বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

টেরাকোটা- পর্ব ২

বাংলার মধ্যযুগের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

খন্দকার মাহমুদুল হাসান

বাংলায় সাহিত্য শিল্পকলার মতো স্থাপত্যবিদ্যার চর্চার ইতিহাসও সুপ্রাচীন। প্রস্তর যুগের মানুষ যখন কৃষি পশুপালনের মাধ্যমে সভ্যতার পথে অগ্রসর হলো, তখন প্রয়োজনের তাগিদেই তাকে আবাসন নিয়ে ভাবতে হয়েছিল। গৃহ নির্মাণের সূচনা যে কুঁড়েঘর দিয়ে হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। তবে হাজার হাজার বছরের কালপরিক্রমায় কুঁড়েঘরের নির্মাতাদের বংশধরেরা পালবংশের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ রাজা ধর্মপালের আমলে (আনুমানিক ৭৮১-৮২১ খ্রি.) নির্মাণ করেছিল অত্যাশ্চর্য স্থাপত্যকর্ম সোমপুর মহাবিহার, যার নির্মাণ নকশার অনুকরণ হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে পর্যন্ত। প্রাচীন বাংলার প্রকৌশলী নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা বিশাল গ্রানাইট পাথরখণ্ড কেটে দূর অতীতে নির্মাণ স্থাপন করেছিলেন নওগাঁ জেলার দীবর দীঘি স্তম্ভ। তারাই জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে তুলসীগঙ্গা নদীর ওপর পাথরের সেতু, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার গোরকুইয়ে পাথরের কুয়ো, পরিখা প্রাচীর ঘেরা পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গনগরী, বগুড়ার উঁচু পাকা প্রাচীর তোরণযুক্ত বিশাল দুর্গনগরী পুণ্ড্রনগর, উয়ারি-বটেশ্বরের বাণিজ্যনগরী নির্মাণ করেছিলেন। পরিখা মাটির প্রাচীরে ঘেরা অসংখ্য দুর্গও তারাই বানিয়েছিলেন (যেমনরংপুরের সাতগড়া, ময়মনসিংহের বোকাইনগর কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুর) স্তূপ, মন্দির, বিহার কত যে নির্মিত হয়েছিল তার ঠিক নেই। তবে প্রাচীনযুগের কীর্তিগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে প্রধানত তিনটি কারণে। সে কারণগুলো হলো. প্রাকৃতিক দুর্যোগ, . বৈরী শক্তির আক্রমণ, নির্মাণোপকরণের ভঙ্গুরতা। বাঁশ-কাঠ দিয়ে বড় বড় নির্মাণকর্মও হয়েছে। কাদামাটি-বাঁশ-কাঠ দিয়ে বড় বড় দ্বিতল বাড়ি পর্যন্ত এখনো বাংলাদেশের কোনো কোনো এলাকায় তৈরি করা হয়। নির্মাণোপকরণের সহজলভ্যতার কারণেই ধরনের ঘরবাড়ি নির্মাণ দেশে সবসময়ই জনপ্রিয়। অবশ্য দীর্ঘকাল এমন নির্মাণকর্মের স্থায়িত্ব আশা করা যায় না।

মধ্যযুগের স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর সঙ্গে প্রাচীন যুগের নির্মাণকর্মের ধরনের পার্থক্য আছে। তবে নতুন নির্মাণরীতিও পুরোপুরি লোকজ সাংস্কৃতিক উপাদানকে অস্বীকার করেনি। প্রাচীন যুগে অনুসৃত নির্মাণ নকশার কোনো কোনো বিষয় মধ্যযুগেও অন্তত প্রথম দিক পর্যন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছিল। মধ্যযুগেও যে প্রাচীন রীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, তা বোঝার জন্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভারত সীমান্তবর্তী গৌড় নগরীর বাংলাদেশভুক্ত অংশের দরসবাড়ি মাদ্রাসার কথা উল্লেখ করা যায়। মাদ্রাসার ভূমি নকশার সঙ্গে প্রাচীন বাংলায় নির্মিত বৌদ্ধ বিহারগুলোর ভূমি নকশায় আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখা যায়। এখানেও অভ্যন্তরের খোলা চত্বরের চারপাশজুড়ে আছে ছাত্রাবাস কক্ষগুলো, ঠিক যেমনটি দেখা যেত বিহারের ভিক্ষুনিবাসে। পশ্চিম ছাড়া অন্য সব দিকে আছে একটি করে প্রবেশপথ। প্রতি পাশে ১০টি করে মোট ৪০টি কক্ষ আছে। প্রতি পাঁচটি কক্ষের পরপর একটি করে প্রবেশপথ আছে। পশ্চিম দিকের প্রবেশপথের বদলে আছে একটি নামাজের ঘর। নামাজকক্ষ বা মসজিদে তিনটি ছোট মেহরাবও আছে (সূত্র: খন্দকার মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ, মধ্যযুগ, পার্ল পাবলিকেশন্স, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২৮৭, ২৮৮) ধারণা করা হয়, মাদ্রাসা ছাত্রাবাসের ছাত্ররা পাঠগ্রহণ করতেন খুবই নিকটবর্তী দরসবাড়ি মসজিদে, যে মসজিদের নির্মাণকাল ৮৮৪ হিজরি মোতাবেক ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে এবং তা ছিল শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের (১৪৭৬-৮১ খ্রি.) আমলে (সূত্র: প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮৩) প্রাপ্ত শিলালেখর ভিত্তিতে জানা গেছে, মাদ্রাসাটির নির্মাণকাল ৯০৯ হিজরি মোতাবেক ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দ। বাংলায় হোসেনশাহি রাজবংশের (১৪৯৩-১৫৩৮) শ্রেষ্ঠ সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমল (১৪৯৩-১৫১৯) ছিল তখন। এটি ছিল টানা ২০০ বছরের (১৩৩৮-১৫৩৮) সুলতানি যুগের শেষ রাজবংশ আর আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন রাজবংশের প্রথম সুলতান। বাংলায় বখতিয়ার খলজির বিজয় সম্পন্নকরণের সাল ছিল ১২০৪ অথবা ১২০৫ খ্রিস্টাব্দ। হোসেনশাহি আমল তথা হোসেন শাহের রাজত্ব শুরু হয়েছিল বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়ের (১৪৯৩-১২০৫) ২৮৮ বছর পর এবং মাদ্রাসাটি নির্মিত হয়েছিল (১৫০৪-১২০৫) ২৯৯ বছর পর। অর্থাৎ বাংলায় মুসলিম শাসন প্রবর্তনের প্রায় ৩০০ বছর পরও নির্মাণরীতিতে পাল প্রভাব বিদ্যমান ছিল, যদিও পাল যুগের প্রায় ৪০০ বছর শাসনের অবসানের পর ১১০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে বাংলায় সেন শাসনের সূচনা হয়েছিল। বখতিয়ারের বিজয়ের আগেই প্রায় ১০০ বছর ধরে চলেছিল সেন শাসন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মানুসারী সেনদের আমলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের চর্চার কী অবস্থা হয়েছিল তা সবারই জানা। বাংলায় পরমতসহিষ্ণুতা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে পাল যুগকে স্বর্ণযুগ বলে বিবেচনা করা হয়। পক্ষান্তরে সেন যুগে অনেক ক্ষত্রেই বিপরীত অবস্থা, বিশেষ করে পাল যুগীয় বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছিল। কাজেই দরসবাড়ি মাদ্রাসার নির্মাণ নকশায় পাল প্রভাব এটা প্রমাণ করে যে বাংলার প্রাচীন যুগের, বিশেষ করে পাল যুগের স্থাপত্য নির্মাণ কৌশল মধ্যযুগের সূচনারও অনেক পর পর্যন্ত যতটা সীমিত পরিসরেই হোক, তার প্রভাব বজায় রাখতে পেরেছিল।

এখন আমরা মধ্যযুগের বাংলার প্রধান স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারি। নয়া স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মুসলিম বিজয়ের সম্পর্ক ছিল। বখতিয়ারের বিজয়ের পর নতুন একটি ধর্মমতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইমারত নির্মাণের উপযোগিতা সৃষ্টি হলো। বেশ দ্রুতই নবাগত ধর্মমতে আস্থাশীলদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। ফলে নতুন স্থাপত্যরীতিও বিকশিত হলো অপেক্ষাকৃত দ্রুততার সঙ্গে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ধ্যান-ধারণার আত্তীকরণও হলো। সময়ে বাংলায় প্রচলিত চালাঘরের অনুকরণ এখানকার স্থাপত্যকর্মকে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে করার পেছনে যুক্তি আছে। প্রাচীন যুগের মতোই টেরাকোটার ফলকের ব্যবহার মধ্যযুগেও অব্যাহত রইল। ইমারতের বহির্ভাগ এবং অভ্যন্তরভাগ অর্থাৎ বাইরের ভেতরের দেয়াল অলংকরণের জন্য টেরাকোটার অলংকৃত ফলক ব্যবহারের ধারা চলতে লাগল। তবে প্রাচীন কালের মতো মানুষসহ প্রাণী মূর্তি ফুটিয়ে তোলার প্রচলিত রীতি ইসলাম ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হলো। ভিন্ন ধর্মের মানুষের বাসগৃহ ধর্মীয় স্থাপনায় অবশ্য তার ব্যবহার অব্যাহতই রইল। মুঘল যুগের বহু মঠ মন্দিরেই প্রাণী চিত্র উত্কীর্ণ টেরাকোটার ফলক এখনো টিকে আছে। যেমনফরিদপুরের মথুরাপুর দেউল বাগেরহাটের কোদলা মঠ। তবে ইসলাম ধর্মসংক্রান্ত ইমারতে গাছ, ফুল, লতা-পাতা শিকল-ঘণ্টার মতো প্রাণিজগতের বাইরের জিনিসের চিত্রশোভিত ফলকের ব্যবহার হতে লাগল। অপ্রাণীবাচক চিত্রশোভিত ফলক ব্যবহারের মাধ্যমেও শিল্পকলার অসাধারণ সব নিদর্শন প্রকাশিত হতে লাগল। সুলতানি যুগে নারায়ণগঞ্জের মহজমপুর মসজিদ, রাজশাহীর বাঘা মসজিদ, মুন্সীগঞ্জের বাবা আদমের মসজিদসহ আরো অনেক মসজিদেই টেরাকোটার ফলকের অপূর্ব কাজ আজো টিকে আছে। ইমারতগাত্রে রিলিফের ব্যবহার প্রাচীন যুগের মতোই অব্যাহত রইল। মসজিদের ভেতরের দেয়াল অলংকরণের কাজে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বাক্য উত্কীর্ণ আরবি লিপির ক্যালিগ্রাফি শোভিত পাথরখণ্ডের ব্যবহারও হতো। চট্টগ্রামের ছুটি খাঁ হাম্মাদিয়া মসজিদে সুলতানি যুগের এমন অলংকৃত পাথরের ব্যবহার হয়েছে। মধ্যযুগেই কাদার বদলে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে চুন-সুড়কির ব্যবহার আমরা দেখি। ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগে সুলতানি যুগে নির্মিত বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদে বাংলাদেশে প্রচলিত চালাঘরের মতো চারচালা গম্বুজের দেখা মেলে। মুঘল আমলের পাকা দোচালা ঘর (যেমনরাজশাহীর বিড়ালদহ মাজার, ঢাকার হাজি শাহবাজ মসজিদ, কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুর মসজিদ) এবং উঁচু প্লাটফর্মের ওপরে নির্মিত ইমারত (যেমনঢাকার খান মোহাম্মদ মিরধার মসজিদ, মুসা খাঁর মসজিদ) দেখতে পাই আমরা। সুলতানি যুগে বাংলার চালাঘরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বাঁকানো কার্নিশ যুক্ত হলো, যা মুঘল আমলে এসে বিদায় নেয়। মঠ চৈত্যের পাশাপাশি অলংকৃত সমাধি (যেমনসোনারগাঁর কালো পাথরের ওপর কারুকাজময় গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের বলে কথিত সমাধি, বাগেরহাটের সুলতানি আমলের খান জাহান আলীর মাজার) এবং কারুকার্য শোভিত সমাধিসৌধের (যেমনখিলানসহ বারান্দাযুক্ত বিবি মরিয়মের মুঘল যুগীয় মাজার, রাজমহলের কালো পাথরের ভিত্তিভূমির ওপর নির্মিত চমত্কার গম্বুজ মার্বেল পাথরের জালিকাযুক্ত দরজাসহ মুঘল যুগের পরী বিবির মাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নেয়ামতুল্লা ওলীর মাজার) আবির্ভাব হলো মধ্যযুগে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের হুগলির ত্রিবেণীতে অবস্থিত ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত জাফর খান গাজীর (১২৯৮-১৩১৩) সমাধিকে আহমদ হাসান দানি বাংলায় প্রাপ্ত মুসলিম স্থাপত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন (Alexander Cunninghum, Report of a tour in Bihar and Bengal in 1879-80, Vol-15, Indological Book House, Delhi, India, 1969, p.21) প্রবেশ তোরণ (যেমনসুলতানি যুগে গৌড়ে নির্মিত কোতোয়ালি দরওয়াজা, দাখিল দরওয়াজা, গুমতি গেট) আলাদা মিনার সুলতানি যুগে বাংলায় এল। নিচের দিকে ৬০ ফুট ওপরের দিকে ১৫ ফুট ব্যাস সর্পিল সিঁড়িপথ যুক্তবিশিষ্ট ছোট পাণ্ডয়ার মিনারটি (Alexander Cunninghum, Report of a tour in Bihar and Bengal in 1879-80, Vol-15, I Indological Book House, Delhi, India, 1969, p. 126) খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আহমদ হাসান দানির মতে, বাংলার সবচেয়ে পুরনো তিনটি মিনারের মধ্যে এটি একটি (Ahmad Hasan Dani, Muslim Architecture in Bengal, Asiatic Society, Dacca, 1962,P. 23,24) অন্য দুটি মিনার হলো গৌড়ের ১২ কোণাকার ফিরোজা মিনার (নির্মাণকাল ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দ) এবং গৌড় মালদহের মধ্যবর্তী নিমসরাইয়ের মিনার। শেষেরটি সম্রাট আকবরের ফতেপুর সিক্রির মিনারের অনুরূপ। গোড়ার দিকে আট কোণাকার মিনারের নির্মাণকাল খ্রিস্টীয় ষোলো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। সময়ের শাসকরা প্রাসাদ নির্মাণে খুব বেশি মনোযোগী ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে নদী, খালে ভরা বাংলাদেশে বেশকিছু সেতু নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে যেমন ইটের তৈরি পাকা সেতু ছিল, তেমনি ছিল কাঠের সেতুও। গৌড়ের বাংলাদেশ অংশে এবং বাগেরহাটের খলিফাতাবাদে সুলতানি যুগের ইট নির্মিত পাকা সেতু পাওয়া গেছে। মুঘল আমলের পাকা সেতুর মধ্যে আছে সোনারগাঁর পানামের পুল, ঢাকার নিকটবর্তী পাগলার পুল প্রভৃতি। সুলতানি মুঘল আমলে বাংলাদেশে তিন ধরনের দুর্গও নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সনাতন পদ্ধতির মাটির প্রাচীরযুক্ত দুর্গ, জলদুর্গ প্রাসাদ দুর্গ। প্রাচীন যুগ থেকেই মাটির প্রাচীরযুক্ত দুর্গ বাংলায় ছিল। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এমন ধরনের দুর্গ নির্মাণ সংরক্ষণ বিশেষ কোনো কঠিন কাজ ছিল না বলে মধ্যযুগেও এমন দুর্গ নির্মিত সংরক্ষিত হয়েছিল। মুঘল আমলে ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথানের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থবাহারিস্তান গায়বি’-তে যুদ্ধ-বিগ্রহের বিবরণকালে এমন অনেক দুর্গের কথা আছে। সাতক্ষীরা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় এমন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আছে। জলপথে আক্রমণকারীদের হাত থেকে নগরকে রক্ষার জন্যে মুঘল আমলে নির্মিত জলদুর্গের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা দুর্গ, মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর দুর্গ প্রভৃতির নামোল্লেখ করা যায়। উঁচু প্রাচীর, তোরণ অট্টালিকাবিশিষ্ট প্রাসাদ তোরণের উদাহরণ হিসেবে ঢাকার লালবাগের কেল্লার কথা উল্লেখ করা যায়। মুঘল যুগে ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরার হাবেলিতে, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুরে জাহাজঘাটায় এবং ঢাকার লালবাগের কেল্লায়সহ কয়েকটি স্নানাগার বা হাম্মামখানা নামের বিশেষ ধরনের সুনির্মিত ইমারত পাওয়া গেছে। মধ্যযুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাসাদ দুটি ঢাকায় অবস্থিত ছিল। এগুলো ছিল ছোটকাটরা বড়কাটরা।

বিশদ পর্যালোচনায় স্থাপত্যরীতি তার বিবর্তনের যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে, তা এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো

মোটাদাগে মধ্যযুগের স্থাপত্যরীতিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়

১। মুঘলপূর্ব রীতি

২। মুঘলরীতি

মুঘলপূর্ব রীতি প্রচলনের সূচনা হয়েছিল বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের পর থেকেই। বাংলার আবহাওয়ার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ স্থানীয় রীতির প্রভাব ছিল প্রথম দিককার অনেক ইমারতে। ইট বা ইট-পাথর দিয়ে তৈরি হতে লাগল ইমারত। কাদামাটির মর্টার কিংবা পাথরের পর পাথর বসিয়ে কোনো রকমের মর্টার ছাড়া ইমারত গড়ার সাবেকি কৌশল ধীরে ধীরে বর্জিত হলো। মুঘলপূর্ব আমলের রীতিকে আবার সাত ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর প্রথম ভাগ হলো মামলুক রীতি।

ক। মামলুক রীতি: আদি নিদর্শনগুলোতে ইমারত নির্মাণে ব্যবহূত হয়েছিল ইট পাথর। ইমারতে খিলানের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে তখনো সুলতানি যুগের বাঁকানো কার্নিশ কোনার মিনার আবির্ভূত হয়নি। বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যেসব জায়গায় প্রথম মুসলিম শাসন প্রবর্তিত হয়েছিল, সেসব জায়গায় এমন ইমারত প্রথম নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। নওগাঁর শীতলমঠে বাংলাদেশে মধ্যযুগ তথা মুসলিম আমলের সবচেয়ে পুরনো যে শিলালেখটি পাওয়া গেছে, তা ঢাকার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। আবুল ফাতাহ ইউজবকের আমলের শিলালেখটিতে যে পবিত্র ইমারত নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার নির্মাণকাল ১২৫৪ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর। বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের ৫০ বছরের মধ্যে বখতিয়ারের রাজধানীর অপেক্ষাকৃত নিকট দূরত্বে নির্মিত সেই ইমারতটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও তা যে মামলুক রীতিতে নির্মিত হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।

খ। ইলিয়াসশাহি প্রথম যুগের রীতি: সুলতানি আমলের গোড়ার দিকের এই রীতির ইমারতে পাথর ইটের সাহায্যে ইমারত নির্মিত হয়েছিল। টেরাকোটার অলংকরণও অব্যাহত ছিল। নকশা শোভিত খিলান ছিল বিশেষ দিক। সিকান্দার শাহ কর্তৃক ১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত পাণ্ডয়ার আদিনা মসজিদ, সোনারগাঁর গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মাজার বলে কথিত কালো পাথরে মোড়া নকশা শোভিত সমাধি আমলের নিদর্শন।

গ। একলাখি রীতি: হজরত পণ্ডয়ার একলাখি সমাধিসৌধ একটি বিশেষ রীতির আদর্শ উদাহরণ। সৌধে রাজা গণেশের পুত্র জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ ওরফে যদু সমাহিত আছেন। উজ্জ্বল টালি পোড়ামাটির অলংকরণে শোভিত ইটের তৈরি ইমারতে বাংলার নিজস্ব নির্মাণরীতির স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। খিলানের সাহায্যে নির্মিত ইমারতের কোনায় আট কোণাকার মিনার ছিল। পুরু দেয়ালবিশিষ্ট ইমারতে প্রবেশপথ ছাড়া কোনো জানালা ছিল না।

ঘ। ইলিয়াসশাহি-পরবর্তী যুগের রীতি: সুলতানি আমলের বেশ পরিণত নির্মাণ কৌশল সময়ে (পরবর্তী ইলিয়াসশাহি যুগে) বিকশিত হয়েছিল। রীতিতে আনুপাতিক সাম্য বজায় ছিল। পরিকল্পিত অলংকরণের বদৌলতে ইমারতগুলো অধিকতর দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছিল। পূর্ববর্তী নির্মাণরীতিগুলোর অসম্পূর্ণতাগুলো রীতিতে সংশোধিত হয়েছিল। গৌড়ের বাংলাদেশ অংশের টেরাকোটার কারুকাজ শোভিত বিপুলায়তনের দরসবাড়ি মসজিদ, গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা, কোতোয়ালি দরওয়াজা, চামকাট্টি মসজিদ, হাবশি আমলের ফিরোজা মিনার প্রভৃতি রীতির উদাহরণ।

ঙ। হোসেনশাহি রীতি: ইট বা ইট-পাথরের সমন্বয়ে টেরাকোটার ফলকে শোভিত চমত্কার সব ইমারত রীতি অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছিল। টেরাকোটার ফলক শোভিত দিনাজপুরের সুরা মসজিদ, গৌড়ের ছোট বড় সোনামসজিদ এর উদাহরণ। ছোট সোনামসজিদের দেয়াল ইটের তৈরি হলেও তা এভাবে পাথরে মোড়া যে দেখলে মনে হয় মসজিদটি পাথরেরই তৈরি। ইমারতের গায়ে রঙের প্রলেপ রঙিন টালির ব্যবহার রীতির ইমারতে দেখা যায়।

চ। খান জাহানী রীতি: উলুঘ খান জাহানকে (মৃত্যু ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ) রীতির প্রবর্তক বলে মনে করা হয়। প্রধানত বাগেরহাটসহ বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলে রীতির ইমারতের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। দিল্লির তুঘলক আমলের রীতি, বাংলার স্থানীয় রীতি ইলিয়াসশাহি-পরবর্তী যুগের রীতির ছাপ এতে দেখা যায়। অনেক মসজিদ রীতিতে নির্মিত হয়েছ। মসজিদের বাইরের দেয়ালে পলেস্তারা বা অলংকরণ এতে তেমন দেখা যায় না। তবে মেহরাবে টেরাকোটা ফলকের প্রচুর অলংকরণ দেখা যায়। এই রীতির আদর্শ উদাহরণ হলো বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। রীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, কোনার মিনারগুলো আট কোণাকার নয়, গোলাকার বলয়যুক্ত।

ছ। সুলতানি মুঘল যুগের মধ্যবর্তীকালের রীতি: ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় ২০০ বছরের টানা সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে। সেই থেকে মুঘল শাসন প্রবর্তিত হওয়া পর্যন্ত সময়ে স্বাধীন বারোভুঁইয়ারা ছাড়াও অনেক স্থানীয় শাসক শাসন করেছিলেন। সময়ে স্থানীয় রীতির প্রভাব বেড়েছিল।

মুঘলপূর্বকালের মসজিদের চারটি প্রধান রীতি: আহমদ হাসান দানির মতানুযায়ী পর্যবেক্ষণের আলোকে বিভাজনের সংক্ষিপ্তসার রকম

ক। এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ: বাগেরহাটের খলিফাতাবাদের রণবিজয়পুর মসজিদ, সিংড়া মসিজিদ, ঝিনাইদহের বারোবাজারের নুনগোলা মসজিদ শুকরানা মসজিদ এর উদাহরণ।

খ। সামনে বারান্দাযুক্ত একগম্বুজ মসজিদ: দিনাজপুরের চেহেলগাজিতে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে সুলতান রুকন উদ দিন বারবাক শাহের আমলে নির্মিত মসজিদটি এর উদাহরণ।

গ। একাধিক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ: ঝিনাইদহের বারোবাজারের গলাকাটি মসজিদ ফেনীর সর্সিদি মসজিদগুলো ছয় গম্বুজবিশিষ্ট। এগুলোকে ধারার মসজিদ হিসেবে গণ্য করা যায়।

ঘ। বড় নামাজকক্ষ খিলানযুক্ত ছাদবিশিষ্ট মসজিদ: ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিকান্দার শাহ কর্তৃক হজরত পাণ্ডয়ায় নির্মিত আদিনা মসজিদ।

প্রসঙ্গত, সুলতানি যুগের চৌচালা কুঁড়েঘরের আকৃতির গম্বুজের কথাও উল্লেখ করা যায়। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ গৌড়ের বাংলাদেশ অংশের ছোট সোনামসজিদের ছাদে এমন গম্বুজ আছে।

২। মুঘল রীতি: মুঘল রীতিতে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। বাঁকানো কার্নিশ আর রইল না। ব্যতিক্রম বাদে সব ক্ষেত্রে কার্নিশ হলো সোজা। দেয়াল অলংকরণে টেরাকোটার চেয়ে গুরুত্ব পেল পলেস্তারার ব্যবহার। প্যানেলিং কুলুঙ্গির কাজ চালু হলো। টেরাকোটার কাজ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না হলেও টেরাকোটা শিল্পের চর্চায় ক্ষতি হলো। খিলানের ব্যবহার, চালাঘর আকৃতির ছাদ প্যারাপেটে তীক্ষ চূড়া মুঘলরীতির বৈশিষ্ট্য। ছাদের গম্বুজের নিচের আট কোণাকার ড্রাম সংযোজিত হওয়ায় গম্বুজের উচ্চতা বাড়ল। গম্বুজের ওপরে পদ্মফুল নকশা ড্রামের অলংকরণও রীতির বৈশিষ্ট্য। প্রবেশপথে একটি উদ্গত অংশ থাকত। আর তার ভেতরে থাকত খিলানযুক্ত অপেক্ষাকৃত ছোট খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। দ্বিকেন্দ্রিক খিলানের বদলে চারকেন্দ্রিক খিলান এবং প্রধান প্রবেশপথের প্রতি পাশে সরু মিনার নির্মিত হতে লাগল। ঢাকার শায়েস্তা খাঁ এবং আরো পরের করতলব খানের মসজিদগুলোসহ বাংলাদেশে সব প্রান্তেই মুঘল স্থাপত্যরীতির ইমারতের দেখা মেলে। এমনকি মুঘল শাসনের অবসানের পরও রীতির প্রভাব দেখা যায়।

মধ্যযুগ যেমন প্রাচীন যুগের সঙ্গে সম্পর্কহীন ছিল না, তেমনি মুঘল যুগের ধারাবাহিকতাও অব্যাহত ছিল পরবর্তীকালেও। তবে আমাদের স্থাপত্যে পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ নতুন উপাদানও যুক্ত হয়েছে।

মধ্যযুগে মসজিদ, হাম্মামখানা, প্রাসাদ প্রভৃতি ছাড়াও বিপুলসংখ্যক মন্দিরও নির্মিত হয়েছিল। মধ্যযুগে বাংলার স্থানীয় রীতির সঙ্গে পশ্চিম মধ্য এশিয়া থেকে আসা মুসলিম রীতির একটা মিশ্রণ গড়ে ওঠে এবং এই মিশ্র রীতির ব্যাপক প্রভাব পড়ে মন্দির স্থাপত্যে। অঞ্চলে পাথরের স্বল্পতার কারণে নির্মাণকর্মে ইটের ব্যবহার ব্যাপক ছিল। ইটের দেয়ালের ওপর পোড়ামাটির ফলকের অলংকরণ মন্দিরগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলত। টেরাকোটার অলংকরণ বাংলায় প্রাচীন যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল। তবে মধ্যযুগে খিলান, বাঁকানো কার্ণিশ, আট কোণাকার মিনার, উড়িষ্যা বৈশিষ্ট্যের টারেট প্রভৃতির সমন্বয়ে স্থাপত্য কৌশলে নতুন রূপ এল। ভল্ট আবৃত বারান্দা, প্যারাপেট প্রভৃতির কথাও উল্লেখ করা যায়। মন্দির স্থাপত্যের সাধারণ শ্রেণীবিভাজন (সূত্র: খন্দকার মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ, মধ্যযুগ, পার্ল পাবলিকেশন্স, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১১৭-১১৯) রকম

১। শিখর: সাধারণভাবে আয়তাকার বা আট কোণাকার ভূমি পরিকল্পনার ওপর নির্মিত এমন মন্দিরের ছাদ ক্রমান্বয়ে শীর্ষে উঠে পিরামিডের আকার ধারণ করত। উড়িষ্যা রীতি প্রভাবিত বাংলার মন্দির স্থাপত্যে রীতির প্রভাব দেখা যায়। বাগেরহাটের কোদলার মঠ ফরিদপুরের মথুরাপুর দেউলে রীতির প্রভাব দেখা যায়।

২। ধাপ বা তাকযুক্ত অথবা পীড় বা ভদ্র: বাংলাদেশে এমন মন্দির টিকে না থাকলেও অন্তত দুটি প্রাচীন নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, দেশে এই রীতির মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার হরিনাথপুরে ভদ্র মন্দিরের চূড়ার আকৃতির একটি অলংকৃত পাথর নরসিংদী জেলার আশরাফপুরে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জ স্তূপে রীতি দেখা যায়। হরিনাথপুরের পাথরখণ্ডের বৈশিষ্ট্যগুলো বেশ স্পষ্ট (সূত্র: আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, দিনাজপুর মিউজিয়াম, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১২৬-১২৭) এক্ষেত্রে মন্দিরের মূল কক্ষের উপরিভাগ কয়েকটি ধাপ বা ভাগে বিভক্ত হয়ে উপরে উঠে যায়। শীর্ষভাগে আমলক থাকে।

৩। শীর্ষভাগে শিখরযুক্ত তাকবিশিষ্ট: মন্দিরের উপরাংশ তাকবিশিষ্ট শীর্ষভাগে শিখরযুক্ত। মুন্সীগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী মহাকালী গ্রামের বুদ্ধমূর্তি এবং বাগেরহাটের শিববাড়িতে প্রাপ্ত বুদ্ধমূর্তিতে ধরনের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ধারণা করা যায়, এমন মন্দির প্রাচীনকাল থেকেই দেশে ছিল।

৪। শীর্ষভাগে স্তূপযুক্ত তাকবিশিষ্ট: মন্দিরের উপরাংশ তাকবিশিষ্ট শীর্ষভাগে স্তূপযুক্ত। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার জটার দেউল ধরনের মন্দির।

৫। রত্ন মন্দির: মূল ইমারতের উপরে এক বা একাধিক ক্ষুদ্র কক্ষ, চূড়া বা রত্ন থাকতে পারে। যেমন দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার কান্তজিউ মন্দির। এটি একটি কৃষ্ণ মন্দির। এটি টেরাকোটায় মোড়া একটি বিশ্বখ্যাত মন্দির। তবে এটি একটি নবরত্ন মন্দির। এর শীর্ষভাগে ছিল নয়টি চূড়া। তাই এটি নবরত্ন মন্দির। কুমিল্লার জগন্নাথপুরের ১৭ রত্ন মন্দিরটিও একটি একাধিক রত্নবিশিষ্ট মন্দির।

৬। চালাবিশিষ্ট মন্দির: বাংলায় স্থানীয়ভাবে খড়ের তৈরি চালাঘর নির্মাণের প্রচলন ছিল। তারই প্রভাবে পাকা চালাবিশিষ্ট মন্দির নির্মাণের প্রচলন হয়েছিল। তবে শুধু মন্দিরই নয়, মুসলিম স্থাপত্যেও চালাঘর দেখা যায়। এর মধ্যে ছিল.একক দোচালা বা একবাংলা, . পরস্পরসংলগ্ন দুটি দোচালা বা জোড়বাংলা, . চারচালা, . একটি চারচালার উপরে আরেকটি চারচালা মিলিয়ে আটচালা . আটচালার উপরে আরেকটি চারচালা মিলিয়ে বারোচালা।

ডেভিড ম্যাককাচ্চন বাংলার মধ্যযুগীয় মন্দিরগুলোর যে শ্রেণীবিভাজন করেছেন, তা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন। তার শ্রেণীবিভাজনে স্থাপত্য রীতিরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ডেভিড ম্যাককাচ্চনের বিবরণ অনুযায়ী শ্রেণীবিভাজন রকম

১। ঐতিহ্যগত। . রেখা, . পিরহা

২। কুঁড়েঘর রীতি। . বাংলা, . চালা

৩। ইন্দো ইসলামিক। . রত্ন, . গম্বুজবিশিষ্ট

৪। ইউরোপীয় প্রভাবিত। . বাঁকানো, . আট কোণাকার, . সমতল ছাদবিশিষ্ট, . উড়িষ্যা রীতির রেখা চূড়াবিশিষ্ট Porches

. . দোলমঞ্চ, তুলসীমঞ্চ, ঝুলন মন্দির, রাসমঞ্চ ইত্যাদি

. . রাসমঞ্চ, . যেসব মন্দিরকে নিয়মত শ্রেণীবিভাজনের মধ্যে ফেলা যায় না, . জোটবদ্ধ মন্দির

শ্রেণীবিভাজনকালে ম্যাককাচ্চন বর্ণনা করেছেন, বাংলাদেশে পাঁচ চূড়াবিশিষ্ট মন্দির বিরল। তবে ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের মন্দির স্থাপত্য নিবিড় পর্যবেক্ষণকালে বর্তমান প্রবন্ধের লেখকের কাছে উক্তিকে অভ্রান্ত বলে মনে হয়নি। কারণ তথ্য সংগ্রহ সরেজমিনে ভ্রমণকালে মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামের নিকটবর্তী পঞ্চরত্ন মন্দির, রাজশাহীর পুঠিয়া, মাগুরার মোহাম্মদপুর, দিনাজপুরের গোপালগঞ্জ, ঝিনাইদহের নলডাঙ্গসহ নানা স্থানে পঞ্চরত্ন মন্দির দেখার সুযোগ পেয়েছি।

মধ্যযুগে বাংলায় মুসলিম শাসন চলাকালে বিপুল বৈচিত্র্যময় মন্দির স্থাপত্য গড়ে উঠেছিল। এসব স্থাপত্যে বাংলার স্থানীয় রীতি, মুসলিম রীতি, ইউরোপীয় রীতি প্রভৃতির প্রভাবও পড়েছিল। বৌদ্ধ খ্রিস্ট ধর্মীয় উপাসনাকেন্দ্রও গড়ে উঠেছিল। যেমন ১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ঢাকার তেজগাঁওয়ের গির্জার কথা উল্লেখ করা যায়। আদতে এর ছাদ ছিল কাঠের। দর্শনীয় গির্জায় ইউরোপীয়, মোগল ভারতীয় রীতির সমন্বয় দেখা যায়। কাজেই মধ্যযুগে বাংলার স্থাপত্যকর্মে বিপুল বৈচিত্র্য যে ছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

 

খন্দকার মাহমুদুল হাসান: সাহিত্যিক প্রত্নতাত্তিক গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন