শীর্ষ খেলাপির তালিকায় মাহিন এন্টারপ্রাইজ

ব্যাংকের টাকায় ব্যাংক পরিচালক আশিকুর রহমান

ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম ব্যুরো | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

সংসদে সদ্য প্রকাশ করা শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকায় পাঁচ নম্বরে রয়েছে চট্টগ্রামের মাহিন এন্টারপ্রাইজের নাম। শিপ ব্রেকিং খাতে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮২৫ কোটি টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আশিকুর রহমান লস্কর (মাহিন) নিজেই একটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক। শীর্ষ খেলাপির তালিকায় মাহিন এন্টারপ্রাইজের নাম আসার পরও এখনো মেঘনা ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে বহাল রয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ করা তালিকায় মাহিন এন্টারপ্রাইজের মোট ঋণ দেখানো হয়েছে ৯৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮২৫ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা নেয়া হয়েছে এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির কাছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৪৩ কোটি টাকা এবং ঢাকা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ও ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার বড় অংকের পাওনা রয়েছে। এ ঋণগুলোর অবস্থাও ভালো নয় বলে জানিয়েছেন ব্যাংক দুটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তিন ব্যাংক মিলে মাহিন এন্টারপ্রাইজের কাছে বর্তমান পাওনা ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৫ সালে এবি ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করে মাহিন এন্টারপ্রাইজ। এরপর ২০০৭ সাল থেকে ধীরে ধীরে বড় অংকের ঋণ সুবিধা নিতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন সময়ে শত শত কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নিলেও ব্যাংকের টাকা পরিশোধে কোনো সময়েই তত্পর ছিলেন না মাহিন। বিশেষ করে ২০১৩-১৪ সালের পর থেকে এবি ব্যাংকে বড় অংকের কোনো টাকা পরিশোধ করেননি বললেই চলে। বর্তমানে সেই ঋণের পরিমাণ ৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে বড় অংকের এ ঋণের টাকা ফেরত না পেয়ে বিপাকে রয়েছে এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা। কারণ বড় অংকের এ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধকি সম্পত্তির পরিমাণ খুবই নগণ্য। তাছাড়া ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের ব্যবসায় নেই। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্তারা বহু চেষ্টার পর ঋণের টাকা উদ্ধারের কোনো আশ্বাস পাননি।

মাহিন এন্টারপ্রাইজের ব্যবসা শুরুর ঘটনা বেশিদিনের নয়। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা জামালপুরের আতিউর রহমান লস্কর। জার্মানভিত্তিক কোম্পানি ‘অ্যাকর্ড’-এর মেরিন সার্ভেয়ার ছিলেন তিনি। পেশা থেকে অবসর নিয়ে ২০০০ সালের দিকে চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে ভোগ্যপণ্য (গম) আমদানি করলেও অল্প কিছুদিন নাম লেখান জাহাজ ভাঙা খাতের ব্যবসায়। অবশ্য তাকে বেশিদিন ব্যবসায় সময় দিতে হয়নি। কারণ লন্ডন থেকে পড়ালেখা শেষ করে এসে তার ব্যবসার হাল ধরেন যোগ্য ছেলে আশিকুর রহমান লস্কর (মাহিন)। জাহাজ ভাঙা শিল্পের সুদিনে ব্যবসায় এসে একের পর এক ব্যাংক লোন নিয়েছেন। যদিও ঋণের টাকায় ব্যবসা না করে ফান্ড ট্রান্সফার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পাওনাদার ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিলেও সেই ঋণের বড় অংশ তিনি বিদেশে পাচার করেছেন। বিশেষ করে মাহিন এন্টারপ্রাইজের বড় অংকের ফান্ড পানামা ও লাইবেরিয়ায় পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত শুরু করেছে। এছাড়া ব্যাংকঋণের টাকায় একটি ব্যাংকের পরিচালক হওয়া, জমি কেনা, বিলাসবহুল বাড়ি বানানো, নতুন নতুন মডেলের গাড়ি কেনাসহ বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগ রয়েছে এ তরুণ উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে।

তারা বলেন, মাহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আশিকুর রহমান লস্কর সম্পর্ক ও ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু পাওনাদার ব্যাংকের ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে সেই টাকায় তিনি মেঘনা ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন। খেলাপি হওয়ার পর তিনি এখনো ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে বহাল রয়েছেন।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার প্রধান ও ব্যাংকটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাহিন এন্টারপ্রাইজের কাছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৪৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এরই মধ্যে সংসদে প্রকাশ করা শীর্ষ খেলাপির তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নাম এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে দ্রুত আমাদের পাওনা আদায়ে চেষ্টা করছি।

ব্যবসার শুরু থেকে মাহিন এন্টারপ্রাইজের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশীর ২ নম্বর সড়কের ১৬/সি নম্বর বাড়িটি। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের টাকায় জমি কেনেন অভিজাত আবাসিক এলাকা উত্তর খুলশীর ৫ নম্বর সড়কে। প্রায় ১০০ শতক জমিতে সম্প্রতি গড়ে তোলেন বিলাসবহুল বাড়ি। ওই বাড়িতে রয়েছে সুইমিংপুল, জিমনেশিয়ামসহ অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। নগরীর অভিজাত খুলশী এলাকায় বর্তমানে প্রতি শতক জমির মূল্য কোটি টাকার বেশি। জমির দাম ও নির্মাণ ব্যয়সহ বর্তমানে এ বিলাসবহুল বাড়ির মূল্য শতকোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছেন নির্মাণকাজে জড়িত এক প্রকৌশলী। তিনি বলেন, এ ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে টেকসই, অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল সামগ্রী।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল আশিকুর রহমান লস্করের ব্যক্তিগত সেলফোন নম্বরে কল করা হলে পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

জাহাজ ভাঙা শিল্পের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের স্বর্ণযুগ। এ সময়ে বহু নতুন উদ্যোক্তা এই শিল্পে বিনিয়োগ করেন। ব্যাংকগুলো তখন এ খাতে নিঃসংকোচে বিনিয়োগ করে। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উত্থান-পতনে অনেক ব্যবসায়ী বড় লোকসান করেন। এ সময়ে কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি বিপাকে পড়ে। কারণ এ খাদ থেকে উঠে আসতে তাদের কোনো বিকল্প প্রতিষ্ঠান ছিল না। তবে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত অর্থায়নের সুযোগে ফান্ড ট্রান্সফার করে জমি কেনা, বিদেশে পাচার কিংবা ভোগবিলাস করে অর্থ আত্মসাৎ করা ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কম নয়। মাহিন যেহেতু এ সময়ে ব্যবসায় এসেছেন, সেই হিসেবে সব ধরনের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

জাহাজ ভাঙার পাশাপাশি এ তরুণ উদ্যোক্তা এআরএল গ্রুপ নামে পোশাক খাতেও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পোশাক খাতের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মাহিন গ্রুপের সাবেক এক কর্মকর্তা।