শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় দুই ধাপ অবনমন বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে আরো দুই ধাপ অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। দ্য গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস ইনডেক্স . র‍্যাংকিংয়ে বছর বিশ্বের ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান (র্যাংকিং) ১০৫তম। গত বছর র্যাংকিংয়ে ১৪০টি দেশের মধ্যে ১০৩তম ছিল বাংলাদেশ।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) গতকাল সারা বিশ্বে একযোগে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন (জিসিআর) প্রকাশ করেছে। ডব্লিউইএফের পক্ষে বাংলাদেশে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উপলক্ষে রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

ডব্লিউইএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে এবার মোট ১২টি স্তম্ভের ১০টিতেই পতন ঘটেছে বাংলাদেশের। প্রতিযোগিতার স্কোর নির্ধারণে জরিপকালে বিবেচনায় নেয়া ১২টি স্তম্ভ হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, পণ্যবাজার, আর্থিক ব্যবস্থা, শ্রমবাজার, বাজারের আকার, ব্যবসায়িক গতিশীলতা উদ্ভাবনী সক্ষমতা।

গত বছর প্রতিবেদনের জরিপে বাংলাদেশের ৯৩টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত থাকলেও এবার ৭৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ গাজীপুরে অবস্থিত। জরিপের মূল্যায়নকাল ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ১২টির মধ্যে দুটি স্তম্ভে বাংলাদেশ ভালো করেছে। একটি পণ্যবাজার, অন্যটি স্বাস্থ্য খাত। দুটি ক্ষেত্রে যথাক্রমে চার তিন ধাপ উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ মাত্র একটি স্তম্ভের প্রথম শীর্ষ সারির ৫০টি দেশের মধ্যে স্থান পেয়েছে। এটি হচ্ছে বড় বাজার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম। অন্যান্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০ থেকে ১০০ বা তার উপরে। এর মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতায় ৯৫তম স্বাস্থ্যে ৯৩তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বাকি স্তম্ভগুলোয় বাংলাদেশের অবস্থান ১০০-এর উপরে।

বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থানের কারণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশের একটি দুর্বলতা। স্কিল বা দক্ষতা বাংলাদেশের জন্য ভয়ের জায়গা। দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বাংলাদেশের বড় শ্রমশক্তি বোঝা হয়ে হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে এতে।

প্রতিযোগিতা সক্ষতার কোনো কোনো সূচকে বাংলাদেশ বেশ পেছনে পড়ে আছে। যেমন অনিরাপদ পানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৬তম, বাণিজ্য শুল্কে ১৩০তম, ব্যাংকের সাউন্ডনেসে ১৩০তম, অডিটিং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের সক্ষমতায় ১২৬তম, দুর্নীতির ক্ষেত্রে ১২৫তম গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় ১২৩তম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় বছর সুশাসনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে যেসব ব্যবসায়ীর মতামত নেয়া হয়েছে, তাদের ৭৮ শতাংশ বলেছেন, সরকারি কাজ পেতে ঘুষ দিতে হয়। আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ঘুষ দিতে হয় বলে মত দিয়েছেন ৭৬ শতাংশ ব্যবসায়ী। ৭৪ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, কর পরিশোধে ঘুষ দিতে হয় এবং ৭৭ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হচ্ছে, রাজনীতিবিদদের নৈতিক অবস্থানের অবক্ষয় হয়েছে। ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি তহবিলের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া একটি সাধারণ প্রবণতা। বিচার ব্যবস্থা প্রভাবমুক্ত নয় বলে মনে করেন ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা। ঘুষের মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা যায় বলে মনে করেন ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা। মেধাসম্পদের সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল বলে মনে করেন ৭৩ শতাংশ ব্যবসায়ী। ৬১ শতাংশ মনে করেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে পর্যাপ্ত বিচার ব্যবস্থা নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বাজেটে যে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, তা সব খাত সমানভাবে পাচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব অনিয়মের কারণে এমন পক্ষপাতমূলক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে সরকার নতুন যেসব নীতি নিচ্ছে, তার প্রশংসা করেছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে এবং সেসব ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মতামতের প্রতিফলন হচ্ছে।

এতে আরো বলা হয়, অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন হলেও রেল যোগাযোগ এখনো আগের অবস্থায় রয়ে গেছে। তবে সড়ক, নৌ আকাশপথের যোগাযোগ আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়ায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো মানসম্মতভাবে প্রকল্প শেষ না হওয়ায় নতুন প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

ডব্লিউইএফ ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশকেও প্রতিবেদনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই থেকে সিপিডি বাংলাদেশে সংস্থাটির সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে। এবারো ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশের ওপর একটি সমীক্ষাও প্রকাশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।


. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশ ক্রমান্বয়ে উন্নতি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানো মানবসম্পদের উন্নয়ন করা দরকার।

অন্যদিকে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে অভ্যন্তরীণ বাজার কতিপয় ব্যবসায়ীর হাতে আটকে যায়নি। এখানে ছোট ব্যবসায়ীর সুযোগ থাকতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতি বন্ধে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

বছর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জরিপে ১৪২টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। গত বছর সংখ্যা ছিল ১৪০। এবার তিনটি নতুন দেশ যুক্ত হয়েছে। দেশটি তিনটি হচ্ছে বারবাডোজ, গ্যাবন মাদাগাস্কার। অন্যদিকে দুটো পুরনো দেশ লাইবেরিয়া সিয়েরা লিওন জরিপে অংশ নেয়নি বা তারা বাদ পড়েছে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে সিঙ্গাপুর এবার প্রথমবারের মেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে। আগের চেয়ে উন্নতি করেছে হংকং, নেদারল্যান্ডস সুইডেন। তবে সুইজারল্যান্ড, জাপান, জার্মানি যুক্তরাজ্যের অবস্থানের অবনমন হয়েছে।

সিঙ্গাপুর ভালো করার কারণ দেশটি ১২টি স্তম্ভের ১০টিতেই তাদের অবস্থান একেবারে শীর্ষপর্যায়ে নিয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ওইসিডি দেশগুলোর চেয়েও ভালো। তারা অবকাঠামোয় ভালো, স্বাস্থ্য-শ্রম-আর্থিক খাতেও তারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল। সুশাসনগত কারণে প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশটি। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ার কারণ বৈশ্বিক পর্যায়ে ব্যবসার অনিশ্চয়তা। কারণেই দেশটি ১২টির মধ্যে নয়টি স্তম্ভেই আগের চেয়ে পিছিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভেতরে শ্রীলংকা নেপাল উন্নতি হয়েছে। বাকি তিনটি দেশ ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশের অবনমন হয়েছে। ভারত ১০ ধাপ, বাংলাদেশের দুই ধাপ পাকিস্তানের তিন ধাপ অবনমন হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন