শনিবার | নভেম্বর ২৩, ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

আমেরিকার ‘আর্জেন্টিনা ঝুঁকি’বিষয়ক পর্যালোচনা

কৌশিক বসু

চারদিকে পুঞ্জীভূত যে বিশ্বাসটি ক্রমে গাঢ় হচ্ছে তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক মন্দার দিকে ধাবিত। যথাসম্ভব ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই দেশটি ওই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। বতর্মান অর্থনৈতিক তথ্য পরিসংখ্যান মোতাবেক আমেরিকার অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্র স্পষ্টতই চাপের মুখে রয়েছে। যদিও বিষয়টি আমার কাছে সুস্পষ্ট নয়। তবে যাই হোক, আর্থিক মন্দা তাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এমনকি আমেরিকার আসল বিপদটি কিন্তু আরো বেশি ভয়াবহ। একে আমেরিকার আর্জেন্টিনা ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আর এটি হচ্ছে সবচেয়ে সেরা সম্বোধন।

বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকজুড়ে আর্জেন্টিনা ছিল বিশ্বের দ্রুতবর্ধমান অর্থনীতির একটি। কার্যত সে সময় অন্য কোনো দেশের তুলনায় মাথাপিছু মেধাবী অভিবাসী আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় তারা। ফলস্বরূপ জার্মানি কিংবা ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনা বিশ্বের ১০ ধনী দেশের তালিকায় জায়গা করে নেয়।

তবে ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনার প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসে ফেলিক্স উরিবুরুর নেতৃত্বে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাসনক্ষমতার হাতবদলের মাধ্যমে রাতারাতি সবকিছু বদলে যায়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান, অভিবাসন স্থগিত আর শুল্কযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৩০ ১৯৩৩ সাল নাগাদ আর্জেন্টিনা এর গড় আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি নিয়ে যায়। ফলে আকস্মিক আর্থিক মন্দার ঘটনা না ঘটলেও ধীরগতির মন্দার দিকে ধাবিত হয় দেশটি, কয়েক যুগ অতিক্রান্ত হলেও আর্থিক মন্দার ওই আঁচড় আজো স্পষ্ট। ধনী অবস্থা থেকে একটি রাষ্ট্র কীভাবে পথ হারিয়ে ফেলতে পারে, সে সম্পর্কে আর্জেন্টিনার উদাহরণটি একটি সতর্কতামূলক গল্পে পরিণত হয়েছে।

আমেরিকান অর্থনীতি তার বৈশ্বিক কর্তৃত্ব ধরে রেখেছে। যদিও সম্প্রতি আমরা তা দেখতে পারছি না, বরং ক্রমে মেরুকরণ আর বেদনাদায়ক পরিস্থিতিই আমরা অবলোকন করছি। রাষ্ট্রটির নিচের দিকে ধাবমান পাক খাওয়া পরিস্থিতি দেখে আমার স্মৃতিরা আমাকে প্রায় সিকি শতাব্দী পেছনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ১৯৯৪ সালে আমি যখন সপরিবারে ভারত থেকে আমেরিকায় চলে আসি, তখন আমি আমার সহধর্মিণী এই ভেবে চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ি যে অপরিচিত সংস্কৃতি, নতুন সমাজের সঙ্গে আমরা কীভাবে মানিয়ে চলব এবং আমাদের সন্তানরা কি আদৌ তাদের নতুন বিদ্যালয়গুলোয় গ্রহণযোগ্য হবে? আমরা খুব দ্রুত আশ্বস্ত হয়েছিলাম।

নতুন অন্বেষণে আগ্রহী হিসেবে কিছুদিনের মধ্যেই আমরা স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে সংগীত উৎসবের খবর পেয়ে তাতে যোগদানের জন্য ইথিকার শহরতলি থেকে সেখানে ছুটে গেলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের ধারণা ভাঙে আর আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারি। তা হলো, উৎসবটি মূলত ছিল সমকামী যুগলদের জন্য। আমেরিকান চিত্রকর গ্রান্ট উডের ইন্ডিয়ান গথিক-এর মতো আমরা কয়েকজনপিতা, মাতা, পুত্র কন্যাব্যথিত বৃদ্ধাঙ্গুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ আমরাও উৎসবে আসা বাকি অংশগ্রহণকারীর মতোএমনটা ভান করার কোনো সুযোগই ছিল না। কিন্তু হঠাৎ বিস্মিত হলাম। আমাদের দৃশ্যমান অসহায়ত্ব দেখে অনেকেই এসে আমাদের সঙ্গে গল্প করা শুরু করল, কেউ কেউ হাসির সব কৌতুক শোনাল আর আমাদের সন্তানদের সঙ্গে হাসি আড্ডায় মেতে উঠল। আমরা মূলত একটি মুক্ত সহনশীল সমাজে বাস করছিবিষয়টি উপলব্ধি করে সেদিন আমরা যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলাম।

তো ওই সময়ের পর আমেরিকায় কী এমন ঘটল? বিশেষ করে স্বতন্ত্র আচরণগত জায়গাগুলোয়? কিছুই নয়। আমেরিকা আজো তেমন আছেস্বাধীন, সভ্য, বিনয়ী। আপনি যখন এখানে এসে উবারচালক, কফিশপকর্মী রাস্তার পাশের বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলবেন, তখন বিষয়টির প্রমাণ পাবেন। তবে আমি কিন্তু ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর উদাহরণ টানছি না, যেখানে আগে থেকে ঠিক করে দেয়া প্রশ্নটি জিজ্ঞাসার পর বলা হয়, দুর্দান্ত প্রশ্ন আর আপনার উত্তরটি খারাপ হলেও চমত্কার জবাব হিসেবে স্বীকৃত হবে। কিছু সামাজিক পরিস্থিতিতে কথা বলাটা সমীচীন নয়, কেননা কেউ হয়তো ভিন্ন শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ’—অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসনের উপদেশ আজ পরিষ্কার সহজাতভাবেই আমেরিকানরা উপলব্ধি করতে পারছে।

পরিবর্তন যা হয়েছে তা হলো রাজনীতি। ধাঁধাটি হচ্ছে, সাধারণ আমেরিকানরা কেনযদিও কোনোভাবেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ট ট্রাম্পকে সমর্থন করছে, বিশেষ করে তিনি যখন তাদের মতো নন; যিনি কিনা মহানুভবতা, শিষ্টাচার আর সহানুভূতির মতো গুণাবলি নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন এবং ভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য যার উদ্বেগ যৎসামান্যই।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই বোঝা জরুরি যে গোটা বিশ্ব একটি প্রযুক্তিগত মন্থনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেমনটি সর্বশেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল শিল্প বিপ্লবের সময়ে। সাধারণ শ্রমিকদের জন্য জীবন ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। চাকরি পাওয়া দুষ্প্রাপ্য, স্বল্প পারিশ্রমিক আর অন্য সুযোগ-সুবিধাগুলোও উপেক্ষিত। আমেরিকানদের বেকারত্বের হার কম হওয়ার একটি কারণ দেশটির অনেক লোকই কাজ খুঁজতে আগ্রহী নয়। অর্থনীতিবিদদের দেয়া বেকারত্বের সংজ্ঞানুসারে কাজ করে না এবং কাজের সন্ধান করে না, এমন ব্যক্তিদের জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। রাস্তায় গৃহহীন যেসব আমেরিকানকে দেখা যায়, তাদের বেকার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় না।

অর্থনৈতিকভাবে এমন সংকটাপন্ন সময়ে সাধারণ মানুষ শক্তিশালী নেতাদের দিকে আশায় তাকিয়ে থাকে যে তারা হয়তো নীতি সংস্কারে জোর দেবেন। আমেরিকায় ট্রাম্প এমন কিছু নীতি ফেরি করেছেন, যা কিনা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে চূড়ায় তোলার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের মূল্য চুকানোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ধনীদের করছাড় দেয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, এটি সাময়িকভাবে চাহিদা উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এমন কর্তনের ফলে রাজস্বের ওপর চাপ পড়ার কারণে অর্জিত ফল আকার্যকর হবে। 

কম এমনকি নেতিবাচক সুদের হার ঘিরেও ট্রাম্প একইভাবে গোঁ ধরে আছেন। প্রাথমিকভাবে কম মূল্যের কারণে চাহিদা বাড়ে কারণ লোকেরা সঞ্চয় বা সংরক্ষণের জন্য আগ্রহী থাকে না। তবে যখন কম সুদের হারের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, লোকেরা অবসরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয়ের বিষয়ে চিন্তা করে; যা তাদের সঞ্চয়ের জন্য উৎসাহিত করে এবং ভোগপ্রবণতা লাগাম টেনে ধরে।

তাছাড়া যখন রাষ্ট্রের একটি গোষ্ঠীর ওপর সুদের হার অব্যাহত থাকবে, তখন হার বৃদ্ধির ফলে প্রথমত কারেন্সি অ্যাপ্রিসিয়েশন রফতানি মন্দার অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। ফলে কেউই অগ্রসর হবে না এবং স্বল্প সুদের ফাঁদে আটকা পড়বে। এমন স্বল্প কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন নীতি পুঁজি করে আমেরিকা বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে। পর্যায়ে গতিপথ বদলে নিলেও দুর্ভাগ্য এড়ানো সম্ভব হবে না।

পরিশেষে অভিবাসী আর বিদেশীদের বিরুদ্ধে ভীতি ছুড়ে দিয়ে আমেরিকার সমাজকে ট্রাম্প সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হতে উৎসাহী করছে, যেমনটা ঠিক ১৯৩০-এর দশকে আর্জেন্টিনার নেতারা করেছিলেন, যা দেশের সাফল্য উন্নয়নের গতিকে ক্রমে তলানিতে নিয়ে গেছে।

তবে চলমান পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে হলে কী করণীয় বা অবস্থায় ঠিক কোন নীতিগুলো কার্যকরী, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ নয়। সুস্পষ্ট ভুলগুলো এড়ানোটা কঠিন। পর্যায়ে একমাত্র নৈতিক সংকল্পসম্পন্ন নেতারাই চলমান পরিস্থিতির রক্ষাকবচ, যারা ভালো কিছু করার ইচ্ছাধারী; সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, সমাজের সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত শ্রেণী, যাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্যের প্রয়োজন, তাদের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ এবং যারা অন্যের প্রতি সমবেদনাসম্পন্ন মনোভাবের অধিকারী।

 দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানবিক তালিকা থেকে ট্রাম্প বাদ পড়ে যান। তাছাড়া অবাক হওয়ার কিছু নেই যে জনাকয়েক উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক নেতা তার মিত্র হওয়ার চেষ্টা করছেন; যা একটি মর্মান্তিক বিষয় হবে কেবল আমেরিকার জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য। তা হলো, আমেরিকা যদি তার বর্তমান নীতিতে অটল থাকে, তবে এটি তার আর্জেন্টিনা ঝুঁকিকে চরমভাবে বাড়িয়ে তুলবে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনে নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন