শনিবার | মে ৩০, ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

টেরাকোটা- পর্ব ২

বাংলার মধ্যযুগের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

খন্দকার মাহমুদুল হাসান

বাংলায় সাহিত্য শিল্পকলার মতো স্থাপত্যবিদ্যার চর্চার ইতিহাসও সুপ্রাচীন। প্রস্তর যুগের মানুষ যখন কৃষি পশুপালনের মাধ্যমে সভ্যতার পথে অগ্রসর হলো, তখন প্রয়োজনের তাগিদেই তাকে আবাসন নিয়ে ভাবতে হয়েছিল। গৃহ নির্মাণের সূচনা যে কুঁড়েঘর দিয়ে হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। তবে হাজার হাজার বছরের কালপরিক্রমায় কুঁড়েঘরের নির্মাতাদের বংশধরেরা পালবংশের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ রাজা ধর্মপালের আমলে (আনুমানিক ৭৮১-৮২১ খ্রি.) নির্মাণ করেছিল অত্যাশ্চর্য স্থাপত্যকর্ম সোমপুর মহাবিহার, যার নির্মাণ নকশার অনুকরণ হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে পর্যন্ত। প্রাচীন বাংলার প্রকৌশলী নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা বিশাল গ্রানাইট পাথরখণ্ড কেটে দূর অতীতে নির্মাণ স্থাপন করেছিলেন নওগাঁ জেলার দীবর দীঘি স্তম্ভ। তারাই জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে তুলসীগঙ্গা নদীর ওপর পাথরের সেতু, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার গোরকুইয়ে পাথরের কুয়ো, পরিখা প্রাচীর ঘেরা পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গনগরী, বগুড়ার উঁচু পাকা প্রাচীর তোরণযুক্ত বিশাল দুর্গনগরী পুণ্ড্রনগর, উয়ারি-বটেশ্বরের বাণিজ্যনগরী নির্মাণ করেছিলেন। পরিখা মাটির প্রাচীরে ঘেরা অসংখ্য দুর্গও তারাই বানিয়েছিলেন (যেমনরংপুরের সাতগড়া, ময়মনসিংহের বোকাইনগর কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুর) স্তূপ, মন্দির, বিহার কত যে নির্মিত হয়েছিল তার ঠিক নেই। তবে প্রাচীনযুগের কীর্তিগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে প্রধানত তিনটি কারণে। সে কারণগুলো হলো. প্রাকৃতিক দুর্যোগ, . বৈরী শক্তির আক্রমণ, নির্মাণোপকরণের ভঙ্গুরতা। বাঁশ-কাঠ দিয়ে বড় বড় নির্মাণকর্মও হয়েছে। কাদামাটি-বাঁশ-কাঠ দিয়ে বড় বড় দ্বিতল বাড়ি পর্যন্ত এখনো বাংলাদেশের কোনো কোনো এলাকায় তৈরি করা হয়। নির্মাণোপকরণের সহজলভ্যতার কারণেই ধরনের ঘরবাড়ি নির্মাণ দেশে সবসময়ই জনপ্রিয়। অবশ্য দীর্ঘকাল এমন নির্মাণকর্মের স্থায়িত্ব আশা করা যায় না।

মধ্যযুগের স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর সঙ্গে প্রাচীন যুগের নির্মাণকর্মের ধরনের পার্থক্য আছে। তবে নতুন নির্মাণরীতিও পুরোপুরি লোকজ সাংস্কৃতিক উপাদানকে অস্বীকার করেনি। প্রাচীন যুগে অনুসৃত নির্মাণ নকশার কোনো কোনো বিষয় মধ্যযুগেও অন্তত প্রথম দিক পর্যন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছিল। মধ্যযুগেও যে প্রাচীন রীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, তা বোঝার জন্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভারত সীমান্তবর্তী গৌড় নগরীর বাংলাদেশভুক্ত অংশের দরসবাড়ি মাদ্রাসার কথা উল্লেখ করা যায়। মাদ্রাসার ভূমি নকশার সঙ্গে প্রাচীন বাংলায় নির্মিত বৌদ্ধ বিহারগুলোর ভূমি নকশায় আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখা যায়। এখানেও অভ্যন্তরের খোলা চত্বরের চারপাশজুড়ে আছে ছাত্রাবাস কক্ষগুলো, ঠিক যেমনটি দেখা যেত বিহারের ভিক্ষুনিবাসে। পশ্চিম ছাড়া অন্য সব দিকে আছে একটি করে প্রবেশপথ। প্রতি পাশে ১০টি করে মোট ৪০টি কক্ষ আছে। প্রতি পাঁচটি কক্ষের পরপর একটি করে প্রবেশপথ আছে। পশ্চিম দিকের প্রবেশপথের বদলে আছে একটি নামাজের ঘর। নামাজকক্ষ বা মসজিদে তিনটি ছোট মেহরাবও আছে (সূত্র: খন্দকার মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ, মধ্যযুগ, পার্ল পাবলিকেশন্স, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২৮৭, ২৮৮) ধারণা করা হয়, মাদ্রাসা ছাত্রাবাসের ছাত্ররা পাঠগ্রহণ করতে?

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন