শেষ পাতা

সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

বণিক বার্তা ডেস্ক | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের উত্তরের লালমনিরহাট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এছাড়া পাহাড়ের ঢলের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে নেত্রকোনা, সিলেট, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল। এসব এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—

লালমনিরহাট: জেলার তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমার দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এটি বেড়ে বিপত্সীমার ১০-২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা করছে লালমনিরহাট ও ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। হাতীবান্ধা উপজেলার গোড্ডিমারী ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজের উজানে ডালিয়া পয়েন্টে গতকাল সকাল ৬টার পর পানি পরিমাপ করা হয়। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজের উজানে পানিপ্রবাহের বিপত্সীমা ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার নির্ধারণ রয়েছে। কিন্তু গতকালে সেখানে ৫২ দশমিক ৬২ সেন্টিমিটার পানিপ্রবাহ পরিমাপ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পানি পরিমাপক উপসহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশীদ। তিনি বলেন, তিস্তা ব্যারাজে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

ডালিয়া, লালমনিরহাট ও রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গত সোমবার থেকে রংপুর অঞ্চলে মুষলধারে বৃষ্টিপাত ও তিস্তা ব্যারাজের উজানে ভারতেও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানি বাড়তে থাকে। পানিপ্রবাহ আরো বেড়ে গতকাল ভোরে বিপত্সীমা অতিক্রম করে। এতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়ন, হাতীবান্ধা উপজেলার গোড্ডিমারী, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, ডাউয়াবাড়ী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, তুষভাণ্ডার, কাকিনা ইউনিয়ন, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়ন এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, পঞ্চগ্রাম ও গোকুণ্ডা ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার লোকজনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দুর্ভোগ বেড়েছে। মানুষের বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি শিশুদের খাদ্য ও গোখাদ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর বলেন, এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বন্যাকবলিত মানুষের তালিকা করার পাশাপাশি পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

সিলেট ও সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের ছয় উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এছাড়া প্লাবিত হয়েছে সিলেটের তিন উপজেলার নিম্নাঞ্চল। এতে দুই জেলার দুই শতাধিক বিদ্যালয়ে পানি উঠে পাঠদান বন্ধ হয়ে পড়েছে। বন্যায় বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত সাতটি সড়কের যোগাযোগ।

টানা বৃষ্টিতে গত বুধবার থেকে সুনামগঞ্জের সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। গতকালও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নদ-নদীর পানি বেড়ে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। অন্যদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গতকাল সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত তিন-চারদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, বৌলাই, কংসসহ সবক’টি নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। গতকাল বেলা ৩টায় সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বৃষ্টিপাত ও ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক ভূইয়া।

পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর ও সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক এবং সিলেটের সারী-গোয়াইনঘাট, সিলেট-সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দুই জেলায় লক্ষাধিক পরিবার বন্যাকবলিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার উপজেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে জেলা প্রশাসন।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জানান, জেলার পাঁচটি উপজেলায় বন্যাকবলিত হয়েছে ১৩ হাজার ১০০টি পরিবার। এসব পরিবারের জন্য ৩০০ টন চাল, ২ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও প্রত্যেক উপজেলায় ৫০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। প্রতি পরিবারকে ১৫ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে।

বাড়িঘর-রাস্তাঘাটের মতো এ ছয় উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি উঠে গেছে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরেও।

গতকাল বিকাল পর্যন্ত ১৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান স্থগিত করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতের কারণে ধর্মপাশায় ৫৯টি, তাহিরপুরে ১৯, বিশ্বম্ভরপুরে ২৭, জামালগঞ্জে ৩০, সদরে ২২, দোয়ারাবাজারে ১৮ ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের তিনটি বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। এসব বিদ্যালয়ের পাঠদান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে পানি উঠে যাওয়ায় সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলায় আরো অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে জেলায় কোনো বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। বৃষ্টি থামলেই পানি কমে যাবে। তখন পাঠদান শুরু হবে।

গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে সারী নদীর পানি বিপত্সীমার ১১ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার ও পিয়াইন নদীর পানি ১২ দশমিক ৭৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

রাঙ্গামাটি: গত শনিবার থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে রাঙ্গামাটির দুর্গম উপজেলা বাঘাইছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার বাঘাইছড়ির মধ্যমপাড়া, মুসলিম ব্লক, পুরান মারিশ্যা, বটতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে জীবনযাপন করছে। এ কারণে ওই এলাকাগুলোতে পানীয়জলের সংকট দেখা দিয়েছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আহসান হাবিব জিতু জানান, দ্রুতগতিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। বৃষ্টি না কমলে আরো অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজ নিজ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় খাবারের ব্যবস্থা করছেন। পৌর এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় বাজার থেকে কিনে খাবার দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে।

গতকাল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টায় রাঙ্গামাটিতে ১৭৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক ক্য চিনু মারমা। তিনি বলেন, জেলায় গত শনিবার থেকেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে গতকাল।

বান্দরবান: টানা পাঁচদিনের ভারি বৃষ্টিতে বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্লাবিত হয়েছে জেলা শহরের নিম্নাঞ্চল।

ভারি বৃষ্টিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে পৌর এলাকার আট হাজার ঘর ও দোকানপাট এবং আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন লামা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল।

এদিকে সদর পৌর এলাকার ইসলামপুর, কাসেমপাড়া, আর্মিপাড়া, বনানী স’ মিল, বাসস্টেশন, হাফেজঘোনা ও বালাঘাটা এলাকায় বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের বাজালিয়া এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যান চলাচল তিনদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

নেত্রকোনা: চারদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে নেত্রকোনার প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে এরই মধ্যে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় ১১টি ইউনিয়নের তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। কয়েকশ পরিবার বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান জানান, জেলার সোমেশ্বরী, উব্দাখালী, কংস ও ধনু নদের পানি বাড়ছে। অতিবৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে দুর্গাপুরে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপত্সীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কলমাকান্দায় উব্দাখালী নদীর পানি বিপত্সীমার ১ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে চারদিন ধরে পানি ওঠানামা করছে। বৃষ্টি ও ঢলের গতি বাড়লে পানি বাড়ে, আবার গতি কমলে পানি কমে। এভাবে প্রতিদিন গড়ে ৩০ সেন্টিমিটার পানি ওঠানামা করছে।