শনিবার | নভেম্বর ২৩, ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর

সহযোগিতার নতুন দিগন্ত প্রসারিত হোক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ভারতীয় শাখা ইন্ডিয়ান ইকোনমিক ফোরাম-২০১৯- যোগ দিতে আজ সকালে চারদিনের সফরে দিল্লি পৌঁছবেন। ওই ফোরামে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়াসহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের অগ্রগতি সমৃদ্ধি তুলে ধরবেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার সরকারের ব্যাপক সাফল্যের কথাও উল্লেখ করবেন। তিনি ভারতের বড় বড় বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে আরো বিনিয়োগেরও আহ্বান জানাবেন। এছাড়া তিনি ভারতের তিনটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের নেতাদের সঙ্গে আগামী শুক্রবার যৌথভাবে বৈঠক মতবিনিময় করবেন। বাংলাদেশ ভারতের শুধু নিকট প্রতিবেশীই নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অকৃত্রিম বন্ধু সুহূদ। দিল্লি বাংলাদেশের কাছে করিডোর, ট্রান্সশিপমেন্ট, শুল্কমুক্ত পণ্য পরিবহন বাণিজ্য সুবিধাসহ যখন যা চেয়েছে, তখনই তা পেয়েছে সহজে। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধে ভারতের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন সহযোগিতা সর্বদাই স্মরণ করা হয়। সে তুলনায় বাংলাদেশের চাহিদা প্রাপ্তি অনেক কম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় উজানে পানিপ্রবাহ প্রাপ্তির কথা। ভারত কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি আইনকানুন ভঙ্গ করে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অবরুদ্ধ করতে পারে না। অথচ ভারত তা- করেছে প্রথমে গঙ্গা এবং পরে তিস্তা অন্যান্য নদ-নদীতে বাঁধ ব্যারাজ নির্মাণ করে। সর্বশেষ ব্রহ্মপুত্রেও বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেছে। বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রেই ন্যায়ানুগ যুক্তিসংগত প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে দুঃখজনক হলো, গঙ্গার পানি নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা হয়নি; বরং ঝুলে আছে দীর্ঘদিন থেকে।

গত এক দশকে উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রথাগত খাত যেমন নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রভূত পরিমাণে বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন অপ্রচলিত খাত যেমন ব্লু ইকোনমি, মহাকাশ গবেষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উভয় দেশ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছে। আমরা মনে করি, আরো নানা ইস্যুতেই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। রোহিঙ্গা তিস্তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এনআরসি। ইউএন সফরে মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হলেও মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। হাসিনা-মোদির আনুষ্ঠানিক বৈঠকে আসাম থেকে অবৈধদের বাংলাদেশে পাঠাবে না ভারত সিদ্ধান্তই জানতে চায় মানুষ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবসময় ভারত বাংলাদেশের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক মহল কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ভারতের সরাসরি সমর্থন আদায় চায় জনগণ। আর তিস্তা নিয়ে তো মোদি বাংলাদেশ সফরে কথা দিয়েছিলেন, এটা তার সরকার বাস্তবায়ন করবে। তাই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এখন যা দরকার তা হলো, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এগুলো বাস্তবায়ন করা। মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশ, ভারতসহ প্রাকৃতিক সম্পদের অংশীদার অন্যান্য আঞ্চলিক দেশকে সম্পৃক্ত করে অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিশেষ করে স্থল জলপথে ট্রানজিট ট্রান্সশিপমেন্টের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে পারস্পরিক সুবিধা লাভের জন্য উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে ভৌগোলিক কারণে ভারত এক অনন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এবং ভারতের কাছেই এসব ক্ষেত্রে উদ্যোগ প্রত্যাশা করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাস দমন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত বিপর্যয় ঠেকাতে যথোপযুক্ত সহযোগিতার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের আলোকে অন্যান্য জটিল বিষয়কে ধরনের কাঠামোর আওতায় এনে বাংলাদেশ ভারত আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্পর্ককে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।

অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি সুসংবাদ। প্রক্রিয়ায় ইতিবাচকভাবে সব প্রতিবেশী দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। এতে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সংরক্ষিত হতে পারে বলে দেশটির অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশকেও ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ধারাকে বুঝতে হবে এবং প্রক্রিয়ায় ক্রিয়াশীল সব শক্তির সঙ্গে সমন্বয় বন্ধুত্ব করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের কূটনৈতিক কাঠামোকে আরো বেশি কার্যকর শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পেশাদার সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভারতনীতি প্রণয়ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া। বলা বাহুল্য, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিষয়টি ভাবাবেগ দ্বারা পরিচালিত নয়, বরং এটি একটি গভীর স্বার্থের বিষয়। এখানে প্রয়োজনে ছাড় দিতে হবে, প্রয়োজনে কূটনৈতিকভাবে দরকষাকষি করে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এজন্য দরকার একটি সামাজিক কূটনৈতিক বাতাবরণ কাঠামো তৈরি করা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন