বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

থানায় জব্দ গাড়িগুলোও এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র

নিহাল হাসনাইন

গত ২৯ জুলাই পল্লবী থানা হেফাজতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এক আসামি। তিনি এখন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মাদক মামলার ওই আসামি থানায়ই এডিস মশার দংশনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে থানায় জব্দ গাড়িতে এডিস মশার লার্ভা থাকার তথ্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভুপেন্দর নাগপাল।

থানাগুলোয় এডিস মশার লার্ভা থাকার বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়, সবগুলো থানায়ই রয়েছে বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দকৃত গাড়ি। এসব গাড়ি থানা কম্পাউন্ডের খুব কাছাকাছি খোলা পরিবেশে রাখা হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই গাড়ির লুকিং গ্লাসসহ বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা সামান্য পানিতেই ডিম পাড়ে এডিস মশা।

গত বৃহস্পতিবার মিরপুর ৯ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্তে অবস্থিত পল্লবী থানায় গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সামনে পড়ে থাকা জব্দ গাড়িগুলোয় জমে রয়েছে বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি। শুধু তা-ই নয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানাসহ বিভিন্ন ইউনিটের কার্যালয়গুলোয়ও এমন অসংখ্য গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু আসামিরাই নন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরাও। সর্বশেষ কোহিনুর খাতুন নামে এক এসআই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তিনি পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত ছিলেন। অফিস থেকেই জ্বর নিয়ে বাসায় ফেরেন। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক জানান তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত।

সরেজমিনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানা ও পুলিশ বক্স ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ থানায়ই আলামত হিসেবে জব্দ করা একাধিক গাড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। গাড়িগুলোয় জমে রয়েছে বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি। থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানসংকুলান না হওয়ায় গাড়িগুলো থানা কম্পাউন্ডেই রাখতে হয়।

গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনসহ (পিবিআই) পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের কার্যালয়গুলোয়ও একই অবস্থা। গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ের মাঝখানে রয়েছে দীঘি। দীঘির পাড়ঘেঁষে রাখা হয়েছে জব্দকৃত কয়েকশ মোটরসাইকেল।

ডা. ভুপেন্দর নাগপাল জানান, এডিস মশা খুব অল্প পানিতে (৫ মিলি বা ১ চা চামচ) ডিম পাড়ে। এ ডিম শুষ্ক ও প্রতিকূল পরিবেশেও দীর্ঘদিন অক্ষত থাকতে পারে। স্বচ্ছ পানি পেলেই ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রথমেই বাহক এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ ও প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে ১০ লিটার পানিতে এক গ্রাম টেমিফস দিয়ে তা আশপাশে ছিটিয়ে দিলে ডেঙ্গুর লার্ভা ধ্বংস হবে।

এদিকে এডিস মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার পর সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বেশকিছু পদক্ষেপ। ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া প্রত্যেকটি থানা পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি সবগুলো ইউনিটকে থানার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায়ও এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের জন্য কাজ করতে বলেছেন।

ডিএমপি কমিশনারের এ নির্দেশনার পর থানাগুলোয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে আলামত হিসেবে জব্দ গাড়িগুলোর কোনো গতি হয়নি।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের মোট ৬০১ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৭৬ জন। এখনো চিকিৎসাধীন ১২৫ জন। এ পরিসংখ্যান শুধু রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী গত সোমবার সব মেট্রোপলিটন কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সুপারদের সঙ্গে এক জরুরি ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। তিনি ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন