গোবিন্দ দেবের দর্শনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

সৈয়দ আবুল মকসুদ | ০০:০০:০০ মিনিট, মার্চ ২৬, ২০১৬

মধ্যযুগের পর থেকে পশ্চিমের আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন গড়ে উঠেছে একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। বড় বড় দার্শনিকের প্রায় সবাই ছিলেন কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। আন্তর্জাতিক খ্যাতি নেই ইউরোপে, এমন প্রাতিষ্ঠানিক দার্শনিকের সংখ্যা প্রচুর। বিশেষ করে জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স দেশে গত চারশ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে বহু মৌলিক দার্শনিকের।

প্রতিষ্ঠালগ্নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও মনোবিজ্ঞান বিভাগে এমন কয়েকজন অধ্যাপক ছিলেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং যাঁদের কারো কারো মৌলিক চিন্তাও গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান জর্জ হ্যারি ল্যাংলি হলেও, প্রথম দিনই যোগ দেন হরিদাস ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একজন মৌলিক দর্শনতত্ত্ববিদ। প্রতিষ্ঠালগ্নে তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, সতীশচন্দ্র রায়, উপেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ও মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায় দর্শনতত্ত্বে অসামান্য পণ্ডিত ছিলেন। কাজেমউদ্দিন আহমদ ও ক্ষিরোদচন্দ্র মুখার্জি সহকারী লেকচারার হলেও দর্শনশাস্ত্রে তাঁদের প্রগাঢ় জ্ঞান ছিল। কাজেমউদ্দিন আহমদ বহু বছর সরকারি কলেজে চাকরি করে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।

হরিদাস ভট্টাচার্য ২৬ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন, তার মধ্যে ২২ বছর ছিলেন বিভাগীয় প্রধান। আমি তাঁর কিছু বাংলা ও ইংরেজি রচনা সংগ্রহ করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম ১৯৮০-’র দশকের প্রথম দিকে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম। তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ভাঁটপাড়ার সংস্কৃত পণ্ডিত বংশের মানুষ। খোঁজ নিয়ে তাঁর এক ছেলের সন্ধান পাই, তিনি ড. অজয় ভট্টাচার্য, পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী। সুইডেনের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ডক্টরেট করে স্টকহোমের ABB নামক এক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। তাঁরা বাবার অমূল্য রচনাবলি সংরক্ষণের চেষ্টা করেননি। শেষ পর্যন্ত আমি বেশকিছু রচনার সন্ধান পাই। গোবিন্দচন্দ্র দেব-পূর্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে উপমহাদেশে দর্শনচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, তা প্রমাণ করা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু উপযুক্ত উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

সতীশচন্দ্র রায়, উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, ক্ষিরোদচন্দ্র মুখার্জি, মমতাজউদ্দিন আহমদ কাজেমউদ্দিন আহমদ, বিনয়েন্দ্রনাথ রায় ও বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের কিছু প্রবন্ধও খুব উঁচুমানের দার্শনিক রচনা। তাঁদের সেসব রচনা আজ বিলুপ্তির পথে। বহুদিন আগে তাঁতীবাজারের উমেশ ভট্টাচার্যের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আমাকে তাঁর দুটি বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের সন্ধান দিয়েছিলেন।

কলকাতা সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় থেকেই লেখার অভ্যাস ছিল গোবিন্দ দেবের। ১৯২০-এর দশকের শেষদিকে প্রকাশিত একটি দর্শনগ্রন্থের তাঁর এক আলোচনা আমার কাছে আছে। হিন্দুদর্শন নিয়ে রচিত বইটির লেখক ছিলেন কুমিল্লা অধিবাসী। গোবিন্দ দেব বইটির শুধু প্রশংসা করেননি, সমালোচনাও করেন। তাঁর যে বিশ্লেষণের ক্ষমতা ছিল, তা তাঁর প্রথম লেখাতেই লক্ষ করা যায়। সুরেন্দ্রনাথ কলেজের অধ্যক্ষ থাকার সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততায় তিনি লেখালেখির অবকাশ পেয়েছেন কম। ১৯৫৩-তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে তিনি দর্শনচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। বিচিত্র রাজনৈতিক কোলাহলের মধ্যেও তিনি তাঁর মানসিক স্থৈর্য অটুট রাখেন। জীবন ও জগতের জ্ঞান অর্জন ও তা বিতরণের ব্রত থেকে কখনো সরে যাননি একাত্তরে পাশবিক শক্তির হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম প্রহরেই তাঁকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করে। ধর্ম-বর্ণ-মতাদর্শ নির্বিশেষে আরো বহু শিক্ষাবিদ সেদিন নিহত হন। গোটা বাঙালি জাতিই ছিল তখন পাকিস্তানি শাসকদের শত্রু। তাই সাধারণ মানুষকে শুধু নয়, বাঙালিদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা বিশিষ্ট, তাঁদের তালিকা

করে তাঁরা হত্যা ও নির্যাতন করে। আমরা জানি, ব্যক্তিগত জীবনে গোবিন্দ দেবের মতো অজাতশত্রু মানুষ সেদিন বিখ্যাতদের মধ্যে দ্বিতীয় আর কেউ ছিলেন না। যে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে হত্যা করেছে, তাঁদের যদি তাঁর সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান থাকত, তাহলে তারা তাঁর বুকে গুলি না করে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দুই দশক পরে আমি করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদে গিয়ে করাচি ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ড. দেব গোটা পাকিস্তানে দর্শনের শিক্ষকদের কাছে কতখানি সমাদৃত ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন। ১৯৫০ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানে যতগুলো দর্শনের সম্মেলন হয়েছে, তাতে প্রফেসর এমএম শরিফের পরই তিনি সবচেয়ে সম্মানের আসনখানি পেতেন। পাকিস্তানি ফিলসফিক্যাল কংগ্রেসগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অধিবেমনগুলোয় তিনি সভাপতিত্ব করেছেন। সামরিক একনায়ক জেনারেল আইয়ুব খানের সরকার তাঁকে খুবই সম্মান ও মর্যাদা দিত। পাকিস্তানই ছিল তাঁর জন্মস্থান ও স্বদেশ। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, আরেক সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনী তাঁকে প্রার্থনারত অবস্থা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। তিনি নিহত হওয়ার সময়ও পাকিস্তান ফিলসফিক্যাল কংগ্রেসের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সম্পাদক ছিলেন। পুরো এক দশক তিনি ওই দায়িত্ব পালন করেন।

ড. দেব ছিলেন মূলত বিশুদ্ধ তত্ত্বদর্শন বা মেটাফিজিকেসর মানুষ। তাঁর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা পিএইচডির অভিসন্দর্ভটিই একটি তত্ত্বদর্শনমূলক রচনা, যার শিরোনাম Reason, Instutition and Reality। যেমন তেমন শিক্ষক তাঁর এই অভিসন্দর্ভের পরীক্ষক ছিলেন না। তাঁর পরীক্ষক ছিলেন সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ এবং হরিদাস ভট্টাচার্য। তাঁর ওই অভিসন্দর্ভ একটি মূল্যবান দার্শনিক রচনা।

পঞ্চাশের প্রথম দিকে জার্মান নাগরিক ড. স্ট্যানলি ম্যারন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে যোগ দেন। তিনি ছিলেন ইতিহাস দর্শনের শিক্ষক। তিনি পদত্যাগ করে চলে যান এবং তখনই যোগ দেন ড. দেব। সেকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়া ছিল কঠিন ব্যাপার। তাঁর মতো অভিজ্ঞ অধ্যাপকও লেকচারার হিসেবেই যোগ দেন। কিন্তু পদ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তিনি চাইছিলেন দর্শনচর্চার একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র, যা কলেজের অধ্যক্ষের চাকরি করে সম্ভব নয়। তাঁর Idealism and Progress ১৯৫২তে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর উপমহাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি যোগ দিতে পারতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগ্রহ দেখানোয় তিনি আনন্দের সঙ্গেই এখানে আসেন।

বারট্র্যান্ড রাসেলের মতে, দার্শনিকরা হলেন— are both effects and causes : effects of the social circumstances and politics and institutions of their time, causes (if they are fortunate) of beliefs which moulds the politics and institutions of later ages.  অর্থাত্ তাঁরা তাঁদের যুগের সৃষ্টি। তাঁরা প্রভাবিত তাঁদের কালের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্বারা এবং তাঁদের সময়ের প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা। অন্যদিকে যদি তাঁরা ভাগ্যবান ও প্রভাবশালী হন, তাহলে পরবর্তীকালের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারেন। ড. দেবও ব্যতিক্রম নন। তিনিও তাঁর কালের সৃষ্টি। তবে পরবর্তীকালকে তিনি কতটা প্রভাবিত করতে পেরেছেন, পরবর্তী সময় দেশ ও সমাজ তাঁর দর্শন  থেকে কতটা গ্রহণ করতে পেরেছে তা বিচার্য।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামী আদর্শের নামে, যদিও সেখানে ইসলামের সাম্য-মৈত্রীর দর্শনের প্রয়োগ ছিল না। শুরু থেকেই পাকিস্তান প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ নেতাদের করায়ত্ত থাকে। তাঁদের কাছে উঁচু আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোনো মূল্য ছিল না। ড. দেব রাজনীতিহীন মানুষ ছিলেন। কিন্তু রাজনীতিকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না, তা নয়। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সিলেটে তাঁর বিভাগ-পূর্ব সময় থেকেই পরিচয় ছিল। ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় সে পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। ঐতিহাসিক কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ড. দেবকে মওলানা আমন্ত্রণ জানান ‘পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য। ওই সময় তিনি সন্তোষে গিয়ে মওলানার কুঁড়েঘরে তিনদিন ছিলেন। তখন কথা প্রসঙ্গে মওলানা তাঁকে ইসলামী দর্শন নিয়ে লেখার অনুরোধ করেন। ড. দেবকে তিনি বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রে ইসলামী দর্শনের প্রগতিশীল দিকগুলো তুলে ধরা দরকার। তিনিও তাতে সায় দেয়।

হিন্দু ধর্মতত্ত্ব গভীরভাবে অধীত ছিল ড. দেবের। স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন নিয়ে বই লিখেছেন। বুদ্ধের মানবতাবদী দর্শন নিয়েও তাঁর গ্রন্থ রয়েছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইসলামী দর্শন নিয়েও তিনি গভীর পড়াশোনা করেন এবং বেশকিছু নিবন্ধ রচনা করেন। অকালে নিহত না হলে ধারণা করি, ইসলামী দর্শন নিয়েও তিনি গ্রন্থ প্রকাশ করতেন। কারণ মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে তার প্রয়োজন ছিল। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, এই মাটির মানুষের মধ্যে তিনটি ধর্মেরই গভীর প্রভাব রয়েছে। সুতরাং এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলামী দর্শনের চর্চা হওয়া জরুরি। তিনি যে সমন্বয়ী ভাববাদী দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন, তার সঙ্গে এ তিন ধর্মতত্ত্বের চর্চাও সংগতিপূর্ণ ছিল।

প্রথাগত মুসলিম দর্শন এবং ইসলামী দর্শন যে এক নয়। বিভিন্ন সময়ের মুসলিম দর্শন যে ইসলামের সারসত্তা থেকে দূরে সরে গেছে, তা স্পষ্ট ভাষায়ই বলতেন ড. দেব। ঐতিহ্যগত ইসলাম ও মুসলিম দর্শনের মাঝের দূরত্ব দূর করার তাগিদ দিতেন পাকিস্তানি দর্শনবেত্তাদের। ইসলামী দর্শনকে তিনি শুধু একটি প্রাচীন জ্ঞান মনে না করে একটি গতিশীল দর্শন বলেই স্বীকার করতেন। তাঁর ভাষায়— মুসলিম দর্শন is a dynamic philosophy of synthesis of matter and spirit, of faith and reason। ড. দেব বলেছেন, ‘কুরআন একই সঙ্গে যুক্তি, সদাচার ও অনুভূতিকে সমর্থন করে। ইসলামী চিন্তাধারায় বিশেষত মুসলিম দর্শনের ভবিষ্যত্ সে মিলনেরই পথে।’ [‘বিশ্বসভ্যতায় মুসলিম দার্শনিকদের দান’]

মুসলিম দর্শনের সবকিছুই সেকেলে হয়ে গেছে, তা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলেছেন, অতীতের অনেক ধারণাই অতি আধুনিক এবং আমাদের আধুনিককালের অনেক ধারণাই অতি পুরনো— some of our old concepts are really most modern and some of our most modern ideas very old. [‘Philosophy in Pakistan: Important Trends’]

বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে এক সমন্বয়ী দর্শনের প্রবক্তা ড. দেব। জড়বাদী দর্শন ও পশ্চিমের আগ্রাসী সভ্যতা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাঁর ভাষায়: উগ্র বস্তুবাদের প্রেরণায় জড়ের যে মূল্যবোধ আমাদের আজ প্রায় পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে, আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো দিনের অজাগতিক আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সঙ্গে তার সমঝোতা সম্ভব। ইসলামে দীন ও দুনিয়ার মাঝখানের ব্যবধান সরিয়ে দেবার ও গীতায় কর্মজীবনের সামঞ্জস্যের যে চেষ্টা তার মূলে রয়েছে আমার মতে এ সমন্বয়-দর্শন।

এই সমন্বয়-দর্শনের মূল কথা মানুষের ব্যাপক জীবনের কর্ম ও প্রেমের সামঞ্জস্য। বৈজ্ঞানিক জড়বাদ বা বস্তুবাদ আমাদের জীবনদর্শনকে কর্মমুখর করে তুলেছে। জড়ের সঙ্গে চেতনের ঐক্যবোধ আমাদের কর্মচাঞ্চল্যকে প্রেমমুখর করে তুলবে। এতে হবে শক্তি ও প্রেমের সমঝোতা। একাত্মবোধকে তাত্ত্বিক স্বীকৃতি না দিয়েও বুদ্ধ এই প্রেমকে সর্বজীবে মৈত্রী-ভাবনার মাধ্যমে তাঁর জীবনদর্শনে মুখ্য স্থান দিয়েছেন।

বিজ্ঞানের দেয়া অফুরন্ত শক্তি, এই প্রেমের সাহায্যেই মানুষকে শুভ পথে চালিত করে তার ভবিষ্যত্ ভাস্বর ও

উজ্জ্বল করে তুলতে পারে। [‘সমন্বয় দর্শন ও মানুষের ভবিষ্যত্’]

ড. দেব আমৃত্যু চিন্তা করেছেন কি করে একটি উন্নত সমাজ নির্মাণ করা যায় এবং মানুষে মানুষে সমঝোতা গড়ে তোলা যায়— grow a better world and a better understanding between men and man  কাজটি সহজ নয়। দার্শনিক চাইলেই তা হবে, তা নয়। একশ্রেণীর বিভেদপন্থী রাজনীতিকদের কারণে তা আজ সুদূর পরাহত। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ড. দেব মধ্যপন্থাকেই উপযুক্ত মনে করতেন। যে মধ্যপন্থার কথা প্রাচ্যের তিনটি মহান ধর্ম— হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ও ইসলামও বলেছে।

ড. দেব যে ধারার সমন্বয়ী দর্শনচর্চা করেছিলেন পাকিস্তানি আমলে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ওই ধারাটি বিকশিত হওয়া উচিত ছিল। তাঁর শেষের দিকের রচনাগুলোয় বিশুদ্ধ তত্ত্বদর্শনের উপাদান কম, মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের চিন্তাই বেশি। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের এমনকি ইসলামের শ্রেয়বোধের ওপর জোর দিয়েছেন। হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদের কথা বারবার বলেছেন। তিনি বলেছেন: I am always eager to effect a synthesis of humanism and religious consciousness and erect a durable world structure on this secular foundation.

মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে, শান্তিতে বসবাসের লক্ষ্যে এবং সার্থক মানবজীবন যাপনের স্বার্থে ঐক্য ও সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বারবার বলেছেন। তাঁর ভাষায়: Man today badly needs this gospel of unity for his survival, for his peace, for successful living on the widest possible scale.

বিজ্ঞানের সবকিছু তাঁর ভালো লাগেনি। বিজ্ঞানের যে আবিষ্কার মানুষকে ধ্বংস করে, সে আবিষ্কারে তাঁর কোনো সমর্থন ছিল না। তিনি তাই সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, I am primarily interested in the contribution of science to human happiness. মানুষের সুখই আসল, সম্পদশালী হওয়া বড় কথা নয়।

দুই.

আলোচনার শুরুতে আধুনিক দর্শনচর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দর্শন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উল্লেখ করেছি। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বদর্শনের আলোচনা হতো। ষাটের দশক থেকে মানবকল্যাণমূলক দর্শন আলোচনার প্রতি ঝোঁক দেখা যায়। এবং তার সূচনা ঘটে ড. দেবের দ্বারা।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অর্থাত্ বাংলা, বিহার ও ওড়িষার দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অখণ্ড বঙ্গে দর্শনচর্চার দ্বিতীয় প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভাববাদী বা idealist দর্শনচর্চার জন্য খ্যাত। বিশেষ করে সেখানে ভারতীয় দর্শন আলোচনায় উত্সাহ ছিল বেশি। ব্রজেন্দ্রনাথ শীল (১৮৬৪-১৯৩৮) কলেজে ছিলেন বিবেকানন্দের সহপাঠী। হিন্দুধর্মতত্ত্ব ও প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে তাঁর ব্যক্তিগত উত্সাহ যেমন ছিল, তেমনি সে বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ। হিন্দু ধর্মদর্শন বিচারে গণিতের প্রয়োগে তিনি উপমহাদেশে পথিকৃত্। তাঁর New Essays in Criticism, Introduction to Hindu Chemistry, Positive Sciences of the Ancient Hindus প্রভৃতি ভারতীয় দর্শন বিষয়ে অমূল্য কাজ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক দিগপাল কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৭৫-১৯৪৯) ভারতীয় ভাববাদী দর্শনচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। বেদান্তদর্শনের সঙ্গে ইমানুয়েল কান্টের যুক্তিবাদী দর্শনের যোগ ঘটান। তাঁর দর্শন ছিল বহুতলগভীর ও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণমূলক। অরবিন্দ ঘোষের দর্শনচর্চা প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের বাইরে। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৮৫-১৯৫২) ভারতীয় দর্শনের পাঁচ খণ্ড ইতিহাস লিখে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর A Study of Patanjali, Yoga Philsophy in Relations to Other Systems of Indian Thought  প্রভৃতি ভাববাদী দর্শনের কাজ।

শুরু থেকেই ঢাকায় হরিদাস ভট্টাচার্যরা ঢাকায় ভিন্ন পথ অনুসন্ধান করেন। ভারতীয় ভাববাদ আলোচনার চেয়ে আধুনিক দর্শনের বিশ্লেষণকেই গুরুত্ব দেন।

কলকাতার সহকর্মীদের মতো ড. দেব ভারতীয় ভাববাদ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাননি। তিনি লক্ষ করেছেন, সব ভারতীয় দর্শনের শেষ লক্ষ্য-মোক্ষ নামক এমন এক পরম পুরুষার্থ, যা একেবারেই ব্যক্তিগত, যার সঙ্গে সমষ্টিগত জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু তা-ই নয়। ওই মোক্ষ লাভের কাছে এমনকি ব্যক্তিজীবনেরও দেহ-প্রাণ এবং মনোজগতের কোনো সম্পর্ক নেই, যা এ সবের ঊর্ধ্বে এক অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা, যার নাম আধ্যাত্মিকতা। তবে ড. দেব আধ্যাত্মিকতাকে মূল্য দিয়েছেন।

বিজ্ঞানীর কাছে ও বস্তুবাদী দার্শনিকের কাছে আধ্যাত্মজগতের কোনো মূল্য নেই। বিজ্ঞানীর কাছে বস্তুই শুধু মূল্যবান, আর সব কল্পনাবিলাস। মানবতাবাদে মানুষই জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। মানবতাবাদে মানুষের আধ্যাত্মসত্তার স্বীকৃতি রয়েছে। ড. দেব একজন আধ্যাত্মিক পুরুষও ছিলেন। খাঁটি আধ্যাত্মসত্তা শান্ত-সমাহিত ও সাত্ত্বিক। আধ্যাত্মসত্তার আলোকেই মানুষের বহির্জগতের সত্যরূপ উপলব্ধি করা যায়। তিনিও তা করেছেন।

ড. দেবের দর্শন জীবনমুখী। দর্শন কতগুলো বাঁধা পন্থায় সীমিত নয়, এই প্রত্যয় নিয়ে তিনি দর্শনচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। নিজস্ব নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবনকে গড়ে তোলার প্রেরণা রয়েছে তাঁর দর্শনে। জগত্ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাঁর শেষ দিকের বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধে। তাঁর লেখাগুলো একত্রে পাঠ করলে তাতে লক্ষ্য করা যায় এক নতুন জীবনবোধের সন্ধান।

রাসেলকে উদ্ধৃত করে আগেই বলেছি, সমাজ ও রাজনীতি দার্শনিকদের প্রভাবিত করে, তাঁরাও কেউ কেউ অনাগত রাজনীতিকে প্রভাবিত করেন। গোবিন্দ দেব তাঁর ব্যতিক্রম নন। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার ১০ বছর আগে তাঁর জন্ম। বাংলাদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তাঁর জীবনাবসান। তিনি দেখেছেন প্রথম মহাযুদ্ধ, তারপর ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মারণযজ্ঞ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পঞ্চাশের মহাদুর্ভিক্ষ, বাংলা ভাগ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, ষাটের দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ছয় দফার স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়। তিনি এসব ঘটনার গভীর পর্যবেক্ষক ছিলেন। এসব ঘটনা তাঁর চিন্তাজগেক নির্বাণ করেছে। তিনি যে সিনথেটিক আইডিয়ালিজম বা সমন্বয়ী ভাববাদের কথা বলেছেন, তা গড়ে উঠেছে তাঁর সময়ের সমাজ ও রাজনীতির অবস্থার প্রেক্ষাপটে। তিনি বারবার সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন। মানুষের সুখ-শান্তি স্থাপনে পুরনো মূল্যবোধগুলোকে পুনর্ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন।

যে ধর্মীয় পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনবোধ করেননি ড. দেব। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন যুক্তি। তাঁর সহজাত আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে অর্জিত বস্তুবাদী জ্ঞানও যোগ করেছেন। একজন কমনম্যান বা সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তোলেন তাঁর সমন্বয়বাদী দর্শন। প্রশ্ন ওঠে— কিসের সঙ্গে কিসের সমন্বয়? আমরা বলব, বস্তুর সঙ্গে ভাবের সমন্বয়। আমরা তাঁর দর্শনকে বলতে পারি বাস্তবসম্মত ভাববাদ বা মানুষের কল্যাণমূলক ভাববাদ। তাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণমূলক ভাববাদী দর্শন থেকে যা আলাদা। নিরেট বস্তুবাদী দর্শনের সঙ্গে তার দূরত্ব বিরাট। ড. দেবের দর্শনকে আমরা Philosophy of life বা জীবন দর্শন বলব- Metaphysics বা তত্ত্বদর্শন বলব না। সেজন্যই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির নাম আমার জীবন দর্শন।

তত্ত্বদর্শন ও বিশ্লেষণী দর্শনের বিচার-বিশ্লেষণ থেকে সরে এসে ড. দেব যে এক উদার মানবতাবাদী দর্শনের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন, তা ছিল ষাটের দশকের অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ড. দেব ছিলেন অবিচল আস্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও গভীর ধর্মপ্রাণ হয়েও ধর্মনিরপেক্ষ। তিনি চাইতেন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানবতাবাদী হোক। বাংলাদেশের secular foundation সুদৃঢ় হোক। তাঁর রক্তের ওপর দিয়ে স্বাধীন হওয়া ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশটি তিনি দেখে যেতে পারেননি। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ছিল গোবিন্দচন্দ্র দেবের স্বপ্ন। তাঁকে কেন্দ্র করে ঢাকার দর্শনচর্চার একটি বলয় তৈরি হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে দর্শনচর্চার সুদিন যদি আবার ফিরে আসে, তাহলেই ড. দেবের আত্মা শান্তি পাবে।

 

 

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক