সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

পোশাক শিল্প

সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে বড়দের

নিজস্ব প্রতিবেদক

 নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ফকির নিটওয়্যারস লিমিটেডের কারখানায় কাজ করেন প্রায় সাড়ে ১১ হাজার শ্রমিক। ফকির গ্রুপের কারখানাটিতে মূলত টি-শার্ট, পোলো শার্টস ট্যাংক টপস তৈরি করেন শ্রমিকরা। গত বুধবার কারখানা ছুটি হয় নিয়মিত কর্মঘণ্টার বেশ আগেই। কারণ জানতে চাইলে একজন শ্রমিক বলেন, কারখানায় কাজ কম। কারণে কর্মঘণ্টা কমিয়ে এনেছেন উত্পাদন ব্যবস্থাপকরা। আগে প্রতিদিন যেখানে -১০ ঘণ্টা মেশিন চলত, এখন চলে - ঘণ্টা।

পোশাক শিল্পের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপ। ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন গ্রুপের পোশাক কারখানাগুলোয়। প্রডাকশন লাইন আছে সব মিলিয়ে সাড়ে তিন শতাধিক। এর ৩০ শতাংশ এখন বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বড় কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৃহত্ উত্পাদন সক্ষমতা নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে ২০০-এর মতো প্রতিষ্ঠান। খাতের মোট কারখানার যা ১০ শতাংশ। ১০ শতাংশ বড় কারখানাই মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের পোশাক খাতের সিংহভাগ ব্যবসা। কাজের সংকটে উত্পাদন সক্ষমতা অব্যবহূত রাখতে হচ্ছে এসব কারখানাকে। ফকির হা-মীম গ্রুপ ছাড়াও স্ট্যান্ডার্ড, আল-মুসলিম স্টারলিং গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়।

১৯৮৪ সালে একটিমাত্র কারখানার মাধ্যমে পোশাক খাতে যাত্রা করে হা-মীম গ্রুপ। এরপর সাড়ে তিন দশকে গ্রুপটিতে যুক্ত হয়েছে আরো দুই ডজনের বেশি কারখানা। ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রফতানি আয়। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাড়ে তিনশর বেশি প্রডাকশন লাইনের ৩০ শতাংশ বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবেই পোশাক শিল্পে ক্রয়াদেশ সংকট চলছে বলে জানান হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি কে আজাদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ক্রেতাদের চলে এমন কারখানার সবাই ক্রয়াদেশ সংকটে আছে। কারণ ওই অঞ্চলের দেশগুলোয় পোশাকের বিক্রি কমে গেছে। বিশেষ করে ওভেন পণ্যের ক্রয়াদেশ কমেছে ২০-৩০ শতাংশ। পাশাপাশি মূল্যও কম পাওয়া যাচ্ছে। ক্রেতারা পণ্য বিক্রির গতি-প্রকৃতি দেখে অর্ডার দেন। বিক্রি কমে যাওয়ায় তারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানাগুলো মূলত নিট পণ্য উত্পাদন করে। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা বলছেন, মুহূর্তে পোশাক শিল্প-কারখানাগুলো মোট উত্পাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশ ব্যবহার করছে। যদিও স্বাভাবিক সময়ে সক্ষমতার ৭৫ শতাংশ ব্যবহার হয়। অর্ডার সংকটে ছোট মাঝারি কারখানাগুলো বসে যাচ্ছে। বড়রা তুলনামূলক ভালো থাকলেও উত্পাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না কেউই।

বার্ষিক ১৪-১৫ কোটি ডলারের পোশাকপণ্য রফতানি করে ফকির নিটওয়্যার। প্রতিষ্ঠানটির সব কারখানাই নারায়ণগঞ্জে। তুলনামূলক কম কাজ থাকার কথা স্বীকার করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির আখতারুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের উত্পাদন সামর্থ্য প্রতি মাসে ৬৫ লাখ পিসের। আমাদের ক্রেতারা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ৪০-৫০ লাখ পিসের ক্রয়াদেশ দিত। মৌসুম শেষ হওয়ার আগে পরবর্তী সময়ে তারা ক্রয়াদেশ আরো বাড়িয়ে দিত, যেটাকে তারা বলে ইনক্রিজড কোয়ান্টিটি এখন মৌসুমে ইনক্রিজড কোয়ান্টিটি নেই। অনেক ক্রেতা তাদের মোট অর্ডারের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে। আমার কারখানায় এখন ওভারটাইম চলার কথা কিন্তু নিয়মিত কর্মঘণ্টাও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আমাদের প্রডাকশন লাইন ১০০টি। লাইনগুলোর ব্যবস্থাপনায় এখন পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এখন ৫টা পর্যন্ত কাজ করিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি শ্রমিকদের। কাজ যেহেতু নেই তাই দ্রুত কাজ শেষ করার চাপও দেয়া হচ্ছে না শ্রমিকদের।

গাজীপুর কোনাবাড়িসহ ঢাকার আশপাশে ১০টি পোশাক কারখানা আছে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের, যেগুলোর বার্ষিক রফতানি ৪০ কোটি ডলারের। এসব কারখানায় কাজ করছেন ৪৮-৫০ হাজার শ্রমিক। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানায় প্রডাকশন লাইন আছে ৩৯০টি।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একজন প্রতিনিধি জানান, কোনাবাড়ী, হেমায়েতপুরসহ কোনো এলাকার কারখানায়ই নিয়মিত আট ঘণ্টা সচল রাখার মতো অর্ডার নেই। বর্তমানে যে পরিমাণ অর্ডার আছে, তাতে কোনোমতে ঘণ্টা সচল রাখা যায় কারখানা। কিন্তু ঘণ্টার কম সচল রাখা যাবে না। তাই ঘণ্টার কাজ ঘণ্টায় করাতে হচ্ছে। কোনো কোনো সপ্তাহে বিরূপ পরিস্থিতিতে কারখানার কিছু প্রডাকশন লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গত আট-নয় বছরে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। কারখানাটির উত্পাদন সক্ষমতা প্রতি মাসে ৬০ লাখ। শুধু অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য ক্রয়াদেশ আছে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। অক্টোবরের জন্য অর্ডার আছে ২৫ লাখ পিসের। নভেম্বরের জন্য আছে ৪৬ লাখ পিসের। আর ডিসেম্বরের জন্য আছে ৫০ লাখ পিসের। অর্থাত্ এক প্রান্তিক হিসাবে উত্পাদন সক্ষমতা কোটি ৮০ লাখ পিসের বিপরীতে অর্ডার আছে কোটি ২৭ লাখ পিসের। অর্থাত্ ৫৩ লাখ পিস অর্ডার সংকটে গ্রুপটি।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, কারখানায় প্রডাকশন লাইন বসে আছে। শুধু আমরা নয়, বড় কারখানাগুলোর জন্য এখন এটা একটা রূঢ় বাস্তবতা। এখন অর্ডার বেশ কম। ক্রেতাদের পক্ষ থেকে চাহিদাই কম। কারখানাভেদে প্রডাকশন লাইনের -১০ শতাংশ বসিয়ে রাখতে হয়। কারখানার অর্ডারের প্রকৃত পরিস্থিতি জানাতে তিনি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধারণা করা হচ্ছিল চীন মার্কিনদের বাণিজ্যযুদ্ধের সুফল পাবে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসতে পারত, সেগুলো চলে যাচ্ছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোয়। দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ফলে ক্রেতারা অতিরিক্ত যে ক্রয়াদেশগুলো বাংলাদেশে দিতেন, তা তারা দিচ্ছেন অন্যান্য দেশে।

বিজিএমইএ পরিচালক রেজওয়ান সেলিম বণিক বার্তাকে বলেন, বড় কারখানাগুলোর অধিকাংশেরই প্রডাকশন লাইন ফাঁকা। কাজ বা ব্যবসা না থাকার কারণেই অবস্থা। পরিস্থিতির শুরু হয় গত নির্বাচন থেকে। যখনই নির্বাচন আসে, তখন বড় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমাতে শুরু করেন। সেই ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে; এরপর দুই ঈদ পর্যন্ত সব মিলিয়ে বাংলাদেশে অর্ডার কম এসেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এর ফলে মূল্য সক্ষমতার বড় ধরনের পতন হয়েছে। এদিকে ভিয়েতনাম আবার ইউরোপে জিএসপি পেয়েছে, ক্রেতারা এখন থেকেই দেশটির সক্ষমতা ব্যবহার শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে আমাদের সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার পোশাক শিল্পের বড়রাও করতে পারছে না। ছোট বা মাঝারির সংকট নতুন করে আর বলার কিছু নেই।

বিজিএমইএর হিসাবে, দেশে পোশাক কারখানা আছে চার হাজারের কিছু বেশি। হাজার থেকে হাজার ৯৯৯ জন শ্রমিক কাজ করছেন দেশে এমন পোশাক কারখানা রয়েছে ৮৪টি। হাজার থেকে হাজার ৯৯৯ শ্রমিক নিয়ে চলছে ৪০টি কারখানা। এছাড়া পাঁচ হাজার থেকে হাজার ৯৯৯ জন শ্রমিক কাজ করছেন এমন কারখানার সংখ্যা ২২।

ছয় হাজার থেকে হাজার ৯৯৯ জন শ্রমিক কাজ করেন এমন কারখানা আছে ১৩টি, সাত হাজার থেকে ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন এমন কারখানা ২৩টি এবং ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন ১৫টি পোশাক কারখানায়।

জানা গেছে, শিল্প শ্রমঘন নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ন্যূনতম ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন এমন কারখানা আছে ১৫ থেকে ২০টি। এর মধ্যে দু-তিনটি কারখানা সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখতে পারছে। বাকিরা উত্পাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

বিকেএমইএর সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, বড়রাও স্বস্তিতে নেই। সামর্থ্যের ৭৫ শতাংশ ব্যবহারে হিমশিম খেতে হচ্ছে বড় কারখানাগুলোকে। এর কারণ বাংলাদেশে এখন পোশাকপণ্যের অর্ডারের সংকট চলছে। বেশির ভাগ কারখানায় কাজ চলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। কোনো কারখানা অর্ধবেলা চলে বন্ধ করে দিতে হয়। পরিস্থিতিতে বড়রা অর্থায়ন সংকটের মধ্যে বেশি পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামালের দাম পরিশোধ করতে ফোর্সড লোনের মতো পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। প্রতি মাসে রফতানির বিপরীতে যে পরিমাণ আয় আসার কথা, সেই পরিমাণ না আসায় ফোর্সড লোন করে কাঁচামালের মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন