শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা- পর্ব ২

মৃত্তিকায় মুসলিম যুগচিহ্নাবলি

প্রদ্যোত ঘোষ

পৃথক পৃথক ভবন বা স্থাপত্যের কথা উল্লেখে মুসলিম স্থাপত্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা বা পরস্ফুিট করা যায় না। রীতি সঠিক বৈজ্ঞানিক রীতিও নয়, কারণ একেক যুগে একেক বিশেষ ধরন-ধারণ বা স্টাইল তৈরি হয়, এটি স্বাভাবিক বা ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ তার রীতিতে ব্যক্তি বা একটি বিশেষ রাজত্বের শাসকদের বিশিষ্ট রুচি ভাব-ভাবনার স্বাক্ষর মেলে; সুতরাং সেই যুগে নির্মিত সব স্থাপত্যই একটি সাধারণ ঢঙের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। পৃথক পৃথক আলোচনা তাই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এই ভ্রান্তিতে পড়েছেন প্রায় প্রতিটি গবেষক-আলোচক। ক্রিটন, র্যাভেনশ, আবিদ আলি খান চৌধুরী, এমনকি জ্যামিতিক নকশা উপস্থিত করায় নতুনত্বের দিশারি হয়েও মনমোহন চক্রবর্তী সরসীকুমার সরস্বতী সঠিক পথে যাননি বলে বর্তমান লেখকের ধারণা। প্রতিটি শিল্পকর্মের নিজস্ব অগ্রগতি বা বিকাশের ধারা আছে। সেই বিকাশের পথে কতই না আদান-প্রদান! তার চিত্র অনুপস্থিত থাকলে সেই স্থাপত্যরীতির সঠিক মূল্যায়নও সম্ভব নয়। ভৌগোলিক, উপাদান, স্থানীয় ঐতিহ্য, বিদেশী প্রভাবসবই এসব রীতিকে বারবার প্রভাবান্বিত করে থাকে। এসব উপাদানকে পৃথক চৌহদ্দিতে আবদ্ধ করা যায় না, করা সম্ভবও নয়, কিন্তু তাদের রীতি বারবার ভিন্ন ভিন্ন যুগে বাঁক বদল করেছে। সেই বাঁকের চিত্রটি তুলে ধরলে যুগে যুগে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রুচি ঐকান্তিকতার ইতিবৃত্ত যেমন পাওয়া যায়, তেমনি বাংলার মৃত্তিকায় মুসলিম স্থাপত্যের যুগচিহ্নাবলি সুস্পষ্ট না হলেও মোটা দাগে ভাগ করা যায়।মোটা দাগেকথাটির অর্থযে ক্রান্তিকালে পূর্বকালের চিহ্ন উত্তরকাল কিছুটা বহন করেসেজন্য সেখানে স্পষ্ট পৃথকীকরণ সম্ভব নয়।

স্থাপত্য ভাস্কর্যের উপাদান বা মাধ্যম একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলায় পরিপূর্ণ পাথরের ভবন, মন্দির বা মসজিদ তৈরি হওয়ার পক্ষে বাধা তার উপাদান সংগ্রহে অসুবিধা। অধুনা পশ্চিম বাংলার মালদহেরই সন্নিকটে রাজমহল পাহাড়ই কালো পাথরের  সংগ্রহস্থল। বেলেপাথর গ্রানাইট পাথরের যে নমুনা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়, তা বিহার থেকে আমদানি বলেই মনে হয় (মালদহে একাধিক প্রাপ্ত ভাস্কর্য বেলেপাথরে নির্মিত), সুতরাং বাংলার একমাত্র স্থাপত্য বহু ভাস্কর্যের (যার পরিচয় মালদহ ভিন্ন অন্য কয়েকটি জেলায়ও ব্যাপক লক্ষিত হয়। বিশেষ করে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির কাজ চব্বিশ পরগণার হালিশহরের নন্দকিশোর মন্দিরে রামায়ণের রাম-রাবণের যুদ্ধ, পাইক পাড়ার সেনপুকুরে দেবী দশভুজার মূর্তি, বাওয়ালীর মন্দির গাত্রের কারুকার্য, টিটাগড়ের অন্নপূর্ণার মন্দিরের অলংকৃত প্রবেশপথ বিশেষ উল্লেখ্য) মাধ্যম মাটি, পোড়ামাটি বা চুন-সুরকির কাজ। মুখ্যত ইটের কাজই অর্থাৎ ইট-রীতিই  তার বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে।

প্রস্তর ফলকের পরিচয় পাওয়া গেলেও পরিপূর্ণ পাথরের কাজ বাংলায় গড়ে ওঠেনি। বাংলার স্থাপত্যের মসলা (Mortar) চুন-সুরকির কাজের পরে পাথরের স্লাব ব্যবহূত হয়েছে। অবশ্য গৌড়ে সুরকির বদলে একটু বড় ইটের টুকরাও লক্ষ করা যায় কোথাওবা (বারদুয়ারী) মুসলিম স্থাপত্যেও রূপরীতিই দেখা যায়। খিলানের স্থানে যেমন ইটের কাজও দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় চুন-সুরকির কাজের পরে পাথরের আস্তরণ। সুতরাং প্রাক-মুসলিম যুগের রূপরীতির উপরে বিশেষ করে চুন-সুরকি ইটের কাজ প্রায় একই থাকল মুসলিম যুগে। মুসলিমদের যে অবদান খিলান, গম্বুজ, মিনারসেগুলো স্বতন্ত্র। গম্বুজের ভেতরের অংশে ইটের তার মাথার উপরে চুন-সুরকির পেটাই করা কাজ। চুনের কাজে জল মানায় মজবুত হয়। চুনের বা পঙ্খের কাজ তো প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে! মসলা ব্যবহূত হওয়ায় ইটের অতিরিক্ত ভার বহনের ক্ষমতারও আর দরকার হলো না, সে কারণে ইটের আয়তনও ক্ষুদ্রতর-ক্ষুদ্রতম হলো। ইটগুলোও ভালো করে পোড়ানোর ফলে তাতে লোনাও লাগে না।

পঞ্চদশ শতকে আমরা চকচকে টালির সাক্ষাৎ পাই। এগুলো এক অথবা বহু বর্ণের (Polichrome) কিছুতে আবার ফুলের নকশা। এগুলো অন্য স্থান থেকে আমদানি হয়নিস্থানীয় সৃষ্টি।

বঙ্গদেশের স্থাপত্য মূলত ইটের কথা ঠিক নয়। সমগ্র বঙ্গদেশের গৃহ বা ভবনগুলোর দিকে লক্ষ করলে এটা স্বতঃই প্রতীয়মান যে ইটের ভবন বা স্মৃতিসৌধগুলো মূলত শহর বা শহরতলিতেই বর্তমান। দেশ জুড়ে গৃহগুলোর যে চেহারা, সেখানে আছে বাঁশের বিচালি বা খড় এবং কুটো দিয়ে ছাওয়া ঘর। কোথাওবা (যেখানে যে উপাদান বিশেষ করে দেখা যায়) হোগলা বা গোলপাতা দিয়েও ছাওয়া হয়। আসলে তার নির্মাণকৌশলে যে কাঠামোটি আছে, তাহলো বাঁশের রীতি। ইংরেজিতে বলে Bamboo style.

মুসলিমরা দেশে এসে দেশীয় রূপরীতির দ্বারা প্রভাবান্বিত হবে এটাই স্বাভাবিক। মুসলিম স্থাপত্য সম্পর্কে আলোচনায় তিনটি বিষয় লক্ষ রাখা প্রয়োজন বলে কেউ কেউ মনে করেছেন।

() স্থাপত্যরীতি (Forms)

() নকশা (Design)

() নির্মাণকার্যে ব্যবহূত উপাদান (Constructional Element)

তবে পূর্বোক্ত তিনটি বিভাগ করার বিশেষ কোনো যুক্তি নেই, কারণ স্থাপত্যের আলোচনায় স্বাভাবিক নিয়মেই এই তিনটি ভাগ এসে পড়েই।

বাংলায় মুসলিম স্থাপত্য সম্পর্কে আলোচনার প্রাক-লগ্নে পূর্বকথিতবাঁশের রীতিআলোচনা করা প্রয়োজন।

বঙ্গভূমিতে বাঁশ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। যদিও ইদানীংকালে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক হারে শরণার্থী আসার ফলে নতুন বসতি জমি আবাদ করার জন্য দিন দিন নির্মূল হওয়ার পথে, তবুও বর্ষীয়ান লোকদের কাছে তথ্য মেলে যে প্রায় সব জেলাতেই ব্যাপক বাঁশের সাক্ষাৎ মেলে। বাঁশ নমনীয় সহজলভ্য, সুতরাং বাঁশ বঙ্গভূমির প্রায় সব কাজকর্মে লাগে। জ্বালানি থেকে শুরু করে গৃহনির্মাণ পর্যন্ত। পাকা বাঁশের আয়ু অনেক দিন। দুই ধরনের গৃহনির্মাণ সাধারণত হয়ে থাকে () দোচালা, () চৌচালা বা চারচালা। গৃহের মাথা গুণ পরানো ধনুকের মতোমধ্যভাগ উচ্চদুই পাশ নিচের দিকে। দোচালায় দুটি চাল বর্তমান। এই বক্রাকৃতি বাঙালির রুচি দৃষ্টিতে সুন্দর ঠেকে বলেই তার নিজস্ব সৃষ্টি বলে ফার্গুসন সাহেব মনে করলেও সেটি সত্য নয়। বাঁশের কাঠামোয় যাতে জল না দাঁড়ায় এবং অত্যন্ত সহজ রীতিতে তৈরি বলেই এটি বঙ্গভূমিতে চালু হয়েছিল। মুসলিম স্থাপত্যেও ইটের কাজে কাঠামো বা রীতি দেখা যায় না বলে দানী সাহেব যা বিবৃত করেছেন, তা সঠিক নয়কারণ গৌড়ে রীতিতে নির্মিত ফতে খাঁয়ের সমাধিভবন লক্ষিত হয়। এটি যেসব লেখকের মতে হিন্দুমন্দির, তা আমরা প্রসঙ্গান্তরে অগ্রাহ্য করব।

চৌচালা পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে দ্বিতীয়ার্ধে বঙ্গদেশে মুসলিম স্থাপত্যে বর্তমান।

দোচালা চৌচালার স্থাপত্যরীতি সম্পর্কে দুটি কথা জানা দরকার। চতুষ্কোণী (তা আয়তাকার বা বর্গাকার, যা- হোক না কেন) ঘরের মূল চারটি কোণের ওপর মধ্যবর্তী অংশে দুই ভাগে তার বল পতিত হওয়ার জন্য মধ্যে ছোট বাঁশ দিয়ে ভাগ করা হয়ে থাকে। উভয় চালের মিলন অংশটি ধনুকাকৃতি। এই বক্র মিলনরেখার প্রতি দৃষ্টি রেখে অর্থাৎ সাযুজ্য বিধান করে উভয় চালার নিম্নতম অংশও বাঁকিয়ে দেয়া হয়। এখানে উল্লেখ্য যে সুদূর কাশ্মীরেও বাংলাদেশের দোচালার নির্মাণ পদ্ধতি লক্ষ করা যায়। এরূপ দোচালাকে একবাংলা বলা হয়ে থাকে। আবার দুটি একবাংলা যদি পাশাপাশি থেকে মিলে যায়, অর্থাৎ দীর্ঘ বা বৃহৎ করতে হয়, তবে তা হয় জোড়বাংলা। মধ্যবর্তী দুচালার সংগমস্থল জলনিকাশের পক্ষে সহায়ক হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবে এটি চারচালার পূর্ববর্তী বলে মনে হয়। কারণ গৃহকে বর্ধিত করার জন্য চৌচালার বুদ্ধি আরো পরের যুগের। বাঁকুড়ায় জোড়বাংলা মন্দিরের সন্ধান মেলে।

চারচালা ঘরে চারটি চালের চেহারা চৌচালার মতো নয়, খানিকটা ত্রিভুজাকৃতির মতো অন্য দুচালা উপরে উঠে গেছে, কিন্তু মন্দিরের ক্ষেত্রে চারটি দিকই ত্রিভুজের মতো ঘরের দিকে সামান্য ঝুঁকে উপরে উঠে গেছে এবং ঠিক কেন্দ্রস্থলে এক শীর্ষবিন্দুতে পরস্পর মিলিত হয়েছে। ভেতরের স্থান বর্গাকার কিংবা আয়তাকার, তবে কোনো কোনো মন্দিরে ঘরের দিকে চারটি চাল না ঝুঁকে সোজা শীর্ষে পৌঁছেছে। মালদহের হবিবপুর থানা এলাকায় আইহো গ্রামে প্রায় তিনশ বছরের দুটি শিবমন্দিরে এই সরল ভঙ্গিতে (Flat) শীর্ষে চালা টি উঠে গেছে।

দোচালা, চারচালার পর আটচালাও বর্তমান, কিন্তু তা মন্দিরেই বর্তমান। মুসলিম স্থাপত্যে এর কোনো নিদর্শন নেই।

বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের বিশেষত্বগুলোর মধ্যে পূর্বকথিত সূচিমুখী খিলান (Pointed Arch), মেহরাব এবং গোল খিলান (Engrailing Arch), Two Centred Pointed Arch এবং স্থূলাগ্র খিলান (Obtuse Arch)

দুই পার্শ্ববর্তী স্তম্ভ থেকে শীর্ষদিকে ধাবমান। এটি বাঁশের বাখারির দ্বারা প্রস্তুত গৃহস্থের আঙ্গিনার প্রবেশপথকে মনে করিয়ে দেয়। আর একটি বিশেষত্বপিপা সদৃশ খিলান করা ছাদ (Barrel Vault Roof) এটি নৌকার বা গরুর গাড়ির ছইয়ের মতো। এই দুটিও বাংলার পরিবেশ থেকে নেয়া। মালদহের বর্তমান মহদীপুরের পার্শ্বে গুণমন্ত মসজিদ, গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা এবং পুরাতন মালদহের জামি মসজিদে এর সাক্ষাৎ মেলে। কোনো কোনো মেহরাবের রূপরেখার মধ্যে মুসলিম স্থাপত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায়, যেমন মালদহের আদিনার মসজিদে। ধরনের মেহরাব অবশ্য বাংলাদেশের বহু মসজিদেই বর্তমান। বাংলার চৌহদ্দির বাইরে মোগল সম্রাট শাহজাহানই রীতি ব্যবহার করেছেন। তবে মুসলিম স্থাপত্যের সর্বাপেক্ষা অবদান এগুলো, তা মনে করা সঙ্গত নয়। স্থানীয় ভৌগোলিক চরিত্র, তার ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে যে যেভাবে স্বাঙ্গীকরণ (assimilation) করে নিয়েছে, তার নামই পরবর্তী পর্যায়ে বাংলারীতি ধারণ করেছে। তার মর্মমূল কিন্তু প্রাক-মুসলিম যুগে প্রোথিত। কিন্তু আরো কয়েক শতাব্দীর পর রাজকীয় মোগল রীতিতে তা পঙ্গু হয়ে তারও কয়েক শতাব্দী পর ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনুপ্রবেশে সে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে।

প্রাক-মুসলিম যুগের ইটের কাজ ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে প্রচলিত। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর ময়নামতীতে খননের ফলে কোণ (ধহমষবং), বহুপার্শ্ববিশিষ্ট ইট (facets), কুলুঙ্গি (recess), উদগত অংশ (projection), গৃহকোণ (corner) ইত্যাদিরও সাক্ষাৎ মেলে। প্রতিস্থানেই ভিত্তি মজবুত এবং বিপুলাকার বুরুজ (tower) বর্তমান। এটি স্থানীয় মৃত্তিকা জল-হাওয়ার নিরিখেই নির্মিত। হিন্দুদের এক প্রস্তরের স্তম্ভ (সড়হড়ষরঃযরপ ঢ়রষষধৎ) ভূভাগের বৈশিষ্ট্য, যা প্রাচীন যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল। আদিনার মসজিদের প্রস্তরস্তম্ভে লম্বা খাত কাটা কিন্তু অন্যত্র বহুপার্শ্ববিশিষ্ট স্তম্ভই বিদ্যমান। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে স্তম্ভের চরিত্র কিন্তু অনেক বদলে যায়। হিন্দু মন্দির থেকে প্রাপ্ত শিকল ঘণ্টারমোটিফবক্রাকৃতি অবস্থায় কোথাওবা দেখা যায়, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে সরল-সহজ হয়ে অলংকরণহীন হয়ে পড়ে। স্তম্ভ সম্পর্কে ধ্যান-ধারণা কোণে অবস্থিত অষ্টভুজাকৃতি পার্শ্বস্থিত (flanking) বুরুজের মাধ্যমে রূপায়িত হয়। দাখিল দরওয়াজাতে অবশ্য দ্বাদশ-পার্শ্ব অবস্থিত। এই দ্বাদশ-পার্শ্ববিশিষ্ট স্তম্ভের প্রভাব গৌড়ের একমেবাদ্বিতীয়ম্ স্তম্ভফিরোজ মিনারেওলক্ষ করা যায়। মেহরাবেও এর প্রভাব লক্ষণীয়। আরো একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়খিলানের অবলম্বনে দুই সুবৃহৎ বিশালাকার পিলপা (Pier) গৌড়ে চতুষ্কোণী ক্ষুদ্রতর পিলপা দেখা গেলেও ত্রিবেণীর জাফর খাঁন গাজীর মসজিদের পিলপা আদিনার বাদশাহি তখতের পাটাতনের যে স্তম্ভ, তা মুসলিম স্থাপত্যের অন্য একটি বৈশিষ্ট্যকে প্রমাণ করে। কিন্তু সর্বাপেক্ষা যে বৈশিষ্ট্য দর্শকদের মোহিত করে, তা সূক্ষ্ম ইট পাথরের কাজ। মসৃণ করে কাটা ইট এবং মসৃণ পাথরের চিহ্ন এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের ঢঙ, তা মুসলিম স্থাপত্যেও লক্ষ করা গেল। কারণ প্রাক-মুসলিম যুগে পোড়ামাটির অলংকরণের অসংখ্য নিদর্শন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মেলে। তাতে পলেস্তারার কাজ অনুপস্থিত। সুতরাং শিল্পসুষমায় এই রূপ প্রেক্ষাপটের সবুজ বৃক্ষ-তৃণাদির পরিবেশে এক অপরূপ চিত্র উপস্থিত করে। সব মিলিয়ে এক মনোরম চিত্র এইগুলোর মধ্যে মেলে। দাখিল দরওয়াজার গাত্রে যে ইটের অলংকরণ আছে, তাতে শিল্পসুষমার ছাপ আছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু পাণ্ডুয়ার একলাখি ভবনের গাত্রে যে পোড়া ইটের অলংকরণ, তা খুটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সর্বত্র মেলানো বা ব্যালান্স করা হয়নি। কিছুদূর এগোলেই দেখা যাবে অন্য ধরনের অলংকরণ। সামঞ্জস্য কোথাও রক্ষিত হয়নি। একটি মোটিফের দক্ষিণ ভাগে এক রকম, বাম ভাগে অন্য ধরনের। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই মনে করা যেতে পারে যে সুচিন্তিত বা শিল্পী মানসের অনিবার্য ফসল হয়ে উঠতে পারেনি সৌধ। অন্যত্র থেকে অলংকৃত পোড়ামাটির ইটগুলো আনা হয়েছিল। তা মনে করা সংগত। কারণ সুচিন্তিত অলংকরণের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে খর্বিত।

মোগলদের সৃষ্টিতে অবশ্য পোড়ামাটির কাজ প্রায় নেই বললেই হয়। আহমদ হাসান দানী বাংলাদেশের পোড়ামাটির কাজের উপরে লতাপাতার চিত্রের জন্য বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশের অবদানকে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা সত্য নয়। পারসিক বা মোগল চিত্রেও আমরা বিচিত্র লতাপাতার চিত্র দেখতে পাই। আসলে ফুল, ফল বা লতার চিত্র সব দেশের সব শিল্পীর সাধারণ ধারণা। বিচিত্র মাপের, বিচিত্র আকারের প্রকারের ইট, যা স্থাপনা সৃষ্টি সুসংগত শৃঙ্খলার পরিচায়ক এবং দক্ষতার চিহ্নবাহী। যা আদিনা মসজিদের মেহরাব, প্রবেশপথের ধার, দেওয়ালের কার্নিশ, বুরুজের ভেতর, দুই পিলপার মধ্যবর্তী অংশ এবং খিলানের মস্তকোপরি বিস্তৃত অংশ (tympanum), অষ্টকোণাকৃতি (octagonal) বুরুজের বহুপার্শ্ববিশিষ্ট ইটে ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়। লতাপাতার অলংকরণ ছাড়া ব্যাপকভাবে যে মোটিফ ব্যবহূত হয়েছে, তাহলো শিকল-ঘণ্টার। কিন্তু দানী সাহেব কি করে যে তাকে উদ্ভট বলেছেন, তা বোঝা গেল না। মোটিফগুলো অবজেক্টিভ নয়, সাবজেক্টিভ। সুতরাং আলপনা বা মোটিফগুলো সবসময় কোনো যুগে বা কোনো স্থানেই যথাযথহয়ে ওঠে না। সেগুলোকে সহজ, সরল, অকৃত্রিম বা উদ্ভট শব্দাবলির দ্বারা ব্যাখ্যা করা সঙ্গত নয়। আলপনা, অলংকরণ বা মোটিফ সবসময়ে যে যথাযথ হয়, তা নয়, তারা শিল্পীর শিল্প চেতনার জারকরসে সিঞ্চিত হয়ে তার সামগ্রিক রূপকে ধরিয়ে দিয়ে অপরূপ হয়ে ওঠে।

প্রাক-মুসলিম যুগে হিন্দু বৌদ্ধ স্থপতিরা প্রায়ইড আয়তক্ষেত্রাকৃতি বা কখনো বর্গাকৃতি প্রস্তর খণ্ড খোদাই করে অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করেছেন। গৌড় এলাকায় তথা মালদহ জেলায় প্রাপ্ত অসংখ্য মূর্তি আজও পাওয়া যায় মুখ্যত গাজোল, বামনগোলা, হবিবপুর এবং ইংরেজবাজারের কাঁঠাল এলাকায়। তার মধ্যে শতকরা আশিভাগ বিষ্ণুমূর্তি। অন্যদের মধ্যে আছেন মহিষমর্দিনী দুর্গা (আঠের, দশ, অষ্টভূজা), হর-পার্বতী, সূর্য, প্রজ্ঞাপারমিতা, মহানদ, কার্তিক, চণ্ডী, চামুণ্ডা, অবলোকিতেশ্বর, গণেশ, সরস্বতী মনসা। এসব মূর্তিগুলির মধ্যে আবার শতকরা নব্বই ভাগ কালো পাথরের এবং শতকরা দশভাগ বেলেপাথরের। মূর্তিগুলির অপরূপ শিল্পনৈপুণ্য নিঃসন্দেহে দর্শকদের মুগ্ধ করে। পাল সেন যুগের ভাস্কর্যের অপরূপ নিদর্শন ওইসব মূর্তি। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের প্যানেলও ওই সময়ে দেখা যায়, যার নিদর্শন বিভিন্ন মসজিদে (আদিনা চিকা মসজিদ) এবং পাণ্ডুয়ার একলাখি স্মৃতিভবনে মেলে।

প্রস্তরে ভাস্কর্য অলংকরণ ব্যাপকভাবে রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হলেও জনগণেরও চাহিদা ছিল বলে ওইসব শিল্পীর শিল্পচেষ্টা তখন অব্যাহত ছিল। মুসলিম যুগে দেবদেবীর মূর্তি বন্ধ হলেও প্রস্তরে অলংকরণ এমনকি মসজিদের মেহরাবের অলংকরণে তাদের হাত ছিল না কথা ভাবা অন্ততলজিকনয়। কারণ এসব অনবদ্য স্থাপত্য, ভাস্কর্য অন্যান্য অলংকরণে যে দক্ষতা শিল্পচিন্তা প্রয়োজন, তা যুগবাহিত এবং এসব শিল্পীরই একমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। সেদিক দিয়ে মুসলিম শাসকরা যে স্থপতিদের এনেছিলেন, তাদের তা ছিল না, থাকাও স্বাভাবিক নয়। কারণ কষ্টিপাথরের ওপর এই ধরনের কাজের ঐতিহ্য তাদের ছিল না। প্যানেল স্তম্ভের ওপর কারুকৃত মুসলিম যুগে দেখা যায় বটে, যদিও তার আগে হিন্দু যুগেও এগুলো যে ছিল, তার অভ্রান্ত স্বাক্ষর বহন করছে আদিনা মসজিদের বাদশা-কি-তখেতর পশ্চােদশের নিম্নভাগের দ্বারদেশের প্যানেল। মেহরাবের ওপর অলংকরণ যুগের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, কিন্তু সে অলংকরণ আগতশিল্পীদের দ্বারা হয়েছে, নাকি স্থানীয় হিন্দু প্রস্তর শিল্পীদের দ্বারা হয়েছে, তা সঠিক বলা যায় না। তবে স্থানীয় হিন্দু শিল্পীদের শিল্পমানস কর্মের ধারা যে সেখানেও আছে, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত এবং তা থেকে ধারণায় স্থিত হওয়া যায় যে এগুলোর মুসলিম শাসকদের নির্দেশে তাদের দ্বারাই অলংকৃত।

নির্মাণকৌশল বা স্থাপত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই মুসলিম যুগে প্রকট হচ্ছে খিলান (Arch. Vault) I Dome.

হিন্দু স্থাপত্যে এই ধরনের অত্পয ইত্যাদি নেই। স্থাপত্য নির্মাণকৌশলে খিলান অবশ্য আদিতম প্রবেশপথের মাধ্যম। পরিপূর্ণ পাথরের খিলানের নিদর্শন না থাকলেও ইটের খিলান সব স্থানে দেখা যায় প্রায়। মসলা (ইটের টুকরা, সুরকি চুন) দিয়ে খিলান তৈরি করেও তার উপরে সামন্তরিক বা বর্গক্ষেত্রাকার পাথরের অংশ বা প্রস্তরফলক দিয়ে সেগুলো ঢাকা নয়, সেগুলোও ইটের। কিন্তু উপরে চুন-সুরকি দিয়ে পেটাই করা। ধরনের চিত্র পাণ্ডুয়ার কুতুবশাহী মসজিদ, গৌড়ের বড় সোনা মসজিদে লক্ষ করা যায়। তবে বাংলাদেশের মাটিতে মধ্যবর্তী সময়ের (transition) কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। প্রাক-মোগল যুগের ভবনগুলোর খিলান ঞড়ি Centred ‰es Pointed প্রশস্ত বৃহৎ পিলপা থেকে উত্থিত। আদিনা মসজিদের সম্মুখভাগে দেয়াল থেকে উত্থিত খিলানের সারি, গম্বুজগুলো অর্ধবৃত্তাকার এবং উচ্চতায় হ্রস্ব।

কোণগুলো পেডেন্টিভ অতি সুন্দর সূক্ষ্মভাবে কারুকার্য করা। ক্ষুদ্রাকৃতি ইটগুলোর কোণগুলো কখনো ত্রিকোণাকৃতি বা ত্রিভুজাকৃতি, কখনো বা সামন্তরিকভাবে অবস্থিত, কখনোবা প্রথম অংশ জমির সঙ্গে মিলিত এবং পরের অংশ কিছুটা রিলিফের রূপ পরিগ্রহ করেছে। সম্পূর্ণ অংশ মিলেমিশে একটা সুন্দর অলংকরণ সৃষ্টি করেছে। গৌড়ের  লোটন মসজিদের এবং চামকাটির প্রবেশপথ (এখন প্রায় সম্পূর্ণ ভগ্ন হওয়ার পথে) ধরনের অলংকরণের চিহ্ন বহন করে। প্রাক-মোগল যুগের ভবনের কক্ষগুলো বর্গাকৃতিতে ভাগ হয়ে প্রতিটি চতুষ্কোণী ক্ষেত্রের চতুষ্পার্শে চারটি পাথরের স্তম্ভ বিদ্যমান। বাংলাদেশের অবিভক্ত গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদে সামন্তরিক কক্ষ বর্তমান এবং তার ছাদ বাংলার চৌচালারূপ নিয়েছে। প্রাক-মোগল ভবনগুলো আবার পলেস্তারাহীন, তাছাড়া আছে Shouldered Dome, Four-centered Pointed Arch, Horizontal Parapets with Blind Merlons.  মধ্যবর্তী গম্বুজটি বৃহত্তর, পার্শ্ববর্তী বা কোণেরগুলো ক্ষুদ্র।

সাধারণভাবে মসজিদের যে বৈশিষ্ট্য আগে আলোচিত হয়েছে, তাতে দেখা যায় নিম্নলিখিত কয়েকটি অংশ

() লিয়ান (Liwan)অর্থাৎ প্রার্থনা গৃহ(Prayer-hall)

() রিওয়াক (Riwaq)পার্শ্ববর্তী আবেষ্টনী (Cloisters)

() সান (Sahn)প্রাঙ্গণ (Courtyards)

() হাউদ (Haud)পুষ্করিণী (Tank)

() মেহরাব (Mihrab)উপাসনা দিক (Kzjyãx niche/(Prayer-niche)

() মিম্বার (Mimber)বেদী (Pulpit)

() মিনার (Minar)মিনার (Minaret)

এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন মুয়াজ্জিন (প্রার্থনার জন্য যিনি সবাইকে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করেন) ইমাম (যিনি প্রার্থনা পরিচালনা করেন) কিন্তু বাংলাদেশে বিশেষভাবে গৌড়ের যে মসজিদ দেখা যায়, তার একটি সংহত রূপ হচ্ছেএকটি উপাসনা কক্ষ, সম্মুখে উন্মুক্ত তৃণাচ্ছাদিত ভূমিখণ্ড এবং এক প্রান্তে একটি জলাশয়।

তবে উপরোক্ত সবগুলো কোনো কোনো স্থানে মিললেও (পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, পাওয়ার কুতুবশাহী মসজিদ) মধ্যবর্তী স্থানে কোথাও পুষ্করিণী নেই এবং কোথাও একটি মিনারও মসজিদে দেখা যায় না। মোগল যুগ থেকে তফাত এখানেই। বহিরঙ্গের দিক থেকে মোগল যুগের মসজিদ তার স্থাপনা, অলংকরণ এবং অভ্যন্তরীণ সজ্জায় মোগলোত্তর যুগের মসজিদ থেকে যে পৃথক, তা সাধারণেরও দৃষ্টির বাইরে যায় না।

গম্বুজের সংখ্যার দিক দিয়ে প্রাক-মোগল যুগের মসজিদগুলো নিম্নলিখিতভাবে ভাগ করা যায়

. এক গম্বুজবিশিষ্ট

. চতুর্দিক উন্মুক্ত বারান্দাযুক্ত এক গম্বুজবিশিষ্ট

. কেবল সম্মুখে আচ্ছাদিত বারান্দাযুক্ত এক গম্বুজবিশিষ্ট

. বহু গম্বুজবিশিষ্ট এবং এর মধ্যে একটি বৃহৎ কক্ষ (Central Nave)

. বহু গম্বুজবিশিষ্ট কিন্তু অভ্যন্তর সুপরিসর কক্ষহীন

. বহু গম্বুজ এবং পিপারূপ খিলানবিশিষ্ট (Barrel Vault) কিংবা চৌচালা ছাদবিশিষ্ট

শ্রীসরসীকুমার সরস্বতী পরিবর্তনকে ক্রমবিবর্তনের পথে হয়েছে বলে মনে করেছেন। আবার হাসান দানী মুসলিম জগৎ থেকে গ্রহণ বাঙালীকরণ করা হয়েছে বলে মনে করেছেন। কিন্তু উপরোক্ত দুটি ধারণাই সঠিক নয়। মুসলিমরা দেশে এসে প্রথমেই বাংলাদেশের নিজস্ব দোচালা বা চৌচালা গৃহ নির্মাণ পদ্ধতিকে যদি গ্রহণ করে থাকে এবং পরবর্তী পর্যায়ে গম্বুজ খিলান (পিপা, Two Centred Three Centred, Obtuse খিলান) দ্বারা মসজিদ নির্মাণ করে থাকে, তবে বিবর্তনের পথ খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রাচীনতম মসজিদ হুগলীর ত্রিবেণীর জাফর খান গাজীর মসজিদের খিলান গম্বুজে বা গৌড়পাণ্ডুয়া অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের (১৩৭৫) আদিনা মসজিদে মিলত। আবার অন্যদিকে হাসান দানীর এগুলো বাঙালীকরণও করা হয়নি। আসলে এগুলো প্রতিষ্ঠাতাদের রুচি, ইচ্ছা সংগতিকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছিল। সুনির্দিষ্ট অনুশাসন মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে (তার গম্বুজ, বারান্দা, পরিধি, কক্ষ) না থাকার ফলে মসজিদের চেহারার অদল-বদল হয়েছে।

প্রাক-মোগল যুগে মুসলিম নারীদের জন্য পৃথক আসনের ব্যবস্থা কোনো কোনো বৃহৎ মসজিদে থাকত। গৌড়ের বড় সোনা মসজিদ, গুণমন্ত (যা এখন ভগ্ন) পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদে এখনো এর চিহ্ন বর্তমান।

সমস্তবে(Bay) [দুই স্তম্ভ দেয়াল প্রভৃতির মধ্যবর্তী স্থান], আইল (aisle) [স্তম্ভ শ্রেণী দ্বারা বিচ্ছিন্ন মসজিদের পার্শ্ববর্তী বিভাগ] বাংলার আর্দ্র আবহাওয়ায় বায়ু প্রবেশের খাতিরেই এই রূপ পায় এবং বৃষ্টির জল যাতে ঘরে প্রবেশ না করে, তার জন্য দরজাগুলোও ইচ্ছা করেই ছোট করা হয়েছিলদানী সাহেবের বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ পর্যাপ্ত আলো প্রবেশের যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, তা মুসলিম শাসক বা স্থপতিদের গড়ে ওঠেনি। হিন্দু স্থপতিরা যারা কার্যে নিযুক্ত হয়েছিলেন, তাদেরও কোনো ধারণা ছিল না। কারণ প্রাচীন মন্দিরের অভ্যন্তরের ত্রুটিও ওই একই ধরনের। বৃষ্টির জল যাতে ঘরে না ঢোকে, তার জন্য দরজা ছোট করা দরকার, বক্তব্য স্থাপত্যের রীতিকেও সমর্থন করে না। মসজিদ ছাড়াও সুদীর্ঘ দাখিল দরওয়াজার পার্শ্ববর্তী কক্ষগুলোয় প্রখর সূর্য করোজ্জ্বল দিনেও আলো ঢোকে না। পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদের প্রবেশপথের খিলান দীর্ঘ হলেও তার তথাকথিতবাদশাহী তখত’-এর অবস্থাও একই প্রকার। সুতরাং দানী সাহেবের এই যুক্তি ধোপে টেকে না। শুধু এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোই যে কারাগারের মতো মনে হয়, তা নয়। মুসলিম স্থাপত্যের সর্বক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আলো কক্ষমধ্যে না ঢোকার ফলে সবগুলোতেই ওই ত্রুটি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে এবং নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা হয়েছে।

[গৌড়-বঙ্গের স্থাপত্য বই থেকে সংক্ষেপে পুনর্মুদ্রণ]

 

প্রদ্যোত ঘোষ: ইতিহাসবিদ গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন