রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

নির্মাণ খাতের ‘বাবল’ কতদিন থাকবে?

মেহেদী হাসান রাহাত

আট বছরে দেশের নির্মাণ খাতের আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। নির্মাণ খাতের বাবল মূলত সরকারের মেগা প্রকল্পকে ঘিরে। এসব মেগা প্রকল্পে চাহিদার কথা বিবেচনা করে রড সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সম্প্রসারণ করেছেন কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা। যদিও যেসব মেগা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বাড়তি বিনিয়োগ তার অনেকগুলোই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সমাপ্ত হবে। কিছু প্রকল্পের কাজ আবার এরই মধ্যে শ্লথ হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে শঙ্কা রয়েছে আগামীতে আবাসন খাতের চাহিদা বৃদ্ধিতেও। সব মিলিয়ে নির্মাণ খাতের বাবল কতদিন থাকবে, সে প্রশ্ন উঠছে।

কয়েক বছর ধরেই উচ্চহারে বাড়ছে নির্মাণ খাতের বাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্থির মূল্যে ২০১১-১২ অর্থবছর দেশের নির্মাণ খাতের আকার ছিল ৪৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছর তা ৪৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছর এর আকার আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ২০০ কোটি ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। নির্মাণ খাতের আকার বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে পরবর্তী বছরগুলোয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর খাতটির আকার বেড়ে হয় ৬১ হাজার ৫০০ কোটি ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৬৭ হাজার কোটি টাকা। পরের অর্থবছর ৭৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যায় নির্মাণ খাতের আকার। আর সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছর দেশের নির্মাণ খাতের আকার দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায়।

নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধিতে আবাসন খাতের অবদান থাকলেও সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এসব প্রকল্পের ওপর ভর করেই রড-সিমেন্টের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছেন খাতের উদ্যোক্তারা।

খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশে ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪০টির বেশি। ইস্পাতের বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে দুই প্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের স্টিল (একেএস) বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (বিএসআরএম) একেএসের দখলে রয়েছে বাজারের ৩০ বিএসআরএমের দখলে ২৭ শতাংশ। এছাড়া ইস্পাতের বাজারের শতাংশ কবির স্টিল রি-রোলিং (কেএসআরএম), শতাংশ আনোয়ার ইস্পাত লিমিটেড এবং শতাংশ পিএইচপি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শতাংশ করে বাজার অংশীদারিত্ব রয়েছে রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (আরএসআরএম), বায়েজিদ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বসুন্ধরা স্টিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের। শতাংশ করে বাজার দখলে আছে বন্দর স্টিল লিমিটেড জিপিএইচ ইস্পাতের। সীমা অটোমেটিক রি-রোলিং মিলসের দখলে রয়েছে বাজারের শতাংশ।

উৎপাদন সক্ষমতার বিচারে শীর্ষে রয়েছে বিএসআরএম স্টিল। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক গড় উৎপাদনক্ষমতা ১৬ লাখ টন। এছাড়া একেএসের বার্ষিক রড উৎপাদনক্ষমতা ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন, কেএসআরএমের ছয় লাখ টন, পিএইচপি স্টিলের লাখ ২০ হাজার টন, আরএসআরএমের লাখ ২৮ হাজার টন, আনোয়ার ইস্পাতের লাখ ৬০ হাজার টন, বসুন্ধরা স্টিল কমপ্লেক্সের লাখ ৬০ হাজার টন, বায়েজিদ স্টিলের লাখ ৮০ হাজার টন, জিপিএইচ ইস্পাতের লাখ ৬০ হাজার টন, বন্দর স্টিলের লাখ ২০ হাজার টন সীমা অটোমেটিক রি-রোলিং মিলসের উৎপাদন সক্ষমতা ৪৫ হাজার টন।

সিমেন্ট রড উৎপাদনে দেশের অন্যতম বড় শিল্প গ্রুপ জিপিএইচ। গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ক্রাউন সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট জিপিএইচ ইস্পাত। জিপিএইচ ইস্পাতের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির একটি নতুন ইউনিট নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যার উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে আট লাখ টন।

আরো ১৫-২০ বছর রড সিমেন্ট খাতের প্রবৃদ্ধি থাকবে বলে মনে করেন জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, যতদিন দেশের অর্থনৈতিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, ততদিন রড সিমেন্টের চাহিদা থাকবেই। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে রড সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়টি নির্ভরশীল। অর্থনীতির আকার বড় হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো শেষ হলে তখন আরো নতুন প্রকল্প আসবে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি যে হারে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে বর্তমানের তুলনায় আরো অনেক বড় মেগা প্রকল্প আসবে।

সরকারের মেগা প্রকল্পকেন্দ্রিক চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে দেশের সিমেন্ট কোম্পানিগুলোও গত কয়েক বছরে তাদের সক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছে। আবার বেশকিছু কোম্পানির সম্প্রসারণকাজ চলছে। দেশের সিমেন্ট খাতের চাহিদার ৮১ শতাংশই পূরণ করে শীর্ষস্থানীয় ১০ কোম্পানি। খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে লাফার্জহোলসিমের দশমিক ৩১ শতাংশ, ক্রাউন সিমেন্টের দশমিক শূন্য , প্রিমিয়ার সিমেন্টের দশমিক ৩৬, হাইডেলবার্গ সিমেন্টের দশমিক ১৪, মেঘনা সিমেন্টের দশমিক ৯১, কনফিডেন্স সিমেন্টের দশমিক ৮২ আরামিট সিমেন্টের প্রায় শতাংশ বাজার রয়েছে। অন্যান্য কোম্পানির দখলে রয়েছে বাজারের ৭১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

বসুন্ধরা গ্রুপের বসুন্ধরা সিমেন্টের বর্তমান বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ লাখ মেঘনা সিমেন্টের লাখ টন। দুটি প্রতিষ্ঠানই তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে বসুন্ধরা সিমেন্ট আরো ছয় লাখ টন মেঘনা সিমেন্ট ২০ লাখ টন সক্ষমতা বাড়াবে। সেভেন রিংস সিমেন্ট এরই মধ্যে তাদের সক্ষমতা ৩৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮৫ লাখ টনে উন্নীত করেছে। প্রিমিয়ার সিমেন্টও তাদের সক্ষমতা তিন লাখ থেকে আট লাখ টনে উন্নীত করবে। ক্রাউন সিমেন্ট ২০২১ সালের মধ্যে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ লাখ থেকে ৫৮ লাখ টনে উন্নীত করবে। হাইডেলবার্গ সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতা ২৩ লাখ থেকে ২৮ লাখ টনে উন্নীত করবে।

সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হওয়ার পর চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে খাতের কোম্পানিগুলো একটা ধাক্কা খাবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও সরকারি প্রকল্পে সিমেন্টের ব্যবহার ছিল ১০-১৫ শতাংশ। বর্তমানে এটি ৪০ শতাংশ। বর্তমানে দেশের সিমেন্ট কারখানাগুলোর সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা প্রায় অর্ধেক। অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে এমনিতেই সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর ওপর সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হয়ে গেলে খাতের কোম্পানিগুলো একটা ধাক্কা খাবে। তবে বেশকিছু কারণে সাময়িক প্রভাব পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে দেশে সিমেন্টের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। যেমন পদ্মা সেতু হয়ে গেলে এর সঙ্গে ২১ জেলার সংযোগ তৈরি হবে এবং এসব জেলায় তখন বিভিন্ন ধরনের নির্মাণযজ্ঞ শুরু হবে। তাছাড়া আমাদের মাথাপিছু সিমেন্ট ব্যবহারের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। বর্তমানে সিমেন্ট খাতে -১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ভবিষ্যতেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। মেগা প্রকল্পগুলো শেষ হয়ে গেলে সাময়িকভাবে চাহিদার একটি বড় অংশ কমে যাবে, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়বে।

যেসব মেগা প্রকল্পের ওপর ভর করে নির্মাণ খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেগুলোর অন্যতম পদ্মা সেতু। ২০১৩ সালের অক্টোবরে জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়কের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় প্রকল্পের কাজ। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮১ শতাংশ। ২০২১ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজও ২০২৪ সালের জুন নাগাদ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ১৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। মেট্রোরেল প্রকল্পের লাইন--এর কাজ চলছে। লাইনটির কাজ দুই অংশে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রথম অংশ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। দ্বিতীয় অংশ আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মেট্রোরেল উদ্বোধনের লক্ষ্য রয়েছে।

১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার বান্দরবানের ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইনের ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ করছে সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ২৯ শতাংশ।

সরকারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আর্থিক ব্যয়ের আকারে দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প এটি। ঈশ্বরদীর রূপপুরে হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বা লাখ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিটটির ২০২৩ সাল নাগাদ উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদন আসবে ২০২৪ সালে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্প। এটির অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৪৮ শতাংশ। প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া বাস্তবায়নাধীন রামপাল থারমাল বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে। মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হবে আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে। প্রকল্প এলাকায় সড়ক নির্মাণ, টাউনশিপ গড়ে তোলাসহ আনুষঙ্গিক কাজের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সাল নাগাদ। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ২৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণকাজ এখন চলছে।

এসব মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রয়েছে আবাসন খাতের। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে খাতটি। তবে মধ্যবিত্তের বাড়ি ক্রয়ের সক্ষমতা সেভাবে নেই। ক্রয়ক্ষমতা রয়েছে কেবল উচ্চমধ্যবিত্তদের। ফলে আবাসন খাতকে ঘিরেও ভবিষ্যতে নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংশয় দেখছেন অনেকে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন