শেষ পাতা

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ : মহাজনি কারবারের ধরন পাল্টেছে

সুজিত সাহা চট্টগ্রাম ব্যুরো | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে রহস্যময় টু-টু পদ্ধতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে টাকা না দিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ও দেউলিয়া হয়ে পড়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় আস্থার সংকটে পড়ে পুরনো এ মহাজনি পদ্ধতি। এ অবস্থায় পণ্যের দামের ওপর লভ্যাংশ ধরেই নতুন টু-টু লেনদেন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে খাতুনগঞ্জে। লিখিত ডকুমেন্ট থাকার কারণে ঋণদাতা ও গ্রহীতা উভয়েরই আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগও রয়েছে এ পদ্ধতিতে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নতুন এ পদ্ধতির লেনদেন হয় সবচেয়ে বেশি বিক্রীত পণ্যের ওপর। যে পণ্যটি বেশি বিক্রি হয় কিংবা যে পণ্যটির বর্তমান বাজারমূল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, সেটি ক্রয়ের নামেই সুদে টাকা নেয়া হয়। এক্ষেত্রে পণ্য বিক্রির সময় বর্তমান বাজারমূল্যের পরিবর্তে অগ্রিম লাভ ধরে দাম নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেনা পণ্যটির অতিরিক্ত মূল্যই সুদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্রেতা-বিক্রেতা চাইলে যে কারো কাছেই রসিদযুক্ত পণ্যটি কম দামে বা বর্তমান বাজারমূল্যে বিক্রি করে দিতে পারবে। অথবা চাইলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পণ্য সংগ্রহ করে না ঋণগ্রহীতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিনি, ভোজ্যতেল ছাড়াও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া মসলাপণ্যের ওপর ‘নতুন পদ্ধতির টু-টু’ লেনদেন চলছে খাতুনগঞ্জে। বর্তমানে এলাচসহ মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা বেশি থাকায় এসব পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে টু-টু সেবা নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমান বাজারে এলাচের ওপর অর্থ সংগ্রহ করলে অতিরিক্ত ৫০ টাকা (কেজিপ্রতি), জিরায় অতিরিক্ত ৫ টাকা ও দারচিনিতে অতিরিক্ত ৫ টাকা হারে লভ্যাংশ আগাম কেটে রাখা হয়। এ পদ্ধতি ক্রেতা বা ঋণ নিতে চাওয়া ব্যবসায়ী পণ্যের অতিরিক্ত দামসহ হিসাব করে নির্দিষ্ট দিনের চেক প্রদান করে সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে বিক্রেতা বা অর্থ লগ্নিকারী ব্যবসায়ী পণ্যটির বর্তমান বাজারমূল্যের দাম ধরে একটি রসিদ দেন ঋণগ্রহীতাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করলে চেকটি ফেরত পাবেন ঋণগ্রহীতা। চাইলে তিনি বাড়তি মূল্যসহ পণ্যটিও সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে নতুন এ পদ্ধতিতে পণ্য সংগ্রহ হয় না বললেই চলে।

খাতুনগঞ্জের শীর্ষ একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, বিশ্বাসের লেনদেনে ফাটল ধরার কারণে অনেকে জামানত ছাড়া টাকা ধার দিতে চান না। এ কারণে পণ্য বেচাকেনার ওপর নির্ভর করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করেন। অনেকটা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি দামে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে লাভ করে বা সুদ আদায় করেন লগ্নিকারী ব্যবসায়ী। এতে অর্থের নিশ্চয়তার পাশাপাশি আইনিভাবেও বড় ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয় না।

তাদের দাবি, আগে মহাজনি কারবার বা টু-টু পদ্ধতিতে টাকা দেয়ার পর ফেরত না পেলে অনেকেই লোকলজ্জা বা আইনের চোখ ফাঁকি দিতে প্রতারণার বিষয়টি জনসমক্ষে আনতেন না। কিন্তু বর্তমানে কেউ যদি চেকের টাকা নির্ধারিত সময়ে ফেরত না দেন, তবে মামলা করার আগেও সমিতি বা তৃতীয় পক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। পণ্য বিক্রির রসিদের মাধ্যমে লেনদেন হয় বলেই টু-টু পদ্ধতির বিষয়টি আড়ালে চলে যায় বলে জানিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী এবং চাক্তাই শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, টু-টু খাতুনগঞ্জের খুবই উচ্চসুদের সাময়িক ঋণের প্রথাগত ব্যবস্থা। প্রাচীন আমলে ব্যাংকিং লেনদেন না থাকায় ব্যবসায়ীরা এভাবেই অর্থ সংগ্রহ ও লেনদেন করতেন। মাঝে কিছুদিন কমলেও ভোগ্যপণ্যে ঋণ প্রদানে ব্যাংকের কঠোরতার কারণে টু-টু পদ্ধতিতে অর্থ লেনদেন আবার বেড়ে গেছে। বর্তমানে পণ্যের দামের ওপর ভিত্তি করে লেনদেনটির পরিমাণ বাড়ছে। এতে বাজারে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

খাতুনগঞ্জের ঊর্ধ্বতন এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, খাতুনগঞ্জে নগদ অর্থের চাহিদা খুব বেশি। ব্যবসার ধরন ও ব্যবসায়িক প্রকৃতির কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের চাহিদা থাকে। ব্যাংকগুলো কঠোর থাকায় টু-টু পদ্ধতিতে লেনদেন বাড়ছে। নতুন করে স্লিপ ও পণ্যের দামের সঙ্গে লেনদেন বাড়ায় আইনিভাবে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হলেও পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ তৈরি করছে, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করছেন তিনি।