শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

বড় আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না রাকাব

হাছান আদনান

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) এডি রেশিও প্রায় দুই বছর ধরে শত ভাগেরও বেশি। আমানতের চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণ করে তারল্য সংকটে পড়েছে ব্যাংকটি। সংকটের কারণে এখন বড় আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত এ বিশেষায়িত ব্যাংক।

সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত না পেয়ে সরকারি ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মেয়াদি আমানত নিয়েই চলছিল রাকাবের কার্যক্রম। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৮ কোটি টাকাই নেয়া হয় ১০টি সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান থেকে।

রাকাবের কাছে সবচেয়ে বেশি ৩০০ কোটি টাকার মেয়াদি আমানত রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের। মেয়াদ শেষ হলে কয়েক দফায় নবায়নও করা হয় এ আমানত। সম্প্রতি আবারো মেয়াদ শেষ হলে আমানতের সে অর্থ ফেরত চায় অগ্রণী ব্যাংক। কিন্তু টাকা ফেরত না দিয়ে সুদ পরিশোধ করে আমানতটি নবায়ন করা হয়েছে।

সরকারি ব্যাংক হওয়ায় এ আমানত নবায়ন করা হয়েছে বলে জানান অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম। তিনি বলেন, রাকাবের মালিক সরকার। অগ্রণী ব্যাংকের মালিকও সরকার। রাকাবকে দেয়া আমানত নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা নেই। এজন্যই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারো নবায়ন করা হয়েছে। রাকাব আমানতের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে সরকার পরিশোধ করবে।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক থেকে নেয়া রাকাবের ১০০ কোটি টাকা আমানতের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে তিন দফায় মেয়াদ বৃদ্ধিও করা হয়েছে। এখন চতুর্থ দফায় সে আমানতের মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে রাকাব। যদিও রূপালী ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের নীতি হলো, টানা তিন মেয়াদের বেশি কোনো আমানত নবায়ন না করা। এজন্য টাকা ফেরত চেয়ে সম্প্রতি রাকাবকে চিঠি দিয়েছে রূপালী ব্যাংক।

একই পরিস্থিতি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রেও। পরিশোধ করার সামর্থ্য না থাকায় বেশি সুদ দিয়ে হলেও আমানতগুলো নবায়নের চেষ্টা করছে রাকাব। সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইইএফ ফান্ডের ১৫৮ কোটি ৩০ লাখ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১১০ কোটি, জীবন বীমা করপোরেশনের ৯০ কোটি ৫৫ লাখ, সোনালী ব্যাংকের ১০০ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১০০ কোটি, সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের ৬০ কোটি ৩৪ লাখ, গৃহায়ন তহবিলের ৫৬ কোটি ১ লাখ, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ৪৯ কোটি ৬৯ লাখ এবং পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির (গ্র্যাচুইটি তহবিল) ৪৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মেয়াদি আমানত রয়েছে রাকাবে। মেয়াদ শেষ হওয়ায় এসব আমানতের বেশির ভাগই একাধিকবার নবায়ন করা হয়েছে।

মূলত এডি রেশিও সীমা অতিক্রম করায় এমন তারল্য সংকটে পড়েছে রাকাব। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকটিকে কয়েক দফা সতর্কও করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

রাকাবের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৫ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। যদিও একই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে বিশেষায়িত ব্যাংকটির এডি রেশিও শতভাগেরও বেশি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী, রাকাবের এডি রেশিও হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ। আমানতের চেয়ে বিনিয়োগ বেশি হওয়ায় ব্যাংকটিকে সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ খেলাপি হয়েছে রাকাবের। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া ৭৭৪ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতেও রয়েছে বিশেষায়িত ব্যাংকটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত বিনিয়োগের কারণে রাকাবের এডি রেশিও শতভাগ পার হয়েছে। এজন্য সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ধার নেয়া বড় আমানতগুলো পরিশোধ করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের জন্য জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতেও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। আমানত সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশও অর্জিত হয়নি। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, তাতে সহসা গ্রাহকদের বড় অংকের আমানত ফেরত দেয়া সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় রাকাবকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) সঙ্গে দ্রুততম সময়ে একীভূত করা হলে বিপর্যয় কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের পক্ষে রাকাবের বেশির ভাগ কর্মীও। ব্যাংকটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাকাবের ভালো কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ব্যাংকটি যত দিন থাকবে, তত বেশি দুর্বল হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে একীভূতকরণের বিপক্ষে থাকতে পারেন। কিন্তু মধ্য থেকে নিচের দিকের কর্মীরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে একীভূতকরণের পক্ষে। যে প্রেক্ষাপটে রাকাব সৃষ্টি করা হয়েছিল, এখন সে পরিস্থিতি নেই। রাজশাহী বিভাগ ভেঙে রংপুর বিভাগ হয়েছে। এজন্য ব্যাংকের নামের যৌক্তিকতাও হারিয়েছে। বিকেবির সঙ্গে একীভূত হলে কস্ট অব ফান্ড কমে আসবে। বিকেবিও শক্তিশালী হবে।

আমানতের অর্থ ফেরত না দিতে পারলেও মুনাফায় থাকার কথা জানিয়েছে ব্যাংকটি। রাকাবের হিসাবে, তারা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছরেও (২০১৭-১৮) ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা নিট মুনাফায় ছিল ব্যাংকটি। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নিরীক্ষায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি পাঁচটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নিরীক্ষা চালানো হয়। এ তালিকায় রাকাবের নামও রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্ত একটি সূত্রের তথ্যমতে, রাকাবের ওপর পরিচালিত বিশেষ নিরীক্ষা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। ব্যাংকটির রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়, ঢাকাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শাখায় নিরীক্ষা চালানো হয়। নিরীক্ষায় রাকাবের ২৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে উঠে এসেছে।

তবে রাকাব অতীতের তুলনায় ভালো করছে বলে দাবি করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইদ্রিস। তিনি বলেন, দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতেই আমানতের সংকট আছে। রাকাবও এর ব্যতিক্রম নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মেয়াদি আমানত নবায়ন করার চেষ্টা করছি। নতুন আমানত সংগ্রহের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করছি, রাকাবের তারল্য সংকট কেটে যাবে।

মো. ইদ্রিস বলেন, কৃষি ব্যাংকের তুলনায় রাকাব ভালো করছে। গত অর্থবছরে আমরা ভালো মুনাফা করেছি। এখন কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে রাকাবের মার্জার হলে পরিস্থিতি ভালো না হয়ে খারাপও হতে পারে। তার পরও সরকার মার্জারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা স্বাগত জানাব।

১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। কৃষি ব্যাংকের রাজশাহী বিভাগের শাখাগুলো নিয়েই ব্যাংকটি যাত্রা করেছিল। রাজশাহী বিভাগ ভেঙে রংপুর বিভাগ হওয়ায় এখন দুই বিভাগেই ব্যাংকটির কার্যক্রম চলছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) সঙ্গে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে (রাকাব) একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে মতামত চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয়া হয়। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সে চিঠির উত্তরও দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিকেবি, রাকাব ছাড়াও দুর্বল ও ছোট ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণের জন্য ইতিবাচক উত্তর দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন