কেঁচো কম্পোস্টের গ্রাম কুজাইল

বণিক বার্তা প্রতিনিধি নওগাঁ | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

নওগাঁর রানীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম কুজাইল। একসময় সবজি উৎপাদনের জন্য গ্রামটির খ্যাতি ছিল। ‘কমন ইন্টারেস্টেড গ্রুপ (সিআইজি) সমবায় সমিতির’ উদ্যোগে গড়ে তোলা কেঁচো কম্পোস্টের খামার বদলে দিয়েছে এ গ্রামের চিত্র। বর্তমানে কুজাইল গ্রামের ৩০ জন নারী সিআইজির মাধ্যমে কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে বদলে দিয়েছেন নিজেদের ভাগ্য। সেসঙ্গে সবজির জন্য বিখ্যাত গ্রামটি এখন সবার কাছে কেঁচো কম্পোস্টের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

 জানা গেছে, গৃহবধূ সানজিদা আক্তারের উদ্যোগে কুজাইল গ্রামের দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে ২০১৮ সালে গড়ে ওঠে সিআইজি সমবায় সমিতি। বর্তমানে ওই সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩০। সমিতির সদস্যরা প্রতি মাসে দুই হাজার কেজি কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করেন। তাদের উৎপাদিত সার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।

এদিকে সিআইজি উৎপাদিত কেঁচো কম্পোস্টের কারণে কুজাইল গ্রামে কমেছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার। গ্রামের অধিকাংশ কৃষক এখন জমিতে কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন।

সমিতির দলনেত্রী ও উদ্যোক্তা সানজিদা আক্তার বলেন, একসময় গ্রামের অন্য নারীদের সঙ্গে নিয়ে দলীয়ভাবে পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষ করতাম। ক্ষেত থেকে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করার উপায় জানতে কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখন কৃষি অফিস ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন, বাজারজাত ও প্যাকেজিংসহ নানা বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়। বর্তমানে আমাদের কারখানায় কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদনের জন্য ১০টি বড় হাউজ রয়েছে। এছাড়া শতাধিক মাটির পাত্রে এ কম্পোস্ট সার তৈরি করছি আমরা। আমাদের দেখাদেখি গ্রামের অধিকাংশ নারী এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, উৎপাদিত সার নিজেদের সবজি বাগানে ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছি। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বিষমুক্ত সবজি বাজারে বিক্রি করছি। আমরা প্রতি মাসে দুই হাজার কেজি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করি। প্রতি কেজি সার উৎপাদনে খরচ হয় ৩ টাকা। বাজারে তা ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া পাঁচ থেকে ১০ কেজির প্যাকেট তৈরি করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করি।

সানজিদা আক্তা বলেন, কেঁচো কম্পোস্টের উপকারিতা জানায় বর্তমানে আমাদের গ্রামের কৃষকরা ফসলে খুব বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। এতে সবজি ও ফসল উৎপাদনে খরচ যেমন কমছে, তেমনি বিষমুক্তভাবে সেসব পাচ্ছেন ভোক্তারা।

কুজাইল গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, সমিতির সদস্যদের দেখাদেখি কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করি। বর্তমানে প্রতি মাসে ৪০০ কেজি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছি। ১৫ টাকা কেজি হিসেবে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। যা খরচ হয় তার চেয়ে লাভ বেশি থাকে। সংসারের কাজের ফাঁকে এ পেশায় বাড়তি আয় হচ্ছে। এজন্য গ্রামের অন্য নারীরাও এখন কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদনে এগিয়ে আসছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম বলেন, কৃষি অফিস নারীদের এ ধরনের উদ্যোগে যাবতীয় উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও কেঁচো দিয়ে পরিবেশবান্ধব কম্পোস্ট সার উৎপাদনে সার্বিক সহযোগিতা করে। সংসারের কাজের ফাঁকে অবসরে তারা এ সার উৎপাদন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এবং নিজেরাই ক্ষেতে ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন।

তিনি জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি প্রদর্শনী প্লট, ১০ কেজি কেঁচো ও ১০টি পাকা চেম্বার তৈরি করে দেয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামীতে আরো বেশিসংখ্যক নারী এ কাজে সম্পৃক্ত হবেন।