মঙ্গলবার | অক্টোবর ২২, ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘটনাপ্রবাহ কড়চা

তানভীর শাতিল

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টকোরবানির ঈদের আগে তথা ঈদুল আজহার দিন দুয়েক আগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রবল প্রবাহে বাংলাদেশ অনেকটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার সম্মুখীন। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে নির্বাচন পূর্ববর্তী বছরে ক্ষমতাসীন দলের নাজুকতা বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, মানবতার শান্তির পথ বেছে নেয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। বাঙালি জাতির বাস্তুচ্যুত হওয়ার ইতিহাসের জায়গা থেকে কিংবা মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের সহমর্মিতার আকুলতার বিষয় মিলিয়ে জাতীয় মনস্তত্ত্বে মানবিকতার এক ঝড় ওঠে। মনে আছে, সেই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আর্তমানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাশাপাশি ধর্মীয় জাতিসত্তার টানও ধর্মপ্রিয় সাধারণ বাংলাদেশী নাগরিকদের মাঝে প্রবলভাবে লক্ষ করা যায়। এখানে আশ্রিত বাংলাদেশীদের হাত ধরে রোহিঙ্গারা তাদের চরম দুর্যোগের সময় জীবন বাঁচানোর প্রাথমিক সহায়তাটুকু পায়। স্থানীয় জনগণ তাদের সবটুকু উজাড় করে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ায়। দেশব্যাপী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে একটা প্রবল জনমত তৈরি হতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই ব্যাপকতা পায়, বাংলাদেশে আগত লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের ফলে স্থানীয়ভাবে যে সমস্যা ও মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল, তা সামাল দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষায় তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়। ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামলে ওঠে রাস্তার দুপাশে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনের প্রায় ছয় হাজার একর জায়গায় অস্থায়ী আবাস স্থাপন করার মাধ্যমে। জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে আন্তর্জাতিক মহল এ মানবিক বিপর্যয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। স্থানীয় বিভিন্ন উন্নয়ন ও মানবিক সংগঠনগুলোও এ মহা মানবিক বিপর্যয়ে এগিয়ে আসে।

রাতারাতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিস্তীর্ণ বনভূমি উজাড় হয়ে বাজারের সস্তা কালো পলিথিনের তৈরিপলি ঝুপড়ির অরণ্যে পরিণত হয়। ভাদ্রের প্রচণ্ড গরম ও বৃষ্টিময় সময় সেসব ছোটপলি ঝুঁপড়ির বনে কোনোভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেয় রোহিঙ্গারা। শুরুতে স্থানীয়দের মনে একটা ধারণা ছিল রোহিঙ্গারা একসময় তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাবে খুব সত্বরই। কিন্তু সব মানবিকতা, সহমর্মিতা ও বিশ্বাস ধীরে ধীরে উধাও হতে থাকে স্থানীয় বাংলাদেশীদের মন থেকে, যখন তারা দেখতে পায় রোহিঙ্গাদের এত বড় একটা প্রবাহ হওয়ার পর সারা বিশ্ব তাদের দিকে মনোযোগী হওয়া সত্ত্বেও তাদের সুষ্ঠু প্রত্যাবাসনে তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি তারা দেখতে পায় না। তাছাড়া এ অঞ্চলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমনের ঘটনা এটাই প্রথম না! সেই পুরনো রোহিঙ্গা সমস্যা যুগের পর যুগ কেটে গেলেও তার সুষ্ঠু কোনো সমাধান হয়নি আজও। স্থানীয়রা এবার ভেবেছিল যেহেতু অনেক রোহিঙ্গা এবার একসঙ্গে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সারা বিশ্ব এটা নিয়ে সজাগ হয়েছে, এ সমস্যার সমাধান অতিসত্বর হওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেগুলোর কার্যকরী কোনো লক্ষণ দেখতে না পাওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে হতাশা তৈরি করে। পরিস্থিতি আরো প্রকট হয়, বিশেষ করে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ-প্রতিবেশের যে ক্ষতি সাধন হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়া দুয়েক মাসের মধ্যে স্থানীয়দের মাঝে পরিলক্ষিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। আমার মনে আছে, ২০১৭ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের উদ্যোগে, স্থানীয়দের ওপর আগত বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কী চাপ পড়েছিল, তা বোঝার জন্য দুই সপ্তাহের একটা মাঠকর্ম পরিচালনাপূর্বক একটি বর্ণনাত্মক গবেষণা করা হয়েছিল, সে গবেষণায় স্থানীয়দের ওপর যে প্রভাবগুলো পর্যবেক্ষিত হয়েছিল, সেগুলো যেন কালের ব্যবধানে আরো জটিলতর হয়েছে। স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের মাঝে স্থানীয় সম্পদ ভাগাভাগির একটা বিষয় এখানে লক্ষ করা যায়। উপরন্তু রোহিঙ্গাদের ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম স্থানীয় হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে এক ধরনের না পাওয়ার আক্ষেপ তৈরি করে। অনেকের মুখে শোনা গিয়েছিল, ‘রোহিঙ্গাদের থেকে আমাদের অবস্থা বেশি খারাপ, তারা তো ত্রাণ পায়, আমরা তো তা পাই না, এর ওপর মজুরি কমে গেছে, পাহাড়ে যে লাকড়ি সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করতাম সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, পাহাড় হয়ে উঠেছে অনিরাপদ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির যে মূল্যবৃদ্ধি, সব মিলিয়ে আমাদের অবস্থা শোচনীয়। সামাজিক সৌহার্দ ও স্থিতিশীলতা শুরু থেকেই হুমকির মধ্যে ছিল, যা বর্তমান সময়ে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে মিডিয়ার উপস্থাপনার রাজনীতির মধ্য দিয়ে নানা নেতিবাচক খবর হয়ে জাতীয় আলোচনায় চলে আসে দুই বছর পর ২০১৯ সালের আগস্টে। ব্যক্তিগত মতামতের জায়গা থেকে বলব, মিডিয়ার এ উপস্থাপনের রাজনীতি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আসলে যেকোনো বিষয়কেই জাতীয় মানসিকতায় দৃঢ় মূলে গ্রথিত করতে পারে। আর মিডিয়ার ভূমিকা কতটা সরকারি তাঁবেদারি প্রসূত, তা অনেক সময়ই আলোচনায় আসে, তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিগত কিছু দিনে মিডিয়ার উপস্থাপনায় আমি কেমন যেন দ্বিধান্বিত হয়ে যাই, মানবতার খই ফোটানো মিডিয়া কীভাবে যেন কিছুবিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহকে একসূত্রে বাঁধার প্রয়াস চালায় এবং একটা সরলীকরণ বয়ান প্রস্তুতে উৎসাহী, এটা কি সরকারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে যে টানাপড়েন এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্যাবাসনকরণে ব্যর্থতা তা ঢাকার প্রয়াস? অনেকটা তড়িঘড়ি করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটা নেতিবাচক অবয়ব তৈরির প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়, আমি ভুলও হতে পারি। যদিও সাধারণ বাংলাদেশীদের মাঝে বেশ আগে থেকেই রোহিঙ্গা একটা গালি শ্রেণীয় শব্দে পরিণত হয়েছে।

২০১৯ সালের ২২ আগস্ট থেকে ঘটমান ঘটনাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করতে চাই, চীনের দূতিয়ালিতে মিয়ানমার সরকার ও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয় দ্বিতীয়বারের মতো। এর আগে একবার উদ্যোগ নিয়ে সফল না হওয়া সত্ত্বেও এবার কেন যেন বাংলাদেশ সরকার চীনের উপস্থিতিতে বেশ আশাবাদী হয়ে ওঠে। কিন্তু এটা যে সুদূরপরাহত আশায় পরিণত হবে, তা যেন সরকার আগে থেকে আঁচই করতে পারেনি, অন্তত ২২ তারিখে সরকারের উদ্যোগ এবং একটি রোহিঙ্গা পরিবারও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসিত না হওয়ার ঘটনা এমনই বার্তা দেয়।

যেখানে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই মনে করে, এখনো মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি, এমনকি রোহিঙ্গাদের পূর্ববর্তী প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা থেকে মিয়ানমার সরকারের প্রতি যে অবিশ্বাস সেগুলো দূরীকরণে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। পাশাপাশি মিয়ানমার সেনাবাহিনীনির্ভর সরকার রাখাইন বা আরাকান কিংবা মিয়ানমারজুড়ে যে উগ্র বুড্ডিস্ট মানসিকতার আবাদ করছে, তার দিকেও কাউকে নজর দিতে দেখা যায় না। রোহিঙ্গারা তাদের বসতভিটা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর নানা সময়ই তাদের অধিকারের কথা বলে আসছে, কিন্তু তারা এতটাই বঞ্চিত যে তাদের স্বর আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের কানে পৌঁছে না। মিয়ানমারে যে গণহত্যা হয়েছে, তার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এগুলো নিয়ে তেমন তোড়জোড় চোখ পড়ে না কোনো মহলেই। এতসব বিষয় যেখানে কাজ করছে, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আশাবাদী হয়ে ওঠে কেমন করে? তাছাড়া স্বেচ্ছায় প্রত্যাসন করানোর জন্য কি বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় যথাযোগ্য প্রাথমিক কাজ করতে পেরেছে? আমি সন্দিহান। প্রত্যাবাসন দূরের কথা, প্রাথমিকভাবে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসান চরে নেয়ার যে কথা, সে বিষয়ে সরকার কি পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে পেরেছে! আমি অনেক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা মনে করে ভাসান চরে নিয়ে যাওয়া মানে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া, যদিও সরকার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে? তারা অনেকেই মনে করে, সেখানে বাঘ আছে, বর্ষায় তলিয়ে যায় ইত্যাদি। এখন যখন সরকারের ওপর মহল থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তাদের প্রয়োজনে জোর করে ভাসান চরে স্থানান্তর করা হবে, তা আরেকটা উদ্বেগের জন্ম দেয়। এখানে মানবতা কি তবে কেবলই মুখের বুলি!?

ব্যর্থ প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ২২ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ঘটনাপ্রবাহ জোড়া লাগালে দেখা যায়, স্থানীয়-রোহিঙ্গাদের মাঝে খুনাখুনি, ক্রসফায়ারের মাঝে ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হওয়া ও গণহত্যার স্মরণে আয়োজিতদোয়া অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের গণজমায়েত সরকারের টনক নাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি এতদিন ধরে মানবিকতার বুলি ফোটানো মিডিয়াগুলো রাতারাতি রোহিঙ্গাদের নানা নেতিবাচক গুণাবলি নিয়ে নিউজ পয়দা করতে থাকে। এখানে লক্ষণীয়, জাতীয় মিডিয়াগুলো কীভাবে রোহিঙ্গা জাতিকে চিত্রায়িত করে একটা সমস্যাজনক জাতিগোষ্ঠী হিসেবে। আসলেই কি জীবনের তাগিদে, বঞ্চনা আর নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা সবাই খারাপ, রোহিঙ্গারা কিখারাপ একটা জাতি!!?

রোহিঙ্গাদেরজনসভা কিংবাস্মরণসভা বাদোয়া অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারের সব মহল ও মিডিয়া সোচ্চার হয়ে ওঠে, এত বড় জমায়েত দেখার জন্য কোনোভাবেই কেউ প্রস্তুত ছিল না, আসলে কি নির্যাতিতরা ঐক্যবদ্ধ হলে রাজদণ্ড কেঁপে ওঠে, সে যে আঙিকেই হোক! রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা সময়ে ঘুরে নানাজনের সঙ্গে কথা বলে আলোচনা করে জানতে পারি রোহিঙ্গাদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার উদ্যোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তারা নিজেদের অধিকারের কথা নিজেদের স্বরে বিশ্বমহলে তুলে ধরার প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। দৃশ্যত তাদেরনেতা মুহিবুল্লাহ একদিনে হুট করে তৈরি হয়নি! তাছাড়া রোহিঙ্গা ভয়েজ তৈরি হওয়ার জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও গোপন সংস্থা কাজ করেনি, তা-ইবা নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলা যাবে? কেননা মুহিবুল্লাহ (রোহিঙ্গা প্রতিনিধি) মার্কিন মুলুকে ঘুরে আসে, তাদের আর্জি জানিয়ে আসে সরকারের নাকের ডগার ওপর দিয়ে, তখন সরকারের তত্পরতা চোখে পড়েনি। হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ চালান হয়ে যায়, সেখানেও সরকারের তেমন নড়াচড়া চোখে পড়ে না, কেবল পলিটিক্যাল দোষারোপ করা ছাড়া, যে রোহিঙ্গাদের বিএনপি সরকার পাসপোর্ট দিয়েছে ইত্যাদি। [বাকি অংশ আগামীকাল]

 

তানভীর শাতিল: উন্নয়ন গবেষক, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন