শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন মহাসড়ক

৮০ কিলোমিটারে ৪০০ অবৈধ পার্কিং স্পট

শামীম রাহমান ময়মনসিংহ থেকে ফিরে

চার লেনের প্রশস্ত মহাসড়ক। দ্রুতগতিতে চলছে সব গাড়ি। ওভারটেকিংও হচ্ছে। তবে খানিক পরপরই বিপত্তি বাধাচ্ছে রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা গাড়ি। কখনো গতি কমিয়ে, কখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক নিয়ে পেরোতে হচ্ছে এসব স্থান। ব্যস্ততম জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেনের মহাসড়কের যেখানে-সেখানে পার্কিংয়ের কারণে সরু রাস্তায় যানজটও দেখা দিচ্ছে নিয়মিত।

প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মহাসড়কটির ৮০ কিলোমিটারে জরিপ চালিয়েছে সড়ক জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) রোড ডিজাইন অ্যান্ড সেফটি সার্কেল জরিপে ৪০৯টি অবৈধ রোড সাইড পার্কিং স্পট পেয়েছেন সওজের কর্মকর্তারা। অবৈধ এসব পার্কিং স্পট তাত্ক্ষণিক উচ্ছেদ বা অপসারণের সুপারিশ করেছেন তারা।

ঢাকা থেকে টঙ্গী হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তায় গিয়ে দুদিকে চলে গেছে দুটি জাতীয় মহাসড়ক। একটি জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল-জামালপুর, যা জাতীয় মহাসড়ক এন--এর অংশ। অন্যটি জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, যেটিকে অভিহিত করা হয় জাতীয় মহাসড়ক এন- নামে। হাজার ৮০০ কোটি টাকায় নির্মিত জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন মহাসড়কটি চালু হয় ২০১৭ সালের জুনে। বর্তমানে মহাসড়কটি দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে সাড়ে ৩৬ হাজারের বেশি গাড়ি (মোটরাইজড নন-মোটরাইজড মিলিয়ে)

সরেজমিন পরিদর্শনেও মহাসড়কটিতে অসংখ্য অবৈধ পার্কিং স্পট চোখে পড়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালুর পর থেকেই মহাসড়কটির একটি অংশ অবৈধ পার্কিং অবৈধ দোকানপাটের দখলে চলে গেছে। ফলে চার লেনের সুফল একেবারেই পাচ্ছে না মহাসড়ক ব্যবহারকারী যানবাহন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, গাজীপুর চৌরাস্তা পার হলেই জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পার্ক করে রাখা আছে মোটরগাড়ির সারি। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, বাস-মিনিবাস, এমনকি পিকআপ, মাইক্রোবাসও পার্ক করে রাখা হয় সড়কের ওপর। চৌরাস্তা থেকে মাইলখানেক এগোলেই হাতের বাঁ পাশে চোখে পড়বে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) গাজীপুর বাস ডিপো। মহাসড়কের অংশে রয়েছে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। মাঝে মধ্যেই এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। কারণে চালকদের সতর্ক করতে ডিপোর সামনের অংশে দুর্ঘটনাপ্রবণ সাইনবোর্ড টানিয়েছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু সাইনবোর্ডের তোয়াক্কা না করে সড়কের একাংশ দখলে রেখে পার্ক করে রাখা হয়েছে বিআরটিসির গাড়ি।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এনা পরিবহনের গাড়ি চালান সেলিম ভূঁইয়া। অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে গাড়ি চালাতে কোন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, সড়কে বেশির ভাগ গাড়িই ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশি গতিতে চলে। গাড়ির চাপও অনেক বেশি। প্রায়ই ওভারটেক করা লাগে। কিন্তু রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ির কারণে ওভারটেক করতে সমস্যা হয়। আবার কিছু বাঁক রয়েছে, যার সামনে কী আছে তা গাড়ি থেকে দেখা যায় না। তখন সমস্যা হয়। অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সঙ্গে দুর্ঘটনাও ঘটে।

মহাসড়কটির জয়দেবপুর-ভালুকা অংশে রকম শতাধিক স্পট চোখে পড়ে, যেগুলোয় অবৈধভাবে পার্ক করে রাখা আছে অসংখ্য গাড়ি। কোথাও শুধু এক পাশ আবার কোথাও দুই পাশই চলে গেছে অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে। অবৈধ পার্কিং রয়েছে ভালুকা-ময়মনসিংহ অংশের বিভিন্ন স্থানেও।

অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন মহাসড়কের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক . মিজানুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, যানবাহন যেন নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সেজন্য সড়কটি প্রশস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু চালুর পর থেকেই এটি অবৈধ পার্কিংয়ের কবলে পড়েছে। ফলে আগের মতোই অনেকটা দুই লেন দিয়ে চলছে যানবাহন। আমি নিজেও কয়েক দিন আগে মহাসড়কটি ব্যবহার করেছি। অবৈধ পার্কিংয়ের পাশাপাশি অনেক অবৈধ হাটবাজারও চোখে পড়েছে, যেগুলো যান চলাচল বিঘ্নিত করছে।

অবৈধ পার্কিং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কিছু স্থানে তীব্র যানজটও তৈরি করছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিষয়টিতে আরো মনোযোগী হওয়া উচিত।

দেশের যেসব মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন নিষিদ্ধ, তার মধ্যে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কও রয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেদার চলতে দেখা গেছে অসংখ্য ত্রিচক্র যান। খোদ সওজ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতিদিন গড়ে হাজার ৬১৯টি নন-মোটরাইজড যানবাহন চলছে মহাসড়কে। এর বাইরে চলাচল করছে অসংখ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সেগুলো সোজা পথে যেমন চলছে, তেমনি চলছে উল্টো পথেও। রাস্তার একটা অংশ অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে। তার পাশ দিয়ে উল্টো-সিধাভাবে চলছে তিন চাকার যান। এসব বাদ দিয়ে যতটুকু ফাঁকা জায়গা মেলে, সেটুকু দিয়েই চলছে দূরপাল্লার গাড়ি।

সরকারের সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে মহাসড়কে মোটরযান পার্কিংয়ের বিষয়ে বলা আছে, নির্ধারিত এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও মোটরযান থামানো বা পার্ক করা যাবে না। এর ব্যত্যয় হলে হাজার টাকা জরিমানা সংশ্লিষ্ট চালকের পয়েন্ট কেটে নেয়ার বিধান রয়েছে। যদিও আইনের কোনো কার্যকারিতা নেই জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে।

জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এসব অবৈধ পার্কিংয়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হাইওয়ে পুলিশ গাজীপুর জোনের এসপি আলী আহমদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, মহাসড়কটিতে অবৈধ পার্কিং থ্রি-হুইলার চলাচলের মতো সমস্যা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সেগুলো উচ্ছেদ করার। তবে অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপের কারণে অবৈধ পার্কিং, থ্রি-হুইলার চালকদের বিরুদ্ধে চাইলেও ব্যবস্থা নেয়া যায় না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন