শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

খবর

ডাম্পিং স্টেশনে স্থান সংকট

লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি ধরেও ছেড়ে দিচ্ছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় দুটি ডাম্পিং স্টেশন ছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একটি ছিল আগারগাঁও থানার ঠিক পাশে। এখানে মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা বিভিন্ন মোটরযান রাখা হতো। আরেকটি ডাম্পিং স্টেশন ছিল তালতলায়। অর্থনৈতিক আয়ু পার হওয়া লক্কড়-ঝক্কড় মোটরযানের ঠাঁই হতো এখানে। বর্তমানে আগারগাঁও থানাসংলগ্ন ডাম্পিং স্টেশনটি তুলে দেয়া হয়েছে। এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অন্যদিকে মেট্রোরেলের চলমান কাজের কারণে পরিসর কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে তালতলার ডাম্পিং স্টেশন। এখানে ব্যবহার অনুপযোগী গাড়িতে তিল ধারণের জায়গা নেই। তাই আনফিট লক্কড়-ঝক্কড় যান ধরেও ছেড়ে দিচ্ছে পুলিশ।

আগারগাঁওয়ের ডাম্পিং স্টেশনটি আবার ডিএমপির স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নয়। পরিসংখ্যান ভবনের সামনের সড়কের একাংশ সাময়িকভাবে ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এর বাইরে আরো তিনটি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে ডিএমপির। শাহবাগ, কাঁচপুর যাত্রাবাড়ীতে রয়েছে এসব স্টেশন। এর বাইরে ছোট পরিসরে দুটি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে গাবতলী দারুস সালাম এলাকায়। ঢাকার ৪৯টি থানাতেও কিছু গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে থানাগুলোয় সচরাচর মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা গাড়িগুলোই রাখা হয়। সরেজমিন ঢাকার ডাম্পিং স্টেশনগুলো ঘুরে সবকটিতেই জায়গার স্বল্পতা (স্থান সংকট) লক্ষ করা গেছে। কোনোটির নেই নতুন করে গাড়ির রাখার সক্ষমতা। পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কোনো গাড়ি এলে সেগুলো আর ডাম্পিং এলাকায় রাখা যাচ্ছে না। রাখতে হচ্ছে রাস্তার ওপর।

ঢাকায় আনফিট গাড়ি পাঁচ লাখের বেশি। এর একটা বড় অংশ রাস্তায় চলার অনুপযোগী। আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া এসব গাড়ি চাইলেও ডাম্পিংয়ে পাঠাতে পারছে না পুলিশ। রাজধানীতে পুলিশের যে তিনটি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে, তার সবই পুরনো গাড়িতে টইটম্বুর। ডাম্পিং স্টেশনে জায়গাস্বল্পতার কারণে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িকে মামলা দিয়েই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। যেগুলো ফের অবাদে চলাচল করছে রাস্তায়।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সর্বশেষ সভাতেও বিষয়টি তুলেছেন ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সভায় পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকা শহরের লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু পুলিশের ডাম্পিং জোনে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এসব যানবাহন জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গত ২১ আগস্ট পর্যন্ত তথ্য বলছে, সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা লাখ ৩৭ হাজার। আইন অনুযায়ী, প্রতিটি মোটরযানকে এক বছর পর পর ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করতে হয়। মোটরযানের ফিটনেস সনদ হালনাগাদ না থাকলে সেটিকে আনফিট গাড়ির কাতারে ফেলা হয়।

বিআরটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোটামুটি দুই ধরনের আনফিট গাড়ি রাস্তায় চলছে। প্রথমটি হলো সেসব গাড়ির ফিটনেস সনদের মেয়াদ কয়েক দিন বা কয়েক মাস আগে শেষ হয়েছে। গাড়ির মালিক আলসেমি বা অন্য কোনো কারণে সনদ হালনাগাদ করতে দেরি করছেন। ধরনের গাড়িগুলো সাময়িক ফিটনেস সনদবিহীন থাকলেও পরে সেটা হালনাগাদ করে নেন।

আরেক ধরনের আনফিট গাড়ি আছে, যেগুলোর ফিটনেস সনদ বছরের পর বছর ধরে হালনাগাদ হয় না। এগুলোর কোনোটি রাস্তায় চলছে, আবার কোনোটি হয়তো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। যেগুলো চলছে, সেগুলো ডাম্পিংয়ের ভয়েই মালিকরা ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করছেন না বলে জানিয়েছেন বিআরটিএর কর্মকর্তারা।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ পুরনো লক্কড়-ঝক্কড়, ফিটনেসবিহীন যানবাহন। শুধু দুর্ঘটনা নয়, পরিবেশ দূষণেও সমান দায়ী এসব যান। ইউএসএআইডির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বছরে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হয়, তার ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ উৎপাদন করে পরিবহন খাত। বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক . মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের দেশে যেসব গাড়ি আমদানি করা হয়, সেগুলোর একটা বড় অংশ কিন্তু পুরনো। উন্নত দেশে যখন কোনো গাড়ি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তখনই তারা সেসব গাড়ি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পাঠিয়ে দেয়। পুরনো গাড়ি আবার আমাদের দেশে ১০-১৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে চলে। যেখানে একটি গাড়ির গড় আয়ু ১০-১২ বছর, সেখানে আমাদের দেশে চলছে ২০-২৫ বছরের পুরনো গাড়ি। পুরনো গাড়িগুলো রাস্তায় চলাচল করায় একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি যানজট, বিশৃঙ্খলা দুর্ঘটনাও বাড়ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ডাম্পিং স্টেশনগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আগারগাঁওয়ে দুটি ডাম্পিং স্টেশনের মধ্যে একটি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে যে চারটি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে, সেগুলোয় আর গাড়ি রাখার জায়গা নেই। এজন্য অনেক ক্ষেত্রেই বড় যানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বেশকিছু জমির জন্য আবেদন করা হয়েছে, তবে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন