প্রথম পাতা

সংসদে শীর্ষ ৩০০ খেলাপির তালিকা প্রকাশ : ঋণখেলাপির শীর্ষ দশে গ্রামীণ শক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

জাতীয় সংসদে গতকাল শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তালিকায় শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপির মধ্যে আছে গ্রামীণ পরিবারের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ শক্তি। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত হিসাবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০১ কোটি টাকা। দেশের একক কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা দশম সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ।

দেশের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি জনপ্রিয় করতে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রামীণ শক্তি। সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৬০৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে এসে এ ঋণের প্রায় পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ঋণখেলাপির সে তালিকায় নাম ছিল না গ্রামীণ শক্তির।

অর্থমন্ত্রীর প্রকাশিত দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকার প্রথমেই রয়েছে সামান্নাজ সুপার অয়েল লিমিটেডের নাম। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রামভিত্তিক গ্রুপটির আরেক প্রতিষ্ঠান এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেডও রয়েছে শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপির তালিকায়। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭০৭ কোটি টাকা।

জনতা ব্যাংকের ঋণখেলাপি ইউনুস বাদলের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ গ্রুপটির কাছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। চলতি বছর এ ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে। তবে ইউনুস বাদলের সব ঋণকে একসঙ্গে না দেখিয়ে কোম্পানির ভিত্তিতে দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গ্যালাক্সি সুয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮৪ কোটি টাকা।

জনতা ব্যাংকের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণ কেলেঙ্কারি ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান স্থান পেয়েছে শীর্ষ খেলাপির তালিকায়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ গ্রুপটির কাছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছর এ ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে। শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থানে রয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তৃতীয় স্থানে থাকা রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৭৫ কোটি, রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার লিমিটেডের কাছে ৭৯৮ কোটি এবং ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টস লিমিটেডের কাছে ৭৭৬ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী প্রকাশিত ফেব্রুয়ারির তালিকায় শীর্ষে থাকা কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেমস লিমিটেড এবার চতুর্থ স্থানে রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল শেষে অটোবির এ প্রতিষ্ঠানের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮২৮ কোটি টাকা। শীর্ষ ১০-এর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাহিন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের কাছে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৮২৫ কোটি ও সুপ্রভ কম্পোজিট লিমিটেডের কাছে ৬১০ কোটি টাকা।

শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় যুক্ত হয়েছে জনতা ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় গ্রাহক নারায়ণগঞ্জের রানকা সোহেল। শিল্প গ্রুপটির রানকা সোহেল কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের ৪৪৯ কোটি, রানকা ডেনিম টেক্সটাইল মিলসের ২৩১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এছাড়া খেলাপির তালিকায় নতুন করে নাম এসেছে দেশের অন্যতম আবাসন প্রতিষ্ঠান রূপায়ণের। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটের মোট ঋণ ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা আর খেলাপি হয়েছে ২৮০ কোটি টাকা।

সংসদের বাজেট অধিবেশনে গতকাল বৈঠকে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম ও মহিলা এমপি লুত্ফুন নেসা খানের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডাটাবেজে সব তফসিলি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০। তাদের কাছে পাওনার পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ৩১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শীর্ষ ৩০০ খেলাপির নেয়া ঋণের পরিমাণ ৭০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণেরপরিমাণ ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি ও শ্রেণীকৃত হয়েছে ৫২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার ঋণ।

রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি ব্যাংক গত বছর (জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১৮) ৬ হাজার ১৬৩টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ১ হাজার ১৯৮ কোটি ২৪ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে বলেও সংসদে জানান অর্থমন্ত্রী। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে বেশি সুদ মওকুফ করেছে অগ্রণী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি ২ হাজার ৮টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৪৯৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সুদ মওকুফ করেছে। এছাড়া কৃষি ব্যাংক ৬৬টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৪৩৫ কোটি ৯৬ লাখ, রূপালী ব্যাংক ২০৩টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ১৩৪ কোটি ২৬ লাখ, সোনালী ব্যাংক ১৪টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৭৩ কোটি ৭৩ লাখ, জনতা ব্যাংক ২ হাজার ৪৭৩টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৫৩ কোটি ৮১ লাখ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ১ হাজার ৩৮০টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ও বেসিক ব্যাংক ১৯টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে।