বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

টকিজ

‘আমি দেখতে ভালো না, তাই অভিনেতা হতে পারব না!’

ফাহমিদা তাপসী

কখনো কঠিন অবয়বের ভেতরে থাকা নরম হূদয়ের বাবা হয়ে কাঁদিয়েছেন দর্শককে, কখনোবা দালাল কিংবা কাফনের কাপড়ের চোর হয়ে দর্শকের ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও পুরেছেন অর্জনের ঝুলিতে। যার সম্পর্কে এত কথা তিনি অভিনয়দক্ষতা দিয়ে দর্শকের খুব কাছে যেতে পারা অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। বছরেই মোট আটটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে ছোট পর্দায় বিচরণ। ঝানু অভিনেতার অভিনয়জীবনের নানা গল্প উঠে এসেছে আজকের আয়োজনে

অভিনয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার গল্পটা জানতে চাই।

শুরুটা আসলে ১৯৭৮ সালে। তখন আমি কলেজে পড়ি। সে সময় আমাদের এলাকা ফরিদপুরের টাউন থিয়েটার একটা নাটক মঞ্চস্থ করবে ঢাকার জাতীয় নাট্য উৎসবে। সে নাটকের জন্য কিছু তরুণ নাট্যকর্মী প্রয়োজন ছিল। তখন আমাদের পাড়ার নাট্যামোদী এক বড় ভাই (রুমি ভাই) প্রস্তাব দিলেন আমি অভিনয় করব কিনা। সে সময় কিছু না বুঝেই রাজি হই। এরপরের দিন মহড়ায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমার অভিনয় জীবনের সূচনা।

নাটকের প্রতি নেশা তৈরি হয়েছে আরো পরে... 

ফরিদপুর টাউন থিয়েটার মূলত প্রাচীন একটি নাট্য সংগঠন। ফরিদপুরের অভিজাত শ্রেণীর মানুষজন ছিলেন সে ক্লাবের সদস্য এবং তারা বছরে দুয়েকবার নাটক করতেন শখ থেকেই। সে দলের সঙ্গেই প্রথমবারের মতো আমি ঢাকায় জাতীয় নাট্য উৎসবে অংশগ্রহণ করি। আমাদের সে নাটকটির নাম ছিল তালেব মাস্টারের হালখাতা সেখানে তালেব মাস্টারের ছেলের চরিত্রটিই ছিল আমার। প্রথম নাটকটি সফলভাবে মঞ্চস্থ করার পর আমরা ফিরে এলাম ফরিদপুরে। তখন মূলত ভালো লাগা শুরু হয় অভিনয়ের প্রতি। ফিরে আসার পর রুমি ভাইয়ের নেতৃত্বেই আমরা বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠী নামে একটি নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করি। সেখানে আমি যুক্ত হই। সে নাট্যদলের হয়ে দু-তিনটা নাটকে অভিনয়ও করেছিলাম।


আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হলেন যেভাবে...

১৯৮৩ সালে আমি ঢাকায় আসি অগ্রণী ব্যাংকে চাকরির সুবাদে। তখন মনস্থির করলাম এখন থেকে ঢাকায় নাটক করব, ঢাকার বড় নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত হব। এভাবেই সুযোগও হলো আরণ্যকের নাট্যকর্মী হওয়ার। ফলে তাদের মঞ্চনাটক, মুক্ত নাটক, পথনাটক এগুলো সবকিছুর সঙ্গেই একটা সময়ে গিয়ে যুক্ত হয়ে পড়লাম। 

টেলিভিশনে শুরু

১৯৯০ সালের কথা, তখন বেশ ভালোমতোই নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করছি। অভিনয় তখন নেশার মতো। টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম, সে সময় বিটিভির একজন প্রডিউসার কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী তার একটি নাটকে কাজের প্রস্তাব দিলেন। তার নাকি অডিশন বোর্ডেই আমার অভিনয় ভালো লেগেছিল। ফলে তার নাটকে এবং প্রথমবারের মতো টেলিভিশন নাটকে একটা ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। সে নাটকের নাম ছিল মৃত্যুক্ষুধা

গান শিখেছেন কখনো?

সেভাবে শেখা হয়নি। তবে বন্ধুদের আড্ডায় গান গাইতাম। সবাই প্রশংসাও করত আমার গলার। আমি প্রচুর গান শুনতাম, সেসবই পরে গাইতাম। আমাদের সময় তো গান শোনার এত ব্যবস্থা ছিল না। আমরা রেডিওতে অনুরোধের আসরে গান শুনতাম বন্ধুরা মিলে, নতুন কোনো গান বের হলে আমরা সেসব সংগ্রহ করতাম, শুনতাম সবাই মিলে। কখনোবা মাইক ভাড়া দেয়া হতো এমন দোকানে গিয়েও আমরা গান শুনতাম। পরে আবার নিজে নিজে গাইতাম। আমি যখন ঢাকায় এসে নাটকে কাজ করা শুরু করলাম, নাটকের শিক্ষাদীক্ষা নেয়া শুরু করলাম, তখন বুঝতে পারলাম একজন ভালো অভিনেতা হতে হলে আসলে অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত, নৃত্যকলা, মূকাভিনয় ইত্যাদি সম্পর্কেও ধারণা রাখা প্রয়োজন। সে সময় মহাখালী থাকতাম আমি, গান শেখার জন্য পলেন সরকার নামে একজনের কাছে তালিম নেয়া শুরু করলাম। মূলত সংগীতের তাল, লয় এসব সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞানটুকু অর্জনের উদ্দেশ্যে। তিনি আমাকে একটা হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলেন, যা এখনো আমি রেখে দিয়েছি।

ঈশ্বর প্রদত্ত কণ্ঠ রয়েছে আপনার, সেদিক থেকে অভিনয়ের তুলনায় গান নিয়ে এগিয়ে চলা স্বাভাবিক ছিল, তা না করে অভিনয়ে রাজত্ব গড়লেন...


ছেলেবেলায় আমি যখন গান গাইতাম, সবাই প্রশংসা করত। বন্ধুরা একসঙ্গে হলেই গান গাইতে বলত সবাই। ফলে সে সময়ই বুঝতে পারতাম আমার গলা হয়তো ভালো। তবে গান নিয়ে কখনো কিছু করব, এমনটা ভাবার সুযোগ ছিল না। পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ কোনোটাই অনুকূলে ছিল না। সে পরিবেশ যদি থাকত, তাহলে হয়তোবা প্রথম থেকেই গান দিয়েই মিডিয়ায় যুক্ত হতাম। যে নেশা অভিনয়ের জন্য তৈরি হয়েছিল, সে সময় সেটা হয়তো গানের জন্য হতে পারত।

অন্যদিকে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, আমি যখন অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, তখন আমার সে বন্ধুরা আমাকে খুব মিস করত। আমি খুব আড্ডাবাজ ছিলাম, গান করতাম। ওরা আমাকে তখন বলত আমি কখনো অভিনেতা হতে পারব না, কারণ আমার চেহারা ভালো না। বরং আমি গান গাইলে কিছু একটা হলেও হতে পারে। আমাদের সে সময়ে অভিনয় করতেন আফজাল হোসেন, আসাদুজ্জামান নূর, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। তারা সবাই তো সুন্দর দেখতে, তাই আমাকে আমার বন্ধুরা এসব বলত। আর এটাই আমার জেদ ছিল যে আমাকে চেহারা নিয়েই অভিনয় করতে হবে। আমি এটা বুঝতাম, খুব ভালো অভিনেতা হওয়ার জন্য চেহারা বা গ্ল্যামারের প্রয়োজন নেই, বরং অভিনয়দক্ষতা প্রয়োজন। বিষয়ে আমার আইডল ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। তিনি তো দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন না কিন্তু অভিনয় দিয়ে সাড়া ফেলেছেন ঠিকই। ফলে জেদ থেকেই আমি মনেপ্রাণে অভিনয়শিল্পীই হতে চেয়েছি। মনপুরা চলচ্চিত্রে গাওয়া গানের অ্যালবামের সুবাদে অনেকেই আমাকে সংগীতশিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করেন, আমি তাদের বিনয়ের সঙ্গেই বলেছি আমি সংগীতশিল্পী না, অভিনয়শিল্পী।

ছেলেবেলায় কখনো কি ভেবেছিলেন তারকা হবেন?

আমরা যখন বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠী শুরু করেছিলাম, তখন বাংলাদেশে মূলত গ্রুপ থিয়েটার মুভমেন্ট শুরু হয়েছিল। যাকে আমরা বলি সংঘনাট্যের আন্দোলন। আন্দোলন যখন শুরু হয়েছে, তখন আমরা মনে করতাম নাটক দিয়েই সমাজ বদলানো সম্ভব। বাংলাদেশ তখন স্বাধীন দেশ হয়েছে পাঁচ-ছয় বছর হয়েছে। ফলে সবারই তখন চিন্তাভাবনায় সমাজ পরিবর্তন, মানুষকে জাগিয়ে তোলা। এমন ভাবনা থেকে থিয়েটার করেছি বলেই হয়তোবা কখনই তারকা হতে চাইনি, বরং নাট্যকর্মী হতে চেয়েছি কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মী হতে চেয়েছি।

বর্তমানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প কোন অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন।

একটা সময় আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প বেশ সমৃদ্ধ ছিল। সমৃদ্ধ শিল্পটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়েছে। তবে আশাহত হওয়ার কিছু নেই, কেননা অনেক তরুণ এবং নতুন নির্মাতা কাজ করছেন শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই। গিয়াসউদ্দীন সেলিম, গোলাম সোহরাব দোদুল, তৌকীর আহমেদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর মতো নির্মাতারা কিন্তু কাজ করে যাচ্ছেন প্রাণপণে। আমি আশাবাদী মানুষ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে এখনো আশা দেখছি। শক্তিশালী গণমাধ্যম আবার জৌলুশ ফিরে পাবে। এরই মধ্যে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি অনেকটা। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হয়তোবা সংকট কেটে যাবে পুরোপুরি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন