দেশের খবর

চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে অনিয়ম অনুসন্ধানে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম ব্যুরো | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ১২, ২০১৯

চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তা নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর যোগাযোগের অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বড় এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। দীর্ঘ সাড়ে ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি পিলারের পাইলিং কাজ শেষ হয়েছে। পুরো প্রকল্পের মাটি পরীক্ষার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দরপত্র আহ্বানের পর থেকেই অভিযোগ ওঠে, সিডিএর তত্কালীন চেয়ারম্যান আব্দুস ছালামের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্পটির অনুমোদিত ডিপিপিতে উন্মুক্ত ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের কথা বলা হলেও তা অনুসরণ করেনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ। প্রথমবারের দরপত্রে গত ১০ বছরে চার লেনবিশিষ্ট তিন কিলোমিটার উড়ালসড়ক বা ব্রিজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও পরে তা পরিবর্তন করে চার লেনবিশিষ্ট আট কিলোমিটার উড়ালসড়ক বা ব্রিজ নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ৫০০ কোটি টাকার একটি সিঙ্গেল চুক্তিনামা থাকতে হবে বলেও শর্ত দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশে উড়ালসড়ক নির্মাণকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের। সিডিএর চেয়ারম্যানের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পেয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এ ধরনের সংশোধনী আনা হয়। এ প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে চট্টগ্রামের আখতারুজ্জামান (মুরাদপুর-লালখানবাজার) ফ্লাইওভার প্রকল্পের কাজ শেষ করে।

২ হাজার ৮৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজটি পেয়েছে ম্যাক্স র্যানকিন জেভি। এ কাজে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ছিল চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। এছাড়া চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো কোম্পানি লিমিটেড, সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন লিমিটেড, আব্দুল মোনেম জেবি ও হেগো তমা মীর আখতার জেভি দরপত্রে অংশ নিয়েছিল। তবে প্রকল্পটিতে আন্তর্জাতিক মানের দরপত্র না হওয়া ও পছন্দের প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সকে কাজ পাইয়ে দিতে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগে। কিন্তু এখন দেখি প্রকল্পটিতে অনেক ঝামেলা। দুদক থেকে চিঠি এসেছে। চিঠিতে অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া দরপত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি অনুসন্ধানে কাজ করছে।

গত ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সিডিএর বাস্তবায়নাধীন এ এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে ১৬ কিলোমিটার। চার লেনবিশিষ্ট এ সড়কের প্রস্থ হবে সাড়ে ১৬ মিটার। নগরীর মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত নির্মাণাধীন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ফ্লাইওভারটি এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এরই মধ্যে প্রকল্পের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে কাঠগড় পর্যন্ত প্রায় ৬০ পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। পাঁচটি টেস্টপাইল সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখিত স্থানে নিরাপত্তা ফেন্সিংয়ের বাইরে প্রয়োজনীয় দুই লেন রাস্তা রাখার জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার কার্পেটিংসহ রাস্তা প্রশস্তকরণ কাজ শেষ হয়েছে এবং রাস্তার দুই পাশে ড্রেন ও ফুটপাতে নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া লালখানবাজার থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত প্রায় ৪৫০টি সয়েল টেস্টের কাজ শেষ হয়েছে।

বন্দরের পাশ ঘেঁষে যাওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে এরই মধ্যে অভিযোগ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির নকশা রিভিউ করতে এরই মধ্যে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ চট্টগ্রাম নগরীর বড় প্রকল্পগুলো নগরবাসীর উপকারের চেয়ে সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালামের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত লাভবান হওয়ার প্রকল্প বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মাহফুজুর রহমানের মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।