টকিজ

প্রামাণ্যচিত্র ‘ক্ষমাহীন নৃশংসতা’ : বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে পাকিস্তানিদের অভিমত

ফিচার প্রতিবেদক | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ১২, ২০১৯

স্বাধীনতা, মুক্তি আর অধিকারের নাগাল পেতে, আপন করে নিতে কত সংগ্রামকেই না আলিঙ্গন করতে হয়েছে এ ভূখণ্ডের জনতার, কত রক্তস্রোতেই না ভেসেছে বাংলার প্রান্তর। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের লড়াই শেষে অর্জিত হয় চূড়ান্ত মুক্তি। আর সেই মুক্তি অর্জনের গল্পে তৈরি হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

এখনো দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে উন্মোচন হচ্ছে এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতার নতুন নতুন চিত্র। এবার সে ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করলেন স্বয়ং পাকিস্তানেরই নাগরিকরা। যারা স্বচক্ষে দেখেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ; যারা প্রত্যক্ষভাবে কোনো না কোনো কারণে জড়িত ছিলেন এ যুদ্ধের সঙ্গে।

বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ, নিপীড়ন, শোষণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে মিথ্যাচার এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার কর্তৃক সংঘটিত নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গণহত্যা ও লুটপাটের ঘটনা নিয়ে কানাডাপ্রবাসী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফুয়াদ চৌধুরী নির্মাণ করেছেন অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ‘মার্সিলেস মেইহেম’ বা ‘ক্ষমাহীন নৃশংসতা। যেখানে নির্মাতা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে পাকিস্তানিদের অভিমত।

২০১৮ সালে নির্মিত ৫৪ মিনিট ব্যাপ্তিকালের এ প্রামাণ্যচিত্রটিই আজ বিকাল ৫টায় দেখানো হবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে। একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের আয়োজনে প্রদর্শিত হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্রটি। এটি প্রযোজনা করেছেন আমান উল্লাহ চৌধুরী।

এ প্রামাণ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারী প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তানের চারজন ব্যক্তিত্ব। তারা হলেন রওশন জামির (১৯৭১ সালে তত্কালীন যশোর জেলার পাকিস্তানি প্রশাসক, পরবর্তী সময় পাকিস্তান সরকারের ফেডারেল সেক্রেটারি হিসেবে অবসর নেন), সাংবাদিক তারেক খান (১৯৭১ সালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে শেষ কার্গো দিয়ে পাকিস্তানে ফেরত যান), ১৯৭১ সালে স্কুলপড়ুয়া কিশোর মোয়াজ্জেম খান (বাবা ছিলেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সে কারণেই জেনারেল নিয়াজির প্রতিবেশী ছিলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে) এবং লেখক ও কলামিস্ট তারেক ফাতাহ। এ চার প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিশিষ্টজনের বক্তব্য, বিশ্লেষণ আর নিপীড়িত-নির্যাতিত ও অসহায় বাঙালি নিধনযজ্ঞের ভয়াবহতার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ক্ষমাহীন নৃশংসতায়।

প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

মার্সিলেস মেইহেম বা ক্ষমাহীন নৃশংসতা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পূর্বাপর জানাতে গতকাল টকিজের মুখোমুখি হন নির্মাতা ফুয়াদ চৌধুরী। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়:

প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো প্রভাবিত করেছে আপনাকে?

দীর্ঘদিন কানাডায় বসবাস করি। সেখানে পাকিস্তানি ব্লগার, লেখক, কবি ও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল। শুরু থেকেই আমার উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানিদের মুখ থেকে শোনা এবং ইতিহাসের অংশ করে তোলা। আমি জানতাম, এসব কথা পাকিস্তানে বসে বলার সাহস না করলেও এখানে করবেন। যদিও এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ বলেছেন যে তারা বলবেন কিন্তু অফ দ্য রেকর্ডে। কারণ হিসেবে তাদের অনেকেই সরাসরি বলেছেন, ‘লাহোর, করাচিতে আমাদের বাড়িঘর আছে, এসব জানতে পারলে রাষ্ট্র তা পুড়িয়ে ফেলবে।’ শেষ পর্যন্ত যারা ক্যামেরার সামনে সাহস নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের নিয়েই প্রামাণ্যচিত্রটি বানিয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ বিষয়গুলোর সংশ্লিষ্টতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে?

আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক আদালত বা যেকোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকার প্রামাণ্যচিত্রটিকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। তথ্য হিসেবে এর শতভাগ সত্যতা আছে। যেটা এতদিন ওই অর্থে ছিল না।