শেষ পাতা

সিপিডির পর্যালোচনা : চাপের মুখে সামষ্টিক অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ১২, ২০১৯

ব্যাংকিং খাত সংকটে আছে। বেসরকারি বিনিয়োগ আশানুরূপ নয়। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ১০ শতাংশের নিচে। বেড়ে চলেছে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি। বাজেট বাস্তবায়নের হারও কমছে। সব মিলিয়ে চাপের মধ্যে আছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ পর্যালোচনা দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংস্থাটি এমন এক সময় দেশের অর্থনীতি নিয়ে এ পর্যালোচনা দিল, যার দুদিন পরই নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী। যে কারণে গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনের শিরোনামও দেয়া হয়েছে ‘জাতীয় অর্থনীতির পর্যালোচনা ও আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গ’। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির জাতীয় অর্থনীতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান। এতে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দুদিন বাদে নতুন বাজেট। নতুন একজন অর্থমন্ত্রী বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করবেন। বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারের যথাযথ গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করছি আমরা। এটি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সর্বশেষ বছর। সেদিক থেকে চিন্তা করলেও এ বাজেট হবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আকাঙ্ক্ষা বা লক্ষ্যের মধ্যে যে ঘাটতি ছিল, তা মেটানোর সর্বশেষ প্রচেষ্টা। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ বাজেট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি ভিন্নধর্মী সংসদে তা উপস্থাপন হতে যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় অর্থনীতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ উপস্থাপনায় সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমরা তিনটি বিশেষ দিক দেখাতে চেয়েছি। তা হচ্ছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, নির্বাচনী ইশতেহার ও টেকসই উন্নয়ন। অর্থনীতি ও আয়-উন্নয়নের বাইরে গিয়ে সমপর্যায়ের সাতটি দেশের সঙ্গে তুলনায় দেখা যায়, প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ভালো করছে। তবে কিছু সূচক যেমন মাথাপিছু আয় (পিপিপি) এবং সঞ্চয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। সরকারি বিনিয়োগ ভালোই হচ্ছে, কিন্তু সার্বিকভাবে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে আরো কাজ করার আছে। আমরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছি রেমিট্যান্সের প্রবাহ ও রফতানি লক্ষ্যমাত্রায়। পাঁচ বছর আগে যে লক্ষ্যগুলো স্থির করা হয়েছিল, বর্তমান অবস্থায় তা অর্জন করা সম্ভব না।

তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে আমাদেরও। আইএমএফ বলছে, ২০১৮-১৯ এ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে আসবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যে তেল-সারের দাম বাড়ছে। সামনের দিনগুলোয় অন্যান্য দেশের মুদ্রা অবমূল্যায়িত হতে পারে। অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার দাবি রাখে।

সরকারের রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের পর থেকে আমাদের রাজস্ব-জিডিপি (কর-জিডিপি) অনুপাত খুব একটা বাড়ছে না। ২০১৮ সালে এটি ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ শতাংশেরও নিচে ছিল। একইভাবে সরকারি ব্যয়ের অনুপাতও কমেছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর থেকে বেশকিছু নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাজেট বাস্তবায়নের হার কমে গেছে। আগে ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করতাম, এখন তা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। আগে বলতাম আয় করতে পারছি না, ব্যয়ও করতে পারছি না, ফলে বাজেটের ঘাটতির চাপ অতটা নেই। কিন্তু এখন ঘাটতির ওপর চাপটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখনো হয়তো এটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে, কিন্তু ধীরে ধীরে চাপটা বাড়ছে। রাজস্ব আয়ে প্রত্যক্ষ করের অংশটাও বাড়ানো যাচ্ছে না। করনীতির মাধ্যমে যে সামাজিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন করব, সে জায়গাটায়ও আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে বলা হয়, অনেকগুলো বিষয় বড়ভাবে চলে আসছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় মূলধন সংকট রয়েছে। শ্রেণীকৃত ঋণও কমেনি। আরেকটা বড় চিন্তার কারণ হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময় তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যেটা সামনে আরো বাড়বে। ব্যাংকিং খাতের আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধিও অনেকটাই কমে গেছে। সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। যেহেতু জাতীয় সঞ্চয়পত্রে প্রচুর বিনিয়োগ হচ্ছে, সেটার একটা প্রভাব ব্যাংকিং খাতের আমানত সংগ্রহ ও অন্যান্য সূচকেও পড়ছে।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না জানিয়ে সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে ধরনের পদক্ষেপ দেখেছি, সেগুলো যথেষ্ট আশার সঞ্চার করেছে বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে না। ১৬ মে সার্কুলার এসেছে ঋণ পুনর্গঠনের। এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা দূর হবে না। তারল্য সংকটের কারণে আবার কল মানির সুদের হার বাড়ছে। বড় সমস্যা হলো প্রকৃত সুদহার।

ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের জন্য আশু পদক্ষেপ দরকার বলে মনে করে সিপিডি। সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠনের মাধ্যমে সংস্কার করতে হবে। এর জন্য বাজেট সাপোর্ট লাগলেও তা যেন বাজেটে রাখা হয়। এক্ষেত্রে শৃঙ্খলার বিষয়গুলো যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিপালন করতে পারে, তা দেখতে হবে। সংস্কারের অনেক বিষয় আছে। ব্যাংকরাপ্সি অ্যাক্ট এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংস্কার ও সংশোধনের প্রয়োজন আছে।

সংবাদ সম্মেলনে ধানের দামের প্রসঙ্গও তুলে এনেছে সিপিডি। ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ৫ হাজার টাকা করে দেয়ার সুপারিশ করছে সংস্থাটি। সিপিডি হিসাব করে দেখিয়েছে, এটি করলে সরকারের ব্যয় হবে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রফতানি খাত ৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দাবি করছে। এটা দিলে সরকারের বাড়তি ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে। ফলে রফতানি খাতে মোট ভর্তুকি দাঁড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো। আমি কৃষককে ৯ হাজার কোটি টাকা দিতে কোনো সমস্যা দেখি না। এটা দিলে তা যুক্তিযুক্ত ও সাম্যবাদী আচরণ হবে। এ বছর ধানের দাম নিয়ে কৃষকের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এ রকম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার প্রকট চিত্র অন্য খাতে দেখা যায়নি। তাই কৃষক ভর্তুকি দাবি করতেই পারেন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে কয়টা পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সবগুলোই আরো বেশি ক্ষতিকর হয়েছে বলে মন্তব্য করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত জানুয়ারিতে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, খেলাপি ঋণ ১ টাকাও বাড়বে না। অথচ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। ১ টাকা বাড়বে না বলার পর ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে নাড়াচাড়া করে ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান হবে না। কাঠামোগতভাবে সুশাসন যদি আনা না যায় এবং যারা ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা না যায়, তাহলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট সৃষ্টি হবে। এটা দেশ ও জাতির জন্য ভালো হবে না। সুদের হারকে নাড়াচাড়া করে যে কিছু করা যাবে না তার প্রমাণ হলো, সুদের হার কমে গেলেও ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তারল্য চলে গেছে, ব্যাংকে কেউ টাকা রাখছে না, যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, তারাও টাকা দিচ্ছে না। এ তারল্য সংকটের সমাধান সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে হুকুমের অর্থনীতির মধ্যে ফেলে দিলে তা কোনোভাবেই সুখকর হবে না।

রাজস্ব ঘাটতি প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, প্রতি বছরই রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে; চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা বলা হলেও বছর শেষে এর পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। গত ১০ বছরে যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন চাপের মুখে আছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একসময় অর্থনীতির শক্তি ছিল। সে শক্তিতে এখন চিড় ধরেছে। সেখানে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। এর অনুষঙ্গগুলো হলো কর আহরণে অপারগতা। বাংলাদেশের উন্নয়নে একটা অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে এটি। এটাকে যদি অতিক্রম করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অভিলাষ, তার জন্য বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাবে। এছাড়া অন্য উৎস থেকে যদি বিনিয়োগের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।