সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

তারল্য সংকটের চাপে নেই তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি

মেহেদী হাসান রাহাত

তারল্য সংকটের মধ্যে আছে দেশের আর্থিক খাত। অর্থায়ন করার মতো পর্যাপ্ত তারল্য নেই ব্যাংকগুলোর হাতে। ফলে ঋণ না পেয়ে সিংহভাগ বড় করপোরেট চলতি মূলধন সংকটে ভুগছে। এর মধ্যেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি আছে, যারা তারল্য সংকটের চাপে নেই। কোম্পানিগুলোর পরিচালন কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত অর্থপ্রবাহ থাকায় দায় মেটানোর পরও এসব কোম্পানির কাছে যথেষ্ট তারল্য রয়েছে।

কোনো কোম্পানির হাতে তারল্য কেমন তা পরিমাপের অন্যতম নির্দেশক হলো কারেন্ট রেশিও টার্নওভার ইনভেন্টরি রেশিও। দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন সেবা খাতের ২১৯টি কোম্পানির কারেন্ট রেশিও এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্তত ১৫টি কোম্পানির হাতে যথেষ্ট তারল্য রয়েছে।

কারেন্ট রেশিও হচ্ছে, একটি কোম্পানি চলতি দায়ের বিপরীতে তার কাছে কী পরিমাণ চলতি সম্পদ রয়েছে তার অনুপাত। কারেন্ট রেশিও -এর মানে হচ্ছে, কোম্পানির টাকা চলতি দায়ের বিপরীতে টাকার সম্পদ রয়েছে। আর কারেন্ট রেশিও -এর বেশি হওয়া মানে হচ্ছে, সেই কোম্পানির কাছে চলতি দায় মেটানোর পরও উদ্বৃত্ত অর্থ থাকবে। অন্যদিকে ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও হচ্ছে, কোনো কোম্পানি বছরে কতবার তার উৎপাদন কার্যক্রমে ইনভেন্টরি ব্যবহার করছে তার অনুপাত। সাধারণত বছরে তিনবার কিংবা তার বেশি ইনভেন্টরি ব্যবহার হলে কোম্পানি তার পরিচালন কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত তারল্য পায়। তবে টার্নওভার ইনভেন্টরি রেশিও খুব বেশি হলে সেটি ভালো নয়। এর অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানির ইনভেন্টরির পরিমাণ অপর্যাপ্ত।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে তারল্য পর্যাপ্ততার দিক দিয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। ৩০ জুন ২০১৮ সময়ে কোম্পানিটির কারেন্ট রেশিও ৫৮ টাকা ৯০ পয়সা। এর অর্থ হচ্ছে, কোম্পানিটির টাকা চলতি দায়ের বিপরীতে ৫৮ টাকা ৯০ পয়সার সম্পদ রয়েছে। অন্যদিকে কোম্পানিটির ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৬৮, যার অর্থ দাঁড়ায় কোম্পানিটি ১৩৬ দিনে তার ইনভেন্টরি ব্যবহার করে। গত বছর কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছে ৬১৪ কোটি টাকা। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে ১২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকার।

জানতে চাইলে ইউনাইটেড পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি হিসেবে আমরা কর অবকাশ সুবিধা ভোগ করছি। কারণে আমাদের খুব একটা ঋণের প্রয়োজন হয়নি। তাছাড়া শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল ঋণমুক্ত কোম্পানি হওয়া। কারণে আমাদের দায়ের পরিমাণ খুব বেশি নয়। এর বিপরীতে পর্যাপ্ত সম্পদও রয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের তারল্য সংকটের প্রভাব আমাদের ওপর তেমন একটা পড়বে না। কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকলেও তারল্য সংকটের পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। যেমন যেসব কোম্পানি আমাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবসা করছে, তারা যদি তারল্য সংকটের কারণে সমস্যায় পড়ে, তাহলে পরোক্ষভাবে আমাদের ওপরও তার প্রভাব পড়বে। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেন কমিয়ে আনা হয়। তাহলে আর্থিক খাতের তারল্য সংকটও কাটবে এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও ভালো থাকবে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো লিমিটেডের ২০১৮ সালের ৩০ জুন শেষে কারেন্ট রেশিও ছিল ৫। সময়ে কোম্পানিটির ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও ছিল দশমিক ৫৫। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে কোটি ৭৫ লাখ টাকার। গেল বছর কোম্পানিটির টার্নওভার ছিল হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা।

ওষুধ খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কারেন্ট রেশিও দাঁড়িয়েছে দশমিক ৯১। আর কোম্পানিটির ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৯। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমমান সম্পদ রয়েছে হাজার ৬৯৮ কোটি টাকার।

প্রকৌশল খাতের কোম্পানি আরএসআরএম স্টিলের কারেন্ট রেশিও দশমিক ২৭ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৩। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে কোটি টাকার। কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার ৭৬৫ কোটি টাকা।

ওষুধ খাতের আরেক কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের কারেন্ট রেশিও দশমিক এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৪৬। কোম্পানিটির কাছে বর্তমানে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে ১০৫ কোটি টাকা। গত বছর কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছিল হাজার ৮৬০ কোটি টাকা।

যথেষ্ট পরিমাণ তারল্য রয়েছে প্রকৌশল খাতের আরেক কোম্পানি ইফাদ অটোসের। ২০১৮ সালের ৩০ জুন হিসাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির কারেন্ট রেশিও ছিল দশমিক ১৪ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৩৯। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে ২৮২ কোটি টাকার। ইফাদ অটোসের বার্ষিক টার্নওভার হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তারল্যের চাপ নেই বহুজাতিক রং উৎপাদনকারী কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর হিসাবে কোম্পানিটির কারেন্ট রেশিও দশমিক ২৩ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৭৭। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে ১৯০ কোটি টাকার। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির টার্নওভার দাঁড়িয়েছে হাজার ৭৮০ কোটি টাকায়।

ফুটওয়্যার উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানি বাটা সুর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে কারেন্ট রেশিও দাঁড়িয়েছে এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৭৩। কোম্পানিটির কাছে ৮০ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। সর্বশেষ হিসাব বছরে কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছে ৯৫২ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের কারেন্ট রেশিও এবং টার্নওভার ইনভেন্টরি রেশিও ৯। কোম্পানিটির কাছে নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে ৭৪৮ কোটি টাকার। পাওয়ার গ্রিডের বার্ষিক টার্নওভার হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা।

দেশে বিস্কুট উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় কোম্পাানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০১৮ সালের জুন শেষে কোম্পানিটির কারেন্ট রেশিও দাঁড়িয়েছে দশমিক ৯০ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৬৬। অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৪৬ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার হাজার ২৯২ কোটি টাকা।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশের কারেন্ট রেশিও এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৮৫। কোম্পানিটির কাছে ১৬০ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে কোম্পানিটির টার্নওভার দাঁড়িয়েছে ৫৪৬ কোটি টাকা।

ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশের কাছেও পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর হিসাবে কোম্পানিটির কারেন্ট রেশিও দশমিক ৫৭ ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৬৮। সিঙ্গার বাংলাদেশের কাছে ১৯ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।

ব্যবসায়িক মডেলের কারণেই সিঙ্গার বাংলাদেশের তারল্য ঝুঁকি নেই বলে জানান কোম্পানিটির পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন আর্থিক নির্দেশকও ইতিবাচক রয়েছে। আমাদের কাছে ব্যবসা পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে এবং আমরা সেটি সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করি।

২০১৮ সালের জুন শেষে বস্ত্র খাতের কোম্পানি স্কয়ার টেক্সটাইলের কারেন্ট রেশিও দশমিক ৪৮ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ২৯। কোম্পানিটির কাছে ৫৯ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। স্কয়ার টেক্সটাইলের বার্ষিক টার্নওভার ৭৭৫ কোটি টাকা।

সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্টের কারেন্ট রেশিও দশমিক ৪৩ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও ৫। কোম্পানিটির কাছে ১৭৫ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে কোম্পানিটির টার্নওভার দাঁড়িয়েছে হাজার ১১৫ কোটি টাকা।

তামাক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশের কারেন্ট রেশিও দশমিক ৩১ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৪০। কোম্পানিটির কাছে ১৬৩ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে বিএটিবিসির নিট টার্নওভার হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা।

বহুজাতিক আরেক কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) বাংলাদেশের কারেন্ট রেশিও ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দশমিক ২৯ এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও দশমিক ৫২। কোম্পানিটির কাছে ৩৪২ কোটি টাকার নগদ নগদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ হিসাব বছরে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের টার্নওভারের পরিমাণ ৪৮১ কোটি টাকা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন