রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

খেলা

বিদেশী ফুটবলার বাগাতে চীনের বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ

বণিক বার্তা অনলাইন

নিকো ইয়েনারিস। পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠা ইয়েনারিস বাল্যকাল থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বিখ্যাত ফুটবল তারকা হওয়ার। তার শুরুটাও বেশ ভালো ছিল; যুব পর্যায়ে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২৬ বছর বয়সে এসে ব্রিটিশ পাসপোর্ট ফেলে স্থায়ীভাবে বেইজিংয়ে চলে যান তিনি। ডেভিড বেকহ্যামের জন্মস্থান পূর্ব লন্ডনেই  চীনা মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া ইয়েনারিস এখন চীনের নাগরিক বনে গেছেন। এমনকি নতুন চৈনিক নামও নিয়েছেন। এখন তার নাম লি কে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইয়েনারিস বেইজিংয়ের ফুটবল ক্লাব সিনোবো গুয়ানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এটি এখন ইতালির এসি মিলানের চেয়েও মূল্যবান একটি ক্লাব। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি চাইনিজ সুপার লিগ (সিএসএল) এবং চীনের জাতীয় দলের হয়ে ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলেন।

এমন ঘটনা শুধু ইয়েনারিসের ক্ষেত্রে নয়। এভাবে আরও অনেক বিদেশী খেলোয়াড় চীনে চলে যাচ্ছেন, চীনা নাগরিকত্ব নিচ্ছেন। এর পেছনে রয়েছে ফুটবলে চীনের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। জন হউয়ি সায়েতার নামে এক ফুটবলারেরও মা চীনা। সায়েতার তার নরওয়েজিয়ান পাসপোর্ট ছেড়ে বেইজিংয়ের গুয়ান ক্লাবে যুক্ত হয়েছেন। ১৯৯৫ সালে সুইডিশ মিডফিল্ডার পেল ব্লোহম ডালিয়ান ওয়ান্ডার ক্লাবে যোগ দেন। এছাড়া কাতার বিশ্বকাপে চীনের হয়ে দুই ব্রাজিলীয় ও এক পর্তুগিজ খেলোয়াড় মাঠে নামবে বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

যদিও ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, যে খেলোয়াড় জাতিগতভাবে চীনা নন, তিনি চীনে পাঁচ বছর বসবাসের পরই কেবল ফিফার অধীনে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারবেন।

&dquote;নিকো

গত শতকেও  চীনাদের বা দেশটির সরকারের ফুটবলে কোনো আগ্রহ ছিল না। সেসময়ের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে পেল ব্লোহম বলেন, ৫৫ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ামে তারা মাত্র ৩৫ হাজার মানুষকে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেখানে কোনো ড্রেসিং রুম ছিল না। আমাদের হোটেলে তৈরি হতে হতো। আমাকে মার্কিন ডলারে বেতন দেয়া হলেও এই ডলার জমা দেয়ার মতো কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারিনি। ডেলিয়ান শহরে তখন ৫০ লাখ মানুষ বসবাস করলেও কোনো ক্যাফে বা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কোনো শপ ছিল না। শহরে হাতোগোনা কয়েকজন বিদেশী ছিলেন।

সেই চীন এখন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ২০০৮ সালের গ্রীষ্মে এসে বেইজিং ৪০ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার কোটি ডলার খরচ করে অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করে, যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল একটি আয়োজন। ওই আয়োজনে চীনা ক্রীড়াবিদরা ৫১টি স্বর্ণপদক জয় করে, যা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

&dquote;&dquote;

তবে ফুটবলের লড়াইয়ে চীন খুব বেশি উন্নতি করতে পারেনি। ২০০২ ফিফা বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে অভিষেকের পর চীন আর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি। ২০০৯ সালের জুলাইয়ের ফিফা র‌্যাংকিং অনুযায়ী, চীনের অবস্থান ১০৮তম। তার ওপর ম্যাচ-ফিক্সিং এবং দুর্নীতির এতটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল যে সেগুলো পরিষ্কার করতে একটি কমিটি গঠন করতে হয়েছিল।

এরপরই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে দেশটির ফুটবল। ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মার মতো ব্যবসায়ীরা সিএসএ’র অনুর্ধ্ব ১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। ওয়াং জিয়াংলিনের ডালিয়ান ওয়ান্ডা গ্রুপ (ডিডব্লিউজি ) এই খেলায় কয়েকশ কোটি ডলার খরচ করেছে। দেশজুড়ে সরকার একাডেমি ও মাঠগুলো পরিকল্পনা করে ঢেলে সাজাতে শুরু করে। তরুণ-তরুণীদের ফুটবল শেখাতে হাজার হাজার বিদেশী কোচ নিয়োগ দেয়া হয়।

২০১২ সালে চেলসির সাবেক স্ট্রাইকার দিদিয়ের দ্রগবা সাংহাই শেনহুয়া ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। একই বছর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ডার মারুয়ান ফেল্লিনি শানডং লুনেঙে চলে এসেছেন। এই ক্লাব বদলের ফি কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে সেটার পরিমান যে আকাশছোঁয়া হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। গুজব রয়েছে, মারুয়ান ফেল্লিনিকে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারে কেনা হয়েছে।

&dquote;&dquote;

সবশেষ চলতি সপ্তাহে খবর বেরিয়েছে, ওয়েলশ তারকা গ্যারেথ বেল চীনা ক্লাব জিয়াংশু সুনিংয়ের সঙ্গে তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

একাদশ তৈরিতে অবশ্য বিদেশি তারকা আকর্ষণই কেবল চীনের লক্ষ্য নয়। নিজেদের খেলোয়াড় তৈরি করতে চীন সুপার লিগ- সিএসএলগুলোকে সর্বোচ্চ চারজন বিদেশী খোলোয়াড় নিবন্ধনের অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে বাইরের দেশ থেকে তিনজন, পাশাপাশি হংকং, তাইওয়ান বা ম্যাকাওয়ের মতো চীনা অঞ্চল থেকে একজনকে নিতে হবে।

চীনা ফুটবল বিশেষজ্ঞ উইলসন বলেন, এটি মূলত চীনা খেলোয়াড়রা যেন সুযোগ পেতে পারে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য । কয়েকটা সিএসএল দল আবার অ-চীনা খেলোয়াড় পেতে এই নিয়ম ব্যবহার করেছে। যেমন, নাইজেরিয়াতে জন্মগ্রহণকারী অ্যালেক্স আকান্ডে চীনা নাগরিকত্ব পেতে হংকংয়ে দীর্ঘকাল বাস করেছিলেন। এখন তিনি আধা-স্বায়ত্তশাসিত নগরীর চাইনিজ খেলোয়াড় হিসেবে ডালিয়ান ক্লাবের হয়ে খেলেন।

উইলসন বলেন, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেও চীন কিন্তু সেই অনুপাতে ফুটবলে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর পেছনে মূল কারণ চীনে ফুটবল সংস্কৃতি নেই। আমি মনে করি, তারা ফুটবলে নিয়ে ভাবে না। তবে এখানে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একটি বিশাল ‘সোনার খনি’, এটি আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।

&dquote;&dquote;

২০১৯ মৌসুমে সুপার লিগের একটিও ম্যাচ বিক্রি হয়নি। স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতার মাত্র গড়ে ৫১ শতাংশ পূর্ণ হয়েছে। বেশিরভাগ সিএসএল দলই লোকসানে রয়েছে। যেখানে ২০১৮ সালের জুন থেকে বছরের শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আয় ৫৯ কোটি ডলার।

স্কটল্যান্ড থেকে চীনে আসা উইলসন বলেন, যুক্তরাজ্যে আমাদের যে ফুটবল সংস্কৃতি রয়েছে তা অনেক গভীর। এই দেশে সেই সংস্কৃতি তৈরি হতে অনেক সময় লাগবে। চীনের বাচ্চারা বেকহ্যামের মতো বলকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করার স্বপ্ন দেখে না বা বলে লাথি মারতে মারতেও বড় হয় না।

ইয়েনারিস বলেন, ব্রিটিশ ফুটবল ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের অভিজ্ঞতার বিপরীতে বেইজিং এখন লন্ডন, প্যারিস ও নিউইয়র্কের মতো বড় শহর। সুতরাং ফুটবলও অনেক বড় হয়ে গেছে এখানে।

সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা ফিলিপ্পে মে বলেন, ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছেড়ে কেউ চীনা পাসপোর্ট নিতে পারে, দশ বছর আগেএটা কল্পনাই করা যেত না। সেই চীনা পাসপোর্ট গত দশক থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

&dquote;&dquote;

চীনা মান্দারিন ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যারল্ট বলেন, আপনি যদি চীনে তিন বছর ফুটবল খেলে আড়াই কোটি ডলার উপার্জন করতে পারেন, তবে কেন আপনি ১০ লাখ ডলার উপার্জনের কানাডিয়ান বা পর্তুগিজ পাসপোর্টকে বিদায় জানাবেন না!

গত মার্চে চাইনিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন একটি আদেশ জারি করেছে, বিদেশী খেলোয়াড়দের কমিউনিস্ট পার্টির মূল্যবোধ জানতে হবে এবং ক্লাবগুলোকে প্রতি মাসে তাদের পারফরম্যান্সের লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

বিখ্যাত ফুটবল তারকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে ইয়েনারিস এখন মান্দারিন শিখছেন এবং জাতীয় সংগীত মুখস্ত করছেন। চীনকে বিশ্বকাপ এনে দেয়ার লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রমও করছেন তিনি। লন্ডনে জন্ম নেয়া এ মিডফিল্ডার ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে জাতীয় দলে জায়গা পেতে প্রস্তুত বলে মনে করছেন চীনের ইতালীয় কোচ মার্সেলো লিপ্পি।

সিএনএন থেকে অনুবাদ শিহাবুল ইসলাম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন