সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টকিজ

অন্নপূর্ণা দেবীর জীবনী নিয়ে ছবি

গুরু মা

অন্নপূর্ণা দর্শক এবং হাততালি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। একটা কথা আছে যে বনে যখন ময়ূর নাচে, তখন তো কেউ দেখে না...

আজ অন্নপূর্ণা দেবীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তার সমাধিফলক থাকলে সেখানে হয়তো এমনটা লেখা যেত

একটি অনুরোধ 

অনুগ্রহ করে তিনবার বেল বাজাবেন 

কেউ দরজা না খুললে আপনার কার্ড কিংবা

বার্তাটি রেখে যান সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ

শ্রীমতি অন্নপূর্ণা দেবী

 

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম রহস্যঘেরা চরিত্র অন্নপূর্ণা দেবীর মুম্বাইয়ের বাসস্থানের দরজার বাইরে উপরের নোটিসটি ঝোলানো ছিল। জীবনের শেষ কয়েকটি দশক অন্নপূর্ণা লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন এমন মানুষের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। কোনো পারফরম্যান্স কিংবা সাক্ষাত্কারের অনুরোধে একেবারেই সাড়া দেননি। রহস্য ভেদ করা কঠিন, কারণ সেতার সুরবাহারে তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত।

এমন অন্নপূর্ণা দেবীকে নিয়ে নির্মল চন্দরের প্রামাণ্যচিত্র গুরু মা আজ মুম্বাইয়ে প্রদর্শিত হবে। আজ অন্নপূর্ণা দেবীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। নির্মলের প্রামাণ্যচিত্রটিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৬৯ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে সংগীত নাটক একাডেমি। গুরু মা-তে দর্শক অন্নপূর্ণা দেবীর জীবন কিংবদন্তি সম্পর্কে বিশদ জানতে পারবে। খুব সামান্য আর্কাইভাল তথ্য, পরিচিত শিষ্যদের সঙ্গে আলাপ, সাক্ষাত্কারকে ব্যবহার করে নির্মল এমন নারীর জীবনচিত্রকে তুলে ধরেছেন; যিনি ছবি তুলতে কিংবা ভিডিও ক্যামেরার সামনে আসতে পছন্দ করতেন না। তবে নির্মল চন্দর গুরু মা-তে অন্নপূর্ণা দেবীর নিজস্ব জীবনধারার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তার আড়ালে থাকার কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত টানেননি। আমরা হয়তো ১০ জন মানুষের সামনেই নিজের কোনো দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ ছাড়তে চাইব না, কিন্তু অন্নপূর্ণা দেবী সবকিছু পেছনে ফেলে গেছেন’—সানতুর বাদক শিব কুমার শর্মা নির্মলকে এমনটাই বলেছেন। গুরু মা প্রামাণ্যচিত্রটি সম্পাদনা করেছেন নির্মল চন্দর রীনা মোহন এবং চিত্রগ্রহণ করেছেন রঞ্জন পালিত।

২০১৮ সালে আজকের দিনে ৯১ বছরে বয়সে মারা যান অন্নপূর্ণা দেবী। তার শেষকৃত্যে দায়িত্ব পালন করেন তার এক শিষ্য বাঁশিবাদক নিত্যানন্দ হলদিপুর। অন্নপূর্ণা দেবী সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায় তার কাছে। গুরু মা ছবিটি শুরু হয় অন্নপূর্ণা দেবীর শেষকৃত্যের ফুটেজ দিয়ে।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কন্যা অন্নপূর্ণার বিয়ে হয়েছিল আরেক বিখ্যাত সেতার গুরু রবি শঙ্করের সঙ্গে। ১৯৪১ থেকে ১৯৮২ সময়কালে তারা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তারা একসঙ্গে মঞ্চে উঠেছেন মাত্র কয়েকবার। তারপর অন্নপূর্ণা নিজেকে বাইরের প্রদর্শনী থেকে গুটিয়ে নিয়ে শিক্ষাদানে ব্যস্ত হন। অন্নপূর্ণা দেবীর মাত্র তিনটি রেকর্ডিং টিকে আছে। বেশির ভাগ পণ্ডিতই মনে করেন, নানা বিবেচনায় অন্নপূর্ণার কাজ রবি শঙ্করের চেয়ে উন্নত মানের। অন্নপূর্ণা দেবী কেন জনসমক্ষে প্রদর্শনী থেকে সরে গিয়েছিলেন, তার একটি কারণ জড়িয়ে আছে মূল্যায়নের সঙ্গে। শোনা যায়, রবি শঙ্কর তার স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবীর প্রতিভায় শঙ্কিত হয়েছিলেন, তাই তিনি অন্নপূর্ণাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন যেন আর কখনো জনসমক্ষে পারফরম্যান্স না করেন এবং এর মাধ্যমে অন্নপূর্ণা দেবীর সামনে তার হেরে যাওয়ার আশঙ্কা দূর হয়।


অন্নপূর্ণা দেবীকে তার শিষ্যরা গুরু মা বলে ডাকতেন। তাকে মাত্র দুবার দুটি ছবিতে দেখা গেছে। ১৯৬৯ সালে ফিল্ম ডিভিশন তার বাবা আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিল, তাতেই দেখা গিয়েছিল অন্নপূর্ণা দেবীকে। সেই প্রামাণ্যচিত্রের নাম ছিল বাবা। নির্মলের গুরু মা শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে সংগীত নাটক একাডেমির জন্য অন্নপূর্ণার দেয়া একটি সাক্ষাত্কার ব্যবহূত হয়েছে। এতে তাকে ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলতে শোনা যাবে। তবে সাক্ষাত্কারে তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া কিংবদন্তির কোনো সুরাহা হয়নি।

গুরু মার পরিচালক নির্মল চন্দর কথা বলেছেন স্ক্রলইনের সঙ্গে। সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ

গুরু মা নিয়ে কীভাবে কাজ শুরু করলেন?

২০১৫ সালে বেগম আখতারের ওপর আমি একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করি। সংগীত নাটক একাডেমি সেটা প্রযোজনা করেছিল। এর চেয়ারম্যান একদিন আমাকে ডেকে বলেন, আমি অন্নপূর্ণা দেবীর জীবন নিয়ে কোনো প্রামাণ্যচিত্র তৈরিতে আগ্রহী কিনা। ক্ল্যাসিকাল সংগীত নিয়ে আমার কোনো প্রশিক্ষণ বা সম্পর্ক নেই। তবে নির্মাতা হিসেবে আপনি যেকোনো বিষয় নিয়েই অনুসন্ধান করতে পারেন।

অন্নপূর্ণা দেবী আপনাকে কোনো সাক্ষাত্কার দেননি কিন্তু মুম্বাইয়ে তার অ্যাপার্টমেন্টে বিশদভাবে ভিডিওচিত্র ধারণ করেছেন।

তিনি ভিডিওচিত্রে কখনো রাজি হননি। আমার সঙ্গেও কখনো তার দেখা হয়নি। যাহোক, আমি তার বাসায় ঢুকে ভিডিও করার অনুমতি পেয়েছিলাম। বাসায় যাওয়ার পর মা সম্ভবত মনে করেছিলেন, আমি ভদ্র মানুষ।


এসবের কৃতিত্ব তার ছাত্র নিত্যানন্দ হলদিপুরের। তার সাহায্য সমর্থন ছাড়া কাজটি কী হতো, তা আমি জানি না।

আপনার গবেষণায় কী উঠে এসেছে?

অন্নপূর্ণা দেবীর ব্যাপারে বেশির ভাগ লেখাই রবি শঙ্করের সঙ্গে তার বিয়ে প্রসঙ্গে। আমি শুধু বিষয়ে মনোযোগ দিতে চাইনি, এটা তার জীবনের একটা অধ্যায় মাত্র।

আমার গবেষণা এগিয়েছে তিনি যাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তাদের এবং তার শিষ্যদের মাধ্যমে। তার ওপর প্রবন্ধ বা বইয়ের সংখ্যা নগণ্য। তার বাবা আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে তৈরি প্রামাণ্যচিত্র বাবায়ও তাকে কিছুটা পাওয়া যায়।

আমি কাজ করতে গিয়ে অন্নপূর্ণা দেবী সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় পেয়েছি। তার কোনো শিষ্য বলেছেন, তিনি কখনো চিত্কার করেননি, আবার কেউ বলেছেন তিনি অত্যন্ত কড়া মানুষ এবং মেজাজও হারাতেন। তিনি তার সব শিষ্যকে আলাদাভাবে শেখাতেন এবং চাইতেন তাদের নিজেদের মধ্যে যেন দেখা না হয়। তার শিষ্যদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। তার শিষ্যরা তাদের মা সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন।

তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করেছেন কিন্তু সংগীতের প্রতি তার ভক্তি সবসময়ই অক্ষুণ্ন ছিল।

সবাই মনে করেন অন্নপূর্ণা দেবী নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে ক্ল্যাসিকাল সংগীতের অন্যতম প্রতিভার অবদান থেকে দুনিয়াকে বঞ্চিত করেছেন। বিষয়ে আপনার কী মত?

মা দর্শক এবং হাততালি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। একটা কথা আছে যে বনে যখন ময়ূর নাচে, তখন তো কেউ দেখে না। অর্থাৎ কেউ দেখল কি দেখল না, তা নিয়ে ময়ূরের মাথাব্যথা নেই।

পারফরম্যান্স থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তটি আমি কিছুটা বুঝতে পারি। আমাদের কাছে শিল্প অন্যকে দেখানোর জন্য, বাহবা পাওয়ার জন্য। কিন্তু মায়ের কাছে সংগীত ব্যক্তিগত এবং আধ্যাত্মিক যাত্রা ছিল।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন