শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা- পর্ব ২

বাংলাদেশের হাম্মাম

আখতার জাহান দোলন

বাংলাদেশের প্রাপ্ত হাম্মামের সংখ্যা ছয়টি। কোনো নির্দিষ্ট ধরনের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য আলোচনায় সংখ্যা অপ্রতুল। তবে হাম্মাম এমন এক ধরনের সেকুলার স্থাপত্য, যা শুধু বিশেষ রাজকীয় ইমারতের সঙ্গেই নির্মিত হতো। বাংলাদেশের সাধারণ বা ধনাঢ্য মানুষের বাড়িতে হাম্মাম তৈরির প্রবণতা দেখা যায়নি। ফলে ধরনের ইমারতের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কম। স্বল্পসংখ্যক ইমারতগুলোয় আকার গঠনগত কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও প্রকৃতিগতভাবে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের হাম্মামগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো

প্রথমত, বাংলাদেশের হাম্মামের দেয়াল চওড়া করে তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও (যেমন সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মাম) সম্পূর্ণ ইমারতের দেয়ালের পুরুত্ব বেশি না হলেও মূল স্নানাগার অংশে পুরুত্ব বেশি ছিল। জাহাজঘাটা হাম্মাম, সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মাম জিনজিরা হাম্মামের দেয়াল সর্বোচ্চ র্৩র্ -র্০র্ , ঈশ্বরীপুর হাম্মামের দেয়াল সর্বোচ্চ র্৩র্ -র্৬র্ , লালবাগ দুর্গ হাম্মামের দেয়াল সর্বোচ্চ র্৪র্ -র্০র্  এবং মির্জানগর হাম্মামের দেয়াল সর্বোচ্চ র্৪র্ -র্৯র্  প্রশস্ত।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের হাম্মামগুলো নির্মাণে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে ইট, চুন-সুরকি খোয়া। ইটগুলো মোগল বৈশিষ্ট্যের অর্থাৎ কম পুরুত্বের। ইটের দৈর্ঘ্য .র্৫র্ -১০র্৫র্ , প্রস্থ .র্৫র্ -.র্৫র্  এবং পুরুত্ব .র্৫র্ এছাড়া কোথাও কোথাও পাথর ব্যবহূত হয়েছে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের সব হাম্মামে চতুর্কেন্দ্রিক খিলানের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। শুধু ঈশ্বরীপুর হাম্মামের সম্ভবত অর্ধবৃত্তাকার খিলান ব্যবহূত হয়েছিল। প্রশস্ত অপ্রশস্ত দুই ধরনেরই খিলান তৈরি হয়েছে। খিলানগুলো সাধারণভাবে প্রকৃত খিলান নির্মাণ পদ্ধতিতে বা ভূঁসোয়া পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে। শুধু লালবাগ দুর্গ হাম্মামের করবেল পদ্ধতিতে তৈরি খিলান দেখা যায়।

চতুর্থত, গম্বুজ নির্মাণে (Phase of transition) স্কুইঞ্চ পদ্ধতির ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের হাম্মামগুলোর গম্বুজ মজবুত করা হয়েছে, এতে এগুলোর স্থায়িত্বও নিশ্চিত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো ড্রামের ওপর স্থাপিত হয়েছিল। এতে গম্বুজগুলো ইমারতের সঙ্গে মানানসই এবং যথাযথ উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

বাংলার চিরাচরিত বাঁশের কুঁড়েঘরকে ইট নির্মিত স্থাপত্যে রূপান্তর করতে মধ্যযুগের ইমারতে দোচালা বা চৌচালা ছাদ নির্মিত হয়েছিল। বাংলাদেশের হাম্মামগুলোও ধারার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষত লৌকিক (Secular) স্থাপত্য হওয়ায় হাম্মাম নির্মাণে গম্বুজের অবস্থিতি আবশ্যিক ছিল না বিধায় প্রায়ই অনুরূপ ছাদ নির্মিত হয়েছিল। মির্জানগর হাম্মাম ঈশ্বরপুর হাম্মাম ব্যতীত বাংলাদেশের অন্যান্য হাম্মামে চৌচালাকার ভল্টেড ছাদ ব্যবহূত হয়েছে। এছাড়া জাহাজঘাটা হাম্মাম মির্জানগর হাম্মাম ব্যতীত সব হাম্মামে অর্ধগম্বুজ তৈরি হয়েছে। এগুলো খিলান নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বলে অনুমিত হয়।

পঞ্চমত, বাংলাদেশের প্রতিটি হাম্মামে পানি সরবরাহ প্রবাহের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল। পানি প্রবাহিত করতে ব্যবহূত হয়েছিল পোড়ামাটির নল। নলগুলো দেয়াল গাত্রে এবং মেঝের নিচে অন্তঃপ্রবিষ্ট ছিল। এগুলো এমনভাবে স্থাপিত হয়েছিল যে দেয়াল বা মেঝের চাপে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল না।

বাংলাদেশের ছয়টি হাম্মামের চারটিতেই পানি সরবরাহের উৎস ছিল গভীর কূপ। ঈশ্বরীপুর হাম্মাম লালবাগ দুর্গ হাম্মামের পার্শ্ববর্তী নদী থেকে পানি সরবরাহ করা হতো। কূপ বা নদী থেকে পানি উত্তোলনে সম্ভবত কপিকল ব্যবহূত হতো।

বাংলাদেশের প্রতিটি হাম্মামে পানি সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট আকৃতির বদ্ধ কুঠুরিতে পানি সংরক্ষিত হতো। শুধু মির্জানগর হাম্মামে ছাদের ওপর বিশেষ ধরনের চারটি জলাধার নির্মাণ করা হয়েছিল। জিনজিরা হাম্মামে পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্পষ্ট না হলেও বর্তমান গ্রন্থাকার কিছু যুক্তির ভিত্তিতে একটি কক্ষকে পানি সংরক্ষণের কক্ষ হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে।

স্নানের জন্য হাম্মামগুলোর মেঝেতে অন্তঃপ্রবিষ্ট চৌবাচ্চা তৈরি হয়েছিল। জাহাজঘাটা হাম্মাম জিনজিরা হাম্মামে বর্তমানে এরূপ চৌবাচ্চার অস্তিত্ব দেখা যায়। তবে আগে ছিল এইরূপ অনুমানের বেশকিছু সূত্র পাওয়া যায়।

ষষ্ঠত, গোপনীয়তা রক্ষা হাম্মামের ক্ষেত্রে অপরিহার্য বিষয়। এজন্য হাম্মামের প্রবেশপথ জানালাগুলো চাতুর্যের সঙ্গে স্থাপিত হয়। বাংলাদেশের হাম্মামগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানকার কোনো হাম্মামেই মূল স্নানাগার অংশে বাইরে থেকে সরাসরি প্রবেশ করা যায় না। একমাত্র লালবাগ দুর্গ হাম্মাম বর্তমানে স্নানকক্ষ পোশাক পরিবর্তন কক্ষে দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রবেশপথ দেখা যায়। তবে ওইদিকে আরো কক্ষ ছিল বলে ভিত্তিচিহ্ন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় বিধায় ওই প্রবেশপথগুলোও বাইরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল এমন বলা যায় না। আবার সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মামের পোশাক পরিবর্তন কক্ষে একটি অনুচ্চ উন্মুক্ত খিলানপথ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু খিলান ইমারতের এমন একটি কৌণিক অংশে নির্মিত হয়েছিল, যেটি বাইরে থেকে দৃষ্টিগোচর হয় না। এখানে খিলানের সামনে একটি অলংকৃত দেয়াল তৈরি করে গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের হাম্মামগুলোয় সাধারণভাবে ইমারতের বাইরের দিকে জানালা তৈরি করা হয়নি। মির্জানগর হাম্মাম, সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মাম লালবাগ দুর্গ হাম্মামে জানালা তৈরি হলেও তা দেয়ালের এরূপ উচ্চতায় স্থাপিত, যাতে বাইরে থেকে কক্ষের ভেতরের প্রায় কিছুই দেখা যায় না। মোটামুটিভাবে দরজা-জানালাবিহীন হাম্মামগুলোয় ইমারতের ভেতরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণও সহজ ছিল।

সপ্তমত, বাংলাদেশের সবকটি হাম্মামের গম্বুজ বা চৌচালাকার ভল্টগুলোর কেন্দ্র ছিদ্রযুক্ত ছিল। দরজা-জানালাবিহীন কক্ষগুলোর ভেন্টিলেশনের জন্য ছিদ্রগুলো তৈরি করা হয়েছিল। ছিদ্রগুলোর ব্যাস সাধারণত র্২র্  থেকে র্৩র্ বর্তমানে ছিদ্রগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে বা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এগুলোর কোনোটিরই নির্মাণকালীন আচ্ছাদন পাওয়া যায় না। আবার মৌসুমি বৃষ্টিপাতের বাংলাদেশে ছিদ্রগুলো উন্মুক্ত থাকার সম্ভাবনাও যৌক্তিক নয়। সম্ভবত ছোট ছোট থাম বা স্তম্ভ দিয়ে তার ওপর একটি ক্ষুদ্র আচ্ছাদন নির্মিত হয়েছিল।

অষ্টমত, বাংলাদেশের হাম্মামে প্রাচীন তাপ ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়। ঈশ্বরীপুর হাম্মাম, সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মাম লালবাগ দুর্গ হাম্মামের তাপ ব্যবস্থা স্পষ্ট। জিনজিরা হাম্মামে তাপ ব্যবস্থা ছিল বলে জানা গেলেও তেমন কোনো চিহ্ন এখন দেয়া যায় না। জাহাজঘাটা হাম্মামেও তাপ ব্যবস্থা ছিল বলে উল্লিখিত হয়েছে। তবে এটি এত বেশি ভগ্নদশায় উপনীত যে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যায় না।

বাংলাদেশের যে তিনটি হাম্মামে তাপ ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়, সেগুলো মোটামুটি একই ধরনের। সাধারণত হাম্মামগুলোয় চুল্লির জন্য একটি কক্ষ নির্দিষ্ট ছিল। কক্ষগুলো ইমারতের কোনো একটি প্রান্তে অবস্থিত থাকত। চুল্লি কক্ষগুলোর মেঝে ছিদ্রযুক্ত ছিল এবং মেঝের নিচের অংশে বাইরের দিকে দেয়ালে অনুচ্চ খিলানপথ ছিল, সম্ভবত মেঝের ছিদ্রের নিচেই চুল্লির অবস্থান ছিল এবং খিলানপথটি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করা হতো। চুল্লি কক্ষের পাশে জল সংরক্ষণ কক্ষের অবস্থান থাকত। এতে প্রয়োজনে গরম পানি সংরক্ষণ করা হতো বলে অনুমিত হয়। চুল্লি কক্ষগুলো শুধু স্নানের পানি গরম করার জন্যই তৈরি হতো বলে মনে হয় না। সম্ভবত পানি গরম করে গরম বাষ্প তৈরি হলে তা স্নানকক্ষে প্রবাহিত করার ব্যবস্থাও ছিল। এতে স্নানকক্ষটি উষ্ণ থাকত। প্রতিটি হাম্মামেই চুল্লি কক্ষের সঙ্গে পোড়ামাটির নল রয়েছে, যেগুলো স্নানকক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নলগুলো দেয়ালের এমন অবস্থানে স্থাপিত ছিল যে এগুলো দিয়ে বাষ্প প্রবাহিত হতো বলে অনুমান করা যায়।

নবমত, বাংলাদেশের প্রতিটি হাম্মামই কুলুঙ্গি প্যানেলের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারে অলংকৃত। জানালা প্রবেশপথগুলো প্যানেলের মাঝে নির্মিত হয়েছে। হাম্মামগুলোর মধ্যে সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মামে সর্বাধিক কুলুঙ্গি প্যানেলের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এখানে কুলুঙ্গি প্যানেলের আকারেও বৈচিত্র্য এসেছে। ইমারতের গাত্র অলংকরণে প্যানেল কুলুঙ্গি বা খোপকাটা নকশা বাংলা মোগল স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। নকশা উৎস খুঁজতে গিয়ে বাংলার কুঁড়েঘরে ব্যবহূত বাঁশের বেড়ার কথা বলা যায়। বেড়ার বাইরের দিকটা সুদৃশ্য করার জন্য চটাগুলোকে সমান্তরাল সারিতে আনুভূমিক অথবা উলম্ব আকারে আটকিয়ে খোপ খোপ নকশা করা হয়। খোপ নকশাই মোগল ইমারতের তথা হাম্মামে বহুলভাবে ব্যবহূত প্যানেল নকশায় সমাদৃত হয়েছে বলা যায়।

প্যানেল কুলুঙ্গির নকশা ছাড়াও দেয়াল, গম্বুজের নিচের অংশ খিলানে পলেস্তারা কেটে প্রজেকশনের মাধ্যমে হাম্মামগুলো অলংকরণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও মোচা আকৃতির বা কিছুটা মোচা আকৃতির নকশা দেখা যায়। হাম্মামের গম্বুজগুলোয় মোগল বৈশিষ্ট্যের জালের নকশা করা হয়েছে। তবে প্যানেলে কুলুঙ্গি নকশা ছাড়া অন্যান্য মধ্য যুগীয় অলংকরণ শৈলী যেমন ফুলের অলংকরণ, অন্ধ মারলন অলংকরণ ইত্যাদি বাংলাদেশের হাম্মামগুলোয় বেশ কম দেখা যায়।

দশমত, বাংলাদেশের সব হাম্মামই রাজকীয় প্রয়োজন উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। জিনজিরা হাম্মামসংলগ্ন প্রাসাদ, জাহাজঘাটা হাম্মাম দুর্গ, মির্জানগর হাম্মাম লালবাগ দুর্গ হাম্মামসংলগ্ন দুর্গ এরূপ ধারণাকে সমর্থন করে। সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মামসংলগ্ন মোগল মসজিদ অন্যান্য ইমারত এবং ঈশ্বরীপুর হাম্মামের নিকটে অবস্থিত মসজিদ, দুর্গ অন্যান্য ইমারতও হাম্মামগুলোর রাজকীয় ঐতিহ্য প্রকাশ করে।

উপমহাদেশের হাম্মাম বাংলাদেশের হাম্মাম একটি তুলনামূলক আলোচনা

ভৌগোলিক অবস্থার কারণে এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের ফলে বাংলা অঞ্চল বহু আগে থেকে উপমহাদেশের কেন্দ্রীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং আচার দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপাদান স্থাপত্যেও প্রভাবটি স্পষ্ট। ফলে মুসলমানদের মাধ্যমে হাম্মাম স্থাপত্য ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হলে ক্রমেই তা বাংলাদেশের স্থাপত্য অঙ্গনেও প্রবেশ করে অন্যান্য বহিঃবঙ্গীয় স্থাপত্যে যেমন একান্ত বাঙালি স্থাপত্যরীতির প্রকাশ ঘটেছে, হাম্মাম নির্মাণের ক্ষেত্রেও সেই বৈশিষ্ট্যটি অক্ষুণ্ন থেকেছে। তাই উপমহাদেশের হাম্মাম বাংলাদেশের হাম্মামের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বৈসাদৃশ্যও।

সাদৃশ্য

প্রথমত, ইমারতের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য উপমহাদেশের হাম্মামগুলো চওড়া দেয়াল দিয়ে তৈরি হতো। ফতেহপুর সিক্রির বৃহৎ স্নানাগার বা হাকিমের স্নানাগারটির বাইরের দিকের দেয়ালের পুরুত্ব র্৫র্ বাংলাদেশের হাম্মামেও একই উদ্দেশ্যে প্রায় অনুরূপ অধিকতর চওড়া দেয়াল দেখা যায়। এখানকার হাম্মামগুলোর দেয়াল র্৩র্  (যেমন জাহাজঘাটা হাম্মাম) থেকে র্৪র্ -র্৯র্  (যেমন মির্জানগর হাম্মাম) পর্যন্ত প্রশস্ত হয়েছে।

দ্বিতীয় ছিদ্রযুক্ত ভল্ট বা গম্বুজ দিয়ে ভারতীয় হাম্মামগুলো আচ্ছাদিত হতো। ধরনের বায়ু চলাচল ব্যবস্থাকে Ceil-de-boeuf ev ail-de-bauf বলা হয়। লাহোর দুর্গের খিলওয়াতখানা, ফতেহপুর সিক্রির টার্কিশ সুলতানার হাম্মাম, জৌনপুরের হাম্মাম, হাকিমের হাম্মাম ইত্যাদি হাম্মামে এরূপ গম্বুজ ব্যবহূত হয়েছে। এগুলো প্রায়ইCowelদিয়ে আচ্ছাদিত হতো। বাংলাদেশের সব হাম্মামেই এরূপ ছিদ্রযুক্ত গম্বুজ বা ভল্ট ব্যবহূত হতে দেখা যায়। এগুলোর ছিদ্রের পরিমাপ র্২র্  থেকে র্৩র্ বাংলাদেশের হাম্মামগুলোয় গম্বুজ বা ভল্টের ছিদ্রগুলোর নির্মাণকালীন আচ্ছাদন টিকে নেই। সম্ভবত এগুলোওঈড়বিষদিয়ে আচ্ছাদিত হতো।

তৃতীয়ত, সাধারণভাবে উপমহাদেশের হাম্মামগুলোয় বাইরে থেকে ভেতরে যাওয়ার জন্য একটি মাত্র প্রবেশপথ থাকত, উদাহরণস্বরূপ তার্কিশ সুলতানার হাম্মাম এবং হাকিমের হাম্মামের উল্লেখ করা যায়। শেষোক্ত হাম্মামটিতে একাধিক প্রবেশপথ থাকলেও মূল স্নানাগার অংশ থেকে এগুলো অনেক দূরত্বে তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের হাম্মামগুলোয়ও একই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। শুধু লালবাগ দুর্গ হাম্মাম এবং জিনজিরা হাম্মামে মূল স্নানাগারের বাইরের দিকে প্রবেশপথ দেখতে পাওয়া যায়। তবে উভয় হাম্মামেই বর্তমানে বাইরের দিক বলে মনে হওয়া অংশে আগে আরো কক্ষ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

চতুর্থত, উপমহাদেশের হাম্মামগুলোয় পানি সরবরাহ প্রবাহের ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করা হয়েছিল। কূপ থেকে মেঝেতে বা দেয়ালে অন্তঃপ্রবিষ্ট নলের মাধ্যমে পুরো হাম্মামে পানি সরবরাহ করা হতো। স্নানের জন্য তৈরি হয়েছিল চৌবাচ্চা। উদাহরণস্বরূপ শাহজাহানাবাদের হাম্মামের উল্লেখ করা যায়, যেখানে চমত্কার চৌবাচ্চা (Sunken Pools) ছিল। বাংলাদেশের অধিকাংশ হাম্মামেই কূপ ছিল এবং সব হাম্মামেই নলের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। স্নানের জন্য হাম্মামগুলোর মেঝেতে অন্তঃপ্রবিষ্ট চৌবাচ্চাও তৈরি হয়েছিল। উপমহাদেশীয় হাম্মামে অনেক ক্ষেত্রেই ফোয়ারা ছিল। বাংলাদেশের লালবাগ দুর্গ হাম্মামে চমত্কার একটি ফোয়ারা দেখা যায়।

পঞ্চমত, উপমহাদেশের বেশির ভাগ হাম্মামে বিশেষ ধরনের তাপ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। ফলে এখানে গরম পানি গরম বাষ্প প্রবাহ করা সম্ভব হতো। জৌনপুর হাম্মাম, তার্কিশ সুলতানার হাম্মাম প্রভৃতি এরূপ ব্যবস্থাসংবলিত হাম্মামের উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশের লালবাগ দুর্গ হাম্মাম, ছোট সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মাম ঈশ্বরীপুর হাম্মামের প্রাচীন তাপ ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়।

ষষ্ঠত, উপমহাদেশের অনেক হাম্মামেই দরবারের ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়। আগ্রা দুর্গের হাম্মাম, শাহজাহানাবাদের হাম্মাম ধরনেরই হাম্মাম। বাংলাদেশের লালবাগ দুর্গ হাম্মাম ছোট সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মামে দরবার কক্ষ শনাক্ত করা যায়। অন্যান্য হাম্মামেও দরবারের অস্তিত্ব ছিল বলে অনুমান করা হয়।

সপ্তমত, উপমহাদেশের কোনো কোনো হাম্মামে শীতল পরিবেশ তৈরির জন্য তাহখানা (basement rooms) তৈরি হয়েছিল। লাহোর দুর্গের খিলওয়াতখানা, ফতেহপুর সিক্রির তার্কিশ সুলতানার হাম্মামে তাহখানা রয়েছে। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য তাহখানা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কম ছিল। তবে তুলনামূলকভাবে উষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত ছোট সোনা মসজিদ অঞ্চল হাম্মামটিতে তাহখানা তৈরি হয়েছিল।

বৈসাদৃশ্য

প্রথমত, উপমহাদেশে হাম্মামের ধারণাটি বেশ প্রাচীন। সুলতানি যুগ থেকে এখানে হাম্মাম নির্মিত হয়েছিল। আলাউদ্দিন খিলজি, গিয়াসউদ্দিন তুঘলক হাম্মাম নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। বাংলার গৌড়ে সুলতানি যুগে একটি হাম্মাম নির্মিত হলেও বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় অবস্থিত হাম্মামগুলো অনেক পরের। বাংলাদেশের হাম্মামগুলো মোগল যুগ বা এর অল্প কিছুকাল আগ থেকে নির্মিত হতে থাকে।

দ্বিতীয়ত, উপমহাদেশের রাজকীয় হাম্মামের সংখ্যা বেশি থাকলেও সাধারণের ব্যবহারের জন্যও কিছু কিছু হাম্মাম নির্মিত হয়েছিল। ওয়াজির খান লাহোরে সরাইখানা বাজার ইত্যাদির সঙ্গে একটি বৃহৎ হাম্মাম (১৬৩৪-১৬৩৫ খ্রি.) তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। অর্থের বিনিময়ে সবাই হাম্মাম ব্যবহার করতে পারত। পাটনায় সাইফ খান নির্মিত মাদ্রাসা সংলগ্ন হাম্মামটিও (১৬২৯) রাজকীয় প্রয়োজনে নির্মিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রাপ্ত ছয়টি হাম্মামই রাজন্য ব্যক্তিদেও জন্য নির্মিত হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

তৃতীয়ত, উপমহাদেশের হাম্মামে করিডরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ কক্ষগুলোয় আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করা হতো। ফতেহপুর সিক্রির হাকিমের হাম্মামে একাধিক করিডর দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের হাম্মামগুলো অধিক সংখ্যক কক্ষবিশিষ্ট হলেও করিডর নির্মিত হয়েছিল এমন প্রমাণ নেই বললেই চলে। এখানে একটি কক্ষের ভেতর দিয়েই আরেকটি কক্ষে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চতুর্থত, উপমহাদেশের হাম্মামে পানি সরবরাহ প্রবাহের জন্য পোড়ামাটির নলের সঙ্গে তামার তৈরি নল এবং পাথরের তৈরি নল ব্যবহূত হয়েছে। বাংলাদেশের সব হাম্মামে শুধু পোড়ামাটির নল ব্যবহূত হয়েছে।

পঞ্চমত, উপমহাদেশের হাম্মামগুলোর অভ্যন্তরভাগ ব্যাপকভাবে অলংকৃত করা হয়েছে। ফতেহপুর সিক্রির তার্কিশ সুলতানার হাম্মাম, হাকিমের হাম্মাম, লাহোর দুর্গের হাম্মাম (খিলওয়াতখানা), আগ্রা দুর্গের হাম্মাম ইত্যাদি হাম্মামগুলো চিত্রকলা মোজাইক অলংকরণে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের হাম্মামগুলোয় ধরনের অলংকরণ অনুপস্থিত বলা চলে। শুধু লালবাগ দুর্গ হাম্মামে রঙিন টালি ব্যবহূত হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের হাম্মামে আঞ্চলিক মোগল অলংকরণ শৈলী কুলুঙ্গি প্যানেলের অলংকরণ প্রাধান্য বিস্তার করেছে।

ষষ্ঠত, উপমহাদেশের হাম্মামগুলোয় সাধারণভাবে পাথর প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বাংলাদেশের হাম্মামগুলো পাথর খুব কম ব্যবহূত হয়েছে। অঞ্চলের অন্যান্য স্থাপত্যের মতো হাম্মাম নির্মাণেও ইট প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে।

সপ্তমত, উপমহাদেশের হাম্মামগুলোয় গম্বুজের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাম্মামে বাংলাদেশের স্বকীয় স্থাপত্যরীতিই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গম্বুজ ব্যবহূত হলেও দেশের প্রায় সব হাম্মামেই ভল্টেড চৌচালাকার আচ্ছাদন ব্যবহূত হয়েছে। কুঁড়েঘরের দোচালা আচ্ছাদনও ব্যবহূত হতে দেখা যায়।

বাংলা অঞ্চল তুলনামূলকভাবে দেরিতে উপমহাদেশের কেন্দ্রীয় শাসনভুক্ত হয়। ফলে অঞ্চলে আগে থেকেই নিজস্ব স্থাপত্যরীতি গড়ে উঠেছিল। আবার কেন্দ্র থেকে বেশ দূরে অবস্থিত হওয়ায় অঞ্চলের স্থাপত্যে স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন ছিল। তাই বাংলাদেশ হাম্মাম স্থাপত্যের ধারণা উপমহাদেশের হাম্মাম স্থাপত্য থেকে আহরিত হলেও তাতে বাংলার একান্ত নিজস্ব গঠনশৈলী অলংকরণ রীতি প্রযুক্ত হয়েছে।

(বাংলাদেশের হাম্মাম বই থেকে পুনর্মুদ্রণ)

 

আখতার জাহান দোলন: গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন