বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ হচ্ছে তালিকাভুক্ত ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ

মেহেদী হাসান রাহাত

বস্ত্র খাতের কোম্পানি শাশা ডেনিমসের ৫৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছর। এরই মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি। তবে এখন পর্যন্ত ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ রেখেছে শাশা ডেনিমস।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগামী পাঁচ বছর বা ২০২৪ সালের মধ্যে মেয়াদ শেষ হচ্ছে সাত কোম্পানির ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এর মধ্যে আছে সামিট পাওয়ারের আটটি, ডরিন পাওয়ারের তিনটি এবং ওরিয়ন খুলনা পাওয়ারের দুটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র। একই সময়ের মধ্যে মেয়াদ শেষ হবে বারাকা পাওয়ার, জিবিবি পাওয়ার শাহজীবাজার পাওয়ারের একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের।

দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে একসময় ছোট আকারের এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। কিন্তু স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা এরই মধ্যে চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদনের অপেক্ষায় আছে বড় মাঝারি একাধিক কোম্পানি। নির্মাণাধীনও আছে বেশ কয়েকটি। অবস্থায় ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ যদি বাড়ানো হয়ও, সেক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ অর্থ পাবে না এসব কেন্দ্র।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ আর কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না। আমরা সিদ্ধান্তে অটল রয়েছি। আর গ্যাসভিত্তিক যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে যদি পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় এবং বিদ্যুতের চাহিদা থাকে, তাহলে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট নীতি অনুসরণ করব।

আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে সামিট পাওয়ারের। এর মধ্যে কোম্পানিটির জাঙ্গালিয়া-কুমিল্লার ৩৩ মেগাওয়াট, মাওনা-গাজীপুরের ৩৩, রূপগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জের ৩৩ উল্লাপাড়ার ১১ মেগাওয়াট কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। ২০২১ সালে শেষ হবে সামিটের ১০২ মেগাওয়াটের এসএনপিএল, ২৪ দশমিক ৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মাধবদী- ১৩ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার চান্দিনা- বিদ্যুৎকেন্দ্রটির। আর কোম্পানিটির ৩৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার আশুলিয়া-সাভার- বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এসএনপিএল হচ্ছে এইচএফওভিত্তিক। বাকিগুলো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

জানতে চাইলে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক এবং সামিট করপোরেশনের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল করিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার বর্তমানে দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটিকে আমরা স্বাগত জানাই। তাছাড়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যদি কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে সরকার নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট নীতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে মেয়াদে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়, সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রটিতে বিনিয়োগকৃত অর্থ, ঋণের টাকা মুনাফা উঠে আসে। ফলে মেয়াদ শেষ হলেও তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ এখানে উদ্যোক্তাও মুনাফাসহ বিনিয়োগ ফেরত পেয়েছেন। আবার শেয়ারহোল্ডাররা তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে বছর বছর আকর্ষণীয় হারে লভ্যাংশ পেয়েছেন। তাছাড়া তারা এটা জেনেই বিনিয়োগ করেছেন যে ১৫ বছর পর কেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। তবে আমি মনে করি, তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এর বিকল্প কী হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা থাকা উচিত।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বারাকা পাওয়ারের ৫১ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। কেন্দ্রটি থেকে বিপিডিবি ১৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে। কেন্দ্রটি বারাকা পাওয়ারের শতভাগ মালিকানার।

জিবিবি পাওয়ারের ২২ দশমিক ৮০ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৩ সালে। কেন্দ্রটি থেকে ১৫ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি রয়েছে বিপিডিবির। ২০১২ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর জিবিবি পাওয়ার বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে নতুন করে আর কোনো কেন্দ্র চালু করতে পারেনি। গ্যাসের দাম নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানিটির সঙ্গে জিবিবি পাওয়ারের বিরোধ নিষ্পত্তি করে গত বছর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সালিশি ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে। রায়ে কোম্পানিটিকে ২০টি সমান কিস্তিতে ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী তিন হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা শেয়ারপ্রতি আয়ে (ইপিএস) নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে শেয়ারহোল্ডারদের জানিয়েছে কোম্পানিটি।

জিবিবি পাওয়ারের কোম্পানি সচিব এসএম হেদায়েতুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাসচালিত। তাই মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে নিশ্চয় যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। তাছাড়া আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হতে আরো চার বছর বাকি। আমরা বিষয়টি নিয়ে সচেতন আছি এবং বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনাও রয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ের দিকে আমরা শেয়ারহোল্ডারদের কাছে কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরব।

খুলনা পাওয়ারের ১১৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেপিসিএল- এবং ৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেপিসিএল- বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ সালে। এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্র দুটির সঙ্গে বিপিডিবির ১০ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি রয়েছে। এছাড়া খুলনা পাওয়ারের ১১০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ গত বছর শেষ হয়েছে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হলেও বিপিডিবির পক্ষ থেকে এখনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

খুলনা পাওয়ারের পরিচালক ফয়সাল করিম খান জানান, বিপিডিবির কাছে কেপিসিএল- বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার কারণে সরকার এটির মেয়াদ বাড়াতে চাইছে না। তবে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।

শাহজীবাজার পাওয়ারের গ্যাসভিত্তিক ৮৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসপিসিএল- বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। কেন্দ্রটি থেকে ১৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি রয়েছে বিপিডিবির।

ডরিন পাওয়ারের টাঙ্গাইল নরসিংদীর বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি ২০২৩ সালে এবং ফেনীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হবে। প্রতিটি ২২ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাসচালিত।

ওরিয়নের এইচএফওভিত্তিক ওপিএমএল ডিবিপিএএল বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ সালে। কেন্দ্র দুটির প্রতিটির সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট।

তাছাড়া ইউনাইটেড পাওয়ারের গ্যাসভিত্তিক ৫৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার ইউইএল-আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বছরের জুনে। এরই মধ্যে সরকারের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইউনাইটেড পাওয়ারের একজন কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে এর উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে এরই মধ্যে কেন্দ্রটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। আশুগঞ্জে আমাদের পাশেই এগ্রিকোর একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। তারাও মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে। কিন্তু বিপিডিবি তাদের যে দর দিতে চাইছে তাতে তারা সন্তুষ্ট নয়। তারা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

এদিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ছয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। সামিট পাওয়ারের তিনটি এবং খুলনা পাওয়ার, ইউনাইটেড পাওয়ার শাশা ডেনিমসের একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে এর মধ্যে। গত বছর মেয়াদ শেষ হওয়া সামিটের আশুলিয়া-সাভার-, মাধবদী- চান্দিনা- বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রতিটির সক্ষমতা ১১ মেগাওয়াট। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সামিটের পক্ষ থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে পাঁচ বছরের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। ট্যারিফ নিয়ে আলোচনা চলাকালীন আরইবির কাছ থেকে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন চালু রাখার অনুমোদন পেয়েছে সামিট। আর বন্ধ রয়েছে খুলনা পাওয়ারের কেপিসিএল-, ইউনাইটেড পাওয়ারের ইউইএল-আশুগঞ্জ শাশা ডেনিমসের ইপিসিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন।

শাশা ডেনিমসের কোম্পানি সচিব আসলাম আহমেদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর জন্য বিপিডিবির কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু মেয়াদ বাড়ানো হবে কিনা বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কিছু জানানো হয়নি। তাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন