আত্মসাতে গড়া সম্পদ ফের আত্মসাৎ!

নিহাল হাসনাইন, খুলনা ও নড়াইল থেকে ফিরে | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমি লিখিয়ে নিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা নিয়েছেন চারতলা বাণিজ্যিক ভবনের একাংশ। ১৪০০ স্কয়ার ফুটের একটি কমার্শিয়াল স্পেস নিয়েছেন স্থানীয় এক সাংবাদিক। নিকটাত্মীয়ের নামে একটি ফ্ল্যাট নিয়েছেন এক ম্যাজিস্ট্রেট। আরো দুজনের নামে রেজিস্ট্রি হয়েছে পাঁচটি ফ্ল্যাট। দেড় কোটি টাকার জমি গেছে এক ব্যবসায়ীর হাতে। এর সবই লিখিয়ে নেয়া হয়েছে চলন্তিকা যুব সোসাইটি নামের খুলনা অঞ্চলভিত্তিক একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালকের কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি আবার এসব সম্পদ গড়ে তুলেছিল গ্রাহকের জামানত থেকে আত্মসাত্কৃত টাকায়। এ অর্থ আত্মসাতের মামলায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক কারাগারে আটক রয়েছেন এক বছর ধরে।

চলন্তিকা যুব সোসাইটি নামের বেসরকারি সংস্থাটি ২০০৪ সালে খুলনায় গ্রাহক সংগ্রহ শুরু করে। এরপর পর্যায়ক্রমে নড়াইল ও বাগেরহাটে কার্যক্রমের বিস্তার ঘটায় প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকের টাকা ছয় বছরে দ্বিগুণ ও ১০ বছরে তিন গুণ করে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মেয়াদি আমানত, মাসিক আমানত সংগ্রহ ও ঋণদান কর্মসূচির কাজ শুরু করে সংস্থাটি। এভাবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ৯৬ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নেয় চলন্তিকা যুব সোসাইটি। এরপর ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. খবিরুজ্জামান ও নির্বাহী পরিচালক মো. সরোয়ার হুসাইনসহ ৩৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নড়াইলের কালিয়া থানায় মামলা করেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক সাজ্জাদুর রহমান।

ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তা গ্রেফতার হলেও পলাতক ছিলেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক। এরপর গত বছরের মে মাসে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন চলন্তিকা যুব সোসাইটির চেয়ারম্যান খবিরুজ্জামান। এরও দুই মাস পর খুলনার দৌলতপুর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হুসাইনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৪২০ ধারার মামলাটি তদন্তের এক পর্যায়ে মুদ্রাপাচার প্রতিরোধ আইনে আরেকটি মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির অর্গানাইজ ক্রাইমের ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াডের উপপুলিশ পরিদর্শক অলক চন্দ্র হালদার বাদী হয়ে কালিয়া থানাতেই মামলাটি দায়ের করেন।

এক বছরেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার পর গত ২৭ জুন নড়াইলের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন চলন্তিকা যুব সোসাইটির চেয়ারম্যান খবিরুজ্জামান। তিনি দাবি করেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা দেয়ার শর্তে আমানত সংগ্রহ করে তার প্রতিষ্ঠান। ওই টাকায় খুলনা ও এর আশপাশে মোট ২৪টি স্থানে কৃষি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক শ্রেণীর জমি কিনেছিল সংস্থাটি।

গ্রাহকের জামানতের অর্থ মুনাফাসহ ফেরত দেয়ার জন্য খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় সংস্থাটি চলন্তিকা টাওয়ার নামের একটি বহুতল আবাসিক ভবনও গড়ে তোলে বলে দাবি করেন তিনি।

জবানবন্দি দেয়ার সময় খবিরুজ্জামান আরো দাবি করেন, ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৭ সালে শাহ আলম হাওলাদার নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা নিজ স্ত্রীর নামে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চলন্তিকা টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাট ও প্রতিষ্ঠানের একটি গাড়ি লিখিয়ে নেন।

খবিরুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, এজন্য ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ও চলন্তিকা যুব সোসাইটির নির্বাহী পরিচালককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিলেন। পরে মধ্যরাতের আগে সাব-রেজিস্ট্রারকে ডেকে নিয়ে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক সই নিয়ে চলন্তিকা টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাট লিখে নেন শাহ আলম। ওই সময় শাহ আলম হাওলাদার খুলনা পুলিশ লাইনসে উপপুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর কয়েক দিন পরই তত্কালীন খুলনা গোয়েন্দা পুলিশের প্রভাবশালী আরেক কর্মকর্তাও একই প্রক্রিয়ায় আবারো দুজনকে তুলে নিয়ে খুলনা জিরো পয়েন্টে অবস্থিত চলন্তিকার চারতলা বাণিজ্যিক ভবনের একাংশ লিখিয়ে নেন। এছাড়া কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর ও ১৮ ডিসেম্বর তাদের কাছ থেকে চলন্তিকা টাওয়ারের আরো পাঁচটি ফ্ল্যাট জোরপূর্বক লিখিয়ে নেন তুহিন ও মুকুল কান্তি নামে দুই ব্যবসায়ী।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার সময় চলন্তিকা যুব সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হুসাইন জানান, খুলনার হরিণটানায় চলন্তিকা যুব সোসাইটির নামে কেনা ১৭ কাঠা জমি ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূল্যে কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন খুলনার এক ব্যবসায়ী, যিনি খুলনার একটি চার তারকা হোটেলের মালিক। এছাড়া একটি বেসরকারি ব্যাংকেও তার শেয়ার রয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর কথামতো ২০১৭ সালের মে মাসে খুলনার হোটেল ওয়েস্টিন ইনে যান সরোয়ার হুসাইন ও খবিরুজ্জামান। সেখানে তাদের নগদ ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয় ছয়টি ব্যাংক চেকের মাধ্যমে। যদিও পরবর্তী সময়ে ওই ছয়টি চেক হাতিয়ে নেন খুলনার আরেক পুলিশ কর্মকর্তা ও এক সাংবাদিক।

জবানবন্দিতে চলন্তিকা যুব সোসাইটির চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক আরো জানান, হরিণটানায় চলন্তিকা যুব সোসাইটির নামে জমি কিনে একটি চারতলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয় ২০১৪ সালে। চারতলা ভবনের নিচতলায় ছিল ছাপাখানা। দোতলায় ছিল চলন্তিকার মালিকানাধীন একটি পত্রিকা অফিস। তৃতীয় ও চতুর্থতলা ব্যবহার করা হতো চলন্তিকার প্রধান কার্যালয় হিসেবে। শুরু থেকেই চলন্তিকার জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক মিজানুর রহমান মিল্টন। পরবর্তী সময়ে চলন্তিকার টাকায় একটি পত্রিকার অনুমোদন নিয়ে সেটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ওই সাংবাদিককে। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ চলন্তিকা যুব সোসাইটি যখন কার্যক্রম গুটিতে নিচ্ছিল; ঠিক সে সময়েই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পত্রিকাটি ও ১ হাজার ৪০০ স্কয়ার ফুটের একটি বাণিজ্যিক স্পেস লিখিয়ে নেন মিজানুর রহমান মিল্টন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনার জীবন বীমা করপোরেশনে কর্মরত অবস্থায় গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের জন্য চলন্তিকা যুব সোসাইটি নামের এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন খবিরুজ্জামান, সরোয়ার হুসাইন ও মিজানুর রহমান মিল্টন। এ অনুযায়ী ২০০৪ সালে গড়ে তোলা হয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে জামানত হিসেবে গ্রাহকের কাছ থেকে ৯৬ কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করেন তারা। ওই অর্থে পরবর্তী সময়ে জমি কিনে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ শুরু করে চলন্তিকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনা জিরো পয়েন্টের ঠিক পাশেই চলন্তিকা যুব সোসাইটির বাণিজ্যিক ভবনটি। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালককে গ্রেফতারের পর অফিসটিতে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এখনো চলন্তিকার মালিকানাধীন পত্রিকাটির কার্যক্রম ওই ভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। ছাপাখানার তত্ত্বাবধান করতে দেখা যায় উল্লিখিত পুলিশ কর্মকর্তা শাহ আলমকে। কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকেই অবসরপূর্ব ছুটিতে রয়েছেন তিনি। ছুটিতে যাওয়ার পর থেকে তিনিই ওই ছাপাখানাটির দেখাশোনা করছেন। এ সময় চলন্তিকা টাওয়ারের ফ্ল্যাটটির বিষয়ে প্রশ্ন করতেই সটকে পড়েন তিনি।

খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় সাত কাঠা জায়গার ওপর বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে চলন্তিকা যুব সোসাইটি। প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে মিল রেখে ওই বহুতল ভবনের নাম রাখা হয়েছিল চলন্তিকা টাওয়ার। গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের মামলা চলাকালেই চলন্তিকা টাওয়ারের ছয়টি ফ্ল্যাট লিখে নেন পুলিশ কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এর মধ্যে পাঁচটি ফ্ল্যাটই রেজিস্ট্রি করা হয় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা কারাগারে আটক থাকা অবস্থায়। বর্তমানে ওই চলন্তিকা টাওয়ারের নাম বদলে রাখা হয়েছে স্বপ্নের ঠিকানা। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন পুলিশ কর্মকর্তা শাহ আলম।