শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

চসিকের লিজ বাণিজ্য

সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ফুটপাতে উদ্যানে নির্মাণ হচ্ছে দোকান

ওমর ফারুক চট্টগ্রাম ব্যুরো

ওআর নিজাম রোডের প্রবর্তক মোড় থেকে পাঁচলাইশ মোড়। চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম সড়কে প্রায়ই লেগে থাকে যানজট। তীব্র যানজটের সময় গন্তব্যে পৌঁছাতে ফুটপাতই ব্যবহার করে মানুষ। সম্প্রতি সৌন্দর্যবর্ধনের নামে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাছ থেকে জমি বরাদ্দ নিয়ে ফুটপাতে দোকান নির্মাণ করেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

ওআর নিজাম রোডে শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির বিপরীতে রাস্তা ঘেঁষে নির্মাণ করা দোকান দুটির একটি হচ্ছে ফ্রেশ ফুড রেস্টুরেন্ট, অন্যটি ওষুধের দোকান শ্রেষ্ঠা মেডিসিন

জানা গেছে, সিটি করপোরেশন থেকে চুক্তিতে জমি লিজ নিয়ে ফুটপাতের ওপর দোকান নির্মাণ করেছে গ্রিড ওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চসিকের লিজ বাণিজ্যকে আড়াল করতে দোকানের দুই পাশে বসানো হয়েছে কয়েকটি ফুলের টব।

চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে বছর খানেক আগে ফুটপাতে চারটি দোকান গড়ে ওঠে। চারটি দোকানই যাত্রী ছাউনির নামে বরাদ্দ দেয়া জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে। দোকানগুলোর একটি ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটপাতে এবং অন্য তিনটি পিডিবি আবাসিকের পূর্ব পাশে অবস্থিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, জামালখান মোড়ের দোকানগুলোর বিনিময়ে বড় অংকের টাকা পরিশোধ করেছে লিজ গ্রহীতারা। কিন্তু সেই টাকার খুব অল্পই সিটি করপোরেশনের ফান্ডে গেছে। বাকি টাকা লুট করেছে করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তিরা।

বর্তমানে জামালখান মোড়ের পশ্চিম পাশে নালার ওপর অ্যাকুয়ারিয়াম দোকানের জন্য স্থাপনা নির্মাণ করছে একটি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এক কাউন্সিলরের কাছ থেকে দোকানগুলো চুক্তিভিত্তিক লিজ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নালা ফুটপাতের ওপর স্লাব বসিয়ে তার ওপর তিনটি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এখন অ্যাকুয়ারিয়ামগুলোর কাজ করছে লিজ নেয়া প্রতিষ্ঠান। কর্মরত শ্রমিকরা জানান, দুটি স্থাপনার মধ্যে একটিতে অ্যাকুয়ারিয়াম স্থাপন করা হবে। ৪০ বর্গফুট আয়তনের স্থাপনাটিতে দুটি অ্যাকুয়ারিয়াম থাকবে। অন্য স্থাপনায় অ্যাকুয়ারিয়ামের যন্ত্রপাতিগুলো রাখা হবে। পরে দোকান নির্মাণ করা হবে।

সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ একেএম রেজাউল করিম বলেন, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ কাজটি করছেন। করপোরেশনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন নিয়ে কাজগুলো করা হচ্ছে। সৌন্দর্যবর্ধনের কাজগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেখানে বাণিজ্যিক স্টল হিসেবে অ্যাকুয়ারিয়াম বসানো হচ্ছে। এসব স্টল থেকে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজগুলো রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করা হবে।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ দাবি করেন, এলাকার মানুষের বিনোদন সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য অ্যাকুয়ারিয়াম নির্মাণ করছেন। এজন্য ফুট নালার প্রশস্ততা মাত্র ফুট কমিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।

এদিকে নগরীর বিপ্লব উদ্যানে আধুনিকায়নের নামে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দোকান নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। উদ্যানটি ২০ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠান দুটিকে ইজারা দেয়া হয়েছে। এখন সেখানে দোকান সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। 

১৯৭৯ সালে দুই একর জমির ওপর গড়ে তোলা উদ্যানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য গত বছরের ২৮ নভেম্বর রিফর্ম লিমিটেড স্টাইল লিডিং আর্কিটেক্টস লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে সিটি করপোরেশন। উন্নয়ন প্রকল্পের নাম দেয়া হয়েছে প্রাণের স্পন্দন বেসরকারি অর্থায়নে উদ্যানটি আধুনিকায়ন করা হবে।

নগরের অন্যতম উন্মুক্ত স্থান বিপ্লব উদ্যানে দোকান নির্মাণের অনুমতি দেয়ায় সিটি করপোরেশনের সমালোচনা করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। এতে উদ্যানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হবে বলে মন্তব্য তাদের।

তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা বলেন, বিপ্লব উদ্যানের আধুনিকায়নের দায়িত্ব যারা নিয়েছেন তারা স্থপতি। আর উদ্যানে যারা ঘুরতে আসবেন মূলত তাদের জন্য দোকান করা হবে। সেখানে হালকা খাবার শোপিসের দোকান থাকবে। লাইব্রেরিও থাকার কথা। এভাবে করা হলে পার্কের পরিবেশ বিঘ্ন ঘটার কথা নয়।

সরেজমিন বিপ্লব উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, উদ্যানের স্মৃতিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে মাটি ভরাটের কাজ শেষ। বিভিন্ন অংশে রাখা হয়েছে নির্মাণ উপকরণ সামগ্রী। একপাশে দোকানের জন্য অবকাঠামো স্থাপনের কাজ চলছে।

বিষয়ে স্টাইল লিডিং আর্কিটেক্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান স্থপতি মিজানুর রহমান বলেন, উদ্যানের সৌন্দর্যবর্ধন আধুনিকায়নে প্রায় কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। উদ্যানের একপাশে ফুড কোর্টে ২৫-৩০টি দোকান থাকবে। আধুনিকায়নের কাজ শেষে আগামী নভেম্বরে উদ্যান উন্মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যানে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই স্বস্তিতে ঘুরতে পারবেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সিসি ক্যামেরা থাকবে।

চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় ক্রিকেট ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেয়া অনেক খেলোয়াড়ের হাতেখড়ি নগরীর আউটার স্টেডিয়াম থেকে। গত কয়েক বছর আগে মাঠটির অর্ধেক দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে সুইমিংপুল। এরপর বাকি অংশে সৌন্দর্যবর্ধণের নামে বসানো হয়েছে তিনটি দোকান। আরো কয়েকটি দোকান নির্মাণাধীন রয়েছে। চট্টগ্রামে এক সময় খেলাধুলার জন্য বিখ্যাত এলাকাটি এখন খাবারের জোন হিসেবে পরিণত হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে পুরো এলাকাটি লিজ দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া নগরীর নিউমার্কেট এলাকার জিপিওর সামনে ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সামনের ফুটপাতেও দুটি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। সড়ক বা ফুটপাতের ওপর এসব দোকান নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সিটি করপোরেশন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক রাশিদুল হাসান বলেন, ফুটপাত মানুষের নির্বিঘ্নে হাঁটার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। নালা দিয়ে পানি চলাচল করবে। তা না করে সৌন্দর্যবর্ধন বা অন্য যেকোনো উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এভাবে নালা ফুটপাত দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই উচিত নয়। ধরনের ছোট ছোট অপরিকল্পিত স্থাপনাগুলোর কারণে নগরের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নগরের নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানের চারপাশে প্রচুর দোকান রয়েছে। তাই উদ্যানের ভেতরে নতুন করে দোকান স্থাপনের প্রয়োজন নেই। দোকান নির্মাণ করা হলে উদ্যানের উন্মুক্ত পরিসরের জায়গা কমবে। আবার খাবারের দোকানের ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকবে। অনেক সময় দোকানগুলোতে ক্রেতাদের আসা-যাওয়ার কারণে কিছু জায়গা অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তির লাভ ছাড়া নগরবাসীর কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন