উত্তর পূর্ব-দক্ষিণ দিকের কর্নার টাওয়ারের প্লিন্থে আধুনিক মোজাইক করা হয়েছে, . মূল মসজিদের ভেতরের দেয়াল মিহরাব রঙিন টাইলস দিয়ে আবৃত করা হয়েছে।

ঠাকুরদীঘি বা খাঞ্জেলি দীঘির ঘাট: খানজাহানের সমাধির পাশে দক্ষিণে অবস্থিত এক বিশাল দীঘি এই ঠাকুর দীঘি বা খাঞ্জেলি দীঘি। এই দীঘিটির একটি স্থাপত্যিক গুরুত্ব রয়েছে। দীঘির উত্তর পাড়ে রয়েছে বহুধাপবিশিষ্ট ইটে বাঁধানো প্রশস্ত ঘাট। সুলতানি যুগের ইট বাঁধানো পুকুরঘাটের অনন্য উদাহরণ হিসেবে এটি অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বর্তমানে ঘাটটির আর কোনো ঐতিহাসিক তাত্পর্য নেই। টাইলসে বাঁধানো উজ্জ্বল ঝকঝকে আধুনিক ঘাটে রূপান্তরিত হয়েছে। পাশে বাঁধানো প্রস্তরলিপি পাঠে জানা যায়, জনৈক জননেতা তার পিতার স্মৃতির উদ্দেশে এই ঘাটনব রূপায়ণকরেছেন।

নয়গম্বুজ মসজিদ: ঠাকুরদীঘির পশ্চিমে খানজাহান আলীর সমাধিসৌধের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এই মসজিদের অবস্থান। আপাতদৃষ্টিতে বাইরে থেকে মসজিদটি সুন্দরভাবে সংস্কারকৃত এবং ভালো অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু পর্যবেক্ষণে ভিন্ন চিত্র বেরিয়ে আসবে। দক্ষিণের দেয়াল কোথাও কোথাও নোনায় আক্রান্ত। মিহরাব বরাবর বহির্দেয়ালের উদ্গত অংশ (Projected) ভাঙা এবং পশ্চিম দেয়ালের কোনো কোনো অংশের ইট খুলে নেয়া হয়েছে। যত্রতত্র শেওলা আক্রান্ত। সংস্কারের সময় উত্তর দিকের বহির্দেয়ালের অধিকাংশ অলংকরণই ফেলে দেয়া হয়েছে বলে স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ। সংস্কারের পরও মসজিদের ভেতরের অংশ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, তাই ভেতরের দেয়াল অত্যন্ত নাজুক। কেন্দ্রীয় মিহরাবের ইটে ভগ্নদশা। চারদিকে জমে আছে শেওলা। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় হলেও ভেতরের অলংকরণ অনেকটাই দৃশ্যমান।

চুনাখোলা মসজিদ: কারাপাড়া ইউনিয়নে চুনাখোলা গ্রামের এক খোলা জায়গায় অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায় যেন মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। নিঃসঙ্গ বলেই এর প্রতি দায়িত্বশীলদের নজর কম। যেহেতু বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এই মসজিদটি এখনো ভালোভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাই সংস্কারে মনোযোগ দিলে একে রক্ষা করা সম্ভব। মসজিদটির পূর্ব দিকের দেয়াল বিশেষ করে কেন্দ্রীয় দরজার খিলানের আশপাশে নোনায় ইট অলংকরণের ভগ্নদশা। পশ্চিম দেয়ালের কর্নার টাওয়ারের কোনো কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। বহির্দেয়ালের চমৎকার অলংকরণগুলোর অধিকাংশই ধ্বংসপ্রায়। ভেতরের দেয়াল অলংকরণও প্রায় নিশ্চিহ্ন। দক্ষিণের খিলানের মাঝখানে বৃষ্টির পানি জমে শেওলা তৈরি করেছে। সংস্কারের সময় কেন্দ্রীয় মিহরাবে কিছুটা কাজ করা হয়েছে, তবে নির্মাণ দুর্বলতা চোখে পড়ে।

বিবি বেগনি মসজিদ: তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে কর্নার টাওয়ার এবং এর সংলগ্ন দেয়াল ভেজা বলে শেওলা জমে থাকে। সংস্কারের সময় সম্ভবত অলংকরণ নষ্ট করা হয়েছে। গম্বুজ বরাবর বৃষ্টির পানি চুইয়ে ভেতরে পড়ে, তাই স্থানীয় মুসল্লিরা চুন-সুরকির প্রলেপ দিয়ে পানি বন্ধের চেষ্টা করেছেন।

ফকিরবাড়ি মসজিদ বা রণবিজয়পুর মসজিদ: ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে আনুমানিক কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রণবিজয়পুর গ্রামে এই মসজিদের অবস্থান। মসজিদটির বহিরাঙ্গ উত্তমরূপে সংস্কার করা হয়েছে। তবে ভেতরে ঢুকলে থমকে যেতে হয়। ষাটগম্বুজ মসজিদের অনুরূপ প্লাস্টার চুনকাম করে সুলতানি ইমারতের বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

রণবিজয়পুর চিল্লাখানা: রণবিজয়পুর মৌজায় প্রত্ন নিদর্শনটি রয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো দেখে মনে হয় একসময় এখানে একগম্বুজ স্থাপনা ছিল। দুটি প্রাচীন সমাধি শনাক্ত করা হয়েছে। সম্ভবত স্থানীয় মানুষ সিমেন্ট-বালির ব্যবহারে এটিকে আধুনিক বাঁধানো কবরে রূপান্তরিত করেছে। অন্যটিও সংস্কারে হাত দেয়া হয়েছে।

খানজাহানের বসতবাটি: ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের বাজেয়াপ্তি-সুন্দরঘোনা এলাকায় পাশাপাশি তিনটি ঢিবি খানজাহানের বসতবাটি বলে কথিত। ১৯১৪-এর দিকে সতীশ চন্দ্র মিত্র ঢিবির আশপাশে অনেক সাংস্কৃতিক নিদর্শন দেখেছিলেন। এখনো পাথরখণ্ড, মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরা, সুলতানি যুগের ইট দৃশ্যমান। ২০০০ সালে ঢিবির কিছু অংশ খনন করা হলে .৬৬ গভীরতা পর্যন্ত তিনটি সাংস্কৃতিক স্তর বেরিয়ে এসেছে। অসম্পূর্ণ উত্খননের পর পুরোপুরি ঢেকে না দেয়ায় এখন খাদগুলো দৃশ্যমান। এরপর খনন অবাহত রয়েছে। বসতবাটির কিছুটা উন্মোচিত এখন।

জাহাজঘাটা অথবা পাথরঘাটা: মগরা খালের তীরে এই প্রত্নস্থলে একমাত্র প্রত্ননিদর্শন মহিষমর্দিনী মূর্তি খোদিত মাটিতে প্রথিত পাথর খুঁটি। এই পাথর খুঁটি সংরক্ষণের উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই। ফলে ধীরে ধীরে ক্ষয় পেয়ে যাচ্ছে পাথর উত্কীর্ণ মূর্তি।

জিন্দাপীরের ইমারতগুচ্ছ: খানজাহানের সমাধির আনুমানিক ৭০০ মিটার পশ্চিমে কথিত জিন্দাপীরের মাজার, মসজিদ, ধ্বংসপ্রায় ইমারতের কাঠামো এবং কয়েকটি পাকা কবর আছে। জিন্দাপীরের মাজারের বহির্দেয়াল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ভেতরে আধুনিক ছাদ দিয়ে মাজার সুরক্ষিত করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। কারণেই সম্ভবত বহির্দেয়াল সংস্কার চিন্তায় গুরুত্ব হারিয়েছে। জিন্দাপীরের চিল্লাখানা বা মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। কর্নার টাওয়ারে কপুলা বা অনুগম্বুজ যুক্ত করা হয়েছে। সংস্কারের অল্পকাল পরেই দেয়াল নোনায় ধরেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জিন্দাপীরের মাজারের পশ্চিম পাশে দুই সারি এবং উত্তর পাশে এক সারি পাকা কবর আছে। উত্তর পাশের সারিতে রয়েছে পাঁচটি কবর এবং পশ্চিম পাশের দুই সারিতে রয়েছে চারটি কবর। স্থানীয় জনগণ কবরগুলো বাঁধাতে গিয়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নষ্ট করে ফেলছে। মাজার এলাকার উত্তর-দক্ষিণে ইমারতের ভগ্নাবশেষ রয়েছে। যদিও অধিদপ্তরের সংস্কার কার্যক্রমে এগুলো গুরুত্ব পায়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আমরা ভগ্ন ইমারতের কাঠামোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনেছি। প্রসঙ্গে পরে আলোকপাত করা হবে।

রেজাখোদা মসজিদ: সুন্দরঘোনা মৌজায় অবস্থিত এই ছয়গম্বুজ মসজিদটি সম্পূর্ণ ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। এখন যেটুকু দৃশ্যমান তা হচ্ছে উত্তর দেয়াল, অষ্টকোণাকৃতি কর্নার টাওয়ার, কেন্দ্রীয় মিহরাবসহ তিনটি মিহরাব এবং পশ্চিম দেয়ালের কিছু অংশ। মিহরাবগুলোতে পোড়ামাটির অলংকরণ এখনো দৃশ্যমান।

যখন একটি প্রাচীন স্থাপনা মসজিদ বলে সিদ্ধান্ত হবে তখন তার সংস্কার পরিকল্পনা ধারণাকে ঘিরেই রচিত হওয়া স্বাভাবিক। যদিও এখনো গবেষণা শেষ হয়নি, তথাপি কিছু যুক্তি দাঁড় করালে তাতে প্রাথমিকভাবে মনে হয় কেবল মসজিদ হিসেবে এই বিশাল ইমারতটি নির্মিত হয়নি। সম্ভবত এটি ছিল খানজাহান আলীর দরবার হল এবং সমকালীন প্রথা অনুয়ায়ী বিশেষ সময়ে অনিয়মিতভাবে নামাজ পড়ার ঘর হিসেবেও ব্যবহূত হতো। এই ধারণা সৃষ্টির পেছনে কতগুলো যুক্তি রয়েছে:

. সুলতানি যুগে পাকা ইমারত নির্মাণের জন্য নির্মাণ উপকরণ সহজলভ্য ছিল না। তাই সুফি শাসকরা মুসলিম সমাজ বিকাশের পাশাপাশি প্রয়োজন বিবেচনায় মসজিদ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিতেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি ষাটগম্বুজের মতো কথিত মসজিদ থাকার পরও এর সামান্য দূরেই সিঙ্গাইর মসজিদ এবং ঘোড়াদীঘির অন্য পাড়ে বিবি বেগনি মসজিদ রয়েছে। সমকালীন সময়ের জনসংখ্যার বিষয়টি যদি বিবেচনায় রাখা যায় তবে অনুমান করা সহজ যে নির্মাণ উপকরণের এই কঠিন সময়ে সিঙ্গাইর বিবি বেগনি মসজিদেই সন্নিহিত এলাকার নামাজ পড়ার প্রয়োজন মিটতে পারত। অথবা ষাটগম্বুজ নিয়মিত মসজিদ হলে দু-চার কিলোমিটারের মধ্যে আর মসজিদের প্রয়োজন হতো না।

. ষাটগম্বুজ মসজিদে মসজিদের সাধারণ গঠনরীতি মানা হয়নি। সাধারণত মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে কোনো দরজা থাকে না। কিন্তু এই ইমারতে তা রয়েছে। দরজার পর থেকে একটি পথ চলে গেছে পশ্চিমে সীমানাপ্রাচীর পর্যন্ত। এখানে একটি প্রবেশ তোরণও আছে। বোঝা যায় প্রশাসকের (খানজাহান আলী?) ‘দরবার ঘরেপ্রবেশের বিশেষ ফটক দরজা। মসজিদের বাইরে বিশাল এলাকাজুড়ে বেষ্টনী দেয়াল আর কোনো মসজিদে দেখা যায়নি। দরবার হলের মতো একটি প্রশাসনিক স্থাপনার সৌন্দর্য নিরাপত্তার বিষয়টি দেয়াল নির্মাণের ধারণায় যুক্ত ছিল কিনা এই বিষয়টি আমরা বিবেচনায় রাখতে চাইছি। মনে রাখতে হবে ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই মসজিদ সামাজিক-রাজনৈতিক পরামর্শ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান হিসেবেও বিবেচিত হতো।

. সামরিক নিরাপত্তার জন্য বাড়তি ব্যবস্থা মসজিদ স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো নজির নেই। বাগেরহাটে খানজাহানি রীতির মসজিদগুলোর এক গুরুত্বপূর্ণ বেশিষ্ট্য কর্নার টাওয়ার। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে কর্নার টাওয়ারগুলো ছাদের সমান্তরালে এসে থেমে গেছে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ষাটগম্বুজ ইমারতের কর্নার টাওয়ার। এগুলো দুর্গের বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেকটা উপরে উঠে গেছে। বিশাল পরিধির কর্নার টাওয়ার দুটির ভেতর দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। চূড়ায় রয়েছে কয়েকটি করে গবাক্ষ। স্পষ্টই বোঝা যায় নিরাপত্তারক্ষীদের পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এখানে।

সুতরাং সংস্কার সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণের আগে স্থাপনাটির প্রকৃত চরিত্র নিরূপণ করা জরুরি। এতে করে নতুন বিবেচনায় অনেক বিশেষ বৈশিষ্ট্য রক্ষা পুনর্গঠন করা সম্ভব। বাগেরহাটের প্রত্ন ইমারত প্রত্নস্থলসমূহ সংস্কার-সংরক্ষণে যেসব ভ্রান্তি সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করা গেছে তাতে এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা সমীচীন হবে না, বরং বলা যায় কঠিন বাস্তবতা থেকেই সংকট বেড়ে উঠেছে। ১৯৮৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠার আগে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতক স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ার সুযোগ দেশে ছিল না। তাই সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যারা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তাদের নিজস্ব মেধা দায়িত্ববোধ থেকে প্রত্নতত্ত্ব চর্চা করতে হয়েছে। ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট আন্তরিক হলেও তাদের প্রশিক্ষিত করে তোলার কতটুকু দায়িত্বইবা গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠান? প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের দায়িত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সভ্য দেশগুলোতে এসব দায়িত্ব যেসব প্রকৌশলীর ওপর বর্তায় তারাপ্রত্ন প্রকৌশলবিদ্যায়বিশেষ পারদর্শী থাকেন। সাধারণ প্রকৌশলবিদ্যার পাশাপাশি ইতিহাস প্রত্নতত্ত্বে তাদের বিশেষ পাণ্ডিত্য থাকতে হয়। আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত প্রকৌশলীরা যথেষ্ট মেধাবী সন্দেহ নেই। কিন্তু পাশাপাশি ইতিহাস ঐতিহ্য চর্চায় পারদর্শী করে তুলতে তাদের জন্য মৌলিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গৃহীত হয়ে থাকে কি?

রাষ্ট্রযন্ত্রের বুঝতে হবে প্রত্নসম্পদ উদ্ধার রক্ষার জন্য যে সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাকে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক করে দেখলে হবে না। এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন থাকে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রাষ্ট্র কখনো বিবেচনায় আনেনি। তাই আন্তর্জাতিক সাহায্যের বাইরে নিজ উদ্যোগে বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়া প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মধ্যযুগ বিশেষ করে সুলতানি পর্ব নানা দিক থেকে সোনাফলা। হিন্দু বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশে ১৩ শতকের শুরুতে রাজশক্তি হিসেবে বহিরাগত মুসলমানরা প্রবেশ করে। এর আগে সীমিত অঞ্চলে সুফি সাধকরা মুসলিম সমাজ বিকাশের পটভূমি রচনা করেছিলেন। সুলতানি শাসনপর্বে সাড়ম্বরে মুসলিম সমাজ বিকাশ চলতে থাকে। পর্বেই শহর খলিফাতাবাদের পত্তন হয়। যার কেন্দ্র আজকের বাগেরহাট। ফলে দীর্ঘকাল ধরে লালিত ঐতিহ্যের ধারক বাগেরহাটের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে শুরু করে স্থানীয় সব শ্রেণীর মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। এতকাল যেসব সীমাবদ্ধতা ভ্রান্তির কারণে যথাযথ সংস্কার বা সংরক্ষণ হয়নি তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণই এখন অপরিহার্য।

 

. একেএম শাহনাওয়াজ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন