সম্পাদকীয়

ভোক্তার বাজেট ভাবনা

এম শামসুল আলম | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ১২, ২০১৯

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আজ ১৩ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করা হবে। বাজেটের আকার হবে প্রায় সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকা। তার মধ্যে উন্নয়ন বাজেট প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ বাজেটে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন হবে ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেটে সর্বোচ্চ ৫৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে পরিবহনে। তার পরই বরাদ্দ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব ও উন্নয়ন উভয় বরাদ্দ বেড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ এসব খাতে।

প্রতি বছরই বাজেটের আকার নিয়ে কারো না কারো বক্তব্যে প্রকাশ পায় বাজেট উচ্চাভিলাষী। অর্থমন্ত্রীও বাজেট বক্তৃতায় এমন বক্তব্য বলে গর্ববোধ করেন। কিন্তু ভোক্তাদের কাছে বড় আকারের এ বাজেটের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রস্তাবিত বাজেট প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ। উন্নয়ন বাজেট প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৯ শতাংশ। গত এক দশকে বাজেটের এমন প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা এখন ৮ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা সোয়া ৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এনবিআর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু রাজস্ব ও উন্নয়ন উভয় খাতে বাজেটে বরাদ্দ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাজেটের সে বরাদ্দ ব্যয়ে অজ্ঞতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতিজনিত অপচয়, তছরুপ ও আত্মসাৎ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয়, কোনোভাবেই তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সারা সমাজ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে।   

প্রতি বছর বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠে, বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ যেন বৃদ্ধি পায়। ভোক্তা যেসব শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন, সেসব সেবা বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির ওপর কতটা নির্ভরশীল—এ প্রশ্ন ভোক্তাকে ভাবায়। গত ১০ বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর পরিমাণে কর্মচারী-কর্মকর্তা-শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ হয়েছে। সেই সঙ্গে ভবনও নির্মাণ হয়েছে। যৌক্তিক চাহিদার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ সৃষ্টি করা হয়েছে অনেক বেশি। পদের তুলনায় লোক নিয়োগ হয়েছে আরো বেশি। স্থান সংকুলান হয়েছে পর্যাপ্ত। অথচ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে জ্ঞান প্রজননক্ষমতা হারিয়েছে। অনেকগুলোর আবার সে ক্ষমতাই নেই। নিয়োগে প্রতিযোগিতা নেই বলে শিক্ষক-শিক্ষিকা নির্বাচনী কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য পদত্যাগ করেন। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য়ের বিরুদ্ধে নির্মাণ ও নিয়োগে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় সরকারের সফলতা দৃশ্যমান। অথচ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি দ্বারা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই জনবল হ্রাস করেনি। ব্যয়সাশ্রয়ী  হয়নি। বরং বাজেট বৃদ্ধিতে তাদেরও ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন অসংগতিপূর্ণ। চাহিদা নির্ধারণ ও এর বিপরীতে ব্যয় প্রাক্কলন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। ক্রয় ও নির্মাণ ঠিকাদার নিয়োগ বিতর্কিত। উপাচার্য নিয়োগেও ঠিকাদারদের ভূমিকা থাকে। ঠিকাদাররা যথেষ্ট প্রভাবশালী। তাদের ক্ষমতার উৎস স্থানীয় নেতাকর্মী। ছাত্র-ছাত্রীদের নেতা-নেত্রীরা। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় শিক্ষকরাও। তাছাড়া উপরের পর্যায়ে সংযোগও শক্ত। এসব স্বার্থসংশ্লিষ্টরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এদের নিয়ন্ত্রণে। উপাচার্য এদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত উপাচার্য সুরক্ষিত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জবাবদিহির আওতায় নেই। এখন উপাচার্য হওয়ার জন্য অনেকেই চাকরির শুরুতেই গ্রুপিং, লবিং, এমনকি অর্থও ব্যয় করেন। জ্ঞান অর্জন করেন না। কারণ জ্ঞান অর্জন উপাচার্য হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃজনক্ষমতা হারাতে বাধ্য। বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি ৪৫টি এবং বেসরকারি ১০৩টি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রতিযোগিতাহীন। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য এবং অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ বাণিজ্য হয়।

জাতীয়করণ করায় রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন সরকারি হলেও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার মান উন্নয়ন হয়নি। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজগুলোর নির্মাণ ব্যয় ও পরিচালনা ব্যয় এখন সরকারই বহন করে। এসব প্রতিষ্ঠান কোনো এক সময় সরকারি হয়। নতুন করে কোনো সরকারি স্কুল-কলেজ করা হয় না। ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য হয়। ফলে শিক্ষা ও শিক্ষকের মান উন্নত নয়। এসব স্তর পেরিয়ে যখন কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষিত হয়, তখন সে মানসম্মত শিক্ষা পায় না। শিক্ষার্থীকে ব্যক্তি খাতেও শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিক্ষায় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি ভোক্তার শিক্ষা ব্যয় কিংবা মান বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখে না।

গত এক দশকে সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীর হার, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, তদুপরি শিক্ষিত জনসংখ্যা বেড়েছে। এজন্য প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। কিন্তু শিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ায় এ বিনিয়োগ ফলপ্রসূ হচ্ছে না। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থী ইংরেজি ও অংকে দুর্বল ভিত্তি নিয়ে আসে। সমীক্ষায় দেখা যায়, পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে অংকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ২০১১ সালে ছিল ৩২ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ। বাংলা, ইংরেজি ও অংকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশও কাঙ্ক্ষিত মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। উচ্চ মাধ্যমিকের পরও মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা থাকায় কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা ১০ শতাংশও পাস মার্ক পায়নি। শিক্ষার এমন নিম্নমানসম্মত জনবল শ্রমবাজারে অচল এবং সম্পদে পরিণত হওয়া দুরূহ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ এখানেই। দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা সবার পেছনে। এমনকি নেপালেরও। শিক্ষার মান অনেকটাই নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতার ওপর। এখানেই আমরা বড় বেশি বিপদে আছি। বাস্তবে দেখা যায়, সরকারি বিনিয়োগে মানহীন শিক্ষার সম্প্রসারণ শিক্ষাকে বাণিজ্যে পরিণত করার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। 

স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে সরকারের সফলতা হাসপাতালগুলো দেখলেই বোঝা যায়। গ্রামীণ জনসাধারণ উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পায়। কোনো এক উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দেখা যায়, সেখানে ৩১ বেডের হাসপাতাল আছে। অথচ রোগী ভর্তি আছে মাত্র তিনজন। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার বন্ধ। কারণ অপারেশন করার মতো রোগী নেই। ডাক্তার আছে ২১ জন। কর্মরত ১০ জন। দিবসে বহির্বিভাগে কিছু রোগী আসে। তাদের দেখার জন্য ১০ জন ডাক্তার লাগে না। মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে চায় না। চিকিৎসা নেয় ডাক্তারের বাসায় কিংবা তার প্রাইভেট চেম্বারে। কাজের বুয়াও এভাবেই চিকিৎসা নেয়। সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসায় ভোক্তার আস্থা নেই। সেখানে তারা হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হয়। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালগুলোও অনুরূপ অনাস্থার শিকার। বিত্তবান তো বটেই, এমনকি নিম্নমধ্যবিত্তরাও চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায়। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালায়েশিয়ায় হরহামেশা যায়। ভারতে তো কথায় নেই। মন্ত্রী হার্টে রিং পরানোর মতো অপারেশন করাতেও বিদেশে যান। চেকআপে রাষ্ট্রপতিকেও বিদেশে যেতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে একদিকে বাজেট বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশেও ব্যক্তি খাত চিকিৎসা ব্যবসার সম্প্রসারণ হচ্ছে। এ ব্যবসায় দেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাতে মনে হয়, আগামীতে কেবল স্বাস্থ্যসেবার বাজারই নয়, লাভজনক সব পণ্য ও সেবার বাজার বিদেশী উদ্যোক্তাদের দখলে যাবে। দেশী উদ্যোক্তারা বাজার হারাবেন। তাহলে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির তাত্পর্য কী? ভোক্তার কাছে এমন প্রশ্নের উত্তর, শিক্ষার মতোই সরকারি বিনিয়োগে মানহীন স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ দ্বারা স্বাস্থ্যসেবাকে বাণিজ্যে পরিণত করা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে দক্ষ ও সক্ষম জনসম্পদ তৈরি হয়। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে আর্থিক প্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পায়। এ বৃদ্ধি আবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে। এভাবেই বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি চক্রাকারে অব্যাহত থাকে। তাতে একদিকে জাতি দক্ষ ও সুস্বাস্থ্যসম্পন্ন জনসম্পদে সমৃদ্ধ হয়, অন্যদিকে এ সম্পদ বৃদ্ধিতে প্রবৃদ্ধির নানামুখী উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সরকারের বিনিয়োগের যোগসূত্রটি স্পষ্ট করা যাচ্ছে না। ফলে আগামীতে এ প্রবৃদ্ধি বজায়যোগ্য হবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়।

শ্রমবাজারে এখন স্বল্পশিক্ষিতদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান খুবই সীমিত। উচ্চপ্রবৃদ্ধি আমাদের শ্রমবাজারের গুণগত পরিবর্তন আনতে পারেনি। আবার বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও সরবরাহে নানামুখী পরিবর্তন আসছে। এমন পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ সম্পৃক্ত শ্রমবাজার উপযোগী শ্রমশক্তি উৎপাদনে আমরা সফল হইনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সরকারের বিনিয়োগ কোনো কাজে আসেনি। রাজস্ব আহরণ এবং বাজেটে তার বিলি-বণ্টনে সে লক্ষ্য অর্জন গুরুত্ব পায়নি। উন্নয়ন নীতি ও কৌশল সে লক্ষ্যে গৃহীত না হওয়ায় বাজেট গতানুগতিক ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এমন পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির উপযোগী হতে পারেনি। ফলে প্রস্তাবিত বাজেট গণমুখী বলা যায় না।

প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ (বয়স: ১৫-২৯ বছর) শ্রমবাজারে আসছে। বর্তমানে এরাই দেশের মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশ, চার কোটির ওপর। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই শ্রমশক্তি। এ শক্তি সম্পদে পরিণত করা আজ আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এ শ্রমশক্তি কাজে সম্পৃক্ত হলে সেই কাজে সম্পদ বৃদ্ধি হবে, সে বৃদ্ধি উচ্চতর প্রবৃদ্ধি দেবে। তাই জনবল উন্নয়ন সর্বোচ্চ মনোযোগ পাবে। অথচ তেমন মনোযোগ পায়নি। তবে মনোযোগ পায় সরকারি খাতে নিয়োজিত প্রায় ২০ লাখ জনবল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সমন্বয়ে বেতন ও ভাতাদি বৃদ্ধি হয়। সঙ্গে নানা সুযোগ-সুবিধা: আর্থিক ছাড়ে ফ্ল্যাট-প্লট, করমুক্ত ভাতা, স্বল্প সুদে গাড়ি-বাড়ি কেনার ঋণ, পেনশন, স্বামী-স্ত্রীর পেনশন একজনের অবর্তমানে অন্যজন উত্তরাধিকারী, প্রতিবন্ধী সন্তানও উত্তরাধিকরী ইত্যাদি। আবার অনেকেই ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা রকম অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেন। এমন শ্রমশক্তি দেশের সম্পদ ও সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি তথা প্রবৃদ্ধি অর্জনে কতটা ইতিবাচক, তাও ভোক্তার ভাবনার বিষয়।

সরকারি খাতের বাইরে মোট শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশেরই কাজের সংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক। অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তি খাতভিত্তিক। এ খাতে সরকারি খাতের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতি অনিয়মিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো বেতন কাঠামোও নেই। মূলত এই বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তির ওপরই প্রবৃদ্ধি নির্ভরশীল। অথচ এরা ভয়ানক বৈষম্যের শিকার। সরকারি ও ব্যক্তি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির মধ্যে এমন বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি একেবারেই সরকারের বিবেচনায় নেই। এমন বৈষম্য বজায় রেখে কোনো জাতির পক্ষে দক্ষ ও সুস্বাস্থ্যসম্পন্ন জনসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। তেমন জনসম্পদ ব্যতীত টেকসই প্রবৃদ্ধিও অসম্ভব। আবার ব্যক্তি খাত বাজেটবহির্ভূত। সরকারি ও ব্যক্তি খাত মিলিয়ে সার্বিক কর্মকাণ্ডে অর্থপ্রবাহ এবং এর বৃদ্ধিতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। কিন্তু বাজেট কেবল সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ নিয়ে হয়। কিন্তু প্রবৃদ্ধি কেবল সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগেই নির্ভরশীল নয়, তাই প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে বাজেট সীমাবদ্ধতার শিকার।

ব্যক্তি খাত এখন বিনিয়োগ ও সুশাসন সংকটের শিকার। এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। ব্যাংকই একমাত্র ঋণের উৎস। ব্যাংকগুলো আমানতই পাচ্ছে না। বেশি বেশি সুদ প্রস্তাবেও কাজ হয়নি। এ বছরে সব কয়টি ব্যাংক মিলিয়ে বিনিয়োগযোগ্য আমানত নেমে এসেছে ৬৪ হাজার কোটি টাকায়। অথচ এ আমানত গত বছরেও ছিল প্রায় দ্বিগুণ। আবার ঋণের টাকাও যথাসময়ে পরিশোধ হচ্ছে না। ফলে আদায় অনিশ্চিত ঋণের পরিমাণ এখন  প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার তো আছেই। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় এখন অনেক বেশি। তাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। একসময় রিজার্ভ দিয়ে আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যেত। এখন তা চার মাসে নেমে এসেছে। বেকার যুবক কাজের প্রত্যাশায় নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছেন। এসব অবস্থা মোকাবেলায় কেবল ঋণখেলাপিদের ছাড় দেয়া ব্যতীত আর কোনো কিছুই করা হয়নি। তাতেও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ব্যক্তি খাত উদ্যোক্তা সংঘবদ্ধ দুর্নীতির সহায়তায় এমন অবস্থা মোকাবেলা করছে। সংঘবদ্ধ দুর্নীতি ছাড়া ব্যবসায় টিকে থাকা যাচ্ছে না। সঠিক ও সুস্থভাবে কোনো ব্যবসা চালানো যায় না। শক্তিশালী লবিং ব্যতীত কোনো উদ্যোক্তার পক্ষে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া অসম্ভব। তাই বিদ্যমান সুশাসন সংকটে ব্যক্তি খাত উদ্যোক্তাকে বিপথগামী হতে হয়। এমন সব ব্যক্তি খাতের পক্ষে যুগোপযোগী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো কৃষিভিত্তিক। তা সত্ত্বেও খাদ্যে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারায় খাদ্য আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে ১৯৭৩ ও ২০০৮ সালে দেশ চরম খাদ্য সংকটের শিকার হয়। ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে খাদ্য দুষ্প্রাপ্য ছিল। তখন অতিরিক্ত মূল্যেও খাদ্য পাওয়া যায়নি। আবার বন্যায় ফসলহানিতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে ব্যবসায়ীদের অবাধে চাল আমদানির সুযোগ দেয়া হয় এবং গত বছর প্রায় ৪০ লাখ টন চাল আমদানি হয়। তাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও পাচ্ছেন না কৃষক। ফলে শুল্ক আবার বাড়ানো হয়েছে। ধান-চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করেন। কৃষকের ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য ব্যবসায়ীরা চাল রফতানির সুযোগ পাবেন। তাতে কৃষকের নয়, ব্যবসায়ীর লাভ হবে। ভোক্তাকে চাল আরো বেশি দামে কিনতে হবে। রফতানির সুযোগ দেয়ায় ইলিশ মাছের মূল্য এত বেশি যে সে মাছ সাধারণ ভোক্তার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাতে জেলে লাভবান হননি। লাভ হয়েছে নানা পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের, স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের। কৃষক যে মূল্যে তার পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তা সে পণ্য যে মূল্যে ক্রয় করেন—এ উভয় মূল্যের ব্যবধান যৌক্তিক মুনাফাসহ পণ্যের সরবরাহ ব্যয় অপেক্ষা অনেক বেশি। এই অনেক বেশি অংশের অর্থ কৃষকের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হলে কৃষকের স্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষিত হয়। ওই অনেক বেশি অংশের অর্থ কৃষকের প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষিপণ্য সরবরাহ চেইন উন্নয়ন হলে সমস্যা সমাধান হয়। চাল আমদানিতে শুল্ক কমানো বা বাড়ানো কিংবা চাল রফতানি কোনো সমাধান নয়। কারণ চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

এলএনজি আমদানি ব্যয়ে ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য সরকার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি চায়। এ মাসেই মূল্যবৃদ্ধির আদেশ হবে। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হবে। ভোক্তার গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলই কেবল বাড়বে না, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যয় বাড়ায় ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। অথচ তার আয় বাড়বে না। সুতরাং এ ব্যয় বৃদ্ধির অভিঘাত ১২ কোটি নিম্ন আয়ের সাধারণ ভোক্তার জন্য কতটা সহনীয় হবে তা ভাবনার বিষয়। ভোক্তাদের কাছে বিষয়টি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ তেল, গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎ, এলপিজি ও এলএনজির মূল্য ও মূল্যবৃদ্ধি ন্যায্য ও যৌক্তিক কিনা। সঠিক দামে, সঠিক মানে এবং সঠিক মাপে ওইসব জ্বালানি পাওয়া ভোক্তার আইনি অধিকার। অথচ ভোক্তা সে অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব প্রসংগে ভোক্তার মৌলিক প্রশ্ন, এ বরাদ্দের যৌক্তিক ভিত্তি কী?

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নিম্নে বর্ণিত অসংগতিগুলো ভোক্তা অধিকার খর্ব করেছে:

১. গ্যাস খাত থেকে ভোক্তাদের কাছে সরকার প্রতি বছর যে রাজস্ব পায়, তার প্রবৃদ্ধি অত্যধিক এবং অযৌক্তিক। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যে রাজস্ব ছিল ৫ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ সালে তা হয় ১৪ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে ভোক্তারা দিয়েছেন হালনাগাদ মোট গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে প্রায় ১০ হাজার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এ খাতের কোম্পানি ও সংস্থাগুলো অত্যধিক মুনাফা করায় তাদের হালনাগাদ পুঞ্জীভূত সর্বমোট উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ হবে কমবেশি ৩০ হাজার কোটি টাকা। উচ্চমূল্যের এলএনজির কারণে গ্যাসে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা হয়। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও আইওসি গ্যাসের নির্ভরশীলতা হ্রাস করে গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় কমানোর জন্য গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়। প্রতি বছরই এসব তহবিলে ভোক্তারা অর্থ জমা দিচ্ছেন। চলতি অর্থবছরে জমা হবে যথাক্রমে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ও ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

২. এলএনজিযুক্ত হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। দেশী কোম্পানির গ্যাস উৎপাদন ব্যয়, এলএনজির ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয়, রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ ও সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় এবং গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়, পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের সার্ভিস চার্জ, জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়ন চাহিদা—এসব গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির নিয়ামকগুলো যৌক্তিক কিনা, তা যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ ভোক্তাদের নেই। কেবল সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জহার (২৫ ও ২৩ পয়সা/ঘনমিটার) বৃদ্ধি প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়। এ গণশুনানিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি বলে চালানো হয় এবং ভোক্তা প্রতারিত হন।

৩. সরবরাহ ব্যয় হার ৭ দশমিক ৩৯ টাকা থেকে বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ টাকা। ফলে চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। তবে বিতর্ক রয়েছে: সাড়ে ৬ ডলার দরের এলএনজি ক্রয় করা হয়েছে ১০ ডলারে। রিগ্যাসিফিকেশনে যৌক্তিক চার্জের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ধরা হয়েছে, এলএনজি পরিবহনে জাহাজ ভাড়া কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বেশি, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে দেশী কোম্পানির গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে গ্যাস সরবরাহে আইওসির গ্যাস বেড়েছে এবং দেশী কোম্পানির গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে আইওসি গ্যাসের অনুপাত ৬০ শতাংশ এবং আইওসি গ্যাসের মূল্যহার ২ দশমিক ৫৫ টাকা হলেও বাপেক্সের গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় ৩ দশমিক শূন্য ৪ টাকা। সঞ্চালন ও বিতরণে প্রকৃত ব্যয়সহ বিধিমতে নির্ধারিত মুনাফা দেয়ার পরেও প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাড়তি অর্থ সমন্বয়ে সঞ্চালন ও বিতরণ মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। কেবল তিতাসকে সিস্টেম লস সমন্বয় সুবিধা দেয়া হয়েছে। অন্যদের পেইড অব ক্যাপিটালের ওপর মুনাফা দেয়া হয়েছে ১২ শতাংশ অথচ তিতাসকে দেয়া হয় ১৮ শতাংশ। বেশি বেশি কর, মুনাফা, অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতি অব্যাহত থাকবে। এসব প্রতিরোধ করে ঘাটতি সমন্বয় করা হবে না। ঘাটতি সমন্বয়ে ভর্তুকি, আর ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্যবৃদ্ধি হবে। 

৪. মূল্যবৃদ্ধি ন্যায্য ও যৌক্তিক হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও সেখানে কতটা ব্যতয় ঘটে তার নমুনা নিম্নরূপ:

(ক) প্রি-পেইড ও ইভিসি মিটার না লাগিয়ে গ্যাস চুরির সুযোগ রেখে মিটারবিহীন আবাসিক এবং ইভিসি মিটারবিহীন শিল্প ও বাণিজ্যিক ভোক্তাদের গ্যাসের দাম বাড়ানো অন্যায় ও অযৌক্তিক। আবার এলপিজি পেট্রোলিয়াম পণ্যের বাই-প্রডাক্ট হওয়া সত্ত্বেও ভোক্তা পর্যায়ে এর মূল্য এলএনজির মূল্য ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে সিএনজির মূল্যও এলএনজির যৌক্তিক মূল্য অপেক্ষা অধিক। আবার পরিবহন ভাড়ায় ভোক্তারা জ্বালানি তেলের দরপতন সমন্বয় সুবিধা পাননি। দফায় দফায় সিএনজির দাম বাড়ায় ডিজেল ও সিএনজি উভয় পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি পায়। এ পরিস্থিতিতে সিএনজির আবারো মূল্যবৃদ্ধি পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ভাড়া বাড়ারই নামান্তর। সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি দ্বারা গ্যাসে যে পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় হবে, এর থেকে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ ভাড়া বৃদ্ধি দ্বারা ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। এমন অন্যায় ও অবিচার হবে জেনেও কমিশন মিটারবিহীন আবাসিক ভোক্তার গ্যাস এবং সিএনজির দাম বৃদ্ধিতে অনড়। ভোক্তাদের অভিমত, এলপিজির বাজার সম্প্রসারণে আবাসিক গ্যাস ও সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে, ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষায় কিংবা গ্যাসে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য নয়।

(খ) বিইআরসির আদেশ প্রতিপালন না করা বিইআরসি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে শাস্তি অর্থদণ্ড কিংবা কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। এ অপরাধের দণ্ডস্বরূপ মিটার লাগানোর আদেশ প্রতিপালিত না হওয়া অবধি তিতাসকে কস্ট প্লাস ট্যারিফের (মূল্যহার) পরিবর্তে শুধু কস্টভিত্তিক ট্যারিফ প্রদানের জন্য ভোক্তার পক্ষ থেকে কমিশনের কাছে নানাভাবে প্রস্তাব করা হয়। সে প্রস্তাব কোনো কাজে আসেনি। ফলে বিশেষ করে তিতাসের জন্য গ্যাস চুরি/আত্মসাতের সুযোগ অব্যাহত থাকে।

(গ) গ্যাস সংযোগ স্থগিত থাকা সত্ত্বেও সংযোগ দেয়া, ডিমান্ড নোটিস ইস্যু করা, অর্থ জমা নেয়া, সংযোগ না দিয়ে সংযোগের নামে নেয়া অর্থ বছরের পর বছর আটকে রাখা-সংক্রান্ত ভোক্তা অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি হয় না। তিতাসকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না। পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগও নিষ্পত্তি হয় না।

৫. ২০১৫-১৬ অর্থবছরের হিসাবে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়হার যৌক্তিক করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৫ টাকার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। সেই সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়হার যৌক্তিক করা হলে বছরে বিদ্যুৎ সরবরাহে ৮ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। বেতন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় সব ইউটিলিটির রাজস্ব ঘাটতি হয়। তা সমন্বয়ের জন্য সব ইউটিলিটির মূল্যহার বৃদ্ধির দরকার হয় কিন্তু বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি ব্যতীত। গণশুনানিতে প্রমাণ পাওয়া যায়, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যয় যৌক্তিক করা হলে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। তাতে ঘাটতি ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সমন্বয় হয়ে উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ তা যৌক্তিক না করে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি দেখানো হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা এবং সে ঘাটতি সমন্বয়ে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে মূল্যবৃদ্ধি করা হয় ৩৫ পয়সা। বাদবাকি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়।

৬. ২০০৯-১০ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর অবধি জ্বালানি তেলে ভর্তুকি প্রদান করা হয় ৩১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। দরপতন ও তা অব্যাহত থাকা এবং সে দরপতন যৌক্তিক সমন্বয় না হওয়ায় ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে অদ্যাবধি এ খাত লাভে রয়েছে। কিন্তু দরপতন সুবিধা ভোক্তারা পাননি। আবার সিএনজির মূল্যহার বৃদ্ধিতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির অভিঘাতের শিকার হতে হয় ভোক্তাকেই। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যয় ও ব্যয় বৃদ্ধি যৌক্তিক হলে এবং এ খাত দুর্নীতিমুক্ত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যহার কমিয়ে আনা সম্ভব। এ মূল্যহার যৌক্তিক কিনা, তা যাচাই-বাছাই করার সুযোগ ভোক্তার। মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির হলেও সে মূল্যহার অবৈধভাবে জ্বালানি বিভাগ নির্ধারণ করে। একইভাবে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির হওয়া সত্ত্বেও তা অবৈধভাবে নির্ধারণ করেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা।

৭. প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটে বিদ্যুতে ২৪ হাজার এবং জ্বালানিতে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে বিদ্যুতে ৬ হাজার ৫০০ এবং গ্যাসে ৩ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে গ্যাসে ভর্তুকির প্রস্তাব রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে গ্যাসে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা আরো বাড়বে। জ্বালানি তেলে ভর্তুকির কথা বলা হয়নি। তবে বিপিসি কিছুদিন আগেও বলেছে ডিজেলে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুতেও ঘাটতি প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা।

৮. ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিদ্যুতের পিক চাহিদা ছিল ৯ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ৭ হাজার ৩৫৬ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল প্রায় ২১ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১০ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ ঘাটতি নিরসনে অগ্রগতি নেই। এ সময়ে গড়ে বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে ১২ শতাংশ। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৬ শতাংশ। প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৯ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪০ শতাংশ। উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে তথা উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উত্পদানক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিকল্পিত এবং অযৌক্তিক। সুতরাং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি বা কম এর কোনোটারই যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কিত দলিলপত্রাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকার যেকোনো মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে মূল্যহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। নানা ধরনের গৃহীত কৌশল এ মূল্যবৃদ্ধির নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে ভোক্তা অধিকার বিপন্ন।

সর্বোপরি ভোক্তার ভাবনার বিষয় কীভাবে যৌক্তিক ব্যয়ে মানসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করে সব খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা যায়। নইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান অসংগতি দূর হবে না এবং ভোক্তা অধিকার খর্ব হবে। তাই সে লক্ষ্য অর্জনে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ এবং দিকনির্দেশনা দরকার। অন্যথায় রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশলই বাজেটকে ভোক্তাস্বার্থ ও অধিকারবিরোধী বলে প্রমাণ করবে।

 

লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

অধ্যাপক ও ডিন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা