বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

গ্রামবাসীর বিক্ষোভ

আবরারের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি বুয়েট উপাচার্য

বণিক বার্তা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া

আবরার ফাহাদের গ্রামে গিয়েও তার বাড়িতে ঢুকতে পারেননি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। গ্রামবাসীর বিক্ষোভের মুখে পড়ে বাড়িতে না ঢুকেই কুষ্টিয়ায় ফিরে যান।

আবরারের পরিবারকে সমবেদনা তার কবর জিয়ারত করার জন্য সকালে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হন উপাচার্য সাইফুল ইসলাম। তার আগমনের কথা কুষ্টিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে আবরারের আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী গ্রামবাসী সকাল থেকেই বাড়ির সামনে অবস্থান নেন।

বিকাল সাড়ে ৪টা নাগাদ উপাচার্য আবরারের গ্রামের বাড়ি কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা পৌঁছান। সেখানে তিনি আবরারের বাবা বরকতুল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন আবরারের কবর জিয়ারত করেন। কবর জিয়ারত শেষে পরিবারকে সমবেদনা জানাতে নিহত আবরারের বাড়িতে যাওয়ার সময় গ্রামবাসী উপাচার্যবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা উপাচার্যকে ঘিরে রেখে আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর উপাচার্য সাইফুল ইসলাম দ্রুত সেখান থেকে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউজে চলে আসেন। সময় তার সঙ্গে ছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সোহরাব আবরার হোসেন, পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম প্রমুখ।

গ্রামবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আবরারকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলেও ভিসি তাকে দেখতে যাননি। আর এখন আসছেন কবর জিয়ারত করতে।

গত রোববার সন্ধ্যায় বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে যায় হলের কিছু ছাত্রলীগ নেতা। তাদের নির্যাতনের একপর্যায়ে গভীর রাতে হলেই মৃত্যু হয় তার।

শেরেবাংলা হল প্রভোস্টের পদত্যাগ: বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলনের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান। গতকাল বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের সামনে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ শিক্ষার্থীদের কথা জানান। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার জন্য শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বুয়েটে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা: আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের জবাবদিহি, বিগত নির্যাতনের বিচার, নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ১০ দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলেও জানিয়েছেন তারা। গতকাল বেলা ১১টায় শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন।


তাদের ঘোষিত ১০ দাবির মধ্যে প্রথমটিই হলো, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাসহ সিসিটিভি ফুটেজ জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে শনাক্তকারী খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় দাবিটি হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে শনাক্তকৃত সবাইকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে আজীবনের জন্য বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয় দাবিতে মামলা চলাকালীন সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের সব ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করার কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ দাবিটি হলো, দায়ের করা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করার জন্য প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পঞ্চম দাবিতে বলা হয়েছে অবিলম্বে চার্জশিটের কপিসহ অফিশিয়াল নোটিস দিতে হবে। ষষ্ঠ দাবি, বুয়েটে সাতদিনের মধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সপ্তম দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, সেটার জবাবদিহি করতে হবে। অষ্টম দাবি আবাসিক হলগুলোয় র্যাগিংয়ের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আগের ঘটনায় জড়িতদের ছাত্রত্ব বাতিলের পাশাপাশি বিচার করতে হবে। নবম দাবি, পূর্বে ঘটা ধরনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে ঘটা যেকোনো ঘটনা প্রকাশের জন্য একটা কমন প্লাটফর্ম থাকতে হবে। দশম এবং সর্বশেষ দাবিটি হলো রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উত্খাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার।

গতকাল দিনভর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে এবং ছাত্র রাজনীতির নানা সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। পরে সন্ধ্যা ৭টায় বুয়েটের হাজারো শিক্ষার্থী মোমবাতি প্রজ্বালন মৌন মিছিল করেন। বুয়েট শহীদ মিনার চত্বর থেকে তারা মৌন মিছিল বের করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক বৈঠকে বসে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। বৈঠক শেষে দুপুর আড়াইটায় শিক্ষার্থীদের সামনে এসে অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত, ভিসির পদত্যাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধসহ আট দাবি পেশ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন