শুক্রবার | অক্টোবর ১৮, ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

প্রথম পাতা

যুব ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের ঠিকাদারি ব্যবসা

গ্রেফতার ও আত্মগোপনে প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা

তাসনিম মহসিন ও ওমর ফারুক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯ নং ওয়ার্ডের পয়োনিষ্কাশন পানির লাইন প্রতিস্থাপন এবং রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হয় চলতি বছরের মার্চে। ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকায় কাজটি পায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল হাসান জুয়েলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকেই লাপাত্তা ঠিকাদার তার লোকজন। এতে বন্ধ হয়ে গেছে প্রকল্পের কাজও।

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি বা সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে ঢাকার মতো অভিযান এখনো শুরু হয়নি চট্টগ্রামে। কিন্তু এরই মধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এখানকার ডজনখানেক যুবলীগ নেতা। কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন। অনেকে এলাকায় থাকলেও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন না। ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য এলাকার যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের অবস্থাও একই রকম। গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে তাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীন প্রকল্পের কাজ।

ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয় গত ১৮ সেপ্টেম্বর। অভিযানের পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা। ঠিকাদাররা আত্মগোপনে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকায় চলমান রাস্তা সংস্কার থেকে শুরু করে পয়োনিষ্কাশন প্রতিস্থাপন সংস্কারকাজের অধিকাংশ।

বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্পগুলোর একটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯ নং ওয়ার্ডের পয়োনিষ্কাশন পানির লাইন প্রতিস্থাপন এবং রাস্তা সংস্কার প্রকল্প। সরজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১৯ নং ওয়ার্ডের সিদ্ধেশ্বরী রোড, সিদ্ধেশ্বরী লেন, বেইলি রোডসহ অন্যান্য স্থানে রাস্তার একপাশে পড়ে আছে সুয়ারেজের বড় বড় পাইপ। রাস্তার আরেক পাশ কাটা। ফলে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। তারা বলছেন, সরকারের শুদ্ধি অভিযান শুরুর পরপরই ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন।

১৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মুন্সি কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ে আমি বহুবার যুদ্ধ করেছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। ঠিকাদারকে ফোন করলে কোনো কাজ হয় না। প্রকৌশলী, প্রধান প্রকৌশলী এমনকি মেয়রকেও বিষয়ে বলেছি। এখন শুনছি ঠিকাদার যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন।

ঢাকার মতোই গা ঢাকা দিয়েছেন চট্টগ্রামে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারাও। কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর চট্টগ্রামে সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতেন। জিকে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে গেছেন বলে জানান তার ঘনিষ্ঠজনরা। আত্মগোপনে গেছেন তার সহযোগী আক্তার মাস্টার এবং তিন দেহরক্ষী বিশ্বজিৎ, আলতাফ রিয়াজও।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপ-অর্থ সম্পাদক বাবর। মেসার্স বাবর অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও মূলত তিনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।

হেলাল আকবর বাবরের মতো নিজস্ব বন্দুকধারী দেহরক্ষী নিয়ে চলতেন নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শহীদুল ইসলাম শামীম। জিকে শামীম গ্রেফতারের পর শহীদুল ইসলাম শামীমকেও প্রকাশ্যে তেমন দেখা যাচ্ছে না। তিনিও রেলওয়ের ঠিকাদার। তার বিরুদ্ধে রেলওয়েতে টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে।

যুবলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমন মেসার্স গড়াই করপোরেশন মেসার্স আফরোজা এন্টারপ্রাইজের নামে রেলওয়ের ঠিকাদারি কাজ করেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন তিনিও।

যুবলীগ সমর্থিত নেতা হিসেবে রেলওয়েতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে আসছেন ইকবাল হোসেন। মেসার্স সুরমা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ফেন্সি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজ মেসার্স সিআর ল্যান্ড প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি। ১৯ বছর ধরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর টুপি, জুতা ড্রেস সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যুবলীগ নামধারী নেতাও ক্যাসিনো ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।

রেলওয়ের বড় বড় কাজের ঠিকাদার মেসার্স ভুঁইয়া এন্টারপ্রাইজ, এমএম বিল্ডার্স মেসার্স অর্পণ। প্রতিষ্ঠান তিনটির মালিকানায় রয়েছেন ক্যাসিনোর অন্যতম গডফাদার ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। গ্রেফতারের পর থেকে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ স্থবির হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের স্টোরস বিভাগের (সিসিএস) স্ক্র্যাপের ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মেসার্স চৌধুরী সিন্ডিকেট। যুবলীগ নামধারী ফেরদৌস আলম প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি।

একই বিভাগে স্ক্র্যাপের ঠিকাদারি করে মেসার্স অ্যান্ড জেড এন্টারপ্রাইজ মেসার্স কোহিনূর এন্টারপ্রাইজ। ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদের ধরপাকড়ের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না প্রতিষ্ঠান দুটির স্বত্বাধিকারী নুরুল হক মজুমদারকেও।

গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৫৩টি প্রকল্পে একক যৌথভাবে ঠিকাদারি কাজ করছে গ্রেফতারকৃত জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স এককভাবে করছে গণপূর্তের ১৩টি প্রকল্পের কাজ। এসব প্রকল্পের কোনোটির কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার গ্রেফতারের পর বেশির ভাগ প্রকল্প বাস্তবায়নই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার বেইলি রোডে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ঠিকাদার হিসেবে রয়েছে যুবলীগ নেতা জিকে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স। ভবনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে ৭০ শতাংশের মতো। মাদক অস্ত্র মামলায় জিকে শামীমকে গ্রেফতারের পর বন্ধ হয়ে গেছে ভবনটির নির্মাণকাজ।

নির্মাণাধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনের ঠিকাদার হিসেবেও রয়েছে জিকে বিল্ডার্স। জিকে শামীম গ্রেফতারের পর বন্ধ রয়েছে ভবনের নির্মাণকাজও। বন্ধ রয়েছে পার্শ্ববর্তী ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট হাসপাতালের একটি ভবনের নির্মাণকাজও, যা বাস্তবায়ন করছিল জিকে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

তবে জিকে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে বন্ধ হওয়া প্রকল্পগুলোয় আবার দরপত্র চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিম। গতকাল সকালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জিকে শামীমের অনেকগুলো প্রকল্প এখন চলমান। সে প্রকল্পের কিছু জায়গায় তারা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা তাদের নোটিস দেব। যদি তারা এগিয়ে না আসে, অসমাপ্ত কাজ পরিমাপ করে তার জন্য আবার টেন্ডার দেয়া হবে। আর বুঝিয়ে দেয়া কাজগুলোর মান পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় তা টেন্ডারের শর্ত পূরণ করছে না, তাহলে সেসব কাজ গ্রহণ করা হবে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন